শিক্ষা নীতি

আচরণবিধি লেখা যায়, নৈতিকতা লিখে দেয়া যায় না

শিক্ষক শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের ওপর অন্তত তিনটি পরিচয় আপনা থেকেই এসে পড়ে, তিনি চান বা না চান। প্রথমটি, তিনি একজন অনুসরণযোগ্য মানুষ, প্রচলিত কথায় রোল মডেল। শব্দটি এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে আজকাল অনেকে এটি নিয়ে ঠাট্টাও করেন।

একজন চিকিৎসকের একটি ভুল সিদ্ধান্তে একজন রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হন, একজন প্রকৌশলীর ভুলে একটি সেতু বা ভবন বিপদে পড়ে। কিন্তু একজন শিক্ষকের একটি ভুল আচরণ নীরবে ছড়িয়ে পড়ে বহু শিক্ষার্থীর চিন্তায়, মূল্যবোধে এবং তাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে। এ কারণেই শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি এমন এক সামাজিক দায়িত্ব, যেখানে একজন মানুষের কথা, আচরণ ও জীবনযাপনের ধরন অন্য বহু মানুষের চরিত্র গঠনে অংশ নেয়। শিক্ষকের নৈতিকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে তাই কয়েকটি নিয়মকানুন বা আচরণবিধির তালিকায় থেমে থাকা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তির মূল্যবোধ, সমাজের প্রত্যাশা, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং মানুষের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা।

মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও নীতিশাস্ত্র—তিনটি শব্দ আমরা প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহার করি, অথচ এগুলোর মধ্যে কাজের পার্থক্য আছে। মূল্যবোধ মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আদর্শ, যা সে নিজের জীবনে অনুশীলন করে এবং যার আলোকে ভালো-মন্দ বা ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে। নীতিশাস্ত্র বা এথিকস মূলত একটি কাঠামো, প্রতিষ্ঠানের লিখিত নির্দেশনা, যা বলে দেয় কী করা যাবে আর কী করা যাবে না। নৈতিকতা হলো সেই নির্দেশনাকে নিজের ভেতরে ধারণ করে আচরণে পরিণত করার ব্যক্তিগত দায়। প্রতিটি লিখিত আচরণবিধির নিচে একটি নৈতিক ভিত্তি থাকে, কিন্তু আচরণবিধি নিজে নৈতিকতা তৈরি করতে পারে না। প্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষককে লিখে দিতে পারে তাকে কী করতে হবে, কিন্তু কেন তিনি সঠিক কাজটি করবেন, সেই উপলব্ধি আসে তার বিবেক থেকে। এ পার্থক্য বুঝলে শিক্ষকতার নৈতিকতার আলোচনা অনেক সহজ হয়ে যায়।

শিক্ষক শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের ওপর অন্তত তিনটি পরিচয় আপনা থেকেই এসে পড়ে, তিনি চান বা না চান। প্রথমটি, তিনি একজন অনুসরণযোগ্য মানুষ, প্রচলিত কথায় রোল মডেল। শব্দটি এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে আজকাল অনেকে এটি নিয়ে ঠাট্টাও করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ পরিচয় শিক্ষককে ঘোষণা দিয়ে নিতে হয় না, এটি তার ওপর আরোপিত হয়। শ্রেণীকক্ষ অনেকটা একটি মঞ্চের মতো, যেখানে শিক্ষকের ওপর এক অদৃশ্য আলোকবৃত্ত পড়ে থাকে। শিক্ষার্থীরা শুধু তার বক্তব্য শোনে না, তিনি কীভাবে কথা বলেন, ভিন্নমত কীভাবে নেন, ভুল স্বীকার করেন কিনা, দুর্বল শিক্ষার্থীর সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, সবই লক্ষ করে। যিনি শ্রেণীকক্ষে সমতার কথা বলেন, অথচ সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীকে বাড়তি গুরুত্ব দেন, তার বক্তব্যের চেয়ে আচরণটিই শিক্ষার্থীর মনে গভীর দাগ কাটে।

দ্বিতীয় পরিচয়টি হলো, শিক্ষকের ভূমিকা কখনো স্থির থাকে না, তা প্রতি ঘণ্টায়, প্রতিটি প্রেক্ষাপটে বদলায়। একই মানুষ কখনো জ্ঞানদাতা, কখনো পরামর্শদাতা, কখনো অভিভাবকের মতো সহায়তাকারী, কখনো কেবল একজন মনোযোগী শ্রোতা। যে শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে না, তাকে অলস বলে দেয়া সহজ, কিন্তু খোঁজ নিলে হয়তো জানা যাবে সংসার চালাতে তাকে রাতে কাজ করতে হয়। তখন শিক্ষককে একই সঙ্গে নিয়মের প্রতি দায়বদ্ধ আর মানুষের বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল থাকতে হয়। সহানুভূতি মানে নিয়ম ভেঙে বিশেষ সুবিধা দেয়া নয়, ন্যায্য উপায়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করা। তৃতীয় পরিচয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকের প্রধান কাজ বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণ করা, শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, প্রশ্ন তোলা এবং উদ্ভাবনী মন তৈরি করার দায়িত্ব। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান মর্যাদা দিই না, যেন যে হাতে-কলমে কাজ শেখে সে জ্ঞানের শিক্ষার্থী নয়। পৃথিবীর বহু দেশে এ বিভাজন নেই, আর দক্ষ কারিগর বা প্রযুক্তিবিদের ব্যবহারিক জ্ঞানকে ছোট করে দেখা জ্ঞানের বৈচিত্র্যকেই অস্বীকার করা।

শিক্ষকের নৈতিকতার সবচেয়ে কার্যকর প্রকাশ কোনো বক্তৃতায় নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে। আমি যথাসময়ে ক্লাসে আসি কিনা, প্রস্তুতি নিয়ে পড়াই কিনা, খাতা নিরপেক্ষভাবে দেখি কিনা, নির্ধারিত সময়ে ফল দিই কিনা, শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে সম্মান করি কিনা—এ সাধারণ কাজগুলো দেখেই শিক্ষার্থী দায়িত্ব, ন্যায় ও সততার বাস্তব পাঠ নেয়। যে শিক্ষক পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে কঠোর, অথচ নিজের গবেষণায় অন্যের লেখা স্বীকৃতি ছাড়া ব্যবহার করেন, তার নৈতিক অবস্থান শিক্ষার্থীর চোখে টেকে না। আবার কোনো শিক্ষার্থী ভুল ধরিয়ে দিলে শিক্ষক যদি তা স্বীকার করে সংশোধন করেন, শিক্ষার্থী শেখে যে জ্ঞানী হওয়ার অর্থ সব জানা নয়, সত্য গ্রহণের মানসিকতা থাকা।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরো একটি সূক্ষ্ম নৈতিক সীমা আছে, যা সমাজের সাধারণ নিয়মে ধরা পড়ে না। সমাজে কোনো সম্পর্ক বা আচরণ আইনগত ও সামাজিকভাবে বৈধ হলেই তা শিক্ষকের পেশাগত অবস্থানে সমানভাবে উপযুক্ত হয়, এমন নয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্ষমতা, প্রভাব ও মূল্যায়নের একটি অসম সম্পর্ক থাকে। তাই ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা আবেগগত নির্ভরতার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি, এমনকি শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার পরও সেই পুরনো ক্ষমতার ছায়া থেকে যায়। এখানে প্রশ্ন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অস্বীকার করা নয়; বিশ্বাস, সম্মতি, মর্যাদা ও পেশাগত সীমারেখা রক্ষা করা। সমাজ যা অনুমোদন করে, শিক্ষকের নিজের কাছে তার চেয়ে কঠিন মাপকাঠি থাকতে হয়।

লিখিত আচরণবিধি কি একজন মানুষকে নৈতিক করে তুলতে পারে? প্রশ্নটি আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা দিয়েই বিচার করা যায়। ২০১২ সালে বাংলাদেশ জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল গ্রহণ করে প্রাতিষ্ঠানিক সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য মহৎ, কাঠামো সুন্দর, কিন্তু কৌশল প্রণয়ন আর মানুষের আচরণে তার প্রতিফলন এক বিষয় নয়, আর সেই দূরত্বের কথা আমরা সবাই জানি। আচরণবিধি স্পর্শযোগ্য, কাগজে লেখা যায়, কর্মপরিকল্পনায় মাপা যায়। নৈতিকতা স্পর্শযোগ্য নয়, তা জন্মায় মানুষের ভেতরে। নীতিশাস্ত্রকে নির্দেশ দিয়ে নৈতিকতায় রূপান্তর করা যায় না। একজন শিক্ষক শাস্তির ভয়ে অসদাচরণ থেকে বিরত থাকবেন, নাকি বিবেকের তাগিদে সঠিক কাজ করবেন, এ দুই অবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত সদিচ্ছা আর কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, দুটিই লাগে, একটি অন্যটির বিকল্প নয়।

শ্রেণীকক্ষে নৈতিকতা কীভাবে অভ্যাসে পরিণত হয়, তার একটি সরল উদাহরণ মার্কিন শিক্ষক রন ক্লার্কের ‘দ্য এসেনশিয়াল ফিফটি-ফাইভ’ বইয়ের ৫৫টি নিয়মে পাওয়া যায়। সহপাঠী ভালো করলে তাকে অভিনন্দন জানাও, অন্যের মতামত ও ধারণাকে সম্মান করো, জিতলে বড়াই কোরো না, হারলে রাগ দেখিও না, ভুল থেকে শিখে এগিয়ে যাও—এসব নিয়ম দেখলে বোঝা যায় শৃঙ্খলা মানে কেবল শিশুদের নিয়ন্ত্রণ নয়, চরিত্রের দৈনন্দিন অনুশীলন। একই কথা মনে করিয়ে দেয় জেমস পি ওয়েনের ‘কাউবয় এথিকস’, যেখানে আমেরিকার পশ্চিমের গোপালকদের অলিখিত বিধি থেকে ১০টি নীতি তুলে আনা হয়েছে। নিজের কাজে গর্ববোধ করো, যা শুরু করেছ শেষ করো, প্রতিশ্রুতি দিলে রাখো, কঠোর হও কিন্তু ন্যায্য থাকো, কম বলো বেশি বোঝাও, মনে রেখো কিছু জিনিস বিক্রির জন্য নয়, আর জেনে রাখো সীমারেখা কোথায় টানতে হয়। যিনি শিক্ষার্থীর কাছে সম্মান প্রত্যাশা করেন, তাকে শিক্ষার্থীকে সম্মান করতে হয়। যিনি সময়ানুবর্তিতা শেখান, নিজের ঘড়িতেই তার প্রমাণ রাখতে হয়। নৈতিকতা বক্তৃতার বিষয় যতটা, অনুশীলনের বিষয় তার চেয়ে অনেক বেশি।

আরেকটি কথা শিক্ষকরা প্রায়ই ভুলে যান, শিক্ষার্থী কেবল শেখে না, সেও এক রকম শিক্ষক। নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তির জ্ঞান, প্রশ্ন করার সাহস ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষকের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে। শ্রেণীকক্ষ তাই একমুখী জ্ঞান বিতরণের জায়গা নয়, পারস্পরিক শেখার একটি সামাজিক পরিসর। এ সম্পর্কে কর্তৃত্ব থাকবে, অহংকার নয়। শৃঙ্খলা থাকবে, অপমান নয়। মতপার্থক্য থাকবে, অসম্মান নয়। শিক্ষার্থীর আচরণ দেখে আমি শিখি, আমার আচরণ দেখে সে শেখে, আর এ দুই দিকের শেখা মিলেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক আবহ তৈরি হয়।

শেষ বিচারে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সমাজ তিনটি ফল আশা করে, জ্ঞান, দক্ষতা ও চরিত্র। জ্ঞান মানুষকে বুঝতে শেখায়, দক্ষতা কাজ করতে সক্ষম করে, আর চরিত্র ঠিক করে দেয় সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে। চরিত্রহীন দক্ষতা সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, আবার জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া শুধু সদিচ্ছা দিয়ে জটিল সমস্যার সমাধান হয় না। একজন ভালো শিক্ষকের পরিচয় তাই কেবল তিনি কত ভালো পড়ান বা কত গবেষণা করেন, তাতে সীমাবদ্ধ নয়। তার শিক্ষার্থীরা কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সক্ষম মানুষ হয়ে উঠছে, সেটিও তার কাজের মাপকাঠি। শিক্ষক হয়তো তার সব শিক্ষার্থীর জীবনে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন না, কিন্তু তার ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা ও আচরণের শিক্ষা বহু বছর ধরে তাদের সিদ্ধান্তে বেঁচে থাকে। শিক্ষক শুধু জ্ঞান দিয়ে যান না, নিজের অজান্তেই তিনি ভবিষ্যৎ সমাজের নৈতিক ভিত্তি গড়ে দিয়ে যান। শ্রেণীকক্ষের সেই অদৃশ্য আলোকবৃত্ত তাই কোনো বোঝা নয়,

একটি সম্মান, যার ভার বহন করতে জানাই শিক্ষকতার প্রকৃত সার্থকতা।

ড. নিয়াজ আহমেদ খান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক

আরও