প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে প্রভেদ কমানোর দায় নতুন মেয়রদের

আনুমানিক ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার খরচ করে ইন্দোনেশিয়া তার রাজধানী জাকার্তা থেকে সরিয়ে স্থানান্তর করতে পারে বর্নিও দ্বীপের কালিমানতানে। অতিরিক্ত জসংখ্যার চাপে তীব্র যানজটে প্রায়ই নাকাল হয় জাকার্তা। তবে রাজধানী সরিয়ে নেয়ার পেছনে একমাত্র কারণ যানজট নয়। জাভা সাগর পরিবেষ্টিত জাকার্তা প্রতিবছর ১ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার করে ডুবছে সাগরে। ভয়ংকর হলেও সত্যি, শহরের প্রায় অর্ধেক এখন সাগরের উচ্চতার চেয়ে নিচে অবস্থান করছে। ঢাকা শহরও কম বেশি জনভারে পর্যুদস্ত। দেশের কিছু অর্থনিতীবিদ ও উন্নয়ন পরামর্শক দেশের রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া যায় কিনা এমন প্রস্তাব দিচ্ছেন। যদিও রাজধানী রিলোকেট করার চাইতে রিঅ্যারেঞ্জ করাই সাশ্রয়ী । তারপরও পরিকল্পনা প্রণয়ণে

এ শহর প্যারিস-সাংহাই দেখা ব্যস্ত কর্পোরেটের, এ শহর সজনে ডাটা ভরা বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরা রিটায়্যার্ড অফিসারের, এ শহর নেত্রকোনার নির্মলেন্দু গুণের, এ শহর ডেনমার্কের মনোরম পরিবেশকে উপেক্ষা করা ফুটবল অধিনায়ক জামাল ভুইয়ার, এ শহর কাপ বাজিয়ে ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গাওয়া গায়িকা যশপ্রার্থী মেয়েটির, এ শহর দাড়ি কামাতে অনীহ উদাসী তরুণটির, এ শহর স্বপ্নের সৌধের ও প্রত্যাশার সমাধির- এ শহরে এসবই আটপৌরে মন্তাজ। এই সব নিত্য দিনের রুটিনের বাইরে আরেকটি পঞ্চবার্ষীকি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে  দায়িত্বে এনেছে দুজন মেয়র।

‘A great city is not to be confounded with a populous one’, একটি উন্নত নগরী অবশ্যই জন-ভারাক্রান্ত হবে না। এরিস্টটলের এই বাণীকে এক রকম অবজ্ঞা করেই বেড়ে উঠেছে নগরগুলো; কি প্রাচ্যে কি পাশ্চাত্যে। একবিংশ শতকের দুই দশক পার করে  নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, নগরকেন্দ্রিক চ্যালেঞ্জগুলো গত শতকের চ্যালেঞ্জগুলোর চেয়ে ভিন্ন। গ্রামভিত্তিক সমাজ ব্যাবস্থার চরিত্র বদলে স্বাধীনতার পর বেশ দ্রুতই নগরগুলো আধুনিক রূপ নেয়া শুরু করে। নগর-চরিত্র কেমন হবে তা ঠিক করবে নাগরিকরাই। স্থানিক ও প্রচলিত দেশীয় বাস্তবতা মেনে। শহর নগর ঘিরে রাখা নদী-নালা অবারিত সবুজ  শুধু নৈসর্গিক শোভা নয়, এসব  ইকোলজিক্যাল উপহার হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। এই নগর থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ, রাজ করছে ধূসর কংক্রিট। এক কালে সবুজের প্রাচুর্য ছিল এই শহরের  বৈশিষ্ট্য অথচ সে একই শহরকে এখন ‘পরিবেশ-প্রতিবন্ধী’ বা ‘ইকোলজিক্যালি হ্যান্ডিক্যাপড’ বললে প্রতিবাদের কিছু নেই। কদিন উচ্চ আদালত একই ধরনের পর্যবেক্ষণের কথা প্রকাশ পেয়েছে।

