বাংলাদেশের কৃষি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। বর্তমানে দেশীয় আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে এ দুই সংস্থাকে একত্র করার যে আলোচনা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জোরালো হয়ে উঠেছে, তাকে কোনো সংকট মোকাবেলার প্রতিরক্ষামূলক বা বাধ্যবাধকতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটিকে দেখা উচিত একটি সময়োপযোগী, কৌশলগত ও বৈপ্লবিক সম্ভাবনা হিসেবে। দুটি ব্যাংকের বিদ্যমান শক্তি, সম্পদ এবং আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাকে এক ছাতার নিচে এনে একটি বৃহদাকার, আধুনিক এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত কৃষি অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ যদি সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্বচ্ছ রোডম্যাপের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা কেবল প্রতিষ্ঠান দুটিকে আর্থিক দিক থেকে শক্তিশালীই করবে না, বরং সমগ্র উত্তরবঙ্গসহ দেশের সার্বিক কৃষি অর্থনীতিকে একটি নতুন গতিপথে নিয়ে যাবে। বৈশ্বিক ও দেশীয় আর্থিক সংস্কারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরিপূরক শক্তি ও উদ্দেশ্যের দুটি ব্যাংককে একত্রিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ একীভূতকরণের সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক ইতিবাচক দিক হলো দুটি ব্যাংকের বৈষম্যমূলক তহবিল বা ফান্ড সমস্যার দূরীকরণ। আমরা সবাই জানি, উত্তরবঙ্গ হলো বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সিংহভাগ জোগান আসে এ অঞ্চল থেকে। অথচ বৈপরীত্য হলো, এ অঞ্চলে কৃষি ঋণের বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ফান্ড সংকটে ভুগছে। সীমিত মূলধন ভিত্তি ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাকাব একা এ সুবিশাল অঞ্চলের কৃষি অর্থায়নের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে দেশজুড়ে শাখা এবং সার্বিক আর্থিক পরিধির সুবিধার্থে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত লিকুইডিটি বা তরল অর্থের প্রাচুর্য রয়েছে। একীভূতকরণ বাস্তবায়ন হলে বিকেবির এ তহবিল সরাসরি উত্তরবঙ্গের কৃষি খাতে প্রবাহিত করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক কৃষক, উদীয়মান কৃষি-উদ্যোক্তা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পগুলো আর মূলধনের অভাবে থমকে থাকবে না।
দুই কৃষি ব্যাংকের পৃথক অস্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, একীভূতকরণ সেই অপচয় বন্ধের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে বিকেবি ও রাকাবের জন্য দুটি পৃথক প্রধান কার্যালয় ও পরিচালনা পর্ষদ রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে বিশাল অংকের প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। পাশাপাশি বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দুটি ব্যাংকে আলাদাভাবে মূল ব্যাংকিং সফটওয়্যার, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অবকাঠামো বা আইসিটি বাবদ দ্বৈত খরচ বা ডাবল আইসিটি বাজেট ব্যয় হচ্ছে, যা জাতীয় সম্পদ ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকে চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্যাংক দুটি একীভূত হলে দুটি প্রধান কার্যালয়ের পরিবর্তে একটি সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হবে। এতে আইসিটি অবকাঠামো, সফটওয়্যার লাইসেন্স ও ডেটা সেন্টার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ এক ধাক্কায় অর্ধেকে নেমে আসবে। সংরক্ষিত এ বিপুল পরিমাণ বাজেট তখন ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি চালুর কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। একীভূতকরণের মানবিক ও পেশাগত দিকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা এ খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের এক নীরব অবসান ঘটাবে।
অঞ্চলভিত্তিক সীমানা প্রাচীর থাকার কারণে রাকাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেবল উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাতেই তাদের পুরো চাকরিজীবন কাটাতে বাধ্য হন, আর বিকেবির কর্মীরা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত থাকলেও আঞ্চলিক প্রশাসনিক নীতির কারণে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নানামুখী জটিলতার মুখে পড়েন। পেশাগত জীবনে এ ভৌগোলিক সীমারেখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যাকে এক কথায় নিজ দেশে পরবাস বলা চলে। উত্তরবঙ্গের সন্তান বিকেবিতে কাজ করে সারা দেশে ঘুরছেন, কিন্তু নিজ অঞ্চলে বদলি হতে পারছেন না, আবার রাকাবের কর্মীরা সারা জীবনের জন্য উত্তরবঙ্গের গণ্ডিতেই জিম্মি হয়ে আছেন। একীভূতকরণের ফলে এ কৃত্রিম ভৌগোলিক প্রাচীর এক মুহূর্তে ভেঙে যাবে। কর্মী বাহিনীর দক্ষ পুনর্বিন্যাস সম্ভব হবে এবং প্রত্যেকে নিজ যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সুবিশাল নেটওয়ার্কে কাজ করার ও পেশাগত ক্যারিয়ার বিকাশের সমান সুযোগ পাবেন। স্বাভাবিক অবসর, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং বৈষম্যহীন বদলি নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনবলকে একটি উদ্দীপিত ও আধুনিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
