কৃষি ভাবনা

কৃষিভূমিতে বাড়ি বা শিল্প-কারখানা নির্মাণ কি অবাধে চলবে

বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনগণ তাদের আয়ের বড় একটি অংশ খাদ্যের জন্য ব্যয় করে।

সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব সব নাগরিকের খাদ্যের মৌলিক চাহিদা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করা। জাতিসংঘের ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-২) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সব নাগরিকের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।| এ খাদ্য জোগানের মূল ও প্রাথমিক উৎস কৃষি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএসএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান বর্তমানে প্রায় ১১ দশমিক ২ থেকে ১১ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে। গ্রামীণ অর্থনীতির বড় একটি অংশ কৃষি কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনশীলতা, জনসংখ্যার আকার, শস্যের নিবিড়তা, উৎপাদন দক্ষতাসহ নানা বিষয়ের ওপর কৃষিভূমির প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে।

বাংলাদেশে আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ প্রায় ৮৮ লাখ ১৭ হাজার ৯৩৫ হেক্টর। নিট ফসলি ভূমির পরিমাণ প্রায় ৮১ দশমিক ২৬ লাখ হেক্টর এবং মোট ফসলি ভূমির পরিমাণ (এক, দুই, তিন ও চার ফসলি মিলিয়ে) প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ৫৬ হাজার ৮১৬ হেক্টর, যা জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। এছাড়া প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিভূমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। ক্রমহ্রাসমান কৃষিভূমির শূন্যতা কিছুটা পূরণ করা যায় শস্য নিবিড়তা (ক্রপিং ইনটেনসিটি) বাড়িয়ে। একটি নির্দিষ্ট ভূমিতে এক বছরে কয়টি ফসল উৎপাদন করা হয় শস্য নিবিড়তা তা-ই নির্দেশ করে। এটি রাতারাতি বাড়ানো অসম্ভব। সেচ সুবিধাসহ কৃষি উপকরণের অপ্রতুলতা, কৃষিকাজে ভূমি মালিকের অনুপস্থিতি, একই ব্যক্তির অতিরিক্ত জমির মালিকানা, বর্গা চাষ, অকৃষি খাতে উপার্জন সুযোগ বৃদ্ধি, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, কৃষিকাজে কায়িক পরিশ্রম, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা কারণে জমিতে শস্য নিবিড়তা আশানুরূপ বাড়ছে না। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ১৯৭১-৭২ সালে ফসলের নিবিড়তা ছিল ১৫৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ২০৫ শতাংশ। পরিসংখ্যানগতভাবে এটি বাড়লেও বাস্তবে এ বৃদ্ধির পরিমাণ আশানুরূপ নয়।

ফসল বহুমুখীকরণের মাধ্যমে কৃষিভূমির শূন্যতা কিছুটা পূরণ করা যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফসল বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বেশকিছু প্রকল্প এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। তবে অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না। সিম্পসন সূচক অনুযায়ী জাতীয় শস্য বহুমুখীকরণ সূচক ১৯৭০-৭১ সালে ছিল দশমিক ৩৫, যা ২০১২-১৩ সালে দাঁড়ায় দশমিক ৪২ শতাংশ। আমাদের শস্য নিবিড়তা আশানুরূপ বাড়েনি, অন্যদিকে শস্য বহুমুখীকরণও বাড়েনি বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে বাড়ছে না খাদ্যশস্যের উৎপাদন। কৃষিভূমি হ্রাস, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও আশানুরূপ সম্প্রসারণের অভাব, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। তাতে গত কয়েক বছর দেশের কৃষি খাত এক প্রকার অচলায়তনে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বড় ধাক্কা লাগতে পারে দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনায়।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ধান আবাদ হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টরে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদকৃত ভূমি ১ কোটি ১৪ লাখ হেক্টরে নেমে আসে। অর্থাৎ সর্বশেষ পাঁচ বছরে আবাদকৃত ভূমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। এভাবে প্রতি বছরই কৃষিভূমির পরিমাণ কমছে। এর বিপরীতে পাঁচ বছরে হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে কেবল ৪ শতাংশ। আর চাল উৎপাদন মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে। গবেষণায় কৃষিশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৮৪-৯৬ সালে প্রতি বছর গড়ে দশমিক ৯৭ শতাংশ হারে কমেছে কৃষিভূমি। ১৯৯৬-২০০৮ পর্যন্ত কৃষিভূমি কমেছে দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে। ২০০৮-১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতি বছর গড়ে মোট ভূমির দশমিক ২১ শতাংশ হারে কমেছে কৃষিভূমি। অর্থাৎ উল্লেখিত ৩৫ বছরে গড়ে কৃষিভূমির পরিমাণ কমেছে প্রায় দশমিক ৩৫ শতাংশ হারে।

অধিক জনঘনত্বসম্পন্ন বাংলাদেশের নগরায়ণ বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এ নগরায়ণ মূলত অপরিকল্পিত, স্বেচ্ছাধীন, অনিয়ন্ত্রিত, অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অপরিকল্পিত সমাধানভিত্তিক। ফলে কৃষিজমি শিল্প বা আবাসিক ভূমিতে রূপান্তর হচ্ছে, অনেকের পেশাগত পরিচয়ের পরিবর্তন ঘটছে। গ্রামাঞ্চলে যত্রতত্র কৃষিভূমি অপরিকল্পিতভাবে বাসগৃহ, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ অকৃষি খাতে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে আবাদযোগ্য কৃষিভূমি কমছে। জল নিষ্কাশন সুযোগবিহীন গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, খাল-বিল ভরাট করে রাস্তাঘাট নির্মাণ, অপরিকল্পিত রাস্তার অ্যালাইনমেন্ট, অপ্রয়োজনীয় গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণের ফলে গ্রামীণ অঞ্চলে জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। এজন্য দেশের অনেক নিম্নাঞ্চলে বর্ষার পানিপ্রবাহ কমছে। পাশাপাশি পলিমাটির অবর্তমানে কৃষিভূমির স্বাভাবিক উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। দেশের যত্রতত্র গড়ে উঠছে ইটভাটা ও কলকারখানা। এতে কমছে জমি ও ফসল উৎপাদন। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে কৃষকদের ওপর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আবাস ও ব্যবসাকেন্দ্রিক নতুন নতুন কার্যক্রমও চালু হচ্ছে। কোথাও আবার সরকারিভাবে রাস্তাঘাট হচ্ছে এবং বাস্তবায়ন হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প। সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও কৃষিভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। যদিও তিন-ফসলি জমিতে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে কাগজে-কলমে।

কৃষিভূমি রক্ষায় ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬ জারি হয়েছে। কৃষি ও জলাশয় সুরক্ষাসহ সার্বিক পরিকল্পনার লক্ষ্যে স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি হয়েছে। কিন্তু অধ্যাদেশ দুটির বাস্তবায়নের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই, এমনকি প্রস্তুতিরও অভাব রয়েছে। অধ্যাদেশ দুটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিধি প্রণয়নের বিধান রয়েছে, তাও হয়নি। সমগ্র দেশকে স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় আনা বা ভূমি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ প্রণয়নের উদ্যোগ কিংবা প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না। কেউ যদি কৃষিভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু এ নিয়মেরও যথাযথ প্রয়োগ নেই। যার যখন খুশি কৃষিভূমিতে বাড়ি বা শিল্প-কারখানা তুলে ফেলছেন। প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত অর্থে যত্রতত্র ঘরবাড়ি, দালানকোঠা নির্মাণ হচ্ছে। পুরো দেশের ভূমির নির্দিষ্ট শ্রেণীবিন্যাস না থাকায় কৃষিজমির পরিমাণ কমছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, সারা দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ভূমি পরিকল্পনা থাকলে কৃষিভূমি হ্রাসের পরিমাণ পর্যবেক্ষণে রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের নগরভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে মাত্র ১০ শতাংশ ভূমি পরিকল্পনার আওতাভুক্ত রয়েছে। বাকি ৯০ শতাংশ ভূমি কার্যত মহাপরিকল্পনার বাইরে। ফলে যত্রতত্র আবাসন বা শিল্প-কারখানা নির্মাণ করা হচ্ছে। জলবায়ুর অভিঘাতের কারণেও কৃষিভূমি কমছে। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিভূমিতে লবণাক্ততা নতুন সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত স্থানিক পরিকল্পনা (স্পাশিয়াল) অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। কিন্তু এ অধ্যাদেশে কৃষিভূমি রক্ষার্থে ও সংরক্ষণার্থে করণীয় সম্পর্কে যথাযথ গুরুত্বারোপ করা হয়নি বলে কৃষিসংশ্লিষ্টদের ধারণা। অন্যদিকে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬-এ কৃষিভূমি রক্ষার্থে গুরুত্বারোপ করা হলেও তার বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। কৃষিভূমি জোনিং ম্যাপ প্রস্তুতকরণ সম্ভব হলেও বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তার বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য এবং তার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার আর সদিচ্ছা। কৃষিজমি রক্ষার্থে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ ২০২৫ এ দুটি অধ্যাদেশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে কৃষিজমি সংরক্ষণকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সমগ্র দেশে ভূমি ব্যবহারের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। তাছাড়া অবিলম্বে কৃষিভূমি ব্যবহার জোনিং করা এবং জোন পরিবর্তনে কিংবা ভূমির শ্রেণী পরিবর্তনে সতর্কতা এবং কঠোরতা অবলম্বন করা, ভূমি জোনিং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মনিটরিং ও তদারকি করা, অধ্যাদেশে বর্ণিত বিভিন্ন কমিটি গঠন করা এবং অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। এসব কিছুর পূর্বশর্ত হচ্ছে, দৃঢ় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার।

সিকদার আনোয়ার: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব

আরও