অগ্রাধিকার

নতুন করে আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, সৌরবিদ্যুৎই বিকল্প

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আমরা ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করছি, সেখান থেকে ২০২৫ সাল নাগাদ আমরা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে পারি। এখন রূপপুরে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য রাশিয়ার রোসাটমের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। অথচ ছাদভিত্তিক সোলার পাওয়ার প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য আমরা ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করছি, সেখান থেকে ২০২৫ সাল নাগাদ আমরা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে পারি। এখন রূপপুরে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য রাশিয়ার রোসাটমের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। অথচ ছাদভিত্তিক সোলার পাওয়ার প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ব্যয় রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের মোট ব্যয়ের অর্ধেকও হতো না। স্মরণ করা প্রয়োজন, সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব এবং ঝুঁকিমুক্ত প্রযুক্তি। নতুন করে আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বড় অংকের বিনিয়োগ না করে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ ছিল সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। আমরা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী সৌরবিদ্যুতের ওপর কবে জোর দেব?  

চলতি বছরের শুরুতে জাতীয় সংসদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা চলাচল বন্ধ করা সংক্রান্ত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই ৪০ লাখ থ্রি হুইলারকে আমি বলি বাংলার টেসলা’। টেসলা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক গাড়ি, যার ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমা বিশ্ব অতিদ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহন ব্যবহার থেকে মুক্তি পাওয়ার আন্দোলনে শরিক হয়েছে। টেসলা গাড়ি কেনার ব্যাপারটি এখন মার্কিনদের ‘ফ্যাশন ক্রেজে’ পরিণত হয়েছে। প্রধানত এ গাড়ি কোম্পানির দ্রুতবর্ধনশীল মুনাফার জোয়ারে ভর করে ইলোন মাস্ক বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আরো জানিয়েছেন, ‘কত দ্রুত ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমকে ইলেকট্রিকে নিয়ে যাওয়া যায়, সেজন্য সারা বিশ্বে একটা বিপ্লব চলছে। তেলচালিত গাড়ির ইঞ্জিনের দক্ষতার মাত্রা ২০ শতাংশ। আর ইলেকট্রিক যন্ত্রের দক্ষতার মাত্রা ৮০ শতাংশ’। তিনি আরো বলেছেন, ‘আমরা তাদের কোনো বাধা দিচ্ছি না। যান্ত্রিকভাবে এতে ত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ যেটা ব্যবহার করছে তার রিটার্ন অনেক বেশি। এক্ষেত্রে লেড ব্যাটারি থেকে তারা যেন লিথিয়াম ব্যাটারিতে চলে আসে। এটা নিয়ে আমরা একটা প্রকল্প করছি। আমরা লেড ব্যাটারি নিয়ে তাদের লিথিয়াম ব্যাটারি প্রদান করব’। নসরুল হামিদ মত প্রকাশ করেছেন, দেশে যত গণপরিবহন আছে সেগুলো দ্রুত বিদ্যুতে নিয়ে আসা উচিত। এতে খরচ কম, পরিবেশবান্ধব। ওপরে উদ্ধৃত প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য এবং মতামত থেকে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমানে অবৈধ হলেও ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশাকে উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমার প্রশ্ন, সরকার যদি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশাকে দেশে দ্রুত চালু উৎসাহিত করতে চায় তাহলে আজও এগুলোর চলাচলকে ‘আইনগতভাবে অবৈধ’ করে রাখা হয়েছে কার স্বার্থে? সারা দেশে পদে পদে চাঁদা দিয়ে চলাচল করছে এসব যানবাহন। ট্রাফিক পুলিশের ঘুস-দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক চাঁদাবাজদের স্বার্থে কি অবৈধ রাখার অযৌক্তিক আইন বহাল রাখা হচ্ছে?

ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা দেশে চালু হয়েছে প্রায় এক যুগ আগে। গ্রাম-গঞ্জে, মফস্বল শহর ও ছোটখাটো নগরের সড়কগুলোয় ক্রমেই সাইকেল রিকশাকে হটিয়ে দিয়ে জায়গা দখল করে নিচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সিএনজি অটোরিকশার তুলনায় অনেক ব্যয়সাশ্রয়ীর ফলে এগুলোর ব্যবহারও অনেক বছর ধরে দ্রুতবর্ধনশীল। চট্টগ্রামের প্রবাসীপ্রধান এলাকাগুলোয় এখন সাইকেল রিকশার দেখা মিলছেই না বলা চলে, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং অটোরিকশা এলাকার জনসাধারণের প্রধান যানবাহনে পরিণত হয়ে গেছে বহুদিন আগেই। দেশে উৎপাদিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি এখন চীন থেকে আমদানীকৃত অটোরিকশা ক্রমবর্ধমান হারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এসব এলাকায়। এটাকে আমার কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন মনে হয়েছে, কারণ রিকশাওয়ালাদের শারীরিক ধকল প্রশমিত করার এ যানবাহনগুলো একদিকে আধুনিকতার প্রতীক, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব। অনেকে এগুলোকে যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও বিপজ্জনক আখ্যা দিলেও বড়সড় কোনো দুর্ঘটনা এর ফলে ওইসব এলাকায় বেড়ে যাওয়ার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি অবহেলা করা যায় না, কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে এ অভিযোগ ধর্তব্য মনে হয়নি আমার কাছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা হঠাৎ ব্রেক কষলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের দুর্ঘটনা খুব বেশি হলে রিকশা ব্যবহারকারীরাই ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবহারে অনীহ হওয়ার কথা। এ সমস্যা কোথাও গুরুতর আকার ধারণ করার কথা শোনা যায়নি। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার গতি যেহেতু শ্লথ সেজন্য সাইকেল রিকশার মতো এগুলোর চলাচলকেও মহাসড়কে বৈধতা দেয়া যাবে না বোধগম্য কারণে। আমরা এজন্য মহাসড়কে এবং বড় বড় নগরী ও মহানগরের প্রধান সড়কগুলোয় এগুলোর চলাচলকে অবৈধ রাখার পক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করব। কিন্তু গ্রামগঞ্জে, মফস্বল শহরে এবং নগরী ও মহানগরগুলোর অন্যান্য সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার চলাচলকে বৈধতা প্রদানকে আমার কাছে খুবই যৌক্তিক মনে হয়। সাইকেল রিকশা একসময় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের বড়সড় ক্ষেত্র ছিল। বিশেষত ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশের শ্রমশক্তির বিপুল অংশের জন্য যখন ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্ভব হতো না তখন ওই নিম্নবিত্ত ও উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তির বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল সাইকেল রিকশা চালানো। দেশের সর্বত্র রিকশাওয়ালারা বিবেচিত হতেন কোথাও ভালো কর্মসংস্থান করতে না পারা ‘উদ্বৃত্ত জনশক্তি’ হিসেবে, যদিও গ্রামের প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই রিকশাওয়ালাদের দৈনিক রোজগার বেশি ছিল বলে মনে করা হয়। আমরা অনেকেই হয়তো ভুলে গেছি যে, বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রিকশার নগরী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল ঢাকা। বিংশ শতাব্দীর শেষের তিন দশক এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত ঢাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ সাইকেল রিকশাচালক হিসেবে দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহ করতেন। অনেক বিদেশী পর্যটককে রিকশায় চড়ে হাতপাখা দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বাতাস করতে দেখা যেত কয়েক দশক আগেও। তাদের কাছে সাইকেল রিকশা চালানোর এ পেশা ছিল একটি মানবেতর পেশা, বাংলাদেশের জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি ছিল হাড়ভাঙা খাটুনিরত রিকশাওয়ালারা। কিন্তু গত এক দশকে সাইকেল রিকশা চালানোর শারীরিক ধকল কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা চালানোকে ক্রমে গ্রহণযোগ্য মনে করছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। দেশের বেশকিছু অঞ্চলে সেজন্য ক্রমেই উধাও হয়ে যাচ্ছে হাড়ভাঙা খাটুনির প্রতীক সাইকেল রিকশা। একদিক থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি সঞ্চারের প্রতীক হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। হয়তো কয়েক বছরের মধ্যে আর দেখা যাবে না ব্যাটারিচালিত রিকশাও, সড়কে এগুলোর পরিবর্তে দেখা যাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

বিশেষত যেসব অঞ্চলে অভিবাসী বাংলাদেশীরা অনুপাতে জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশে পরিণত হয়েছেন, সেখানে আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনে দেয়া কিংবা কিনতে অর্থ সাহায্য দেয়া এখন প্রবাসী বাংলাদেশীদের ‘প্রথম কর্তব্যে’ পরিণত হয়ে গেছে—সামর্থ্য থাকলে সিএনজি অটোরিকশা, আর সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা থাকলে নিদেনপক্ষে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এমনকি যেসব প্রবাসী বাংলাদেশী অভিবাসী হিসেবে ব্যর্থ হয়ে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় বিদেশ থেকে অসময়ে দেশে ফেরত আসেন তাদের অনেককে দেখা যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে। অতএব সমাজের একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের এ শারীরিক ধকলমুক্ত ব্যবস্থাটাকে আমরা নিরুৎসাহিত করার কোনো যুক্তি দেখি না। সরকারকে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অবিলম্বে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং অটোরিকশা চলাচলকে গ্রামগঞ্জে, মফস্বলে, ছোটখাটো শহরে এবং নগর-মহানগরের ছোটখাটো সড়কে ‘আইনগত বৈধতা’ প্রদান করা হোক। জাতীয় মহাসড়কগুলোয়, মহানগরের প্রধান সড়কগুলোয় এবং অন্যান্য নগরীর প্রধান সড়কগুলোয় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হোক।

সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং অটোরিকশাগুলোর ব্যাটারি চার্জের জন্য অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের যে অভিযোগ তুলেছেন সেটাকে অস্বীকার করা সমীচীন হবে না। ৭০০-৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অবৈধ ব্যবহার ছোটখাটো ব্যাপার নয়। এর জবাবে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে রিকশা ও অটোরিকশাচালকদের উৎসাহিত করার কয়েকটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। তাকে আমার অনুরোধ, অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের উল্লিখিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করুন। বিশেষত লেড ব্যাটারির পরিবর্তে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার উৎসাহিত করার ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করাকে প্রথম অগ্রাধিকার প্রদান করুন। একই সঙ্গে চার্জ ফুরিয়ে যাওয়া ব্যাটারির পরিবর্তে চার্জকৃত লিথিয়াম ব্যাটারি পরিবর্তনের সুযোগ সহজলভ্য করার জন্য এলাকার বিভিন্ন সড়কে সুনির্দিষ্ট চার্জিং স্টেশনের লাইসেন্স প্রদান করা হলে বর্তমান অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, তখন অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণও যৌক্তিক প্রমাণিত হবে। ২০১০ সালে আমি চীনের চেংডু নগরীতে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ওই সময় চেংডু নগরীর প্রায় সব সড়কে আমি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রবল উপস্থিতি দেখতে পেয়েছি, ওখানে চার্জিং স্টেশনও ভালো ব্যবসা করছে। বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারেও চীন পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে। বোঝা প্রয়োজন যে, আগামী এক দশকের মধ্যেই উন্নত দেশগুলোয় অধিকাংশ যানবাহন বৈদ্যুতিক যানবাহনে পরিণত হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে বর্তমানে চীন উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ৮ ফেব্রুয়ারি সংসদে প্রদত্ত বক্তব্যের ভাষ্য মোতাবেক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৪৫৯ মেগাওয়াট (২ শতাংশ) জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া সৌরবিদ্যুৎ। আর ২০২৩ সালের নভেম্বরেও বাংলাদেশে মাত্র ১ হাজার ১৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে। এ ব্যর্থতা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

দেশের আমদানীকৃত কয়লানির্ভর বিদ্যুতের মেগা প্রকল্প স্থাপনের পুরো ব্যাপারটিই বাংলাদেশের জন্য অসহনীয় বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। আমদানীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে এরই মধ্যে বড়সড় বিপদে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের ‘টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) তাদের ঘোষিত ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপে ৩০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের টার্গেট অর্জনের সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে আহরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ছাদভিত্তিক ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মোটেও অসম্ভব নয়, প্রয়োজন হবে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ভর্তুকি-দাম কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাস এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু করা। সম্প্রতি বেশ কয়েকদিন ধরে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর সূর্যোদয় যোজনা’ বা ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’ নিয়ে বেশ হইচই হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ৪৭ হাজার রুপি খরচে তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার সোলার প্যানেল বাড়ির ছাদে স্থাপন করতে চাইলে উল্লিখিত যোজনার কাছে আবেদন করা যাবে। মোট ৪৭ হাজার রুপি প্রাক্কলিত খরচের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১৮ হাজার রুপি ভর্তুকি প্রদান করা হবে, আর সোলার প্যানেল স্থাপনকারী ভোক্তাকে ব্যয় করতে হবে ২৯ হাজার রুপি। মোট এক কোটি পরিবারকে ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনায়’ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত। যোজনার পূর্ণ বিবরণ দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, মডেলটি সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগযোগ্য ব্যবস্থা। বাড়ির মালিকদের জন্য এ ভর্তুকি কর্মসূচি তাদের অবিলম্বে বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

গণচীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত, ফিলিপাইন ও জার্মানি ছাদভিত্তিক সোলার পাওয়ার উৎপাদনে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছে। সোলার প্যানেল ও ‘ব্যাটারি’র দামে সুনির্দিষ্ট ভর্তুকি প্রদান এবং ভর্তুকি-দামে ‘নেট মিটারিং’ স্থাপনে প্রণোদনা প্রদান এসব দেশের সাফল্য অর্জনের প্রধান উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ‘নেট-মিটারিং’ প্রযুক্তি গণচীন থেকে এখন সুলভে আমদানি করা যাচ্ছে। অথচ এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি একেবারেই নগণ্য রয়ে গেল কেন? 

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও