অভিমত

নারীর কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব ইনসাফ নয়, বরং প্রকট করবে বৈষম্য

সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নারীদের কর্মঘণ্টা ৮ থেকে ৫ ঘণ্টায় কমিয়ে আনাকে ইনসাফ বলেছেন, যা নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর তিনি আবারো এ প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং বলেন ৫ ঘণ্টা কাজ করলেও নারীরা ৮ ঘণ্টার মজুরিই পাবেন।

সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নারীদের কর্মঘণ্টা ৮ থেকে ৫ ঘণ্টায় কমিয়ে আনাকে ইনসাফ বলেছেন, যা নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর তিনি আবারো এ প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং বলেন ৫ ঘণ্টা কাজ করলেও নারীরা ৮ ঘণ্টার মজুরিই পাবেন। অতিরিক্ত ৩ ঘণ্টার মজুরি নিয়োগকারী নয়, বরং সরকার প্রদান করবে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, ওই ৩ ঘণ্টায় অন্য যেসব নারী পরিবারে সময় দেয়ার জন্য আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারেন না, তাদের খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। যেহেতু বাংলাদেশে গৃহস্থালি ‍কাজের ভার প্রধানত নারীদের কাঁধেই বর্তায়। তাই আপাতদৃষ্টিতে তার প্রস্তাব নারীদের জন্য কল্যাণকর হিসেবেই প্রতীয়মান হতে পারে। কিন্তু বেশকিছু প্রশ্নের বিপরীতে প্রস্তাবটি দাঁড় করালে এর দুর্বলতা খুব সহজেই চোখে পড়ে।

প্রথম এবং একদম গোড়ার প্রশ্ন, গৃহস্থালি কাজের দায়িত্ব কি শুধুই নারীদের? বক্তব্যে দলটির প্রধান মায়েদের দুগ্ধদানের বিষয়টি সামনে এনেছেন। একজন পুরুষ শারীরিকভাবে সন্তানকে দুগ্ধদান করতে সক্ষম না হওয়ায় স্বভাবতই কাজটি নারীরা করে থাকেন। কিন্তু সন্তান লালন-পালনের অন্যান্য দিকসহ ঘরের বাকি কাজ—যেমন রান্নাবান্না করা বা বাড়ির অন্যদের দেখাশোনা করার কাজে পুরুষদের অংশীদার হতে তো কোনো বাধা নেই। বরং উপার্জন এবং ঘরের কাজে নারী-পুরুষ একে অন্যের সহযোগী হলে প্রত্যেকেই তার পছন্দ অনুযায়ী ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই অবদান রাখতে পারবেন।

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো এবং খণ্ডকালীন চাকরির প্রস্তাব তাই গৃহস্থালি কাজের বোঝা নারীর একার ওপর চাপানোর বৈষম্যমূলক প্রথাটিকেই পুনর্ব্যক্ত করে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশের গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে কীভাবে ঘরের কাজের গুরুভার নারীর উৎপাদনমূলক কাজে অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত করে এবং অর্থনৈতিকভাবে তাকে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল করে রাখে। ফলে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাহীনতায় ভোগেন অনেক নারী। অনেক সময় নির্যাতনমূলক সম্পর্কগুলোও বাধ্য হয়ে জিইয়ে রাখেন।

নারীর প্রতি ইনসাফ হবে তখনই, যখন ঘরের কাজের দায়িত্ব নারী, পুরুষ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে, যা নারীকে কর্মক্ষেত্রে নিজের মতো করে বিচরণের সুযোগ দেবে। পুরুষ সহকর্মীর মতো নারীর জন্যও কর্মক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টা ব্যয় করা তখন ইনসাফ হবে। কারণ বাড়িতে গিয়ে সব কাজ তখন তার এক হাতে করতে হবে না। এ ইনসাফ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অবদানের পথ প্রশস্ত করবে, আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করবে এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার কর্তৃত্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া গবেষণা বলে, গৃহস্থালি কাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে তা পরিবারের সবার মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব রাখে, যার সুফল ভোগ করেন নারী নিজে, তার পরিবার এবং রাষ্ট্র।

