কারিগরি পেশার বিভিন্ন স্তরের মাঝে বিভেদ কোনোভাবেই কাম্য নয়

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। তিনি প্রকৌশলীদের প্রফেশনাল বডি, দি ইনস্টিটিটউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশনের (বাইয়েট) একজন সদস্যও। চলতি বছর জুনে তিনি ‘বাইয়েট’-এর প্রতিনিধি হিসেবে কারিগরি পেশার সর্বোচ্চ বৈশ্বিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যালায়েন্স (আইইএ)’ কর্তৃক অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পাল্টাপাল্টি সাম্প্রতিক আন্দোলন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

ডিগ্রি প্রকৌশলী ও ছাত্ররা সম্প্রতি আন্দোলন করছেন। আবার ডিপ্লোমাধারীরাও বিভিন্ন সময় নিজেদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছেন। এখানে মূল দ্বন্দ্বটা কোথায়?

দ্বন্দ্বটা শুরু হয়েছে সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রাপ্তির বিষয় নিয়ে। কারিগরি পেশায় কয়েকটি স্তর আছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশেও সেই রীতি মেনেই এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ডিগ্রি প্রকৌশলী ও ছাত্ররা মনে করেন যে সরকারি চাকরিতে ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্টদের অতিরিক্ত সুবিধা দেয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আবার ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরাও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে পেশ করছে।

প্রকৌশলী, টেকনোলজিস্ট আর টেকনিশিয়ানের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

যেমন ধরুন, একটি ২০ তলা দালান বানানো হচ্ছে। একজন প্রকৌশলী মূলত দালানটির মূল কাঠামোগত নকশা করে থাকেন। যেমন দালানটির ওপর কত বল কাজ করছে, বলের প্রভাব কোথায় ও কেমন তার ওপর ভিত্তি করে স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস, যেখানে বানানো হবে সেখানকার মাটির মান, ফাউন্ডেশনের আকৃতি, কলাম ও বিমের আকার, কত রড এবং কোথায়, কীভাবে ব্যবহার করতে হবে—এ সবকিছু বৈজ্ঞানিক উপায়ে হিসাব করে তিনি স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করবেন। এ ডিজাইনের পর তাকে একটি কাগজে এঁকে নিচে নিজের নাম এবং প্রকৌশলী হিসেবে তার সরকারি নিবন্ধন উল্লেখ করে স্বাক্ষর করতে হবে। উল্লেখ্য যে দালানটি ভেঙে পড়লে, স্বাক্ষর করা এ প্রকৌশলীকে ধরা হবে, ডিজাইন ঠিক ছিল কিনা?

এরপর সেই নকশা ধরে মাঠ পর্যায়ে কিছু ডিগ্রি প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্টরা তা বাস্তবায়ন করবেন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্টকে অবশ্যই সে ড্রইং বোঝার মতো দক্ষতা এবং একটি দালানের বিভিন্ন অংশের সংজ্ঞা ও মানে বুঝতে হবে। এ বিষয়ে তারা যথেষ্ট পড়াশোনা করে থাকেন।

অন্যদিকে বেশকিছু রাজমিস্ত্রি এখানে কাজ করে থাকেন, আরো থাকেন রড মিস্ত্রি, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা কাঠমিস্ত্রি। বিদেশে এ পদগুলোর জন্য ছোট সার্টিফিকেট লাগে। তারা হলেন ‘ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনিশিয়ান’। বাংলাদেশে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলো থেকে এ ধরনের ডিগ্রি দেয়া হয়ে থাকে। তবে আমাদের দেশে ডিগ্রি ছাড়াই অভিজ্ঞতাবলে অনেকে কাজ করে থাকেন।

অর্থাৎ এ তিন স্তরের পেশাজীবীদেরই একটি ইঞ্জিনিয়ারিং সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। তারা একে অন্যের পরিপূরক।

তাদের মধ্যে পদ-পদবি ও বেতন নিয়ে সমস্যার মূল কারণ কী?

