বিশ্ব অর্থনীতি

বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে উন্নয়নের পথ কী হবে?

সাদা চোখে উন্নয়নকে দেখার সময় হয়তো আমরা পেরিয়ে এসেছি। আগে সাধারণ ধারণা ছিল, উন্নত দেশগুলোর দেখানো পথ অনুসরণ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোও একসময় তাদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারবে।

কিন্তু আমার গবেষণা বলছে, এখানে একটি ‘ক্যাচ-আপ প্যারাডক্স’ বা অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়ার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য রয়েছে। কেবল অনুকরণ করে কোনো দেশ কখনই অগ্রবর্তী দেশগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারে না; তাদের ছাড়িয়ে যাওয়া আরো দূরের আলাপ, বরং পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর উচিত নতুন ও উদীয়মান প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এমনভাবে এগিয়ে যাওয়া, যাতে তারা প্রচলিত ধাপগুলো অতিক্রম করে এক লাফে সামনের সারিতে পৌঁছে যেতে পারে।

মূলত লিপফ্রগিং ধাপ ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়া বলতে বোঝায় যারা একসময় আপনার চেয়ে এগিয়ে ছিল, তাদের আগেই নতুন কিছু করে দেখানো। বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার অনেক উন্নয়নশীল দেশকে স্থায়ী টেলিফোন নেটওয়ার্ক নির্মাণের দীর্ঘ পথ এড়িয়ে সরাসরি মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে লিপফ্রগিং ঘটেছিল এরপর। এসব দেশের কয়েকটি বিশেষ করে কেনিয়া প্রচলিত ব্যাংকিং অবকাঠামো বা ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে না তুলেই উদ্ভাবনী মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করে বিশ্বকে নতুন দৃষ্টান্ত দেখায়। অতএব লক্ষ্য শুধু পুরনো প্রযুক্তি এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং নতুন বাজারে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দ্রুত রূপান্তর তাকে একসময়ের পথপ্রদর্শক জাপানকে ছাড়িয়ে যেতে সহায়তা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং যখন ডিজিটাল টেলিভিশনের বাজারে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছিল, তখন জাপানের সনি অ্যানালগ প্রযুক্তিতেই আটকে থেকে সে খাতেই বিনিয়োগ ও উৎপাদন অব্যাহত রেখেছিল।

এ ‘ইনকামবেন্ট ট্র্যাপ’ বা প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের ফাঁদে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের মটোরোলাও। প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল মোবাইল ফোনের দিকে ঝুঁকতে চায়নি; কারণ তাদের কাছে অ্যানালগ প্রযুক্তিই ছিল অধিক নির্ভরযোগ্য। সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক ছিল না। মটোরোলাসহ এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য বিপুল বিনিয়োগ করেছিল এবং সে অবস্থান ছেড়ে দিতে অনিচ্ছুক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের স্রোতে তারা পিছিয়ে পড়ে।

যেসব দেশ পরে উন্নয়নের যাত্রায় নেমেছে, তাদের জন্য সফলভাবে অগ্রসর হওয়ার মূল শর্ত হলো উদীয়মান প্রযুক্তি যে নতুন সুযোগের জানালা খুলে দেয়, তা সময়মতো চিনে নিয়ে ভিন্ন পথ নির্মাণ করা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ হা-জুন চ্যাং ২০০২ সালে দেখিয়েছিলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান বা অর্থনীতি একবার বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে তারা প্রায়ই নিজেদের পরে আসাদের জন্য ‘সিঁড়ি সরিয়ে দেয়’। পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক এবং অন্যান্য মেধাস্বত্ব সুরক্ষার মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠিত বাজারে নতুনদের প্রবেশ কঠিন করে তোলে। এর সঙ্গে বিদ্যমান উৎপাদন ক্ষমতা, অর্থনীতির জটিলতা, বৃহৎ পরিসর এবং অবকাঠামোগত সুবিধাও তাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করে।

এ প্রেক্ষাপটে লিপফ্রগিং যেন এমন একটি গরম বায়ুর বেলুন, যা সিঁড়ি না থাকলেও মানুষকে ওপরে উঠতে সাহায্য করে। অবশ্য এজন্য পিছিয়ে থাকা দেশগুলোরও কিছু সক্ষমতা ও সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সে ভিত্তি তৈরি হয়ে গেলে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় উপযুক্ত সময় নির্বাচন। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগে কিংবা বহিরাগত ধাক্কা ও ‘সৃজনশীল ধ্বংস’-এর সময় নতুন প্রযুক্তির উত্থান এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে এগিয়ে যাওয়ার পথ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি উন্মুক্ত থাকে।

অনুকূল পরিস্থিতিতেও কোনো যাত্রাই ঝুঁকিমুক্ত নয়। কোন প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং নতুন বাজার গড়ে তোলার ব্যয় কীভাবে বহন করা হবে, এসব সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের অর্থনীতির ক্ষেত্রেই বিষয়টি সমানভাবে প্রযোজ্য। উদাহরণ হিসেবে টেসলার কথা বলা যায়। বৈদ্যুতিক গাড়ির পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠানটি শুরুর দিকে বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও আর্থিক বাজারের সহায়তা না পেলে তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ত।

তবে সরকারি সহায়তা সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সোলিনড্রা ২০০৫ সালে সিলিকনের পরিবর্তে পাতলা ফিল্মভিত্তিক অধিক দক্ষ সৌর প্যানেল প্রযুক্তি নিয়ে বাজারে আসে। চার বছর পর প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ থেকে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঋণ গ্যারান্টিও পায়। কিন্তু লোকসান ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করে।

অর্থাৎ বাজারে প্রথম প্রবেশকারী হওয়ার কৌশল একই সঙ্গে উচ্চ ঝুঁকি ও উচ্চ সম্ভাবনার কৌশল। কিন্তু যারা সে ঝুঁকি নিতে চায় না, কিংবা দীর্ঘ সময়ের ক্ষতি বহনের সক্ষমতা রাখে না, তাদের জন্য বিকল্প হতে পারে ‘প্যারালাল মুভার’ কৌশল। এক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান শিল্পের নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও পণ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ করে। যেমন মোটরগাড়ি শিল্পে জার্মানির ভক্সওয়াগন প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়, চীনের বিওয়াইডি লিপফ্রগিংয়ের উদাহরণ, আর দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন ও বৈদ্যুতিক—উভয় ধরনের গাড়ির উন্নয়নে সমান্তরালভাবে বিনিয়োগ করে মধ্যপন্থা অনুসরণ করেছে।

চীনের লিপফ্রগিংয়ের পেছনে আংশিকভাবে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করেছে। গত মাসে হুয়াওয়ে ‘টাও স্কেলিং ল’ নামে নতুন একটি চিপ নকশা নীতি উন্মোচন করেছে। মুরের সূত্রানুযায়ী ট্রানজিস্টর আরো ছোট করার পরিবর্তে তারা ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ নতুন পদ্ধতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কারণ ওই নিষেধাজ্ঞার ফলে নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল চীনের কাছে তাদের অত্যাধুনিক এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র রফতানি করতে পারছে না।

চিপ নকশায় এ পরিবর্তন আসলে উন্নয়ন নিয়ে চীনের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। চীন কখনই পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল হুবহু অনুসরণ করেনি। দেশটির নেতৃত্ব শুরু থেকেই বুঝেছিল, একই পথে চলতে চলতে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ অনিবার্য। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতেও দুই দেশের প্রতিযোগিতা থাকলেও তাদের কৌশল ভিন্ন। চীন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য উন্মুক্ত উৎসের মডেল তৈরিতে, যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ মালিকানাভিত্তিক অগ্রবর্তী মডেল উন্নয়নে।

লিপফ্রগিং অতীতে অনেক দেশের সফল অগ্রযাত্রার ভিত্তি তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময়ে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর উচিত নিজেদের সক্ষমতা ও সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন সুযোগগুলো খুঁজে বের করা। বাজারে প্রথম প্রবেশকারীর ঝুঁকি দক্ষতার সঙ্গে সামলানো কিংবা প্রয়োজনে আরো সতর্ক সমান্তরাল অগ্রযাত্রার কৌশল গ্রহণ উভয়ই সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

অন্যদিকে উন্নত অর্থনীতিগুলোরও এখান থেকে শেখার আছে। কোনো প্রতিষ্ঠান গতকাল যতই শক্তিশালী থাকুক বা আজ যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের সেই আত্মতুষ্টির ফাঁদই শেষ পর্যন্ত তার জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

কিয়ুন লি: দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক সহসভাপতি। তিনি বর্তমানে সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক।

[ইংরেজি থেকে অনূদিত]

আরও