গত
বছর থেকে শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলো নতুন কিছু সমস্যায় ভুগছে। দেশভেদে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সমস্যার প্রকৃতি মোটামুটি একই। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা ও শিশুখাদ্যের (বেবি ফর্মুলা) জটিল ঘাটতি নিয়ে। রাশিয়ার জীবাশা্ম জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো আবার জ্বালানি সরবরাহজনিত ঝুঁকিতে ভুগছে। তদুপরি প্রায় সব দেশই উচ্চমূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
কেউ কেউ এসব সমস্যার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা, বিশেষ করে বিশ্বায়নকে দায়ী করেছে। এ প্রেক্ষাপটে বি-বিশ্বায়ন (ডিগ্লোবালাইজেশন)
খণ্ডীকরণ (ফ্রেগমেন্টেশন), উৎপাদন
কর্মকাণ্ড নিজ দেশে স্থানান্তর (রিশোরিং), কোনো
ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশে স্থানান্তর (ফ্রেন্ড-শোরিং), পরিবেশগত
অভিঘাত যথাসম্ভব কম রেখে অর্থনীতির বিকাশ (ডিকাপলিং) এবং স্থায়িত্বশীলতা (রেজিলিয়েন্স) এখন বহুল ব্যবহূত শব্দে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী একটা ধারণা গড়ে উঠেছে, অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল থাকলে প্রতিটি দেশেই সাম্প্রতিক অভিঘাতের আঁচ অনেক কম পড়ত।
সরবরাহ নিগড় যে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্রমহ্রাসমান রিটার্নের পরিস্থিতি তৈরি করে, স্বয়ম্ভরতার যুক্তিটা আসলে অনেক ক্ষেত্রে এ পর্যবেক্ষণের বাইরে চলে যায়। আমরা অব্যাহতভাবে দেখছি, অর্থনীতির ভাষায় পরিচিত সুরক্ষাবাদী সরকারি নীতিগুলো বেশ রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে। এর শুরুটা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে, ২০১৮ সালে তিনি যখন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন। অভিপ্রকাশটা এমন, আমাদের সবাইকে সুরক্ষায় বাণিজ্য বাধাগুলো (শুল্ক-অশুল্ক উভয়ই) সাহায্য করবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলো বড় দৃষ্টান্ত, সরকারের আরোপিত বাণিজ্য বাধাগুলো অর্থনীতির স্থায়িত্বশীলতা কমিয়েছে। কাজেই প্রতিটি ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত উদারীকরণই সমস্যা নিরসনে সহায়ক হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শিপিং প্রতিবন্ধকতা নিয়ে প্রথমে আলাপটা শুরু করা যাক। নানা সীমাবদ্ধতায় দেশটির শিপিং খাতটি একটা অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রতিকার হলো জোনস অ্যাক্ট সংশোধন করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলোর মধ্যে পরিচালিত সব শিপিংয়ের ক্ষেত্রে নিজস্ব জাহাজ এবং নাবিক হিসেবে অন্তত ৭৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের নিয়োগের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে।
মার্কিন স্বয়ংস্পূর্ণতা ও জাতীয় নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে প্রণীত এ আইন আসলে ১৯২০ সালে কার্যকর করা হয়। কিন্তু গত বছরজুড়ে পণ্য আমদানির মতো আকস্মিক চাহিদার উল্লম্ফন সামলাতে দেশটির মেরিটাইম ইন্ডাস্ট্রির অসামর্থ্য সরবরাহ নিগড়ে অযাচিত দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করেছে। জোনস অ্যাক্ট না থাকলে এ ধরনের স্ফীত চাহিদা সামাল দিতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী জাহাজ ভাড়া করতে পারত এবং তাতে লজিস্টিকস আরো বেশি স্থিতিশীল হতো। অথচ দুঃখজনকভাবে আইনটি এখনো হালনাগাদ করা হয়নি।
অধিকন্তু, যুক্তরাষ্ট্রে স্থলপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ট্রাক চ্যাসিসের ঘাটতিও এ সমস্যার একটা
অংশে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধান হলো বিদেশ থেকে ট্রাক চ্যাসিসের মতো পরিবহন কাঠামো আমদানি বাধাগ্রস্ত করে এমন সব শুল্ক প্রত্যাহার, যা ট্রাকের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করত।
দেশটিতে শিশুখাদ্যের ঘাটতি নিরসনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল দাবি করে। দেশটির শিশুখাদ্য উৎপাদনকারী অন্যতম বড় কোম্পানি অ্যাবট নিউট্রিশন গত ফেব্রুয়ারির দিকে একটি কারখানায় ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি চিহ্নিত করে। এরপর কিছু পণ্য বাজার থেকে তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। প্রত্যাহার করা একটা মামুলি বিষয়, বিশেষ কোনো ব্যাপার নয়। তবে এ ঘটনায় সৃষ্ট শিশুখাদ্যের তীব্র ঘাটতি আমাদের দেখায়, বেশির ভাগ ঘাটতি মেটাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আসলে আমাদের কতটা সাহায্য করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে শিশুখাদ্যের আদৌ কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দুগ্ধজাত পণ্যের
আমদানির ওপর অতি সুরক্ষাবাদী কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সেগুলোর মধ্যে শুল্কের পাশাপাশি রয়েছে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধমূলক প্রশাসনিক বাধা এবং ‘বায় আমেরিকান’ নীতির মতো পদক্ষেপ। এসব পদক্ষেপে নারী, নবজাতক ও শিশুদের (ডব্লিউটিসি) জন্য ফেডারেল সরকারের বিশেষ সম্পূরক কর্মসূচি বেশ বাধাগ্রস্ত হয়—যে কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটি পরিভোগকৃত মোট শিশুখাদ্যের অর্ধেকই বিতরণ করে। এমনকি যখন উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনা চলছিল, তখন
ট্রাম্প কানাডা থেকেও শিশুখাদ্য আমদানিতে বাধা প্রদান করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অবশ্য সম্প্রতি সাময়িক আমদানির অনুমতি দিতে কিছুটা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
শিশুখাদ্য-সংক্রান্ত ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে কেউ ভালো-মন্দের একটা সাধারণ সিদ্ধান্ত টানতে পারে। এটা সত্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক্সপোজার মাঝেমধ্যে উদ্বায়িতার উৎস হতে পারে, যখন অভিঘাতগুলো সৃষ্টি হয় বিদেশে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ১০ বছর ধরে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর জার্মানির স্বেচ্ছাধীন নির্ভরতা দেশটিকে জ্বালানি নিরাপত্তায় খুবই নাজুক করে তুলেছে, যখন ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু বিপরীতটাও খানিকটা সত্য। রক্ষণশীলতার পরিবর্তে মুক্ত বাণিজ্য উদ্বায়িতাও কমাতে পারে—যখন কোনো অভিঘাতের উৎস সুনির্দিষ্ট দেশের অভ্যন্তরে।
ইত্যবসরে সংকট বিবেচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে চায়, বিশেষ করে যেসব জীবাশা্ম জ্বালানি আগে রাশিয়া থেকে কেনা হতো তার পরিবর্তে। এক্ষেত্রে একটা নীতি সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের দাম আরো বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, সেটি হলো সোলার প্যানেল ও উয়িন্ড টারবাইন আমদানির ওপর শুল্ক বাধা তুলে দেওয়া।
গত ৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সোলার প্যানেল আমদানির ওপর নতুন শুল্ক দুই বছরের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এটা পরিবেশ এবং উচ্চ বৈশ্বিক জ্বালানির দাম মোকাবেলা—দুই দিক থেকে ভালো। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পুরনো শুল্ক বহাল আছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পদক্ষেপ নেবে, যেখানে রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমানো আরো বেশি কঠিন হবে। সুতরাং নবায়নযোগ্য জ্বালানি-সংক্রান্ত সরঞ্জামের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার ও অন্য বাধাগুলো দূরীকরণ হবে তাদের জন্য সঠিক নির্দেশনার একটা পদক্ষেপ।
চূড়ান্তভাবে বলতে গেলে চলমান মূল্যস্ফীতি সমস্যা মোকাবেলার একটা উপায় হলো সাধারণভাবে আমদানি বাধাগুলো কমানো। ট্রাক চ্যাসিস, শিশুখাদ্য ও সোলার প্যানেলের ক্ষেত্রে যা সত্য সেটা ভোগ্যপণ্য, শিল্পপণ্যসহ সামগ্রিকভাবে বাণিজ্যযোগ্য সব পণ্যের ক্ষেত্রেও সত্য। কানাডা থেকে সফটউড আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক গৃহনির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক মার্কিন প্রতিষ্ঠানের অর্থ পরিশোধের মূল্য বাড়িয়েছে, যার বিপরীতে পেরেক, অটোমোবাইল এবং ওই দুটি ধাতুকেন্দ্রিক আরো অনেক পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভোক্তা ব্যয়ও সমান্তরালে বাড়িয়ে দিয়েছে।
এক সাম্প্রতিক গবেষণায় পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস প্রাক্কলন করেছে, বাণিজ্য উদারীকরণের একটি টেকসই প্যাকেজ একবারে মার্কিন ভোক্তা মূল্য সূচক মূল্যস্ফীতি প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমাতে পারে, অঙ্কের হিসাবে যা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারপ্রতি ৭৯৭ ডলারের সমপরিমাণ। বলা হচ্ছে, বাইডেন প্রশাসন বিশেষ করে চীন থেকে আমদানির ওপর ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের কিছুটা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে, এমনটা হলে তা মূল্যস্ফীতি তাত্ক্ষণিকভাবে কমাতে সহায়ক হবে। মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব হবে ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্টের কম। কেননা পুরোপুরি ‘টেকসই প্যাকেজ’ গ্রহণ করা হবে না। তবে নিশ্চিতভাবে এটা হবে একটা উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ।
সত্যি বলতে কি, মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় বাণিজ্য উদারীকরণ একা যথেষ্ট নয়; আরো কিছু পদক্ষেপও এর সঙ্গে নেয়া জরুরি। কিন্তু শিশুখাদ্য, পরিবহন বাধা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো এক্ষেত্রেও বৃহত্তর শিক্ষাটা একই। সেটি হলো, বাণিজ্যে উন্মুক্ততা বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়িত্বশীলতার একটা উৎস হতে পারে।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
জেফরি
ফ্রাঙ্কেল: যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির