দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত—প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। প্রতিটি স্তরেই গুণগত শিক্ষার অভাব রয়েছে। এর অন্যতম কারণ শিক্ষা খাত তেমন অগ্রাধিকার পায়নি। এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় নীতি-কৌশল ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশক শাসনামলে এ খাতের অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ঘটলেও শিক্ষার গুণগত মানের ক্রমে অধঃপতন ঘটেছে। যে কারণে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের সর্বাধিক প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে। কেননা এ অভ্যুত্থানের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল শিক্ষার্থীরা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিভিন্ন খাতের সংস্কার ঘিরে নানা উদ্যোগ নিলেও শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন। দেশ সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন হলেও শিক্ষা খাতে কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। জুলাই সনদেও শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি নেই। অথচ শিক্ষায় অগ্রাধিকার ছাড়া কখনই উন্নত দেশ ও জাতি গঠন সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর প্রতিটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হলো মানসম্পন্ন শিক্ষা। এটি মানবসম্পদ গঠনের অন্যতম উপাদান। আর মানবসম্পদ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই দেশ পুনর্গঠনের আলোচনা ও কার্যক্রমে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। অথচ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের শিক্ষার ব্যাপারে তেমন কোনো পরিকল্পনা আছে বলে চোখে পড়ছে না। প্রাথমিক শিক্ষা এখনো মুখস্থনির্ভর। দক্ষ শিক্ষক সংকট, পুরনো শিখন পদ্ধতি, অপ্রতুল শিক্ষণসামগ্রীর কারণে শেখার পরিবেশের কোনো মানোন্নয়ন ঘটেনি। মাধ্যমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স অনুযায়ী ১০ বছর ২ মাস স্কুলে পড়েও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানে ছয় বছরের দক্ষতা অর্জন করে। সাম্প্রতিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল থেকেও এ দুরবস্থা টের পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানও অনুন্নতই থেকে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অতিমাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষা সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। গবেষণার পরিবেশ তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নেই দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও সময়ের পরিক্রমায় দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অর্থনীতি বা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; মানবসম্পদই তার প্রকৃত শক্তি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে কোনো জাতি টেকসই অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। তাই আগামীতে যে সরকারই দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তার প্রাধান্য হওয়া উচিত শিক্ষা খাতের অগ্রগতি। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত শিক্ষা খাতের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তত একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন করা, যার কাজ নির্বাচিত সরকারের আমলেও অব্যাহত থাকবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে ধাপে ধাপে এগোনো প্রয়োজন। এ খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো প্রায় সবার জানা। বর্তমানে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান করা।
মানসম্পন্ন শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষায় বিনিয়োগ প্রয়োজনের তুলনায় কম। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রম বারবার পরিবর্তন। তৃতীয়ত, একমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব।
ইউনেস্কোর তথ্যমতে, শিক্ষা খাতে একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ এবং বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ ব্যয় হওয়া উচিত। কিন্তু দেশে কয়েক বছর ধরে শিক্ষায় বরাদ্দ বাজেটের ১২ শতাংশের ওপর উঠছে না। এমনকি জিডিপির বিপরীতে এ খাতে বরাদ্দ ক্রমেই কমছে। অথচ বিশ্বের উন্নয়নশীল থেকে যারা উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে, তাদের পরিকল্পনায় প্রাধান্য পেয়েছিল মানসম্মত শিক্ষা। মানসম্মত শিক্ষার সঙ্গে উন্নয়নের একটা সুসম্পর্ক রয়েছে, তা তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে পরিলক্ষিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশের পরিকল্পিত শিক্ষা দেশের সার্বিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। এসব দেশের শিক্ষায় বরাদ্দ অনেক বেশি। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম হওয়ায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন হচ্ছে না, তেমনি বেহাল দশা কারিকুলামের। বিগত সময়ে একাধিকবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম এখনো শ্রমবাজারভিত্তিক করে তোলা যায়নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল শিক্ষিত বেকার তৈরির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাও মানসম্মত হয়ে ওঠেনি। বিনিয়োগ কম থাকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অনেক পিছিয়ে। আবার দেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন সেখানে উপেক্ষিত থাকে।
শিক্ষার ভিত হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক। এ স্তরের শিক্ষার ভিত মজবুত না হলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ প্রতিটি স্তর একে অন্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক থেকেই শুরু করতে হবে। ক্রমান্বয়ে সে কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। দেশ পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে তা টেকসই ও উন্নত করতে হলে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও গবেষণায় অগ্রগতি প্রয়োজন। এজন্য বিজ্ঞান ও গণিতে দক্ষতা বাড়ানো দরকার। নয়তো চতুর্থ বিপ্লবের যুগে হিমশিম খেতে হবে দেশকে। প্রযুক্তিনির্ভর না হলে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্লথগতি দেখা দেবে। আবার অন্যদিকে মানুষ কর্মচ্যুত হবে। প্রথাগত কাজে মানুষের প্রয়োজন ফুরাবে। কিন্তু কর্মচ্যুত মানুষকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া সম্ভব কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে। কেননা উৎপাদনের সব উপকরণই নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে। সে অনুযায়ী জনগণকে দক্ষ করতে পারলে দেশে বেকারত্ব চড়াও হতে পারবে না। মোটকথা, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠবে। আর শুরুতেই বলা হয়েছে, মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব নয়।