সমাজ  উন্নয়ন পরিক্রমায় অবশ্যম্ভাবী পরণতি হচ্ছে নগরায়ণ । অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সঙ্গে  নগরায়ণ বিশেষভাবে যুক্ত যার ফলাফল হিসেবে মানুষ পেয়েছে বর্ধিত ভৌগলিক স্থানান্তর স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক গতিশীলতা, নিম্ন প্রজনন হার সেই সঙ্গে দীর্ঘ জীবন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রথম আদমশুমারি হয়, তাতে দেখা যায়, দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৪ ভাগ নগর এলাকায় বাস করত। শহর এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠী সার্বিক জনসংখ্যার শতকরা ২৮ ভাগে উন্নীত হয় ২০১১ সালে । ২০১১ থেকে ২০৪১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ৪ দশকি ৬ কোটি থেকে ৬ কোটি পর্যন্ত বাড়তে পারে  এবং  জনসংখ্যার বড় অংশই শহর এলাকায় বাস করবে, জাতিসংঘের প্রক্ষেপণ এমন ধারণা দেয়।

উন্নয়ন রূপরেখার চলতি ধারায় যদি চকিত মনোযোগ দেয়া যায় , দেখা যাবে কেবল গত হয়ে যাওয়া শতকই  নয় চলতি শতকেও সবচেয়ে বড় পরিবর্তনশীল প্রবণতা হলো নগরায়ণ । এবং  উন্নয়ন অর্থনীতিবিদগন ধারণা করছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর  অর্ধেকই বসবাস করবে বড় বড় শহর ও নগরগুলোতে। নগরকেন্দ্রিক এই প্রবণতার কারণে আবাসন, যোগাযোগ, অবকাঠামো, নাগরিক সেবাসমূহ, খাদ্য প্রাপ্তি ,শিক্ষা, যথাযথকর্ম সংস্থান এইসব মৌল বিষয়গুলোর ওপর ভারসাম্যহীনভাবে চাপ সৃষ্টি করবে। সেই সঙ্গে বড় বড় নগরগুলোর পরিচালন ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জগুলোও সরকারের  শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) কিছু দিন আগে  ‘দ্য স্ট্যাটাস অব সিটিজ’ শিরোনামে কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে ।গবেষণা প্রতিবেদন যে  সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছিল, সেগুলো মোটা দাগে এমন: 

১. নির্বাচিত  মেয়রের সঙ্গে  সরকারের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ২. সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রদান কেন্দ্রমুখী ৩.  প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে নগরীর মাস্টারপ্ল্যানকে অবহেলা ৪. কেন্দ্রীয় সরকার থেকে  কম অর্থ বরাদ্দ ৫. নগরীর উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে  সমন্বয়ের সংকট। 

প্রতিবেদনটি নগরের শাসন ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্যের চিত্র উদ্ঘাটন করেছিল, সেখানেও সিটি করর্পোরেশনের ক্ষমতাহীনতাই মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, এই প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণ ছিল চট্টগ্রাম নগরীর প্রেক্ষাপটে। ক্ষেত্র সমীক্ষাটি ঢাকায় চালালেও পর্যবেক্ষণের ভিন্নতা পাওয়া যেত না। 

 স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ (৬০ নং আইন)-এর প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সিটি কর্পোরেশন একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হইবে এবং ইহার স্থায়ী ধারাবাহিকতা ও একটি সাধারণ সিলমোহর থাকিবে এবং এই আইন ও বিধিসাপেক্ষে, ইহার স্থাবর ও অস্থাবর উভয় প্রকার সম্পত্তি অর্জন করিবার, অধিকারে রাখিবার ও হস্তান্তর করিবার ক্ষমতা থাকিবে এবং ইহার নামে মামলা দায়ের করিতে পারিবে বা ইহার বিরুদ্ধেও মামলা করা যাবে’। এর অর্থ হচ্ছে, সিটি কর্পোরেশনগুলো পৃথক সত্ত্বা ও পরিচয় বহন করে এবং এগুলো প্রশাসনিক একাংশ বা ইউনিট হিসেবে গণ্য হবে যা কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে পৃথক।

