বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তি আসতে পারছেন না

মামুন রশীদ। প্রথিতযশা ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। প্রায় ৩৫ বছর কাজ করেছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে। ছিলেন ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের পরিচালক ও অধ্যাপক। সম্পৃক্ত ছিলেন এমসিসিআই, এফআইসিসিআই (ফিকি), ব্রিটিশ বিজনেস গ্রুপ এবং আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, চট্টগ্রাম চেম্বার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। দেশের সাম্প্রতিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের নানা ইস্যুতে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

১০০ দিন পেরিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

সাম্প্রতিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ও আন্দোলন-পরবর্তী গঠিত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিশ্বব্যাপী তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ কারণে বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীসহ যারা নিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশে কাজ করছে, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দ্বিপক্ষীয় সংস্থাগুলোসহ সবাই আশাবাদী। এ আশাবাদ বেশ কিছুদিন ধরে ছিল বাংলাদেশকে ঘিরে। এর দুটি ভিত্তি ছিল—প্রথমটি হলো, দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ, যার মূলে রয়েছে দেশের বিশাল একটি তারুণ্যদীপ্ত জনগোষ্ঠী, যাদের গড় বয়স ২৭ বছর। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭১ বছর, যা একটি দেশের জন্য দারুণ অগ্রগতির পূর্বাভাস। বলা হয়ে থাকে, মানুষের জীবনের সবচেয়ে ভালো সময় ২৫-৪০ বছর। সে জায়গা থেকে বাংলাদেশের তরুণদের গড় বয়স যেহেতু ২৫-এর কাছাকাছি, সেহেতু এ তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের জন্য দারুণ সম্ভাবনাময়। আর দ্বিতীয়টি হলো, ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি ও এনজিও প্রতিনিধিত্বের সক্রিয়তায় প্রচুর নারী উদ্যোক্তার সৃষ্টি। এছাড়া আরেকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, আশির দশকের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিগত সরকারগুলোর গৃহীত নানা নীতির কারণে বেসরকারি খাতে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। সেজন্য তারা পরম্পরায় বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করতে চেয়েছে। ২০০৯-১৪ পর্যন্ত এ নেতৃত্ব মোটামুটি ঠিক ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর যখন দেখা গেল, কারো একক নিদর্শনায়, কর্তৃত্বে, পরামর্শে কিংবা যোগসাজশে ও ষড়যন্ত্রে নির্বাচন না দিয়েই এবং ন্যূনতম জবাবদিহিতা ছাড়াই সরকারে থাকা যায়, তখন থেকে মানুষ আশাহত হয়ে একদিকে চলে গেল। বেশির ভাগ মানুষ ধরেই নিল রাষ্ট্রের কাছাকাছি যাওয়ার অর্থই হচ্ছে সরকারের কাছাকাছি থাকা বা গুণগান গাওয়া। তবে দেশে ক্রনি ক্যাপিটালিজম গড়ে তুলতে পারেনি। ক্রনি ক্যাপিটালিজম গড়ে তুলতে পারত যদি তারা সক্ষম হতো।

বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের কথা চলছে। সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সংস্কার তৎপরতা কেমন হচ্ছে?

এখন একটি নতুন ধরনের ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। সংবিধান সংশোধন, প্রশাসনিক সংস্কার, পুলিশ সংস্কার, বাজেটের ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনয়ন, অন্য সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণে অন্তর্বর্তী সরকার সক্ষম কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন এসেছে। এ সরকার বিপ্লবী ও আন্দোলনকারীদের স্বপ্নের কাছাকাছি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি জবাবদিহি সৃষ্টির পরিবেশ কি তৈরি করতে পারবে? গণমাধ্যমে জানতে পেরেছি এসব নিয়ে মানুষ প্রশ্ন করছে। দ্বিতীয়ত, শুরুতে আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে একটা কর্মচাঞ্চল্য ও ভাবচাঞ্চল্য এসেছিল ড. ইউনূস ও ছাত্র-জনতার আন্দোলন কেন্দ্র করে। যে স্বপ্ন ও কৌতূহল এ নতুন নেতৃত্ব ঘিরে তৈরি হয়েছিল সেটা ধীরে ধীরে যেন কিছুটা মিইয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার আমলানির্ভর হয়ে যাচ্ছে, যা বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে। সেখানে উদ্যোক্তাদের জায়গাটি কোথায়? ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ উদ্যোক্তা এবং এ সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দেয়ার মতো মানুষ কোথায়? এ কারণে মনে করছি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) বা ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) বা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) বা অ্যামচেম কিংবা চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স পরিচালিত হতে হবে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দিয়ে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরাই ব্যবসায়ীদের দুঃখ-কষ্ট কোথায় সেটা বোঝে। এ ব্যবসায়ী বলতে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী নয়, সারা দেশের ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দুঃখ কি আমরা বুঝি? সরকার নতুনভাবে যে বাজেট প্রণয়ন করবে কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করপরিকল্পনা করবে, সেখানে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া দরকার।

আপনি চেম্বারের কথা বলছেন। চেম্বারগুলো সচলে কী উদ্যোগ কাম্য?

চেম্বারগুলোকে ডাকা, বাজেট পরিকল্পনা কমিটি গঠন ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপে নিয়োজিত হওয়ার বিষয়ে সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের সময় থেকে আলোচনা শুরু হয়েছিল। সে ধারা পরবর্তী অর্থমন্ত্রীরাও চালিয়ে গেছেন। কিন্তু এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করে দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কি নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দেয়ার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন? এমনকি অনেক আগে বিশ্বব্যাংক তাদের একটি কান্ট্রি রিপোর্টে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখিয়েছিল কাজের দক্ষতার অভাবকে। পুরো রিপোর্টে দক্ষতার ওপর ফোকাস দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) সদস্য, তাই বাণিজ্য উদারীকরণ বা বিশ্বায়নের দিকে যেতেই হবে। এদিকে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যে আর্থিক বরাদ্দ দিচ্ছে তা কিন্তু শর্তযুক্ত। সেসব শর্তে আর্থিক খাত সংস্কার, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার ও প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো বেশি জবাবদিহিতা সৃষ্টি করার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে অভিনবত্বসহকারে এবং সম্মানের সঙ্গে দেশের ব্যক্তি খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ব্যক্তিগত খাতে সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের মাধ্যমে সহায়তা করবে। কিন্তু ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব যদি প্রধান উপদেষ্টা, বাণিজ্য উপদেষ্টা, এনবিআরের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, জ্বালানি সচিব, বিদ্যুৎ সচিবের কাছে শুধু তাদের নিজ স্বার্থ রক্ষায়, যেমন কর হ্রাস করা, ব্যাংক ঋণ নেয়া, ব্যাংক ঋণ মওকুফ করানোর স্বার্থে নিয়োজিত থাকে, তাহলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা কীভাবে সম্ভব? ফেডারেশন অব দ্য ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ফিকি) শিল্প খাতে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা সেল আছে। ফিকি’র অধীনে আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে অনেক চেষ্টা করেছিলাম। দু-একজন উদ্যোগও নিয়েছিলেন কিন্তু তা সফল হননি। এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্ব এ ধারণাকে ধারণই করতে পারেনি।

এফবিসিসিআই সাফল্য দেখাতে পারেনি কেন?

বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) আর্থিক সহায়তায় একটি প্রকল্পে এফবিসিসিআই ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সকে নিয়ে কাজ করেছিলাম, যাতে এ চেম্বারগুলোর বাজেট বিশ্লেষণ ও সমালোচনাসহ সরকারি নীতিমালা বিশ্লেষণে আরো বেশি ঋজুতা অর্জন করা সম্ভবপর হয়। সেজন্য আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ভালো একটি কোম্পানিকে এনে এফবিসিসিআইকে অনেক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। আর দেশের মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ছাড়া অন্য কারো ভালো গবেষণা করার সুযোগ নেই। এর পরও সময়ের পরম্পরায় এমসিসিআইয়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন, তরুণদের আগমন, যোগ্য ব্যবসায়ীদের সময়ের অভাব, শিল্প ক্ষেত্রে সম্পর্কের অবনমন ঘটা এবং শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম নিচ্ছে। এসব কারণে তারা তাদের ব্যবসা দেখবে নাকি এফবিসিসিআই বা এমসিসিআইকে নেতৃত্ব দেবে? এসব কারণে আমরা দেখছি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তি আসতে পারছেন না। যোগ্য লোক না আসতে পারার কারণেই তারা তাদের সচিবালয় এবং খাতগুলোয় ভালো মেধা লালন করতে পারছে না। মেধাকে আকর্ষণ করতে পারছে না। এ অবস্থায় সামগ্রিকভাবে এ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যখন নীতিপ্রণেতারা আলোচনায় বসেন তখন সত্যিকারের নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা ও সৎ উদ্যোক্তাদের সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সব নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বসতে হবে। কিন্তু মূল সমস্যা চিহ্নিতকরণে সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও যোগাযোগের অভাবে নীতিপ্রণেতারাও একপেশে সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তাদের ওপরও চাপ থাকে। জাতীয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তাদের স্বার্থে এমনকি বিশ্বায়নের যুগে আমরা প্রতিবেশী দেশগুলো কিংবা অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যর্থ হচ্ছি। এছাড়া দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মানসম্মত তরুণ উদ্যোক্তা বের করে আনতেও ব্যর্থ হচ্ছি। এ সংকট দূরীকরণে দরকার পাঠ্যক্রম সংস্কার। কিন্তু সেটাও করতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে সরকারি-বেসরকারি একাডেমিয়ার ইন্টেলিজেন্সিয়া, মার্কেট ইন্টেলিজেন্সিয়ায় সংস্কার কিংবা বিজনেস ও একাডেমিয়ার মেলবন্ধনেরও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছি না। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (আইআইএম) অনেক অধ্যাপক বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এমনকি রিলায়েন্স ও টাটার চেয়ার অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করছেন। অর্থাৎ ভারতে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ গড়ে উঠছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো তা সম্ভব হয়নি।

কেন এমনটা হলো?

বাজারবান্ধব অর্থনীতিবিদ, আমলা ও নীতি পরামর্শকরা কোথায়? এ রকম মানুষ তো আমাদের নেই। দেশে ভালো পরিবেশ না থাকায় দক্ষ ও ভালো মানুষগুলো বিদেশে চলে যাচ্ছেন। অনেক ব্যবসায়ীর সন্তানরা দেশে ফিরতে কিংবা ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী নন। ফলে আমরা দেখেছি একটি নির্দিষ্ট নেক্সাসের সদস্যরাই বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও বেসরকারি খাতের উপদেষ্টাই ব্যবসাকেন্দ্রিক সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। কিন্তু এভাবে ঘটা উচিত নয়। যেখানে শুরু করেছিলাম সেখানেই শেষ করতে চাই। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আমরা বেসরকারি খাত নেতৃত্বাধীন উন্নয়নের কৌশল হিসেবে একটি গ্রুপ সূচনা করতে সক্ষম হয়েছি। বেসরকারি শিল্প খাতকে চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি। ১৯৭২ সালে শিল্পের ৯০ শতাংশই ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত। বর্তমানে ৬০ শতাংশের বেশি বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণাধীন। বেসরকারি খাতকে প্রতিবেশী দেশের টাটা, রিলায়েন্স, বিড়লা বা টেক্সটাইল মিল, অ্যাপারেল খাত, বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য একটি নতুন ধরনের সমঝোতা বা বন্দোবস্ত তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে আমলাসহ নীতিনির্ধারকদের বেসরকারি খাতবান্ধব হতে হবে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনার জায়গা কোথায়?

ভারত নিজ ভূখণ্ডের বাইরে বিখ্যাত কেন? কারণ তারা বিশ্বসেরা প্রযুক্তিবিদদের জন্ম দিয়েছে। গুগল, ইন্টেল, টেসলা, টুইটার, মাইক্রোসফট, ফেসবুকের মতো বিশ্বের জায়ান্ট প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ভারতের প্রযুক্তিবিদরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসব প্রযুক্তবিদের জন্ম দিয়েছে কে? প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (আইআইএম) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম) এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) রয়েছে। ভারতের আইআইটি ও আইআইএমের সহযোগিতা নিয়ে বিআইএম ও বার্ডকে আরো মানসম্পন্ন করা যেতে পারে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে প্রযুক্তি সহযোগিতার দিকে যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ প্রশিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সে সম্ভাবনা এখনো হারিয়ে যায়নি। জিটুজি পারস্পরিক সহযোগিতা করতে হবে। বিশ্বের নামিদামি বিজনেস স্কুল, ম্যানেজমেন্ট স্কুল, টেকনিক্যাল এবং টেকনোলজিক্যাল স্কুলের সঙ্গে বাংলাদেশে আন্তঃসংযোগ ও সহযোগিতামূলক শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। দেশে একটি ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি তৈরি করা হয়েছে। ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক করা হয়েছে। প্রতি বছর বাজেটে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে জোর দেয়া হয় এবং প্রচুর বরাদ্দ পায়। কিন্তু দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ অগ্রগতি হচ্ছে না। প্রধান উপদেষ্টার প্রধান কথা হচ্ছে চাকরিজীবী হয়ো না, চাকরিদাতা হও। সেজন্য কী করতে হবে? ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। এখন একটি ভালো সময় এসেছে। সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। সংস্কারে দুটি বিষয় গুরুত্ব দেয়া উচিত। এক. পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। দুই. বিশ্বের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে গিয়ে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করা। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কর্মক্ষম, কর্মদক্ষ ও কর্মোদ্যমী মানবসম্পদ তৈরি করতে হলে এ দুটো বিষয়ের বিকল্প নেই।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে করণীয় কী?

দেশীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজার ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষমতা অর্জনে কাজ করা দরকার। সব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে শিক্ষিত, সৎ, কর্মোদ্যম ও নতুনত্ব আনার মাধ্যমে একটি নতুন বন্দোবস্ত গড়ে তুলতে হবে। এটি করতে হবে সামরিক-বেসামরিক আমলা, নীতিপ্রণেতা ও সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোসহ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় ও সহযোগিতার মেলবন্ধনের মাধ্যমে। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো একটি মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে চায়, কিন্তু তারা তাদের প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে নিতে চায় না। পুঁজিবাজারের প্রধানরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বসেছেন, সেখান থেকে কী ফলাফল আসবে? তারা তো পুঁজিবাজারে বিশ্বাস করেন না। তারা টাকা বানাতে বিশ্বাস করেন। এখন এসব প্রতিবন্ধকতা বা অপচর্চা থেকে মুক্তি পেতে হলে যেমন আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক উদ্যোক্তা সমাজ, তরুণ নীতিপ্রণেতা ও নীতিনির্দেশক দরকার, তেমনি প্রগতিশীল ভবিষ্যৎমুখী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানও দরকার।

আরও