যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অবজ্ঞা করা হয়েছিল সে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা বিশ্ব খাদ্য সংস্থাসহ বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময়। চাল, আলু, আম, সবজিসহ ২২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ দেশের একটি। এর পেছনে যাদের ভূমিকা আছে, তাদের সবার আগে কাজী এম বদরুদ্দোজার নাম থাকবে। দেশের কৃষি খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া থেকে শুরু করে কৃষি ও কৃষকের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কাজ করেছেন এ কৃষি সংগঠক। বস্তুত এ কারণে ৩০ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৪টায় তার মৃত্যুর খবর আসতেই শোকে মুহ্যমান কৃষিবিদরা। সফল কৃষি সংগঠক এবং ন্যাশনাল ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট ড. কাজী এম বদরুদ্দোজার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সর্বস্তরের মানুষ।
বার্ধক্যজনিত কারণে দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কৃষি গবেষণার এ প্রাণপুরুষ, যার নামানুসারে কাজী পেয়ারা নামে একটি জাতের পেয়ারা রয়েছে, যা স্বাদে ও পুষ্টিমানে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ধানের বাইরে দুটি দানাদার ফসল চাষ শুরুর ক্ষেত্রেও কাজী বদরুদ্দোজার হাত রয়েছে। দেশে আধুনিক জাতের গম উদ্ভাবন ও চাষ শুরু করা আর ভুট্টার বাণিজ্যিক আবাদ তার হাত দিয়ে। ভুট্টা থেকে তেল উদ্ভাবন এবং তা পোলট্রি শিল্পের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার শুরুর ধারণাটিও তার কাছ থেকে আসা। ছত্রাকের গণ ‘কাজিবোলেটাস’ নামকরণও করা তার নাম থেকে। এসব অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন এ বিজ্ঞানী।
শুধু ধান বা ভাত খেলে হবে না। সবজি, ফল ও আলুর মতো পুষ্টিকর খাবারও লাগবে। সঙ্গে থাকতে হবে মাছ, দুধ ও মাংস। এসব খাদ্য গৃহস্থ পর্যায়ে স্বল্প পরিসরে উৎপাদন হতো। কিন্তু বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ ও উৎপাদন হতো না। মাছ, গরু, মুরগি, ফল ও সবজির উন্নত জাত চাই। কিন্তু এগুলো কোথা থেকে আসবে? এসব চিন্তা করে কাজী বদরুদ্দোজার নেতৃত্বে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার (ইপসা), বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তার নাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গঠনেও কাজ করেন তিনি। ভিয়েতনামের ইনস্টিটিউট অব জেনেটিকস, পাকিস্তানের এরিড জোন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠান তৈরিতেও ভূমিকা ছিল তার। এসব সংস্থার জন্য বিশাল পরিসরের কার্যালয়, ল্যাবরেটরি, স্থানীয় পর্যায়ে উপকেন্দ্রের জন্য জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে আধুনিক সরঞ্জামাদি ও গবেষক তৈরির কাজেও তিনি নেতৃত্ব দেন। দেশের দুগ্ধ খামারিদের সংগঠন মিল্কভিটার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
১৯৭৪ সালের কথা। ফার্মগেটের খামারবাড়িতে একটি পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের সব বন্দোবস্ত চূড়ান্ত। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকেও খামারের ওই জমিতে হোটেল নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়ে গেছে। এ খবর পেয়ে কাজী এম বদরুদ্দোজা ছুটে গেলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে। গিয়ে বললেন, কৃষি গবেষণার জমিতে তিনি হোটেল বানাতে দেবেন না। বঙ্গবন্ধু বললেন, কেন? উত্তরে কাজী সাহেব বললেন, ‘এটা হলে কৃষির মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। এ জমিতে হতে হবে কৃষি গবেষণার জন্য প্রশাসনিক সমন্বয়ের প্রধান কার্যালয়।’ বঙ্গবন্ধু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুই ঠিক কী চাস, আমার কাছে লিখে নিয়ে আয়।’ বঙ্গবন্ধুর সহকারীর কক্ষে গিয়ে কাজী বদরুদ্দোজা বাংলাদেশ ‘কৃষি গবেষণা কাউন্সিল’ (বার্ক)-এর গঠন কাঠামো ও কার্যপরিধি এবং প্রস্তাব লিখে নিয়ে এলেন। বঙ্গবন্ধু তাতেই স্বাক্ষর করে অনুমোদন দিয়ে দিলেন। জন্ম নিল বাংলাদেশের কৃষিবিষয়ক সব সংস্থার সমন্বয়কারী এ প্রতিষ্ঠান। শুধু বার্ক নয়, স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের কৃষি খাতের যতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তার প্রায় সব কাজী বদরুদ্দোজার হাত দিয়ে তৈরি।
৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত কৃষির কিংবদন্তি ড. কাজী বদরুদ্দোজা ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়। তার মনন ও চিন্তার আকাশজুড়ে বিস্তৃত ছিল কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদরা। তার পূর্বপুরুষরা বগুড়ায় এসেছিলেন ভারতের মিরাট থেকে, সেখানকার নবাবদের বংশধর ছিলেন তারা। ১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম সিপাহি বিদ্রোহে এ পরিবারের সদস্যরা যুক্ত ছিলেন। এতে ইংরেজ শাসকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ফলে পরিবারের সদস্যরা একপর্যায়ে নিজেদের জীবন বাঁচাতে ভারত থেকে পালিয়ে এ দেশের মাটিতে আশ্রয় নেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল হয়ে পড়া ওই পরিবারের সদস্য হিসেবে কাজী ছোটবেলা থেকেই মেধাবৃত্তির টাকা এবং টিউশনি করে লেখাপড়া করেছেন। তিনি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের অধীনে বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি-এজি ডিগ্রি লাভ করেন।
বিভিন্ন সংবাদপত্রের আলোকে ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা সম্পর্কে দেখা যায়, ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি-এগ্রি ডিগ্রি শেষ করার আগে কাজী বদরুদ্দোজার ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানে বিভাগীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অনুমোদনে এগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে একজন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে সঠিকভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও নেতৃত্বের গুণাবলির জন্য তিনি ‘ফুলব্রাইট’ স্কলারশিপ পেয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। ১৯৫৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রপ বোটানিতে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ দেশে ফিরে এসে কৃষি গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। এর পর থেকে সারা জীবন তিনি নিজের গবেষণা এবং এ দেশের কৃষির উন্নতির জন্যই ব্যয় করে গেছেন।
তৎকালীন পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক ও মহাপরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রথম দেশে উচ্চফলনশীল গম চাষের প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ইকোনমিক বোটানিস্ট (ফাইবার) পদ লাভ করেন। স্বল্প পরিচিত ফসল গম ও ভুট্টা চাষ সম্পর্কে জানার জন্য তিনি সুইডেনের বিশ্বখ্যাত স্তালভ গবেষণা কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। এর পর পরই লুগন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপ ইন জেনেটিকস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে দেশে ফেরেন এবং নতুন উদ্যমে আবারো কৃষি গবেষণায় মনোনিবেশ করেন।
প্রখর স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন প্রথিতযশা এ বিজ্ঞানীর মহাপ্রয়াণে আজ কৃষি খাতের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কৃষিবিদরা আজ গভীরভাবে শোকাহত।
মো. বশিরুল ইসলাম: কৃষিবিদ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়