জাফরুল্লাহ ভাই, সবাই তাকে ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী নামেই বেশি চেনে ও জানে। তার সম্পর্কে প্রথম জানি ১৯৭২ সালে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলাম। তিনি যখন সাভারে গণস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেছিলেন, তখনই তার চিন্তা ছিল আর দশজন থেকে আলাদা ও প্রগতিশীল। তার চিন্তা ছিল দেশকে কীভাবে গড়া যায়, সামাজিক কার্যক্রমগুলোকে কেমন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। স্বাধীনতা অর্জনের পরপর এ ধরনের ভাবনা অনেকের মধ্যে জোরদার হয়েছিল। তখন নতুন নতুন গবেষণা চলছিল। যে যার স্থানে থেকে দেশকে এগিয়ে নেয়ায় সচেষ্ট ছিলাম আমরা। সব মিলিয়ে এক ধরনের সামাজিক সার্কেল তৈরি হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশকে কীভাবে গড়ে তোলা যায় এসব নিয়ে ভাবনা ও আলোচনা হতো। আমরাও তার মধ্যে ছিলাম সে সময়। সাভারের গণস্বাস্থ্য তৈরির পর জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মধ্যে স্যানিটেশন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কারণ তখন দেশের অধিকাংশ মানুষের মানসম্পন্ন টয়লেট ছিল না। তিনি বিভিন্ন দেশের টয়লেটের মডেল নিয়ে একটা ল্যাট্রিনের জাদুঘর তৈরি করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কোন ধরনের টয়লেট বাংলাদেশের জন্য চালু করলে সুফল মিলবে। এ রকম নানা বিষয় নিয়ে তার নানামুখী আলোচনা অনেককে আকর্ষণ করত। সত্তরের শেষের দিকে বিআইডিএস এ ধরনের আলোচনার একটি ক্ষেত্র ছিল। ইউনূস ভাইও এসব আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন।
আরো একটা বিষয় এ মুহূর্তে মনে পড়ছে, ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যা হলে বড় ধরনের ত্রাণ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যেটাতে গণস্বাস্থ্য নেতৃত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। জাফরুল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গী শিরীন হকও নারীপক্ষ হতে বন্যার্তদের ত্রাণ বিতরণে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
জাফরুল্লাহ ভাই দেশের কয়েকটি জায়গায় জাতীয় পথিকৃতের মতো ভূমিকা রাখা একজন ব্যক্তিত্ব। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে স্বাস্থ্য যে একটা সামাজিক চাহিদা এবং স্বাস্থ্যসেবা যে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সেটা তিনিই আমাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বাস্থ্য খাতে তার ধারাবাহিক অবদান ছিল অনস্বীকার্য। স্বাস্থ্য খাতে বিশ্ব যে অতিমাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ও ধারাবাহিক অবস্থান নিয়ে কাজ করে দৃষ্টান্ত রেখেছেন জাফরুল্লাহ ভাই। বিশ্বায়ন, উগ্র পুঁজিবাদ, স্বাস্থ্য খাতের বাণিজ্যিকীকরণ—এ শক্তিগুলো প্রবল থাকা সত্ত্বে তার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তিনি কাজ করে গেছেন। দুদিন আগেই খবর প্রকাশ হয়েছে যে ৪৫ শতাংশ শিশু জন্মদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সিজারিয়ান করা হচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহ বাণিজ্যিকীকরণের ফলাফল কেমন হতে পারে তার একটি উদাহরণ। জাফরুল্লাহ ভাই স্বাস্থ্য খাতকে এত গুরুত্ব দিয়েছিলেন কারণ তিনি অনুধাবন করেছিলেন, ভালো স্বাস্থ্য ছাড়া মানসম্পন্ন জনসম্পদ তৈরি করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যসেবার অতি বাণিজ্যিকীকরণের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এবং এর ফলাফল জনগণের বিরুদ্ধেই যায়। তাই জাফরুল্লাহ ভাই স্বাস্থ্যকে একটি জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণের নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য বিলোপ এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। অসুস্থতার পরও তার নিজ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল ছেড়ে বিদেশে যেতে রাজি হননি। এটিই তার ভেতরে লালন করা মন, মানসিকতা ও আদর্শকে আমাদের সামনে তুলে ধরে। এ চিন্তা ও আদর্শকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে তার প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন এবং মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত সে আদর্শ ও চিন্তা অক্ষুণ্ন রেখে কাজ করে গেছেন। তাই স্বাস্থ্য খাতে বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে জাফরুল্লাহ ভাইয়ের অবস্থান, অর্জন ও উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠান আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
জাফরুল্লাহ ভাইয়ের দ্বিতীয় অন্যতম অবদানটিও স্বাস্থ্যসেবা খাতের সঙ্গে জড়িত আর সেটা হলো আমাদের দেশে ওষুধের সহজলভ্যতা। বিশ্বের অনেক দেশ আছে যেখানে ওষুধ সহজলভ্য নয়। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের আজকের অবস্থান তৈরির পেছনে জাফরুল্লাহ ভাইয়ের অবদান কোনো দিন ভোলা যাবে না। ১৯৮২ সালে তৎকালীন সরকারপ্রধান জেনারেল এরশাদের নৈকট্য খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে মাল্টিন্যাশনাল ওষুধ কোম্পানিদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েও তিনি ওষুধনীতি প্রণয়ন করেছিলেন। সেখানে তিনি দেশীয় স্বার্থকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এর জন্য তাকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে। সে সময় বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করে একটি জাতীয় ওষুধনীতিমালা তৈরি করা কোনো ছোটখাটো কাজ নয়। তবে একে শুধু ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে দেখলেই হবে না, তিনি জাতীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ওষুধ নীতিমালার মাধ্যমে দেশীয় ওষুধ শিল্পের পথ তৈরি করেছিলেন। এর সুফল আজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। আজকের ওষুধের সহজলভ্যতা এসেছে সেই নীতিমালার ধারাবাহিকতায়। এটা সম্ভব হতো না যদি জাতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি নির্মাণ করা না হতো আর তা হয়েছে ১৯৮২ সালের ওষুধনীতির কারণে। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যথিত ছিলেন সরকারের নীতির শিথিলতায়। সরকারের পক্ষ থেকে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে যে অবস্থান গ্রহণ করা দরকার ছিল সেটা করা হয়নি। তার পরও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের দাম বিশ্বের অন্য অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে কম। এজন্য জাতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাকে স্মরণে রাখবে।
তৃতীয় যে বিষয়টির জন্য জাতি তাকে স্মরণ করবে সেটি হলো, নারীর অগ্রগতিতে তার অবদান। তিনি যে সময়ে নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সে সময়ে অনেকেই তা কল্পনাও করতে পারেনি। তার হাত ধরে স্বল্পশিক্ষিত নারীরা মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করেছে। তিনি নারীর ক্ষমতায়নের চেয়ে সমতাভিত্তিক উন্নয়নে বেশি দৃষ্টি দিয়েছিলেন। এ কারণে বিভিন্ন অপ্রচলিত পেশায় নারীকে যুক্ত করেন। সেই সত্তরের দশকের কথা মনে পড়ছে, তখন তার গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন একজন নারী। নারীকে অপ্রচলিত পেশায় নিয়ে আসা বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় নানাভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছিলেন। অন্যরা হয়তো পরে গিয়ে আরো অনেক বড় ধরনের কাজে নারীদের সম্পৃক্ত করেছেন কিন্তু জাফরুল্লাহ ভাই পথ দেখিয়েছেন। নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমতা প্রতিষ্ঠার।
চতুর্থত, মানুষ তাকে স্মরণ করবে তার বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষার জন্য, যা তরুণদের অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করবে। এখানে একটা উদাহরণ টানব আমি। কভিড-১৯-এর সময় দেশীয় উদ্যোগগুলোকে তিনি মাঠে আনার চেষ্টা করেছিলেন যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব যেখানে অতি ভোগের সংস্কৃতির মধ্যে ডুবে আছে সেখানে জাফরুল্লাহ ভাই ন্যায়ের পৃথিবী প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন। তার বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ন্যায়সংগত, দারিদ্র্যবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব পৃথিবী তৈরি। তাই তো জাফরুল্লাহ ভাইকে আমরা নানা ইস্যুতে কথা বলতে ও জড়িত হতে দেখেছি। তার বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাগুলো যে কোনো বিলাসিতা নয় তা আমরা কভিড ও জলবায়ু পরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে এসে বুঝতে পারছি। একটি টেকসই পৃথিবী নির্মাণের জন্য আমাদের অতি ভোগবাদী ও অতিমাত্রায় উগ্র পুঁজিবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
জাফরুল্লাহ ভাই সাম্য ও সামাজিক ন্যায়ের পৃথিবী প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ সমর্থক ও কর্মী ছিলেন। এর জন্য রাজনীতি যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটি তিনি উপলব্ধি করতেন এবং স্বাভাবিকভাবে জড়িত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সেভাবে সফলতা পাননি। কিন্তু আমার মতে, সফলতার মাপকাঠি দিয়ে সবকিছু পরিমাপ করা ঠিক হবে না। তবে তার আকাঙ্ক্ষার জায়গা এবং প্রচেষ্টা তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মূলত সামাজিক ন্যায় ও সাম্যের পৃথিবী তৈরি করার কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য রাজনীতির প্রয়োজন—এমন শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন। তিনি রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হননি। তার তাগাদা ছিল যে রাজনীতি একটা মাধ্যম যার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় ও সাম্যের পৃথিবী তৈরি হবে।
সবশেষে তিনি একটা লড়াকু স্পৃহার মানুষ ছিলেন, বিশেষ করে নিজের জীবনের শেষ দশকটি তার উজ্জ্বল প্রমাণ তিনি রেখেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার লড়াকু মনোভাব বজায় ছিল। আজকাল মানুষের কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকে না, সেখানে তার কথা ও কাজে সম্পূর্ণ মিল ছিল। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তার চিকিৎসা দেশে নিয়েছেন বিদেশে যাননি। তিনি চাইলে বিদেশে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করাতে পারতেন, সে সুযোগও ছিল। কিন্তু সেদিকেও তিনি পা দেননি। এর মাধ্যমে তিনি দেশীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নের তাগাদা দিয়ে গেছেন। তার রেখে যাওয়া শিক্ষা ও তাগাদাগুলো জনগণ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনুভব করা দরকার। সেটা অনুভব করে আমরা সবাই যদি কাজে নামি তাহলে তার আত্মা আরো পরিতৃপ্ত হবে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান