একজন পরিবেশবিষয়ক অর্থনীতিবিদ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও শহরের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তার গবেষণা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন), সেভ দ্য চিলড্রেন, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), ইউএনডিপিসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের কৃষি খাত, শিক্ষা ব্যবস্থা, জনমিতিক লভ্যাংশ, ব্যাংক খাত ও আসন্ন বাজেটসহ নানা ইস্যু নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসনের চাহিদাও বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে আবাদি কৃষিজমি কমছে। সরকার অবশ্য কৃষি খাতের উন্নয়নে কৃষক কার্ড বিতরণের পাশাপাশি খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনের সমস্যাগুলো কীভাবে প্রশমন করা যাবে; বাজেটে এ নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা কী হতে পারে?
আবাসন ও কলকারখানার জন্য আবাদি কৃষিজমি কমছে। এটা বন্ধ করা খুব কঠিন। আমাদের কৃষি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ। কৃষি উৎপাদন এগিয়ে নেয়ার জন্য এ হারে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের এক গবেষণা বলছে, আগের মতো কৃষি পরিবার এখন আর নেই। কৃষকের হাতেও কৃষি ব্যবস্থাপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। বীজ, সেচ ব্যবস্থা, সার থেকে শুরু করে জমি চাষের বিষয়গুলোও বহুজনের মাধ্যমে বাজার দিয়ে নিয়ন্ত্রণে। অনেক কৃষক এখন আবাদি কৃষিজমি অন্যকে দিয়ে চাষ করাচ্ছেন। অনেকে আবার জমি লিজ দিয়ে দিচ্ছেন। এটার একটা ভালো দিক হলো কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনের উন্নতি আসবে। আমরা যে পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদন করি, চীনের কৃষক তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করতে পারেন। কারণ তারা কৃষি খাতের পরিবর্তনের জায়গাটা শনাক্ত করতে পেরেছে। মূল বিষয়টা বোঝা জরুরি। কৃষিজমিতে বিনিয়োগ এলে অল্প জমিতেও অধিক উৎপাদন সম্ভব। চীন তাদের কৃষি খাতের ব্যাপারে অনেক সচেতন। এজন্য তারা কৃষিকে এখন উল্লম্ব কৃষি বলছে। যেভাবে বহুতল দালান নির্মাণ করে আবাসন চাহিদা মেটানো হয়, সেভাবেই বহুতল কাঠামোর কৃষি ব্যবস্থা চালু করেছে দেশটি। কৃষি খাতে পরিবর্তন আনতে হলে এর বাণিজ্যিক দিকটাও দেখা জরুরি। সেজন্য প্রচলিত পদ্ধতির কৃষি ব্যবস্থা থেকে সরে বাণিজ্যিক কৃষি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে হবে। দেশের কৃষি খাত নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। উদ্বিগ্ন তখনই হব, যখন দেখব দেশের কৃষকের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসছে না। ফলে কৃষিতে আগ্রহ কমবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জনমিতিক লভ্যাংশ নিয়ে কথা বলেছেন। অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের জন্য বয়স্ক জনগোষ্ঠী একটি বড় সমস্যা। আপনাদের গবেষণা বলছে, দেশের ৮-১০ শতাংশ মানুষের বয়স আশির বেশি। ২০৫০ সাল নাগাদ এ হার ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের ভাবনা আছে কি?
এগুলো আমাদের চিন্তায় আছে। দেশের সাড়ে ৬ শতাংশ লোকের বয়স ৬৫ বছরেরও বেশি। আগামী ১০ বছরে এ হার সাতের ওপরে যাবে। এটার ইতিবাচক ও নেতিবাচক এ দুটো দিকই আছে। ইতিবাচক দিক হলো, একটা নতুন অর্থনীতি তৈরি হবে। ষাটোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর চাহিদা আলাদা। তাদের চাহিদা পূরণে অর্থনীতিতে পরিবর্তন লাগবে। পরিবর্তিত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা না গেলে বিপদে পড়তে হবে। ষাটোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা দেয়া না গেলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। মানুষ তা ভালোভাবে নেবে না, এমনকি দেশও বিপদে পড়বে। এ জনগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল করতে হবে। এক্ষেত্রে দুটো পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমত, তাদের কারিগরি জ্ঞান দিতে হবে। তবে সবাই যে কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হবে না, এ বাস্তবতাও মেনে নিতে হবে। শিক্ষা কাঠামোয় তত্ত্বগত শিক্ষা রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অবশ্য বর্তমানে যারা কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছেন, তারাও যে খুব ভালো রয়েছেন এমন নয়। উদাহরণ হিসেবে ইলেকট্রিশিয়ানদের কথাই বলা যায়। দেশে বিভিন্ন অবকাঠামোয় যে ধরনের দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান দরকার, আমরা সে অনুপাতে পাচ্ছি না। অথচ অনেক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নেই। এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থায় প্রায়োগিক শিক্ষার প্রসারে আরো ভাবতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন প্রায়োগিক শিক্ষা শেষে চাকরি পান তা নিশ্চিত করেই পাঠক্রম সাজাতে হবে। চাকরি পেতে কী লাগে? একটি মহল বলবে উদ্যোক্তা জরুরি আর আরেকটি অংশের দাবি বিনিয়োগ লাগবে। দেশে এ দুটোরই অভাব। এ মুহূর্তে উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি বিনিয়োগও আকর্ষণ করতে হবে। এ দুটোই একসঙ্গে করতে না পারলে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে কাজ হবে না। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা যেন তার শেষ শিক্ষা না হয়। সে যেন যেকোনো সময় বা প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উচ্চ শিক্ষায় যোগ দিতে পারে সে সুযোগও তৈরি করতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তা নেই। ফলে কারিগরি শিক্ষায় অনেকের আগ্রহ নেই।
কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে সফলতার উদাহরণ হিসেবে চীন ও জার্মানির কথাই আসে। দেশেও অনেক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু সেগুলো আশানুরূপভাবে কার্যকর নয় কেন?
এর অনেক কারণ আছে। প্রথমত, আমাদের কারিগরি শিক্ষায় গতি নেই। অবশ্য পুরো শিক্ষা কাঠামোতেই গতি নেই। এজন্য কোনো শিক্ষার্থী কারিগরি কাঠামোর প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে যদি ভালো ফল না পান, তাহলে তার অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকে না। বলা যায়, তাকে ওই সুযোগ দেয়া হয় না। এটা সব ক্ষেত্রেই হয়। এভাবে গোটা শিক্ষা কাঠামোই স্থির এক কাঠামোয় পরিণত হয়। কেউ পরিবারের চাপে হয়তো কোথাও ভর্তি হয়। কিছুদিন পর বেরিয়ে আসতে চাইলে আর সুযোগ থাকে না। আমার এক আত্মীয় আল আজহার থেকে পাস করে ভাবল সে ডাক্তার হবে। সে ব্রিটেনের নাগরিক। সেখানের নিয়ম হলো, ও লেভেলে চারটি আর এ লেভেলে চারটি বিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হবে। এজন্য ও বা এ লেভেল পাস করতে হবে না। আজ সে ডাক্তার। আমাদের শিক্ষা কাঠামোয় এ ধরনের গতিশীলতা নেই। এজন্য অনেকেই চান না এখানে তার সন্তানসন্ততি স্থির কাঠামোয় আটকে থাকুক।
আরেকটি বিষয় হলো, কারিগরি বা অন্য যেকোনো শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি না পেলেও প্রতিষ্ঠান কার্যকর হতে পারে না। বিনিয়োগ না থাকলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। সবাই উদ্যোক্তা কিংবা ব্যবসায়ী হবেন না। তাদের চাই চাকরি। অর্থনীতিতে উদ্যোক্তা না থাকলে চাকরি দেয়ার মালিক হবে সরকার। এজন্যই সবাই সরকারের কাছে দাবিদাওয়া তোলেন। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। টাকা না থাকলে আবার উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। এখন আমাদের অভিনব অনেক আইডিয়া আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ নেই, এমনটি হলে হবে না। এ নিয়ে অনেক কথাই তো হয়েছে। কিন্তু মূল কাজ হলো বাস্তবায়ন করা।
দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগ এখনো প্রথাগত পদ্ধতি অনুসরণ করায় গুণগত মান রক্ষা হয় না। খোদ প্রধানমন্ত্রীই এ কথা বলেছেন। আপনি অনেক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওই অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষক নিয়োগে আপনার কী কী পরামর্শ রয়েছে?
প্রথমত, শিক্ষকদের দলীয়করণ করার প্রবণতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে। অনেকে শিক্ষার্থীদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধের কথা বলেন। তবে আমি বলি শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধের কথা। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে হলে শিক্ষকদের প্রথম লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যতদিন দলীয় ভিত্তিতে শিক্ষকদের লালন করা হবে, ততদিন লেজুড়বৃত্তি বন্ধ হবে না। জ্ঞানী লোকের চিন্তা কখনো সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে যেতে পারে আবার বিপক্ষেও যেতে পারে। এজন্য বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা চিন্তার সঙ্গে, ক্ষমতার সঙ্গে নয়। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের ভোটিং ব্যবস্থা রয়েছে সেটাও একটা সমস্যা। এভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় না, বরং ভোটার নিয়োগ করা হয়। এগুলোয় পরিবর্তন আনতে হবে। আবার এটাও ভাবতে হবে, এ কাঠামো কেন আসছে। মূলত উপনিবেশ আমলে এ ধরনের কাঠামোর প্রচলন ছিল না। তখন শ্বেতাঙ্গরাই সব নিয়ন্ত্রণ করতে চাইত। এ ধরনের একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাকে উপেক্ষা করতেই ভোটিং পদ্ধতি চালু হয়। বিশ্বের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য এমন অংশগ্রহণমূলক কাঠামো মেনে চলে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। সব সিদ্ধান্ত কমিটিভিত্তিক হওয়া উচিত এবং কমিটির গঠন পদ্ধতিতে ভোট বাদ দিতে হবে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা বরাদ্দ কম। আবার অনেকে গবেষণায় আগ্রহীও নন। আমরা কেন গবেষণা আগ্রহী প্রজন্ম তৈরি করতে ব্যর্থ হলাম? আবার যেসব গবেষণা হয়, এগুলো একাডেমিক হলেও শিল্প খাতমুখী নয়। নতুন সরকার গবেষণাকে শিল্পসংযুক্ত করে কীভাবে সাজাতে পারে?
একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির সম্মিলিত গবেষণার বিষয় নিয়ে কথা বলা যত সহজ, সেটি বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দুইশর কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক’জন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। আমাদের উদ্যোক্তাদের নতুন করে গবেষণা করতে হচ্ছে না। তারা চীন থেকে হয়তো পণ্য আমদানি করে তা কপি করে বিক্রি করছে। এখানে উদ্ভাবনের প্রয়োজন নেই। এজন্য দেশে একাডেমিয়া আর শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা কঠিন।
গবেষণা দুই ধরনের হয়। এক ধরনের গবেষণায় নতুন জ্ঞান তৈরি হয়। এ জ্ঞান হয়তো পাঁচ কি ১০ বছর পর কাজে আসবে। এ ধরনের গবেষণায় কোনো শিল্প খাত শুরুতে বিনিয়োগ করতে রাজি হবে না। তাই সরকারকে নিয়মিত গবেষণায় বরাদ্দ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে গবেষণা বরাদ্দের ক্ষমতা থাকা জরুরি। এখন যে নেই এমনটি না। তবে যা আছে তা খুবই সামান্য। কেউ একজন জানালেন গবেষণার জন্য কোনো রসদ কিনতে তার ২ লাখ টাকা লাগবে। তার বরাদ্দ ২ লাখে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হলো। এভাবে গবেষণা সম্ভব না। পুরো গবেষণা কার্যক্রমের ব্যয় আছে। এ ব্যয় সরকারকে বহন করতে হবে। বলতে পারেন কেন করবে? ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য নতুন জ্ঞান লাগবে। শুধু নকল করে তা তৈরি করে ফেললেই হবে না।
গবেষণা প্রতিযোগিতামূলক। যখনই দেশে কেউ গবেষণা করেন, তখন তার গবেষণা প্রকাশের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে। ওই বরাদ্দ তাদের নেই। শিক্ষক বা গবেষকরা যদি বিদেশে যেতে না পারেন, তাহলে নতুন ও টেকসই যে জ্ঞানগুলোর চর্চা হচ্ছে, সেগুলো সরাসরি জানার সুযোগ তৈরি হবে না। এজন্য গবেষণায় আলাদা বরাদ্দ জরুরি। এতে রাতারাতি ফল মিলবে না। সময় লাগবে।
দেশে অনেক শিক্ষার্থী। বর্তমান শিল্প খাত চাইলেই তাদের কর্মসংস্থান করে দিতে পারবে না। আমরা সবকিছু অনেক দ্রুত হবে, এমন প্রত্যাশা করছি। তা সম্ভব না। শিল্প খাতে গবেষণার জন্য আলাদা বরাদ্দ দিলেও সেখানে কর মওকুফের সুবিধা নেই। এমনটা হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ব্যয়ে আগ্রহী হবে কেন? অন্য খাতে কর মওকুফ সুবিধা থাকলে গবেষণা খাতে থাকবে না কেন?
স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের অধিকাংশ ব্যয় হয় অবকাঠামো উন্নয়নে। নতুন অনেক হাসপাতালে দেখা যায় চিকিৎসক, জনবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ নেই। এখানে আরেকটা বিষয়, দেশের স্বাস্থ্যসেবা অনেকটা রাজধানীকেন্দ্রিক। এটাকে বিকেন্দ্রীকরণ এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উপায় কী?
স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিকেন্দ্রীকরণ করে এটিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে গেলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এখনো দেশে নার্সের তুলনায় চিকিৎসক বেশি। স্বাস্থ্য খাত মানে শুধু অবকাঠামো নয়। এটি সেবা নিশ্চিত করার জায়গা। স্বাস্থ্য খাতে সেবা জরুরি, তাই জনবল লাগবে। কিন্তু আমরা ভবন বানাতে যতটা আগ্রহী, সেবা নিশ্চিতে ততটা তৎপর নই। কোনো স্থানে একজন চিকিৎসকের পদ তৈরি করা হলে নার্সের জন্য চারটি পদ তৈরি করতে হবে। এমনটি করলে এ খাতে কর্মসংস্থানের চাহিদা বাড়বে। আর জনবল বাড়লে মানুষও সেবা পেয়ে নিরাপদ অনুভব করবে। করোনা মহামারীর সময় পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হলো অথচ নার্স নিয়োগ হলো এক হাজার। এতেই বোঝা যায় সংকট কোথায়। গোটা ব্যবস্থাই উল্টোপথে হাঁটছে।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো, স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের ব্যয় বাড়ানোর জন্য ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে। অথচ আমাদের উচিত সেবার মান বাড়ানো। দেশে এখনো স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার জন্য রোগীদের পকেট থেকে ৬০ শতাংশের বেশি অর্থ খরচ হয়। এ খরচ কমানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতকে বীমার আওতায় আনতে হবে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা বিনামূল্যে করতে হবে। এগুলোও সেবার আওতাধীন। এ প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য কার্ড দরকার। এ কার্ডের আওতায় নির্দিষ্ট চিকিৎসাসেবা বিনামূল্যে মিলবে। এগুলো সবই সেবার আওতাধীন। কেবল সরকারি হাসপাতালই নয়, বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রেও এমনটি প্রযোজ্য হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে এজন্য আলাদা অনুদান দেয়া দরকার। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এগোতে হবে। নয়তো স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো মানে নতুন অবকাঠামো আর যন্ত্রপাতি কেনায় খরচ। কাজের কাজ হবে না। সেবামূলক হওয়ায় জনবল ছাড়া সেবা নিশ্চিত করা যাবে না। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে বিশ্বমানের সেবা রয়েছে, কিন্তু সেখানে গরিবের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। নতুন হাসপাতালের বদলে এখানে সরকারি সহায়তা করলে চিকিৎসার মান সবার জন্য বাড়বে। নচেৎ কেবল ভবনই তৈরি হবে। যন্ত্রপাতি বসে থাকবে।
নতুন সরকারকে এক দুর্বল ব্যাংক খাত সামলাতে হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৬৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা, খেলাপি ঋণ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রায় ৭০ শতাংশই খেলাপি ঋণ। অন্য ব্যাংকগুলোর একই অবস্থা। আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নিয়ে সরকারের কী করা উচিত?
যাদের অবহেলা, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার কারণে ব্যাংকের এ দুরবস্থা, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারলে আজ এক ব্যাংক বন্ধ হবে, কাল নতুন আরেকটা ব্যাংক অনুমোদন পাবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের এমডিই দায়ী হবেন এমনটা নয়। প্রত্যেক কর্মকর্তাই দায়ী থাকবেন। কারণ সবাই নথি আর কাগজ দেখে, সব যাচাই করেই ঋণ অনুমোদনে সই দিয়েছেন। হয়তো রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা এমনটি করেছেন। তার পরও সবাইকে দায় নিতে হবে। অভিযোগের তীর কেবল ওপরের দিকে থাকলে এ অবস্থা আবারো হবে।
ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যে শর্তগুলো রয়েছে তা যথাযথভাবে মেনে ঋণ বিতরণ হয়েছে কিনা সেটি বিবেচনায় আনতে হবে। নিয়ম মানার বিষয়ে কড়াকড়ি হলে দায়বদ্ধতা সক্রিয় হবে। নইলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরবে না। আস্থা ফেরানোর জন্য দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। এর বাইরে গিয়ে ব্যাংক বন্ধ করে দিলে কোনো লাভ হবে না। বরং অনেকে চাকরি হারাবেন। ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় বৈচিত্র্য আনা জরুরি। যেমন একেকটি ব্যাংক একেক খাতে ঋণ দেবে। কোনো ব্যাংক কৃষি খাতে, কোনো ব্যাংক ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ঋণ দেবে। বিশ্ব এখন এমন এক বাস্তবতায় যে কোন দেশ কোন সময় অন্য দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে তা বলা যায় না। আমাদের ভারত ও চীন থেকে আমদানি করতে হয়। অন্যদিকে আমরা রফতানি করি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। ব্যাংক খাতের পরিচালনা এমনভাবে ভাগ করে দিতে হবে, যেন কেউ ভারতের সঙ্গে লেনদেন সামলাবে আর কেউ সামলাবে চীনের সঙ্গে। চীন তাদের নির্মাণ খাতের চাহিদা দেখে কনস্ট্রাকশন ব্যাংক বানিয়ে ফেলল। এমন বহু ব্যাংক রয়েছে। এজন্য সরকার ব্যাংক বন্ধ না করে খাত ও দেশ অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালনা ভাগ করে দিলে ভালো হবে। নচেৎ দেখবেন হঠাৎ করে কারো ওপর নিষেধাজ্ঞা পড়ে গেছে।
বেসরকারি ব্যাংকের প্রসঙ্গে আসা যাক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে তারল্য সহায়তা দেয়া হলো। তাতে সুফল মেলেনি। অতীতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনর্মূলধনীকরণের মাধ্যমে কোনো ব্যাংক চাঙ্গা করা গেছে, এমন নজির নেই। দুর্বল বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সরকারের করণীয় কী?