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে পদ ও বেতন নির্দিষ্ট। এর বাইরে যাওয়া যায় না। বেসরকারিতে কিন্তু এ সমস্যা নেই। একটি বেসরকারি সংস্থা তার প্রয়োজন বুঝে একজন কর্মীকে বেতন দেবে। কখনো একজন ‘ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনিশিয়ান’কে তার হয়তো বেশি প্রয়োজন ‘প্রকৌশলী’র চেয়ে। সে বেশি বেতন দিয়ে রাখবে। আপনি হয়তো শুনে থাকবেন যে যুক্তরাষ্ট্রে একজন অভিজ্ঞ ‘প্লাম্বার’ অর্থাৎ স্যানিটারি মিস্ত্রি, প্রাইভেটে বাসায় বাসায় কাজ করে অনেক সময় মাসের শেষে অনেক প্রকৌশলীর চেয়ে বেশি টাকা উপার্জন করেন। এটা হতেই পারে। সেসব দেশে মানুষ পদ-পদবি নিয়ে এতটা ভাবে না এবং কোনো কাজকেই ছোট মনে করে না।

কিন্তু সরকারি কোনো চাকরিতে আবার ‘প্লাম্বার’ কখনই প্রকৌশলীর চেয়ে বড় পদ বা বেতন পাবেন না। এখানে একটি সর্বজনস্বীকৃত রীতি আছে। সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে একজন ‘প্লাম্বার’ কখনই নিজেকে প্রকৌশলী দাবি করে বাড়ি বানাতে যাবেন না। বাড়ি বানাতে গেলে আরেক ধরনের লাইসেন্সধারী হতে হবে।

অন্য পেশায়ও কি এ ধরনের বিধিনিষেধ আছে?

হ্যাঁ, শুধু ইঞ্জিনিয়ারিংই নয়, কৃষি এবং মেডিকেল শিক্ষায়ও একই ধরনের কয়েকটি পর্যায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বিদ্যমান এবং সরকারি চাকরিতে তাদের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের সুবিধাদি দেয়া হয়ে থাকে। যেমন ডাক্তারি পেশা ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট’ কিংবা ‘এলএমএফ ডাক্তার’-এর একটি স্তর আছে্। সাধারণত সরাসরি পদোন্নতি পেয়ে ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট’ কিংবা ‘এলএমএফ ডাক্তার’ কখনো ‘মেডিকেল অফিসার’ পদে নিয়োগ পাওয়ার নজির নেই। এবার কৃষি পেশায় আসেন—‘ডিপ্লোমা কৃষিবিদ’ বলে একটি স্তর আছে কৃষি পেশায়। সরকারি চাকরিতে তারা ‘ব্লক সুপারভাইজার’ হিসেবে নিয়োগ পান। সারা বিশ্বে, ডাক্তারি কিংবা প্রকৌশল—এ দুই পেশাই অত্যন্ত কঠোরভাবে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর কোথাও আপনি সে দেশে ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী হিসেবে নিবন্ধিত না হলে রোগী দেখতে পারবেন না কিংবা বাড়ি বানানোর ডিজাইনে স্বাক্ষর করতে পারবেন না। কেননা এর সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণ প্রশ্ন জড়িত বিধায় কঠোর আইনের অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যিনি ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী নন, তিনি যত অভিজ্ঞই হোন না কেন কোনোদিন ডাক্তারের কাজ করতে পারবেন না কিংবা বাড়ির ডিজাইনে স্বাক্ষর করতে পারবেন না—এটাই সারা বিশ্বে স্বীকৃত রীতি।

‘প্রকৌশলী’ পদবি ব্যবহার নিয়ে একটি বিতর্ক আছে। সেটা কী?

আগেই বলেছি ডাক্তার আর প্রকৌশল পেশাগুলো ‘রেগুলেটেড’। কেউ চাইলেই নিজেকে ডাক্তার বা প্রকৌশলী হিসেবে ঘোষণা দিতে পারেন না। তবে তারা নিজেদের নামের আগে ‘ডিপ্লোমা প্রকৌশলী’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারেন। একইভাবে উপসহকারী প্রকৌশলী পদটি ব্যবহারেও আমি কোনো সমস্যা দেখি না।

‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’দের জন্য নিজের ক্যারিয়ার উন্নত করার পথ কি তাহলে রুদ্ধ?