প্রশাসনিক সংস্কারের বিশ্বমানের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত পর্যালোচনা করলে এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা আরো স্পষ্টভাবে উঠে আসে। সর্বপ্রথমে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক একীভূতকরণের সাফল্য আমাদের জন্য অত্যন্ত অনুকরণীয় নজির। ভারত সরকার ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) সহযোগী ব্যাংকগুলোসহ একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে একীভূত করে মাত্র কয়েকটি বৃহদাকার শক্তিশালী ব্যাংকে রূপান্তরিত করে। আগে পরিচালিত ব্যাংকগুলোর আলাদা পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসনিক অবকাঠামোর অপ্রয়োজনীয় খরচ বা প্রশাসনিক অপচয় বন্ধ করে ভারতের একীভূত ব্যাংকগুলো এখন বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও মূলধন ভিত্তি অর্জন করেছে।
গ্রামীণ পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ভারতের ন্যাশনাল ব্যাংক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট তথা নাবার্ড মডেল এবং এর অধীনে আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনও সফলতার বড় উদাহরণ। নাবার্ড সরাসরি ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়ন করে স্থানীয় কৃষি ব্যাংকিংকে অভূতপূর্ব শক্তিশালী করেছে। একীভূত বিকেবি-রাকাবও ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের নাবার্ড স্টাইলে পুরো দেশের কৃষি অর্থায়নে শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যদি আমরা এশিয়ার অন্যান্য কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দিকে তাকাই, তবে থাইল্যান্ডের ব্যাংক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভস (বিএএসি) এবং ভিয়েতনামের ভিয়েতনাম ব্যাংক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্টের (এগ্রিব্যাংক) উদাহরণ দেয়া যায়। ভিয়েতনামের এগ্রিব্যাংক ছোট ছোট সংস্থাকে একীভূত করে গঠিত একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান, যা বর্তমানে ভিয়েতনামের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের কৃষি রফতানি বিপ্লবের মূল কারিগর।
থাইল্যান্ডের বিএএসি একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের সার্বিক সহায়তায় থাই কৃষকদের শতভাগ ডিজিটাল ঋণ সুবিধা, ফসল বীমা এবং এগ্রো-প্রসেসিং ফান্ড সরবরাহ করে থাকে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার ব্যাংকিং সংস্কারের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সে দেশের ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া (বিআরআই) কীভাবে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ঋণ ও ডিজিটাইজেশনকে একত্র করে বিশ্বে সাফল্য লাভ করেছে। ফিলিপাইনের ‘ল্যান্ড ব্যাংক অব দ্য ফিলিপিনস’ সরকারি অর্থায়নে কৃষি খাতে একক বৃহৎ ব্যাংক হিসেবে কাজ করে দেশটির সামগ্রিক গ্রামীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে। ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে পৃথক ক্ষুদ্র ব্যাংক না রেখে কৃষি ব্যাংকিংকে একক বৃহৎ শক্তিতে রূপান্তর করেই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে আফ্রিকার সাফল্যগাথাও আমাদের নতুন দিশা দেখায়। কেনিয়ার মোবাইল মানিভিত্তিক কৃষি ঋণ কর্মসূচি এম-পেশা কিংবা দিগমি ফসল ঋণ মডেল প্রমাণ করেছে যে গ্রামীণ কৃষি অর্থায়নে ডিজিটাইজেশন কতটা বড় রূপান্তর আনতে পারে।
বিকেবি ও রাকাব আলাদাভাবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিচ্ছিন্ন ডিজিটাল অ্যাপ বা সফটওয়্যার চালু করতে গিয়ে যে স্থবিরতার মুখোমুখি হচ্ছিল, একীভূত প্রতিষ্ঠানের সুবাদে তা মুহূর্তেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। একক আইসিটি কাঠামোর অধীনে মোবাইল ব্যাংকিং, অ্যাপের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের সহজ ডিজিটাল আবেদন, উপগ্রহের তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং রিয়েল টাইম ঋণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা অত্যন্ত সহজ হবে। একই সঙ্গে দেশীয় অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক বিগত দিনে দুর্বল কিংবা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও সুশাসিত আর্থিক খাত গঠনের যে নীতি গ্রহণ করেছে, বিকেবি ও রাকাবের মিলন সেই দূরদর্শী আর্থিক দর্শনেরই একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। সামাজিক দৃষ্টি থেকে এ একীভূতকরণ বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের ভাগ্যবদলে বড় নিয়ামক হয়ে উঠবে।
বর্তমানে রাকাব উত্তরবঙ্গে যেসব প্রশংসনীয় ক্ষুদ্র ঋণ, ডেইরি উন্নয়ন বা নারী উদ্যোক্তা প্রকল্প পরিচালনা করছে, বিকেবির সুবিশাল মূলধন ভিত্তি ও আমানত সেই প্রকল্পগুলোর পরিধি বহু গুণ বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। এছাড়া যমুনা ও পদ্মার চরাঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ মেগা প্রকল্প এলাকায় যান্ত্রিক কৃষি, আধুনিক পানি সেচ, কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং দানাদার ফসলের বিকল্প উন্নত জাত চাষে বড় বড় সমন্বিত ঋণ প্রদান কেবল এ বিশাল মূলধনি ব্যাংকের পক্ষেই সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতের বৃহৎ ব্যাংক একীভূতকরণের ইতিবাচক ফল, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের একক কৃষি ব্যাংকিংয়ের সাফল্য, উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের ফান্ড সংকট নিরসন, প্রধান কার্যালয় ও আইসিটির দ্বৈত ব্যয় হ্রাস এবং ব্যাংক কর্মীদের দীর্ঘদিনের পরবাসী ও জিম্মি জীবন থেকে মুক্তির সুযোগ সব মিলিয়ে বিকেবি ও রাকাবের একীভূতকরণ কেবল সময়ের কোনো সাময়িক দাবি নয়, এটি বাংলাদেশের বৈপ্লবিক কৃষি সংস্কারের চূড়ান্ত দিগন্ত। সঠিক নীতিনির্ধারণ ও আন্তরিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ উদ্যোগ আগামী দিনে বাংলাদেশের কৃষি অর্থায়নকে এশিয়ায় এক অনুকরণীয় ও অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়