অভিমত

শিল্প-শিক্ষায়তন সংযোগ নিবিড় হচ্ছে না কেন?

অনেক দিন ধরে এ আলোচনা বেশ জোরেশোরেই হচ্ছে যে শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে চাকরিদাতারা অনেকটা নিরুপায় হয়েই বহুসংখ্যক বিদেশীকে এখানে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছেন এবং হচ্ছেন। সেই সুবাদে দেশে এখন প্রায় ১০ লাখ বা তারও বেশি

অনেক দিন ধরে আলোচনা বেশ জোরেশোরেই হচ্ছে যে শিল্প-কারখানা অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে চাকরিদাতারা অনেকটা নিরুপায় হয়েই বহুসংখ্যক বিদেশীকে এখানে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছেন এবং হচ্ছেন। সেই সুবাদে দেশে এখন প্রায় ১০ লাখ বা তারও বেশি বিদেশী নাগরিক কাজ করছেন, যারা বছরে থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (তথ্য নিয়ে মতপার্থক্য আছে) বৈধ পথে নিজ নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সংখ্যা হয়তো সহসাই দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে এবং সত্যি সত্যি তেমনটি ঘটলে চাকরির বাজারে শিক্ষিত বেকারের প্রবেশের সুযোগ কার্যতই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

অবস্থায় শিল্প-কারখানাগুলো কী ধরনের জ্ঞান দক্ষতাসম্পন্ন জনবল প্রত্যাশা করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে অবগত হয়ে সে অনুযায়ী পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজানো এবং পাঠদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সেটি করার ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী বলে মনে হয় না। ফলে যা হওয়ার তা- হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সনদ নিয়ে যে শিক্ষার্থীরা বেরোচ্ছেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কোনোভাবেই কাজে লাগাতে পারছে না। আর হাতে সনদ নিয়েও কাজ জোগাড় করতে না পেরে শিক্ষিত যুবক চাকরিদাতা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উপর্যুপরি দোষারোপ করে যাচ্ছেন যে তাকে যথাযথভাবেমূল্যায়নকরা হচ্ছে না। কিন্তু তিনি একবারও বুঝতে চাইছেন না, তার ওই সনদের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে যা শিখিয়েছে, তা দিয়ে আর যা- হোক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

উল্লিখিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্নাতক পর্যায়ের কোর্সগুলোর শেষ সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের জন্য দায়সারা গোছের যেইন্টার্নশিপপ্রথা চালু রেখেছে, তার মাধ্যমে সনদের সম্পূরকতা অর্জিত হলেও হাতে-কলমের শিক্ষা বলতে যা বোঝায় তা কতটুকু অর্জিত হচ্ছে, এটি নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। শিক্ষার্থীর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পেশার সঙ্গে এসব ইন্টার্নশিপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চরিত্র মিলে কিনা কিংবা সময়ে শিক্ষার্থী যা শিখছেন তা ওই পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা অথবা সময়ে তিনি আদৌ কিছু শিখতে পারছেন কিনাএসব কোনো কিছুর বাছবিচার না করেই বস্তুত ইন্টার্নশিপ কোর্সগুলো পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে ইন্টার্ন গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই তাদের গ্রহণ করছে এবং এতে গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, ইন্টার্ন শিক্ষার্থী বা প্রেরণকারী শিক্ষায়তন কেউই থেকে খুব একটা উপকৃত হতে পারছে না। ফলে ধরনের ফলাফলবিহীন কর্মসূচির ব্যাপারে একদিকে যেমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও একে আর গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন না। আর দুয়ের মাঝখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী ভাবছে তাও স্পষ্ট নয়। তবে শিক্ষায়তনগুলো যদি সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় ইন্টার্নশিপ কোর্সগুলো পরিচালনা করত তাহলে থেকে শিক্ষার্থীদের পক্ষে কার্যকর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ অনেকটাই সহজ হয়ে উঠতে পারত। আর তা থেকে সীমিত পরিসরে হলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হতে পারত বলে মনে করি।

কথা হলো, প্রতি বছর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কিছুসংখ্যক ইন্টার্ন পাঠানোর মধ্য দিয়েই কি শিল্পের সঙ্গে শিক্ষায়তনের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন হয়ে গেল বা থেকেই কি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাবে? মোটেও না। বরং এক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপের চেয়েও বড় কাজ হচ্ছে শিক্ষকদের শিল্পের সঙ্গে নিয়মিতভাবে যুক্ত রাখা, যাতে তারা শিল্পের বাস্তব কার্যপদ্ধতি চাহিদা সচক্ষে দেখে উপলব্ধি করে সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারেন। পাঠ্যক্রম হালনাগাদকরণের বিষয়টিও প্রক্রিয়ার সঙ্গেই জড়িত। হালনাগাদকরণ এবং সেটিকে বাজার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংগতিবাহী করে তোলার লক্ষ্যে একে ঢেলে সাজাতে হলে শিক্ষকদেরই সর্বাগ্রে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। কিন্তু সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলি, আমাদের অধিকাংশ শিক্ষকই পাঠ্যপুস্তকের অধীত তাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিধির বাইরে গিয়ে শিল্পের বাস্তব কাজের সঙ্গে নিজেদের প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করতে খুব একটা আগ্রহী নন। সেজন্যই তাদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা যা শিখছেন, তা দিয়ে পেশাগত কাজের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের কিছুতেই যোগ্য প্রমাণ করতে পারছেন না।

অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যেও এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যে তারা যেহেতু কর্মদাতা একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী সেহেতু যাদের কাজ দরকার তাদের বা তাদের সুপারিশকারীদেরই (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক) উচিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগটি গড়ে তোলা। সম্ভবত তারা এটিও ভাবেন যে কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করলে খোলাবাজারের চলমান বিশ্বব্যবস্থায় তাদের পক্ষে কর্মী খুঁজে পাওয়াটা মোটেও কঠিন কোনো ব্যাপার নয়; বিদেশী নিয়োগের মাধ্যমে তারা তা পাচ্ছেনও। আর তারা সেটি পাচ্ছেন বলেই দেশের শিল্প-কারখানাগুলোয় আজ বিদেশী কারিগর ব্যবস্থাপকরা কাজ করে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার বৈধ পথে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশ থেকে যে শুধু অবৈধ পথেই বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে তা নয়, বৈধ পথে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণও নেহাত কম নয়, যার জন্য বহুলাংশে দায়ী শিল্প শিক্ষায়তনগুলোর মধ্যকার অনিবিড় সম্পর্ক দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এদিকে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে মান উৎপাদনশীলতার যে স্তরে অবস্থান করছে, তাতে তাদের অনেকের পক্ষেই বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন প্রতিযোগিতামূলক মূল্যহার রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ যখন উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় যুক্ত হবে, তখন থেকে কেউই কিন্তু আর শুল্কহারে ছাড় দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহযোগিতা করবে না। তখন মান মূল্য দুটোর ক্ষেত্রেই তাদের নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদন বাজার গবেষণার কাজটি আরো জোরদার হওয়া প্রয়োজন, যে কাজটি শিল্প শিক্ষায়তনগুলো একসঙ্গে মিলে করতে পারলে খুবই ভালো হয়। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা এর শিক্ষকদের গবেষণার জন্য সীমিত পরিসরে হলেও যে অর্থ বরাদ্দ করে, সেক্ষেত্রে গবেষণা কাজটি এরূপ যৌথভাবে করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হবে মর্মে শর্ত জুড়ে দেয়া যেতে পারে।

মোটাদাগে বলতে গেলে উদ্যমহীনতা, চিন্তাভাবনায় সামগ্রিকতার ঘাটতি, দূরদৃষ্টির অভাব, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে অনভ্যস্ততা, নিজ নিজ অবস্থান থেকে লালিত অহংবোধ প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশের শিল্প শিক্ষায়তনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মান স্তরের যোগাযোগ কিছুতেই গড়ে উঠছে না। নিয়ে কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে বক্তৃতা, আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনতে এবং নিয়ে কাজ করতে চাইলেও একটি সামগ্রিক নড়াচড়া কিছুতেই যেন অনুভূত হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে শিল্প শিক্ষায়তনের মধ্যকার যোগাযোগটি পর্যাপ্ত পরিসরে নিবিড় করে তুলতে না পারলে তাতে শিক্ষার মান শিল্পের উৎপাদন কোনোটির ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের পক্ষে একটি বৈশ্বিক মান অর্জন করা সম্ভব হবে না। আর তা করতে না পারলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সনদধারীর সংখ্যা বাড়তে থাকলেও বাস্তবে তাদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ক্রমে কমে আসবে। অন্যদিকে শিল্প-কারখানাগুলো মান মূল্যের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লে দেশের বাজার ক্রমে বিদেশী পণ্যের জন্য অধিকতর সহজ ক্ষেত্র হয়ে উঠবে, আমাদের মানুষদের যথেষ্ট মেধা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও। আর সে রকম একটি অনাকাঙ্ক্ষিত নিকট ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিক্ষা শিল্প খাতের নীতিনির্ধারক উদ্যোক্তারা পরস্পরের মধ্যে একটি কার্যকর নিবিড় যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় দ্রুতই এগিয়ে আসবেন বলে আশা রাখি।

 

আবু তাহের খান: গবেষক প্রাবন্ধিক

আরও