আমি এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ নই। একজন যাত্রী এবং এ খাতের পেশাজীবী হিসেবে প্রায় ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি থেকে কিছু কথা বলতে চাই। আমরা সবাই চাই, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত ভবিষ্যতে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হোক। সেই আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়েছে ‘এভরিহোয়্যার বাংলাদেশ, আকাশ’ স্লোগানে।
আমরা যদি বিশ্বের দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখব, এভিয়েশন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা। বর্তমান যুগে মানুষকে কম সময়ে, সাশ্রয়ী মূল্যে, সহজ ও নিরাপদ উপায়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হয়। তাই এভিয়েশনকে বিলাসী খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যেমন আমাদের সড়ক পরিবহন, রেলপথ আছে, তেমনি আকাশপথও একটি অপরিহার্য পরিবহন ব্যবস্থা। সড়ক ও রেল পরিবহনের মতো এভিয়েশনকেও তাই সাধারণ মানুষের কাছে আরো সহজলভ্য করতে হবে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে এগিয়ে নিতে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আগামী ১৫ বছরের একটি রোডম্যাপ রয়েছে। এখন প্রয়োজন একটি কৌশলগত বা স্টিয়ারিং কমিটি, যারা স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করবে এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারক করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ যাত্রীসহ বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন যাত্রী বিমান ব্যবহার করেন। এ সংখ্যা ২০-২৪ মিলিয়নে উন্নীত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ৬০ মিলিয়নে নিয়ে যাওয়া আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। বর্তমানে এভিয়েশন বাজারের আকার প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। এটিকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সুযোগ রয়েছে। এসব লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী পুরো এভিয়েশন খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বর্তমানে বিশ্বে এভিয়েশন বাজারের আকার প্রায় ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এখানে প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। আবার দেশের বিমান চলাচল বাজারের প্রায় ২২ শতাংশ দেশীয় এবং ৭৭ শতাংশ বিদেশী এয়ারলাইনসের দখলে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিমান ভ্রমণ বাবদ প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের এভিয়েশন অবকাঠামোর ভিত্তি মোটেও দুর্বল নয়। দেশে চারটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। প্রায় ৩ হাজার মিটার বা তার বেশি দৈর্ঘ্যের রানওয়ে রয়েছে। রয়েছে বড় টার্মিনাল অবকাঠামোও। যদিও অনেক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কিন্তু তার পাশাপাশি এভিয়েশন খাতে বিশাল অবকাঠামোগত সম্পদও রয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ সম্পদ থেকে আমরা বর্তমানে কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছি এবং এগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছি।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিমানযাত্রী সংখ্যা ১২ মিলিয়ন থেকে প্রথমে ২০-২৪ মিলিয়নে এবং দীর্ঘমেয়াদে ৬০ মিলিয়নে উন্নীত করা। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ৫ লাখ টন কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে এভিয়েশন বাজারের আকার বাড়ানোর লক্ষ্য নিতে হবে। তাছাড়া ঢাকার এমন একটি সম্পদ রয়েছে, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না—সেটি হলো ভৌগোলিক অবস্থান।
আমরা পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ঠিক মধ্যস্থলে অবস্থান করছি। ঢাকা থেকে উড়ালপথের দূরত্ব হিসাব করলে দেখা যায় ২, ৪, ৮ ও ১১ ঘণ্টার দূরত্বে কোটি কোটি মানুষ পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাতায়াত করছে। প্রতি বছর প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী আমাদের আকাশসীমার আশপাশ দিয়ে যাতায়াত করে। কেবল জিসিসি (গালফ) দেশগুলো থেকে আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) অঞ্চলগুলোর মধ্যেই বছরে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ যাত্রী চলাচল করে। বাংলাদেশ এ দুই অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে। আমরা এ যাত্রীদের ঢাকায় এনে সাময়িক বিরতি (ট্রানজিট) দিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা অন্যান্য গন্তব্যে পাঠাতে পারি।
বর্তমানে আমাদের ট্রানজিট যাত্রী সংখ্যা ৫ শতাংশেরও কম। আমাদের ৯৫ শতাংশ ভ্রমণই পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট। এসব যাত্রীকে সাময়িকভাবে এ দেশে রেখে কানেক্টিভিটি দেয়ার ব্যবস্থা আমরা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। অথচ আমাদের নতুন টার্মিনালে বছরে ৫০ লাখ ট্রানজিট যাত্রীসেবার সক্ষমতা থাকবে। এ সক্ষমতাকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাব, তা এখনই পরিকল্পনা করতে হবে।
আমাদের নতুন টার্মিনালে অনেক আধুনিক সুবিধা রয়েছে। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। যেমন পার্কিং, রানওয়ে এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। তবে এগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। আমাদের সামনে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হচ্ছে। এটি ইতিবাচক দিক। কারণ একটি হাব তৈরি করতে হলে শক্তিশালী স্থানীয় এয়ারলাইনস প্রয়োজন। বিদেশী এয়ারলাইনস তৃতীয় ও চতুর্থ ফ্রিকোয়েন্সি পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু শুধু বিদেশী এয়ারলাইনস দিয়ে একটি কার্যকর হাব তৈরি করা সম্ভব নয়।
একটি স্থানীয় ক্যারিয়ারকে ঢাকাকেন্দ্রিক যাত্রী পরিবহন করতে হবে। ‘সিক্সথ-ফ্রিডম ট্রাফিক’ কাজে লাগাতে হবে এবং ধীরে ধীরে আরো বিস্তৃত সংযোগ তৈরি করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আয়ের প্রায় ৭৭ শতাংশ বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শুধু বিদেশী এয়ারলাইনস দিয়ে ঢাকাকে একটি টেকসই হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের প্রশংসা করতে চাই। সংস্থাটি বিমানবন্দরের পাশে একটি সমন্বিত সুবিধা তৈরির চেষ্টা করছে। সেখানে শপিং মল, হোটেলসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে। কিন্তু আমাদের এমন সুবিধাও দরকার, যেখানে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ট্রানজিট যাত্রীরা থাকতে পারবেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্বিপক্ষীয় এয়ার সার্ভিস এগ্রিমেন্ট-এর আওতায় বাংলাদেশের পক্ষে ৮৩০টি ফ্লাইটের রাইটস থাকলেও আমরা ব্যবহার করছি মাত্র ৩২৯টি। অর্থাৎ ৫০১টি স্লট আমরা অব্যবহৃত রেখেছি। এভিয়েশন সেক্টরে স্লট অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এশিয়ার অন্য দেশগুলো যেখানে একটি স্লটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করে, সেখানে আমাদের প্রাপ্ত স্লটগুলো খালি পড়ে থাকছে। সময়মতো এগুলো ব্যবহার না করলে এ খাতে আমরা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ব। সেগুলো কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে এয়ারলাইনসগুলো স্লট পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে। উদাহরণ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান যোগাযোগের কথা বলা যায়। প্রতি সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ৪৮টি ফ্লাইট বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইনসগুলো সেখানে তুলনামূলকভাবে কম ফ্লাইট পরিচালনা করে। এ অবস্থায় বাজারের কতটা অংশ ও কতটা রাজস্ব আমরা হারাচ্ছি, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এ অধিকার ও সুযোগগুলো অব্যবহৃত রাখা যাবে না। অন্যথায় এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি এভিয়েশন হাব কীভাবে তৈরি হয়? এক্ষেত্রে আমি শীতকালে বাংলাদেশে আসা পরিযায়ী পাখির উদাহরণ দিতে চাই। সাইবেরিয়া থেকে লাখ লাখ পাখি বাংলাদেশে আসে। তাদের কেউ আমন্ত্রণ জানায় না। কেন তারা আসে? কারণ এখানকার পরিবেশ তাদের জন্য উপযোগী। তারা খাবার, আশ্রয় ও নিরাপত্তা পায়। তাই তাদের কাউকে আলাদা করে এসে আমন্ত্রণ জানাতে হয় না। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা একই। মানুষও এমন জায়গায় যেতে চায়, যেখানে পরিবেশ সুবিধাজনক, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। এখন আমাদের এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলাদেশে আসতে ও এখান থেকে অন্য গন্তব্যে যেতে আগ্রহী হয়। এর জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। আমরা এভিয়েশন খাতকে কোথায় নিয়ে যেতে চাই, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এ খাতের জাতীয় সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের দৃঢ় হতে হবে এবং কৌশলগত লক্ষ্য থেকে সরে আসা যাবে না।
তৃতীয় টার্মিনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। কিন্তু একক রানওয়ের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় সমস্যা। বর্তমানে ঢাকার বিমানবন্দরে প্রতিদিন ৩০০-৩৫০টি বিমান ওঠানামা করে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। এত বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলও প্রয়োজন। কারণ এটি পুরো বিমান চলাচল ব্যবস্থার একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করে। টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ও স্লট ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো গেলে দিনে ৫০০-৬০০টি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে ৩০-৪০ মিনিট ও ওয়াইড-বডির ক্ষেত্রে ৫০-৬০ মিনিটের মধ্যে টার্নঅ্যারাউন্ড করা সম্ভব।
শুধু একটি পূর্ণাঙ্গ রানওয়ের ওপর অনির্দিষ্টকাল নির্ভর করা সম্ভব নয়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন একটি ব্যবস্থা হিসেবে ‘ডিপেন্ডেন্ট’ বা ডুপ্লেক্স রানওয়ের ধারণা বিবেচনা করা যেতে পারে, যা রানওয়ের সংস্কার, জরুরি পরিস্থিতি বা অন্য কোনো অপারেশনাল প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। কলকাতায় দুটি রানওয়ে রয়েছে। যদিও একটি রানওয়ে অন্যটির তুলনায় কম ব্যবহার করা হয়। ঢাকার ক্ষেত্রে কোন ধরনের মডেল কার্যকর হতে পারে, তা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
বর্তমান বিমানবন্দরের সক্ষমতা শেষ হওয়ার পর নতুন বিমানবন্দর নিয়ে ভাবলে চলবে না। এখন থেকেই পরবর্তী বিমানবন্দরের পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমান বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের জন্য তুলনামূলক সহজ কিছু পরিবর্তনও আনা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমান টার্মিনালে প্রায় ২০টি হোটেল কাউন্টার রয়েছে। বিশ্বের বড় বিমানবন্দরগুলোতে সাধারণত একটি সমন্বিত বা কমন কাউন্টারের মাধ্যমে হোটেল-সংক্রান্ত সেবা দেয়া হয়।
এছাড়া বিমানবন্দরে প্রায় ২০টি লাউঞ্জ রয়েছে। অথচ বিশ্বের বড় বিমানবন্দরগুলোতে সাধারণত এর চেয়ে অনেক কমসংখ্যক সমন্বিত লাউঞ্জ থাকে। এ ধরনের বিষয়গুলোও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক কৌশলের অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আরেকটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দেশের অভ্যন্তরে একটি বিমান যোগাযোগের গ্রিড তৈরি করা।
যশোর-কক্সবাজার, যশোর-চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর-কক্সবাজার এবং সৈয়দপুর-চট্টগ্রামের মতো রুটের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব রুটের কিছু আমরা পরিচালনা করেছি। পরে সেগুলো বন্ধও হয়েছে। কোনো নতুন রুট চালু করলে শুরুতেই লাভজনক হবে—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। নতুন রুটের ক্ষেত্রে শুরুতে নানা সমস্যা থাকে। চাহিদা তৈরি হওয়ার জন্য অপারেটরকে পর্যাপ্ত সময় ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে সরাসরি এয়ারলাইনসকে ভর্তুকি না দিয়ে রুটকে ভর্তুকি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, সৈয়দপুর-কক্সবাজার রুটে কোনো এয়ারলাইনস পরিচালনা করলে সরকার শুরুতে কর বা অন্যান্য ক্ষেত্রে রুটভিত্তিক সহায়তা দিতে পারে। রুটটি বাণিজ্যিকভাবে টেকসই না হওয়া পর্যন্ত এ সহায়তা অব্যাহত রাখা যেতে পারে। রুটটি যখন বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম হয়ে উঠবে, তখন ধীরে ধীরে ভর্তুকি প্রত্যাহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো নির্দিষ্ট এয়ারলাইনসকে স্থায়ীভাবে সহায়তা করা নয়, বরং একটি রুটকে টেকসই করে তোলা। আরেকটি বড় সুযোগ হলো ‘সিক্সথ-ফ্রিডম ট্রাফিক’।
উদাহরণ হিসেবে টার্কিশ এয়ারলাইনসের কথা বলা যায়। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে সরাসরি যাত্রীর তুলনায় তারা ইস্তানবুলকে হাব হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য গন্তব্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী যাত্রী পরিবহন করে। একসময় মালয়েশিয়ার এয়ারলাইনস বা অন্যান্য এয়ারলাইনসও বাংলাদেশ থেকে মধ্যবর্তী হাবের মাধ্যমে সৌদি আরব, লন্ডনসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করত। বাংলাদেশকে এ ধরনের মডেল নিয়ে ভাবতে হবে। লক্ষ্য শুধু ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যেসব যাত্রী এরই মধ্যে ভ্রমণ করছেন, তাদের একটি বড় অংশকে ঢাকার মাধ্যমে পরিবহন করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
বাংলাদেশের বাজেট এয়ারলাইনস চালুর নীতিমালা নিয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। বাজেট এয়ারলাইনসগুলো দেখিয়েছে, তারা কীভাবে সম্পূর্ণ নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। রায়ানএয়ার বছরে প্রায় ২০ কোটি যাত্রী পরিবহন করে। ইজিজেট প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ এবং এয়ারএশিয়া প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। কম খরচে বিমান ভ্রমণের সুযোগ তৈরি করে এসব এয়ারলাইনস বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বিমান ভ্রমণের আওতায় এনেছে।
মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস একসময় প্রায় ৪০ লাখ যাত্রী পরিবহন করত। পরে তাদের যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এয়ারএশিয়াও তুলনামূলক ছোট বাজার থেকে কয়েক কোটি যাত্রীর এয়ারলাইনস হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—কম খরচের বিমান পরিবহন শুধু বিদ্যমান চাহিদা পূরণ করে না, নতুন চাহিদাও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবিত্ত ও প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য। একজন প্রবাসী শ্রমিক সীমিত বাজেটে ভ্রমণ করেন। যদি তার ভ্রমণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়, তাহলে তিনি হয়তো বছরে একবারের পরিবর্তে দুবার দেশে আসতে পারবেন। তাই বাজেট এয়ারলাইনস নীতি শুধু এভিয়েশন খাত নয়, পর্যটন, পরিবার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সিঙ্গাপুর, দুবাই ও কাতারের মতো বৈশ্বিক এভিয়েশন হাবের দিকে তাকানো যেতে পারে। এসব দেশের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তাদের বিমানবন্দর দিয়ে নিজ দেশের জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। এটাই একটি হাবের মূল বৈশিষ্ট্য। বিমানবন্দর শুধু দেশের নিজস্ব যাত্রীদের সেবা দেয় না; অন্য দেশের যাত্রীরাও সেখানে এসে ট্রানজিট নেন।
বাংলাদেশেরও একই ধরনের হাব হওয়ার ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে। তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আরেকটি জরুরি বিষয় হলো দক্ষ জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে বা নতুন করে বহরে যুক্ত হচ্ছে। আগামী ১০ বছরে ঢাকাকেন্দ্রিক উড়োজাহাজের সংখ্যা যদি প্রায় ২০০-তে পৌঁছায়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে এসব উড়োজাহাজ কোথায় থাকবে? কোথায় রক্ষণাবেক্ষণ হবে? পাইলট, প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল কোথা থেকে আসবে?
এ কারণেই আমাদের আন্তর্জাতিক মানের এভিয়েশন একাডেমি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এসব বিষয়ে আগামীকাল নয়, আজই ভাবতে হবে। একটি সম্ভাব্য ধারণা হতে পারে চট্টগ্রামকে পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার এবং কারিগরি হাব হিসেবে গড়ে তোলা। বিদেশী এয়ারলাইনস বা এভিয়েশন কোম্পানি যদি বাংলাদেশে এসে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ করতে চায়, তাহলে তাদের জন্য শুল্কমুক্ত বা ফ্রি-জোনের মতো সুবিধা বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল বা এমআরও খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে এবং দেশে কারিগরি দক্ষতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে কক্সবাজারকে জ্ঞান ও পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে। আগামী এক দশকে বিশ্বজুড়ে এভিয়েশন পেশাজীবীর বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পাইলটসহ বিভিন্ন দক্ষ জনবলের প্রয়োজন বাড়বে। কক্সবাজার এভিয়েশন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান হতে পারে। একই সঙ্গে এটি পর্যটন খাতকেও এগিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশে যদি ভবিষ্যতে ২০০টি উড়োজাহাজ থাকে, তাহলে সিমুলেটর, রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত পাইলট প্রয়োজন হবে। এসব সুবিধা রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। এখন থেকেই এগুলোর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শুরু করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার রুটকে সহায়তা দেয়ার উদাহরণ রয়েছে। বড় ধরনের সংকটের পর পর্যটন পুনরুদ্ধারে বালি ও সেবুর মতো গন্তব্যগুলো যাত্রী ও এয়ারলাইনস আকর্ষণে কর বা রুটভিত্তিক প্রণোদনা দিয়েছে। নীতিটি সহজ—রুটটি টেকসই না হওয়া পর্যন্ত সহায়তা দেয়া হবে এবং রুটটি বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম হলে ধীরে ধীরে সেই সহায়তা প্রত্যাহার করা হবে। বাংলাদেশও প্রয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে। একই সঙ্গে রানওয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রানওয়েতে সংস্কারকাজ চলায় সম্প্রতি রাতের ফ্লাইটগুলো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে ২০০টি উড়োজাহাজ এবং ছয় থেকে সাত কোটি যাত্রী পরিচালনার লক্ষ্য নেয়, তাহলে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিকল্পনা এখন থেকেই শুরু করতে হবে।
বর্তমান অবকাঠামো পুরোপুরি সীমায় পৌঁছে যাওয়ার পর অপেক্ষা করলে চলবে না। মানসিক সীমাবদ্ধতা ভাঙতে হবে। এখানে দুটি ছোট গল্প বলতে চাই। প্রথমটি হাতিকে নিয়ে। একটি হাতি যখন ছোট থাকে, তখন তাকে একটি শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। সে বারবার শিকলটি ছিঁড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক মাস চেষ্টা করেও যখন সফল হয় না, তখন তার মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়—সে এ শিকল ছিঁড়তে পারবে না। পরবর্তী সময়ে হাতিটি বড় হয়ে যায়। তখন সে এক টনেরও বেশি ওজন বহন করতে পারে। কিন্তু একই ধরনের শিকলে বাঁধা হলে সে আর মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে না। তার শারীরিক সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা তার মনে একটি মানসিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ক্ষেত্রেও আমরা এমন কোনো অবচেতন ধারণা তৈরি হতে দিতে পারি না যে কোনো কিছু আগে হয়নি বলে সেটি করা সম্ভব নয়। আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
দ্বিতীয় উদাহরণটি শুঁয়োপোকাকে নিয়ে। জীবনচক্রের একটি পর্যায়ে শুঁয়োপোকা নিজেকে কোকুনের মধ্যে আবদ্ধ করে। কিছু সময়ের জন্য তাকে নিষ্ক্রিয় ও দুর্বল মনে হয়। কিন্তু সেই রূপান্তরের পর সে প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে আসে। এর শিক্ষা হলো পরিবর্তনের জন্য সময়, পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ প্রয়োজন। একই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা খাত প্রয়োজনীয় সময় ও প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতও এখন এমন একটি রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে।
আমাদের সামনে এখন বিভিন্ন খাতের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও অংশীজন রয়েছেন। আমরা যদি তাদের সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে এসে একটি সমন্বিত প্রস্তাব ও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে পারি এবং সেটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপন করতে পারি, তাহলে এ খাতকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য একটি বিষয় অপরিহার্য—সমন্বয়।
একটি ভবনের কথা ভাবুন। বালি প্রয়োজনীয়, সিমেন্ট প্রয়োজনীয়, পানি প্রয়োজনীয়, ইস্পাতও প্রয়োজনীয়। কিন্তু এগুলোকে একটি পরিকল্পনার অধীনে একত্র করা না হলে কোনো ভবন তৈরি হবে না। এভিয়েশন খাতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বেসরকারি এয়ারলাইনস, বিমানবন্দর, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিনিয়োগকারী, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসহ সব অংশীজনই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের একটি অভিন্ন পরিকল্পনার অধীনে কাজ করতে হবে।
সবকিছুকে সমন্বিত রাখতে হবে, একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে এবং একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি তা করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামো, এয়ার সার্ভিস রাইটস, মানবসম্পদ এবং ক্রমবর্ধমান এভিয়েশন বাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন ও ট্রানজিট হাবে রূপান্তর করা এবং সময়ের সঙ্গে এভিয়েশনকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। এ খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের একটি ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।
কেএম মুজিবুল হক: চেয়ারম্যান, টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভের বক্তব্যে]