আমাদের  দেখা উচিত সিটি কর্পোরেশনের জন্য নির্ধারিত দায়িত্ব ও কাজের তালিকায় কী আছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯-এ সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৪১ ধারার বিধান এমন, কর্পোরেশন তহবিলের সঙ্গতি অনুযায়ী তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত দায়িত্ব ও কার্যাবলি সম্পাদন করবে। তাছাড়া বিধি এবং সরকার কর্তৃক সময় সময় প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী কর্পোরেশন অন্যান্য দায়িত্ব ও কার্যাবলি সম্পাদন করবে। তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত দায়িত্ব ও কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে, জন্ম-মৃত্যু ও বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ।

তবে মেয়র প্রাথীরা এমন সব প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস দিয়েছেন যা আসলে তাদের এখতিয়ার বহির্ভুত। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীরাই প্রধান, তারাই নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন (রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের মতো)। কিন্তু সিটি করপোরেশন তো মেয়র-কাউন্সিলর সবাইকে নিয়ে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমি মনে করি, সরাসরি ভোটে কাউন্সিলরদের নির্বাচিত করা উচিত। এরপর কাউন্সিলরদের ভোটে একজন মেয়র নির্বাচিত হবেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে সেটাই হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে জাতীয় পর্যায়ে সংসদীয় পদ্ধতি চালু থাকলেও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো চলছে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতিতে। এতে ব্যক্তি প্রধান হয়ে উঠেছেন।’

প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস স্যাম এন্ডারসনের  Boom Town বইটিকে ২০১৮ সালের অন্যতম সেরা বই বলে স্বীকৃতি দেয়। বইটিতে লেখক একটি অনুন্নত, ধ্বংসপ্রাপ্ত  শহরকে কীভাবে পুনর্গঠন করা যায় এবং এর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়  এ নিয়ে একটি বিস্তারিত  ধারণা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি  আরেকটি বিষয়ে লেখক  গুরুত্ব দিয়েছেন তা  হলো,  কোনো শহরকে বিনির্মাণ করতে হলে স্থানিক  সংস্কৃতি ও আবহমান ঐতিহ্য রক্ষা করে উন্নয়নের করতে হবে। নতুন মেয়রগন তাদের ইশতেহারে  ঐতিহ্য রক্ষ্যা করে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অবশ্য।

আনুমানিক ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার খরচ করে ইন্দোনেশিয়া তার  রাজধানী জাকার্তা থেকে সরিয়ে  স্থানান্তর করতে পারে বর্নিও দ্বীপের কালিমানতানে। অতিরিক্ত জসংখ্যার চাপে তীব্র যানজটে প্রায়ই নাকাল হয় জাকার্তা। তবে রাজধানী সরিয়ে নেয়ার পেছনে  একমাত্র কারণ যানজট নয়। জাভা সাগর পরিবেষ্টিত  জাকার্তা প্রতিবছর ১ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার করে ডুবছে সাগরে। ভয়ংকর হলেও সত্যি, শহরের প্রায় অর্ধেক এখন সাগরের উচ্চতার চেয়ে নিচে অবস্থান করছে। ঢাকা শহরও কম বেশি জনভারে পর্যুদস্ত। দেশের কিছু  অর্থনিতীবিদ ও উন্নয়ন পরামর্শক দেশের রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া যায় কিনা এমন প্রস্তাব দিচ্ছেন। যদিও রাজধানী রিলোকেট করার চাইতে রিঅ্যারেঞ্জ করাই সাশ্রয়ী । তারপরও পরিকল্পনা প্রণয়ণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে  অভিঘাত সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ নগরায়ণ ব্যবস্থাপনার মৌলিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে নতুন মেয়রদের । নির্বাচন পূর্ব প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবয়নের মধ্যে মেরুদূর প্রভেদ কমানোর দায় নতুন মেয়রদের হাতে। 

লেখক: এমএম খালেকুজ্জামান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

[email protected]

আরও