২৮ ফেব্রুয়ারি, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ ও আমাদের কবিতার দ্রোহ

আমরা আসলেই মরিনি, ওরা মরেছে। ইতিহাস শিক্ষা দেয়, অগণিত মানুষ কবিতার মাধ্যমে যে স্বপ্নকে লালন করে তা কখনো মরে না। কবিতার বুকে থেকে উৎসারিত রক্ত ও ঘামে ভেজা আমাদের লালিত দৃঢ় স্বপ্ন সত্য হয়েছিল, ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছিল। কবিতা বিজয়ী হয়েছিল। সৎ কবিতা কখনো পরাজিত হয় না।

(একজন বুয়েট ছাত্রের স্মৃতিকথা)

১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি।

এই দিনটি ছিল একটি ভয়ংকর দুঃখজনক দিন। অবৈধ ক্ষমতা দখল, মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি, সামনের প্রস্তাবিত উপজেলা নির্বাচন বিরোধিতা নিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। দুপুরের বেশ পর হাজার হাজার ছাত্র জমায়েত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন আর ব্যবসায় প্রশাসন ভবনের সামনে। পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলের প্রস্তুতি চলছে। ছাত্রদের উজ্জীবিত করতে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ও কবি মোহন রায়হান একটা জ্বালাময়ী কবিতা পড়লেন—

‘আমাদের মৃত্যুর জন্য আজ কোনো পরিতাপ নেই,

আমাদের জন্মের জন্য আজ কোনো ভালোবাসা নেই,

আমাদের ধ্বংসের জন্য আজ কোনো প্রতিকার নেই,

আমাদের সবকিছু আজ শুধু ছলনার, ব্যর্থতার ক্লেদ নিয়ে আসে।

আজকে এখানে একজন শিক্ষক জন্মাক, আজকে এখানে একজন বুদ্ধিজীবী থাক,

আজ নবজন্ম হোক এ দেশের লেখক-কবির আর তারা অন্ধকারে ঝলসিত আগ্নেয়াস্ত্রের মতো হোক স্পর্ধিত;

স্পর্ধিত হোক আজ তারা স্পর্ধিত হোক।’

সেদিন মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন সব ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতারাসহ বুয়েটের দুই বিখ্যাত ছাত্রনেতা খন্দকার মোহাম্মদ ফারুক (তিন তিনবার বুয়েটের নির্বাচিত ভিপি এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি) আর মুনিরুদ্দীন আহমদ (জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি) ওনারা দুজনও ছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রধান নেতা। বুয়েটের অন্য কোনো ছাত্র পরবর্তী সময়ে আর কোনোদিন ছাত্ররাজনীতির ওই উচ্চতায় পৌঁছতে পারেনি। বিশাল মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, টিএসসি, কার্জনহল পার হয়ে ফুলবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হয়, তখনই হঠাৎ দাঙ্গা পুলিশ সামনে ও পেছনে দুই দিক থেকেই ঘিরে ধরে। তবে আশ্চর্যজনক হলো পেছনে ছিল কয়েকটি পুলিশবিহীন ট্রাক। এ রকম খুব কম হয়, দুই দিক থেকে সধারণত দাঙ্গা পুলিশ ঘিরে রাখে না, একটা পথ কৌশলগত কারণে সাধারণত খোলা রাখে ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার জন্য। আজ যেন একটু অন্যরকম। কেমন গা ছমছমে ভাব।

তবে হঠাৎ বোঝা গেল তাদের বীভৎস পরিকল্পনা, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছনের ধীরগতিতে মিছিল অনুসরণ করা ট্রাকটি বর্তমান ফায়ার ব্রিগেড অফিসের পাশ থেকে খুব দ্রুতগতিতে উঠিয়ে দেয়া হলো মিছিলের ওপর। ঘটনার আকর্ষিকতায় সবাই হতবিহ্বল হয়ে গেল, ঘটনাস্থলেই শহীদ হলেন মিছিলে অংশগ্রহণকারী ইব্রাহীম সেলিম ও দেলোয়ার হোসেন। আহত হলো অসংখ্য ছাত্র, চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল অনেকে। নিহত ছাত্রদের লাশ দুটিও পুলিশ তৎক্ষণাৎ নিয়ে গেল। ওনারা দুজনই ছিলেন দক্ষিণ বাংলার সন্তান, সেলিম ছিলেন পিরোজপুরের ছেলে আর দেলোয়ার পটুয়াখালীর।

ফুঁসে উঠল সারা দেশ। সারা দেশে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল ছাত্ররা। রাজপথের আগুন সাংস্কৃতিক মানসেও ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। ছাত্রনেতা কবি মোহন রায়হান ছিলেন স্বভাবে অনেকটা কাজী নজরুল ইসলামের মতো, চট করে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কবিতা লিখে ফেলতে পারতেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেললেন ‘বুনো শুয়োরের ট্রাক’—

ওই যায় ওই...

বুনো শুয়োরের ট্রাক...

ঘোত্ ঘোত্ ঘোত্ ঘোত্

প্রতিবাদী মিছিলকে

পিষে পিষে দ’লে দ’লে

ওই যে পালায় খুনি।

কবি ফরহাদ মজহার এ সময় লিখলেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘লেফটেনান্ট জেনারেল ট্রাক’—

হে সামরিক পোশাক পরিহিত শাহানশার মতো ট্রাক

এই মিছিল

তোমার মত বহুত শাহানশা’কে উলঙ্গ করে ছেড়েছে

তারপর প্রস্রাব করতে করতে

প্রস্রাব করতে করতে

প্রস্রাব করতে করতে

সামরিক আইন প্রশাসকের দফতরগুলো

পরিণত হয়েছে মিউনিসিপ্যালটির

প্রস্রাবখানায়।

বুয়েটের ছাত্রদের বুকেও তখন দ্রোহের আগুন জ্বলছে। ট্রাক-গাড়ি পুড়ছে পলাশীর মোড়ে, সলিমুল্লাহ হল আর আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের মাঝের রাস্তায়, বকশিবাজার মোড়ে। এ রকম এক অগ্নিগর্ভ সময়ের প্রেক্ষাপটে বুয়েটের স্থাপত্যে আমার এক বছরের সিনিয়র ছাত্রনেতা মনজুর কাদের হেমায়েতউদ্দিন ভাইকে নিয়ে আমরা দুজন একটা ছোট প্রতিবাদী কবিতার সংকলন বের করি মাত্র দু-তিনদিনের মধ্যে।

সংকলনে অনেকেই কবিতা দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়েছেন। সংকলনে স্থাপত্যের ছাত্র ও তৎকালীন বুয়েট ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তুখোড় সাহসী ছাত্রনেতা মাহফুজুর রহমান ভাইয়ের (পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত) কবিতার নাম ছিল ‘শালা’—

এতো তোকে গালি দিলুম

তবু বুঝি শখ মেটেনি।

ট্রাক চালিয়ে ভান দেখালি

সেদিন রাতে গাঞ্জা খেয়ে পড়ে ছিলি।

শোক এলো তোর—

এ কোন ছিরি?

আমাদের স্থাপত্যের বন্ধু সহপাঠী এনামুল করিম নির্ঝরের (পরবর্তী সময়ে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক ও নির্মাতা) কবিতার নাম ছিল ‘ঘরের ভেতর শত্রু’, ওর কবিতার শেষ কয়টি লাইনগুলো ছিল এমন—

তবে জনাব আপনি একবারো

কবি রাজার ভাঁওতাবাজি বিশ্বাস করে

সুযোগ খোঁজেন চালাকির—

তবে জানবেন নিশ্চিত নিজের দেশের মানুষের

শিকার হবেন আপনিই।

ছাত্রনেতা শাহিনুল ইসলাম খান ইতি ভাই (পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অথরিটির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ) লিখেছিলেন ‘দেশের এক আহাম্মক’ নামের একটি কবিতা—