মোটেও না। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’রা পরবর্তী সময়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করে ডিগ্রি প্রকৌশলী হতে পারেন। এরপর একজন ‘প্রকৌশলী’র জন্য প্রযোজ্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এমন অনেক ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’ বাংলাদেশে আছেন যারা পরবর্তী সময়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং, এমনকি পিএইচডি পর্যন্ত করেছেন। সুতরাং তাদের পেশায় উন্নয়নে কোনোই বাধা দেখছি না।

তাছাড়া বাংলাদেশ একসময় স্কুলে বিজ্ঞান কিংবা কারিগরি শিক্ষক হিসেবে ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’দের নিয়োগের একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অজ্ঞাত কারণে তা স্থগিত হয়। সম্ভবত বিএ পাস স্কুল শিক্ষকরা ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’দেরকে ‘গ্র্যাজুয়েট’ নন বলে দাবি করে এতে বাধা দেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি বরং, এটিকে যৌক্তিক মনে করি যে স্কুল শিক্ষক হিসেবে তাদের নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। আমার ধারণা, এতে করে স্কুল পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটবে। এতে করে কম করে হলেও হাজারখানেক ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’-এর চাকরির ব্যবস্থা হতে পারে।

কোটা নিয়ে যে দাবিগুলো উঠেছে তার ভিত্তি কী?

সরকারি চাকরিতে ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’দের জন্য যে ৩৩ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে, এটা আসলেই প্রশ্নসাপেক্ষ। কেননা এক্ষেত্রে একজন ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’ তার অভিজ্ঞতাবলে প্রমোশন পেলেও প্রকৌশলী হিসেবে লাইসেন্স পাবেন না। অনেকটা সেই ডাক্তারি লাইসেন্সের মতো। আর এক্ষেত্রে তিনি কোনো ডিজাইন করতে পারবেন না। শুধু নির্মাণ তদারকির কাজ করতে পারবেন বা প্রশাসনিক কাজ। এক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে, সেই টপআপ করে বিএসসি ডিগ্রি নেয়া। সরকারেরও উচিত বিএসসি ডিগ্রি ছাড়া কাউকে সরাসরি প্রমোশন না দেয়া। অন্য নামে কিছু প্রমোশন দেয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই ৩৩ শতাংশ নয়। আবার সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে যে এ হার নাকি ৩৩ শতাংশের চেয়ে বেশি এবং কোনো কোনো বিভাগে শত ভাগ পর্যন্ত।

আবার ১০ম গ্রেডে বিএসসি ডিগ্রিধারীদের আবেদন করতে দেয়া যাবে না, এটাও ঠিক নয়। এটা সত্য যে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে কেউ বিএসসি ডিগ্রি নিয়ে এ পদে আবেদন করবে না। কিন্তু ছোটখাটো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এটি করতে পারে এবং সে সুযোগ থাকা উচিত।

বিদ্যমান সংকট নিরসনে কোন পথে এগোনো দরকার বলে মনে করেন?

বাংলাদেশের কারিগরি পেশার বিভিন্ন স্তরের মাঝে এ বিভেদ কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমার মতে, এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। সরকারি চাকরি দেশে খুব বেশি লোকে করে না। বাকিরা কিন্তু নিজে উদ্যোক্তা হচ্ছে বা বেসরকারি চাকরি করছেন। আর সেখানে কাউকে বেতন দেয়া হয় তার প্রয়োজনীয়তার ওপর। আগেই বলেছি, কখনো ‘প্লাম্বার’ প্রকৌশলীর চায়ে বেশি আয় করতে পারে। অন্যদিকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারীদের পদে পদে বঞ্চিত করা হলে এর পরিণামও দেশের জন্য ভালো হবে না। এমনিতেই বাংলাদেশে প্রকৌশলীরা ‘ব্রেইন ড্রেইন’-এর শিকার হয়ে দেশ ছাড়ছেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আর সম্মান না পেলে তারা আরো বিদেশমুখী হতে থাকবে।

আসলে বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশের উন্নয়নের জন্য বিশাল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা আশু প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমেই তা সম্ভব। ফলে প্রকৌশল শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন মেনে, যে যার সঠিক অবস্থানে থেকে নিজের দায়িত্ব পালন করা উচিত। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যস্থতায় এর বাস্তবসম্মত সমাধান করা যেতে পারে। কারণ পৃথিবীর সব দেশেই এ স্তরগুলো বিদ্যমান এবং তারা যে যার মতো কাজ করছেন।

গত জুনে মেক্সিকোর মারিদায় অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যালায়েন্সের (আইইএ)’ বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে একই ভেন্যুতে একই ছাতার নিচে এ তিন পর্যায়ের পেশাজীবীরাই তিনটি কক্ষে সম্মেলনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছিলেন এবং একসঙ্গে খাবার-দাবার খাচ্ছিলেন। আমার তো মনে হয়, এ ধরনের সম্প্রীতিই এখানে কাম্য।

আরও