দুটো বুদ্ধির কথা ভাবা যায়। ব্যাংকিং নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। শুরুতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে প্রসারের অতিরিক্ত সুযোগ দেয়া হচ্ছিল। এজন্য নিয়মও করা হয় শহরে ব্যাংকের একটি শাখার বিপরীতে গ্রামে দুটো শাখা করতে হবে। এ ধরনের নিয়ম সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে করা যায়। বেসরকারি ব্যাংকের জন্য এমনটা সঠিক নয়। এতে তাদের মুনাফায় আঘাত এসেছে। বেসরকারি ব্যাংক দুর্বল হয়েছে। দেখুন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক লাভজনক, কিন্তু তার কয়টি গ্রামীণ শাখা রয়েছে? আমরা ভুল পথে হেঁটেছি।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের মূল শক্তি হলো আস্থা। ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাই এখানে প্রধান। এখন দুর্বল যেসব ব্যাংকের কথা বলা হচ্ছে, ওগুলোর প্রতি সরকারেরই আস্থা নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরই বলেছেন, এ ব্যাংকগুলোর টিকে থাকা সম্ভব না। এর দায় কেবল ব্যাংকারের নয় বরং ব্যাংক নীতিমালারও। আবার গভর্নর দায়িত্বশীল পদে থাকা অবস্থায় এমন মন্তব্য করা ঠিক নয়। কারণ তিনি বলতে পারেন না কোনো ব্যাংক পুরোপুরি বিপর্যস্ত হবে। এ ধরনের মন্তব্য আমানতকারীদের বলে দেয় যে আপনারা আমানত তুলে নিন। ভালো ব্যাংকের ক্ষেত্রেও যদি এমন মন্তব্য আসে, তখনো আমানতকারীরা অর্থ তুলে নিতে শুরু করবেন। তখন ভালো ব্যাংকও ডুবে যাবে। এ ধরনের বক্তব্য দায়িত্বশীল পদে থাকা অবস্থায় না দেয়াই ভালো। বরং প্রশ্ন করুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কি দায় ছিল না এসব ব্যাংকের ব্যর্থতার জন্য?
দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। এজন্য নতুন একজনকে দায়িত্বও দেয়া হলো। চালু হলো ওয়ান স্টপ সার্ভিস। এ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
দেশে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগই নেই। কোনো দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ না থাকলে বিদেশী বিনিয়োগ না হওয়াই স্বাভাবিক। যতই আমরা ওয়ান স্টপ সার্ভিস করি না কেন, কোনো লাভ হবে না। আগে দেশীয় বিনিয়োগ লাগবে। দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনতে হবে। আস্থায় আনা মানে টাকা দেয়া নয়। তাকে ব্যবসার ভালো নীতিমালা দেয়া। বিনিয়োগ অনেকটা ফুটবল খেলার মতো। খেলার মাঝে নিয়ম পরিবর্তন করলে খেলোয়াড় আস্থা হারিয়ে ফেলে। এটা করা যাবে না। আমাদের দেশে ব্যাংকিং নীতিমালা ট্যাক্সের নীতিমালা খেলার মাঝে বদলে যায়। এতে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী থাকবেন না। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম পরিবর্তন হবে, এমন বাস্তবতায় কেউ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেন না। বড়জোর পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তারা বিনিয়োগ করেন। তাতে অর্থনীতির তেমন লাভ হয় না।
শিগগিরই সরকার বাজেট উপস্থাপন করবে। সরকারের সামনে জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও অবকাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জ আছে। বড় কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয় আছে। বাজেটে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত বলে মনে করছেন?
অগ্রাধিকারের জন্য কিছু খাত রয়েছে। তবে কোন কাজ করা সম্ভব সেটা বোঝা জরুরি। ব্যাংক খাতকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। এটা বাজেটের মাধ্যমে সম্ভব নয়। তবে নিয়মের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। আগামী বছরের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। গোটা বিশ্বেই খাবারের দাম বাড়ছে। এজন্য কৃষি উৎপাদনে জোর দিতে হবে। কৃষি উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে। আবার সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলোও পূরণ করতে হবে। পরে এসব বাস্তবায়ন করতে গেলে আরো বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাতে সরকার বিপদে পড়বে। তবে কোন প্রতিশ্রুতিগুলো অর্থনৈতিক চাপ সামলে সহজেই পূরণ করা যাবে তা ভাবতে হবে। প্রতিশ্রুতি ক্রমান্বয়ে পূরণ করতে গেলে বিপদ বাড়বে। পাশাপাশি ব্যবসা সাবলীল রাখা জরুরি। বিশ্ব এক কঠিন মুহূর্ত পার করছে। কার ওপর কে কখন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তা অনুমান করা কঠিন। এজন্যই সরকারকে সচেতন থাকতে হবে। বৈশ্বিক সংকটাবস্থার আগেই পূর্বপ্রস্তুতি রাখতে হবে। এজন্য ব্যাংক খাত শক্তিশালী করা জরুরি। চীন, রাশিয়া ও ভারত এ কাজ করেছে। আমাদেরও সেদিকেই যাত্রা করা উচিত।