প্রতিরোধে প্রতিশোধে

জনতা যে শত ক্রোধে

সামরিক কুত্তার চামড়া যে তুলবেই।

সংকলনের প্রচ্ছদে নতুনত্ব আনার জন্য আর একই সঙ্গে পয়সা বাঁচানোর জন্য আমরা কাগজ প্যাকিংয়ের জন্য যে গাঢ় নীল রঙের প্যাকিং পেপার ব্যবহার করা হয়, সেই বিনি পয়সার কাগজ ব্যবহার করি, কিন্তু আমাদের এই এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয় না, আমাদের জানা ছিল না প্যাকিং কাগজের ওপর মোমের পাতলা প্রটেকটিভ প্রলেপ থাকে, তাই ট্রেডল মেশিনের রঙ তার ওপর লাগতে চায় না। ইচ্ছা ছিল গাঢ় নীল রঙের ওপর সাদা রঙে স্ক্রিন প্রিন্টে ম্যাট কন্ট্রাস্ট প্রচ্ছদ ছাপার, কিন্তু স্ক্রিন প্রিন্ট করতে যে টাকা দরকার ছিল তা আমাদের কাছে ছিল না। তাই শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম কম দামে ট্রেডল প্রেসেই ছাপব। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, ছাত্রলীগ নেতা মিজানুল মাহবুব ভাই ছিলেন স্থাপত্যে আমাদের এক বছরের সিনিয়র, মিজান ভাই খুব সুন্দর স্কেচ করতেন, তিনি পটাপট পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই ছোট্ট এক টুকরা ট্রেসিং পেপারে ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’ এই থিমে দুর্দান্ত একটা স্কেচ করে দিলেন কভারের জন্য। মিজান ভাই খুব সুন্দর কবিতাও লিখতেন, পাস করার মাত্র কয়েক বছর পর তিনি এক দুরারোগ্য ইউরিনারি ডিজিজে মারা যান।

ট্রেডেল মেশিনে সরাসরি সাদা রঙে প্রিন্ট হয় না, সাদা রঙ শুধু অন্য রঙের সঙ্গে মেশানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, আমরা গোঁ ধরলাম, না, নীল তেলতেলা কাগজের ওপর সাদা প্রিন্ট করতেই হবে। শাহ সাহেব বাজার, মোগল আমলের ঐতিহাসিক খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদের ঠিক পেছনেই সেলিম সাহেবের খাজা আর্ট প্রেস। জীবনে অনেক কালো রঙের মানুষ দেখেছি, কিন্তু সেলিম সাহেবের মতো কুচকুচে ও চকচকে কালো মানুষ আমি আর দেখি নেই। তার দাঁতগুলো ছিল অফসেট পেপারের চেয়েও সাদা আর তার হৃদয়টা ছিল তার চেয়ে আরো অনেক সাদা। তাই তিনি যখন হাসতেন তখন তাকে খুব সুন্দর দেখাত। এমন অদ্ভুত ভালো মানুষ আমি জীবনে কম দেখেছি। ওনার ওপর জীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় নিষিদ্ধ ছাপাজনিত কত অত্যাচার যে করেছি তার হিসাব নেই, এক মুখ হাসি নিয়ে তিনি সব অত্যাচার সহ্য করতেন। মানুষটা আজ বেঁচে নেই। যেখানেই থাকুন পরম করুণাময় তাকে যেন এমন হাসিখুশি রাখেন সেখানেও।

মনজুর ভাই বললেন, ব্যাক কভারটা ফাঁকা না রেখে ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ টাইপ’ একটা টাটকা কিছু লিখে ফেলো, ওটাও সাদা রঙ দিয়ে ছাপব। গভীর রাত্রে বাসি পেটে প্রেসে বসেই এই ‘টাটকা’ জিনিস লিখে ফেললাম—

স্বৈরাচার এখন তার পূর্ণমত্তায়। সাম্রাজ্যবাদের কালো ছায়ায় ঢেকে গ্যাছে সমগ্র স্বদেশ। ট্রাকের চাকার নিচে এখন তাই প্রতিবাদী যুবকের থেঁতলে যাওয়া দেহ আর শিক্ষকের পবিত্র দেহে নির্লজ্জ বর্বরের আঘাত। নারীর শরীরও আজ রক্তাক্ত, দেহে তার সশস্ত্র অসভ্যের হাত। বুকে গুলি নিয়ে শুয়ে আছে এখন সহস্র যুবক। মায়ের চোখেও আবার সেই পুরনো জলের দাগ। এখন কি করে বসে থাকা আর, চাই প্রতিশোধ। চাই প্রতিরোধ। বুকের পোষা আগুনে চাই দাবানলদাহ। আমাদের জীবনই হবে আমাদের অস্ত্র আর আমাদের মৃত্যু আমাদের নবজীবনের শর্ত। এখন তাই প্রতিরোধেই প্রতিশোধ। "

কিন্তু বাদ সাধলেন প্রেসের হেড সুপারভাইজার আলাউদ্দিন মিয়া। তিনি সোজা বলে দিলেন—

এই ডেঞ্জার কাম আমি পারমু না। এই বয়সে পুলিশের বাঁশডলা খাবার সোয়াদ আমার নাইক্কা।

অধস্তনের এ আপাত ‘বেয়াদবিতে’ সেলিম সাহেব রেগে গেলেন না, উনি আসলে রাগতেই জানতেন না। উল্টো তিনি হেসে দিলেন, উনি সব কথায়ই হাসতেন। উনি বললেন, ঠিক আছে আমি নিজেই চেষ্টা করি। সেলিম সাহেবের রাতভর নানা চেষ্টা আর মঞ্জুর ভাইয়ের নানা রকম টাটকা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক’ টেকনিক্যাল কনসালট্যান্সির পরও প্রচ্ছদ হিসেবে যে বস্তু বের হলো তা এক কথায় ভয়াবহ, কিন্তু আর কোনো উপায় ছিল না আমাদের, সময় খুব কম। ছাপা শেষে একগাদা ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’ নিয়ে আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম আর ৫ টাকা করে বিক্রি করতে লাগলাম। যেকোনো বিচিত্র কারণেই হোক আমাদের প্রথম ক্রেতা হলেন স্থাপত্য বিভাগের প্রফেসর প্রচণ্ড সমালোচনাপ্রিয় ইমামুদ্দীন টলো স্যার, তিনি চরম বিরক্তির সঙ্গে ভুরু কুঁচকে ৫ টাকা বের করে দিলেন আর মনোযোগ দিয়ে কবিতাগুলো পড়তে লাগলেন। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো সবাই প্রচ্ছদের ভূয়সী প্রশংসা করল, বিশেষ করে স্থাপত্যের ছাত্ররা। স্থপতিরা বোধ হয় বিশ্বব্যাপীই সবসময় দুরূহ ও দুর্বোধ্য বস্তু পছন্দ করে, অথবা যেটা না বোঝে তার বেশি বেশি তারিফ করে।

বিক্রিতে মনজুর ভাই খুব পারদর্শী ছিলেন। সবাই তো আর কাব্যরসিক হয় না, হওয়ার কথাও নয়, কিন্তু মঞ্জুর ভাইয়ের পাল্লায় পড়লে রসিক-বেরসিক নির্বিশেষে সবাইকেই একটি তাজা টাটকা ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’ কিনতে হতো, অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মলিন মুখে এই ‘টাটকা’ জিনিস কিনত। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন ৫ টাকায় তিনটি কড়কড়া বেনসন (মেড ইন লন্ডন) সিগারেট কেনার পরও ৫০ পয়সা ফেরত পাওয়া যেত, ওই ৫০ পয়সায় সেন্ট্রাল ক্যাফেটেরিয়ায় ক্ষুদ্র তিনকোনা ভাসমান লেবুসহ প্রচণ্ড মিষ্টি এক কাপ লেবু চা পাওয়া যেত অথবা দুপুরবেলা পুরো দুই প্লেট ‘আখনি’ নামের এক মৃদু তৈলাক্ত মাঝারি সরু চালের ভাতের সঙ্গে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সাইজের চার-পাঁচ পিস মাংসসহ এক অদ্ভুত ধরনের পোলাও পাওয়া যেত। আমাদের এক বন্ধু রসিকতা করে বলত, এত ছোট সাইজের মাংস কাটা বটি দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য নাকি বলাকা মার্কা ধারালো ব্লেড ব্যবহার করা হতো। তাই ৫ টাকা তখন অনেক টাকা, ৫ টাকা খরচ করে কবিতা কিনতে আত্মা লাগে।

যেকোনো কারণেই হোক আমাদের ‘প্রতিরোধে প্রতিশোধ’ উতরে গেল, সব কপি বিক্রি হয়ে গেল। এটা এত পাঠকপ্রিয়তা পাবে আর সাড়া জাগাবে ভাবতেই পারিনি। হয়তো মানুষের চেতনা যখন স্বতঃস্ফূর্ত দ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠে তখন তার নান্দনিক বোধের ব্যাকরণও বদলে যায়।

সংকলনে আমার কবিতা ‘সরল ইতিহাস’-এর কিছুটা এখানে তুলে দিচ্ছি—

জালিয়াওয়ালার আবদ্ধ আঙিনায়

ওরা আমাদের গুলিবিদ্ধ করলো,

ছিন্ন ছিন্ন করলো আমাদের দেহ

আমরা তবু মরিনি

ওরা মরেছে।

এবার ফুলহীন ফুলবাড়িয়ায়

ওরা আমাদের পিষ্ট করলো ট্রাকের চাকায়,

থেঁতলে দিলো আমাদের দেহ আর বুকের যা কিছু,

আমরা এবারো মরিনি;

ওরা ঠিক ঠিক এবারো মরবে।

আমরা আসলেই মরিনি, ওরা মরেছে। ইতিহাস শিক্ষা দেয়, অগণিত মানুষ কবিতার মাধ্যমে যে স্বপ্নকে লালন করে তা কখনো মরে না। কবিতার বুকে থেকে উৎসারিত রক্ত ও ঘামে ভেজা আমাদের লালিত দৃঢ় স্বপ্ন সত্য হয়েছিল, ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছিল। কবিতা বিজয়ী হয়েছিল। সৎ কবিতা কখনো পরাজিত হয় না।

শুনেছি মৃত্যুর সময় শহীদ সেলিম ছয় মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে যান যার বয়স এখন হওয়ার কথা ৩৮, সেই পিতাহারা মেয়েটির খোঁজ আমরা হয়তো অনেকেই রাখিনি। আমাদের সেই দ্রোহের আগুন আজ হয়তো নিভে গেছে, ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির খায়েসে আমরা আজ হয়তো অনেক তন্ত্রমন্ত্র আর লগ্ন তিথি মেনে চলি, তবুও যারা জতির চরম দুঃসময়ে নিজের জীবন দিয়ে আমাদের চেতনাকে শাণিত করে গিয়েছিলেন একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের স্বপ্নে, তাদের আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই, আমাদের পরের প্রজন্মরা যেন সেসব কিংবদন্তির নায়কদের গল্প মনে রাখে, কেননা আজ আমি আমাদের অগ্নিগর্ভ সময়ের সেইসব কিংবদন্তির অকুতোভয় অমর শহীদ আর সেইসব স্বতঃস্ফূর্ত দ্রোহের কবিতার কথা বলছি—

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি

আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।

তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল...

সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা

সুপুরুষ ভালোবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা

জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা

রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।

আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো

আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো?

আমি যার কবিতা দিয়ে আমার লেখা শেষ করলাম, ব্যক্তিগতভাবে কবি হিসেবে আমার প্রিয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ স্বৈরাচারী এরশাদের হালুয়া রুটির মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন এবং সেই সময় তিনি বাংলা একাডেমির ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পড়তে এসেছিলেন। কবি মোহন রায়হানের নেতৃত্বে আমরা ক’জন তাকে বাংলা একাডেমির বিশাল স্টেজ থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম, তাকে আমরা কবিতা পড়তে দিইনি। আমরা যখন তার মাইক্রোফোন কেড়ে নিই, তখন তিনি তার মোটা গ্লাসের চশমার ভেতর দিয়ে আমাদের দিকে অদ্ভুত এক বিস্ময় ও অপমানিতের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। আমার সেই দৃষ্টি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। এই ছিল আমাদের অগ্নিগর্ভ যৌবনের প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের কবিতাময় পরম সৃষ্টিশীল নির্মম এক সময়, যখন আদর্শকে সমুন্নত রাখতে প্রিয় কবিকেও আঘাত করতে আমরা দ্বিধা করিনি।

মাহফুজুল হক জগলুল: সহসভাপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট

আরও