তাতে দেশে বিদ্যমান কৃষিজমির ৮০ শতাংশ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কৃষিজমিতে ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা বা রাস্তাঘাট তৈরির আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া জমির ব্যবহার পরিবর্তন করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভূমির পরিকল্পিত ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া কোনো ভূমির জোন পরিবর্তন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অথবা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। কৃষিভূমির জলাধার বা জলাভূমিতে অনুমোদনহীন বাণিজ্যিক আবাসন, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা বা অনুরূপ স্থাপন কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ইটভাটায় বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য কৃষিভূমির উপরিভাগের মাটি, পাহাড় ও টিলা অথবা জলাধারের পাড়ের মাটি ক্রয়-বিক্রয়, অপসারণ, পরিবহন বা ব্যবহার করলে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। এছাড়া বিশেষ কৃষি অঞ্চলের ভূমি ক্ষতিসাধন, ভূমিরূপ পরিবর্তন বা কৃষি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ তিন বছরে বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া যাবে।
বাংলাদেশে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহারের বিষয়ে অতীতেও অনেক আইন এবং নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্প-কারখানা ও বসতবাড়ি নির্মাণ রোধ করে কৃষিজমির শ্রেণী পরিবর্তন বন্ধ এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এসবের তেমন বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতিনিয়তই কৃষিজমি অকৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তাতে দ্রুত চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। জনপ্রতি কৃষিজমির প্রাপ্যতা কমছে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
বাংলাদেশে চাষাধীন জমির পরিমাণ কম। মোট ১ কোটি ৮৬ লাখ একর বা ৭৫ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর। জনপ্রতি প্রাপ্যতা মাত্র ১১ শতক বা ১ বিঘার এক-তৃতীংশ। পক্ষান্তরে সারা বিশ্বে কৃষিজমির জনপ্রতি গড় প্রাপ্ততা তিন একর। বাংলাদেশে জনপ্রতি প্রাপ্ত এ সামান্য পরিমাণ কৃষিজমিটুকু দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৮৩-৮৪ সালে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯২০ লাখ হেক্টর। ১৯৯৬ সালে তা ৮২ লাখ, ২০০৮ সালে ৭৭ লাখ এবং ২০১৯ সালে তা ৭৫ লাখ হেক্টরে হ্রাস পায়। শতকরা হিসাবে আবাদি জমি হ্রাসের গড় হার ছিল ১৯৮৪ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত বার্ষিক শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ, ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দশমিক ৫২ শতাংশ, ২০০৮-১৯ সাল পর্যন্ত দশমিক ২২ শতাংশ এবং ১৯৮৪-২০১৯ সাল পর্যন্ত বার্ষিক দশমিক ৫৮ শতাংশ। ১৯৮০ সালে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল মোট জমির ৬৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা ৫৯ দশমিক ২৮ শতাংশে হ্রাস পায়। ১৯৮৪-২০১৯ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড়ে ৪৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর এবং দৈনিক ১৩৩ হেক্টর কৃষিজমি আবাদের বাইরে চলে গেছে। ২০০৮-১৯ সাল পর্যন্ত কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ার মাত্রা কিছুটা কমে বার্ষিক গড়ে ২০ হাজার এবং দৈনিক ৫৪ দশমিক ৭৯ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কৃষিজমি হ্রাসের প্রধান কারণ হলো শিল্পায়ন, নগরায়ণ, নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ, নতুন বসতবাড়ি স্থাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, ইটভাটা স্থাপন, নদীভাঙন ইত্যাদি। সম্প্রতি জনসচেতনতা মূলক কার্যক্রমের ফলে কৃষিজমি হ্রাসের প্রবণতা কিছুটা কমে আসছে। কিন্তু তা এখনো উদ্বেগজনক ও বিপদাশঙ্কাপূর্ণ। আগামীতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষিজমি অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করতে হবে। বিশেষ করে তিন ও দোফসলি জমি কোনোক্রমেই অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করা যাবে না। এক ফসলি জমি অন্য খাতে ব্যবহার করতে হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ বিষয়ে বর্তমানে জারীকৃত অধ্যাদেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো আবাদযোগ্য পতিত জমির আধিক্য। বর্তমানে এর পরিমাণ ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৩০ হেক্টর। মোট আবাদযোগ্য জমির ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ হচ্ছে পতিত জমি। দেশের বিভিন্ন চিনিকল, পাটকল, বস্ত্রকল ও রেল বিভাগে চাষযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ বেশি। তাছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মচর্চা কেন্দ্র, সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনস্থল এবং ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি ও শিল্প-কারখানার চারপাশেও অনেক আবাদযোগ্য জমি পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। সম্প্রতি কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণেও চাষের আওতাভুক্ত কিছু জমি পতিত ফেলে রেখেছেন অনেক কৃষক। চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কারণেও অনেক সময় কৃষকরা চাষাবাদে অনীহা পোষণ করেন। তাতে ফসলের উৎপাদন হয় কম। এ অবস্থায় সব পতিত জমি চাষের আওতায় নিয়ে আসার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এক্ষেত্রে শস্য বহুধাকরণ, স্বল্প সময়ের শস্য আবাদ, শস্যক্রমের বিন্যাস পরিবর্তন, হাওর অঞ্চলের জন্য নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন ফল, কাজুবাদাম ও কফি চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। বছরের বিভিন্ন সময়ে মাঠের জমি যাতে অনাবাদি না থাকে সে বিষয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা দরকার।
চাষযোগ্য মাটির গুণাগুণ হ্রাস কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অন্তরায়। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের মোট জমির শতকরা ৭৬ দশমিক ২ ভাগ এখন মোটামুটি অনুর্বর। এর পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০০ সালে ১ দশমিক শূন্য ৭ কোটি হেক্টর জমি উর্বরতা হারিয়েছে বলে ধারণা করা হতো। বর্তমানে তা ১ দশমিক ১২৪ কোটি হেক্টরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে হুমকি। এর কারণ বহুবিধ। এর মধ্যে জমিতে অতিরিক্ত পরিমাণে রাসায়নিক সার প্রয়োগ, চিংড়ি চাষের জন্য মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বৃক্ষনিধন ও বনভূমি উজাড় করা এবং জমিতে শিল্প ও ওষুধবর্জ্য ফেলা অন্যতম। জমি গুণমান হারানোর ফলে শস্যের পুষ্টিমান হ্রাস পায় এবং বন্যা ও খরায় তা ফসল উৎপাদনের জন্য ঘাতোপযোগিতা হারায়। এক্ষেত্রে প্রতিকার হিসেবে জমিতে ফসল চক্রের পরিবর্তন, জৈব সার প্রয়োগ, শিল্পবর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকা, বনভূমির গাছ কাটা থেকে নিবৃত হওয়া, কৃষিজমির উপরিভাগ থেকে স্তরভিত্তিক মাটি কেটে বিক্রি করা বা অন্য কাজে ব্যবহার করা এবং ফসলি জমিতে চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ করাকে নিরুৎসাহিত করা দরকার। এক্ষেত্রে নতুন অধ্যাদেশ সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বড় ও মাঝারি খামারগুলো ভেঙে ছোট হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত উত্তরাধিকার আইনে জমি বিভাজন হচ্ছে। তাছাড়া কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিট আয় কমে যাওয়ার কারণে বড় কৃষকরা তাদের কিয়দাংশ জমি বিক্রি করে পরিণত হচ্ছে ছোট কৃষকে। ফলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে এক ধরনের প্রাকৃতিক ভূমি সংস্কার আমরা লক্ষ করছি। বর্তমানে প্রায় ৯২ শতাংশ কৃষকই ছোট। বড় ও মাঝারি কৃষকের সংখ্যা মাত্র ৮ শতাংশ। ছোট কৃষকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ জমি। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে বড় খামারগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা জমি কমেছে ৪৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। মাঝারি খামারগুলো খুইয়েছে ৩৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ জমি। পক্ষান্তরে ছোট খামারগুলো ৩২ দশমিক ২৪ শতাংশ জমি বেশি দখলে নিয়েছে। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে ৯১ দশমিক ৭০ শতাংশে। অন্যদিকে মাঝারি খামারগুলোর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশে এবং বড় খামারগুলোর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে দশমিক ৬ শতাংশে। উৎপাদনের দক্ষতা এবং আধুনিক উপকরণ ব্যবহারের বিচারে খামারের আকৃতির এ স্খলন সম্ভাবনাময় কিছু নয়। তাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যাহত হতে পারে। খামারগুলোর আকার ছোট থেকে ছোট হওয়া কৃষিজমির চরম অভাবই প্রকাশ পায়। এ দেশে ভূমি দারিদ্র্য প্রকট। সময়ের ব্যবধানে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮৪ সালে গড় খামারের আকার ছিল ১ দশমিক ৯৮ একর। ২০০৮ সালে তা ১ দশমিক ৪৭ একরে এবং ২০১৯ সালে ১ দশমিক ২৯ একরে হ্রাস পায়। এমন পরিস্থিতিতে বৃহৎ পরিষরে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বাণিজ্যিক চাষাবাদ দুরুহ হয়ে পড়েছে। প্রতিকারস্বরূপ সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদের প্রতি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষিত যুবকরা কৃষকের কাছ থেকে জমি লিজ নিয়ে বৃহৎ খামার গড়ে তুলছে এবং আধুনিক চাষাবাদের ব্যবস্থা করছে। এ ধরনের উদ্যোগকে নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
কৃষিজমির অকৃষি খাতে ব্যবহার, জমির খণ্ডবিখণ্ডতা বৃদ্ধি, খামারের গড় আয়তন হ্রাস এবং উর্বরতা হ্রাস সম্পর্কে আমরা শঙ্কিত। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিমিত্তে এ সমস্যাগুলোর আশু সমাধান প্রয়োজন। এ বিষয়ে উপযুক্ত বিধিনিষেধ থাকা এবং তা কার্যকর করা খুবই দরকার। এর জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি করা সরকারের দায়িত্ব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামো পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই কৃষি ও এ সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষত সামনে কৃষি খাতে ধান আহরণের মৌসুম আসছে। এ সময় কৃষক যেন সার ঠিকভাবে পান এবং সেচসুবিধার জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বেশকিছু ভালো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। তবে সেগুলো যেন ধারাবাহিক থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)