কাজেই রাষ্ট্রের নারীর কর্মঘণ্টা না কমিয়ে বরং এমন সব পদক্ষেপ নেয়া উচিত, যেগুলো নারীর ঘরের কাজের চাপ কমাবে। আর এ কথার সূত্র ধরেই দ্বিতীয় প্রশ্নটির অবতারণা করা যায়। রাষ্ট্র যদি সব কর্মজীবী নারীর ৩ ঘণ্টার মজুরি প্রদান করার আর্থিক সক্ষমতা রাখে, তাহলে সেই অর্থ অন্য উদ্যোগে ব্যয় করে কেন নারীর গৃহস্থালি কাজের চাপ কমাতে পারবে না? মিসর, তিউনিসিয়া, মরক্কোসহ বিভিন্ন আরব দেশে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বদল ও পুরুষদের ঘরের কাজে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডসহ নানা কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘের ইউএন উইমেন। নেপাল, কলম্বিয়াসহ উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো কয়েক মাস না হলেও এখন সবেতন পিতৃত্বকালীন ছুটির আইন আছে। এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশই এখন শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ সহজতর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়, বেসরকারি ও জনসমাজভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নত যত্নমূলক সেবা খাত (যেখানে অর্থের বিনিময়ে শিশুদের দিবাযত্ন, বয়স্কদের সেবা-শুশ্রূষা ইত্যাদিসহ গৃহস্থালি নানা কাজের সেবা প্রদান করা হয়) বাস্তবায়নের পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকছে।

নারীবান্ধব এসব বিভিন্ন উদ্যোগে বিনিয়োগ ঘরের কাজ যে নারী-পুরুষ সবার, এ দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের পাশাপাশি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই নিজ আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র ও পরিবারে সময় দেয়ার সুযোগ প্রসারিত করবে। কর্মক্ষেত্রে অথবা বাড়ির কাছাকাছি উন্নত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা গেলে নারীকে আর চাকরি বনাম সন্তানের দেখাশোনার দোটানার মুখোমুখি হতে হবে না। এছাড়া দেশের অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অনুন্নত যত্নমূলক সেবা খাতের উন্নয়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তাই বিনা কাজে ৩ ঘণ্টার বেতনের ব্যবস্থার বদলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বেগবান করে এমন উদ্যোগেই রাষ্ট্রের অর্থায়ন জরুরি।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে অর্থনীতির ৮০ শতাংশেরই বেশি অনানুষ্ঠানিক, সেখানে কী উপায়ে সরকার কর্মজীবী নারীদের তালিকা তৈরি করবে এবং তাদের হাতে ৩ ঘণ্টার বেতন তুলে দেবে সেটি আরেকটি বড় জিজ্ঞাসা। দেশের আনাচে-কানাচে যত কর্মজীবী নারী আছেন তাদের খুঁজে বের করে, নাম লিপিবদ্ধ করে, নিয়োগকারীর সঙ্গে সমন্বয় করে এবং সর্বোপরি পুরো প্রক্রিয়াটির অর্থায়ন করে ৩ ঘণ্টার মজুরি তাদের পৌঁছে দেয়ার কোনো বাস্তবসম্মত উপায় বর্তমান বাংলাদেশে আছে? কীভাবে রাষ্ট্র এত অর্থের সংস্থান করবে এবং প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করবে সেই প্রশ্নের যুক্তিসংগত কোনো উত্তর উপস্থাপনের আগে এমন প্রস্তাব উত্থাপন নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত করার আশঙ্কা তৈরি করে, বিশেষত সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যেখানে নারী স্বাধীনতা নানাভাবে, নানা দিক থেকে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

ইনসাফ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজের কম ক্ষমতাসম্পন্ন, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী তাদের ন্যায্য সুযোগ প্রাপ্ত হয়। বিদ্যালয়ে ভালো মানের শিক্ষক না থাকায় কোনো শিক্ষার্থী যদি মাধ্যমিক পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়, তবে ভালো শিক্ষকের ব্যবস্থা করাটাই ইনসাফ, সরকারি উদ্যোগে তাকে উত্তীর্ণ করা নয়। ঠিক তেমনি এককভাবে গৃহস্থালি কাজের দায়িত্বের জন্য নারী যদি জীবিকা অর্জনের অধিকারবঞ্চিত হয়, তবে কী করে এ কাজ পুনর্বণ্টন করলে নারী তার অধিকার চর্চা করতে পারবে, সেই প্রশ্নের সুরাহা করাটাই ইনসাফ। কর্মঘণ্টা যদি কমাতেই হয়, তবে তা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কমানো উচিত, যাতে উভয়েই কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটি সুষম ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন। কিন্তু ঘরের কাজের দোহাই দিয়ে নারীর কর্মঘণ্টা হ্রাস করার প্রস্তাব ইনসাফ নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যকে প্রকট করার একটি প্রয়াস।

জাহিদ নূর: পিএইচডি গবেষক, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সহযোগী, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

আরও