কথা হচ্ছিল কর ব্যবস্থা নিয়ে। প্রায় চার কোটির ওপর পরিবারের দেশে করদাতার সংখ্যা হাতেগোনা। মাত্র ২৩-২৫ লাখ করদাতা সত্যিকার অর্থে কর দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ বলবেন ঠিক তা নয়, দেশের সবাই কর দেয়। কারণ মূল্য সংযোজন করের ভার সবার ওপরই বর্তায়, যা কিছু কেনাকাটা করেন প্রায় সব ক্ষেত্রেই মূল্য সংযোজন কর (মূসক) দিতে হয়। তবে আজকের বিষয় তা নিয়ে নয়। কর কেন দিতে হয়? কিংবা কর দিলে দেশের কী উপকার হয়? কর আহরণের কোনো নীতিমালা আদৌ আছে কি?
খুঁজে বেড়ালাম ইতিহাসের পাতায়। ভারতবর্ষে কর আরোপ হয় ২ হাজার ৪০০ বছর আগে। কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে বলেছেন সরকার কর আরোপ করবে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য। তিনি কর আরোপের পাঁচটি নীতি অনুসরণের কথা বলেছিলেন। প্রথমত, কর হবে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে। তিনি বলেন, কর যদি মানুষকে দরিদ্রতর করে ফেলে তাতে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, করদাতার সুবিধাজনক সময়ে কর সংগ্রহ করা উচিত। প্রাচীন ভারতে কর ছিল উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ যখন কৃষক গোলায় ধান পাবে তখনই কর সংগ্রহ করা হতো। উদ্দেশ্য ছিল কর প্রদানের ক্ষেত্রে করদাতা যেন তা জবরদস্তি মনে না করে। কর আহরণের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর নতুন করে সাল তৈরি করেন। অথচ এক্ষেত্রে আমাদের জুন ৩০ কি কোনো নিয়মনীতির মধ্যে পড়ে? তৃতীয়ত, নিশ্চয়তা ও স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। করহার কখনই ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা যাবে না। এতে করের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে এবং জনগণ কর দিতে নিরুৎসাহিত হবে। এ ব্যবস্থার ফলে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থিতিশীলতা বাড়বে। চতুর্থত, কর আদায়ের খরচ ন্যূনতম হওয়া উচিত। কৌটিল্য দুর্নীতি রোধ করতে এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পৌঁছা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুবিন্যস্ত ও দক্ষ কর প্রশাসনের পক্ষে ছিলেন। পঞ্চমত, কৌটিল্য কর ব্যবস্থায় নমনীয়তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছিলেন এবং সেখানে যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে রাজাকে অতিরিক্ত কর আরোপের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল অস্থায়ী ব্যবস্থা এবং রাজাকে জনগণকে এ ধরনের করের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।
বুঝতেই পারছেন আদি অর্থনীতির প্রতিষ্ঠাতা কৌটিল্য যিনি বিশ্বে প্রথম কর ব্যবস্থাপনার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়েছিলেন। তার মতে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল কর ব্যবস্থা। তার মতে কর অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছর আগে কর ছিল চার প্রকার—কৃষকের উৎপাদনের ওপর কর, ব্যবসার ওপর কর, কারিগরের কাজের ওপর কর ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কর। বুঝতেই পারছেন কর ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। যে সম্পদ ব্যবহার করে আরো সম্পদ উৎপাদন করবে তারই ওপর কর বসবে।
কৌটিল্যর প্রায় ২ হাজার ২০০ বছর পর অ্যাডাম স্মিথ কর আরোপের চারটি মূলনীতির কথা বলেছেন—ক. ন্যায্যতা ও সমতা খ. সুবিধা গ. নিশ্চিততা ও স্থিতিশীলতা এবং ঘ. অর্থনীতি ও দক্ষতা। এ পর্যায়ে বলে রাখা ভালো কর ব্যবস্থাপনা নীতি তৈরিতে কৌটিল্যর পক্ষে অ্যাডাম স্মিথকে নকল করা সম্ভব ছিল না। তবে কি স্মিথ সাহেব কৌটিল্যকে নকল করেছিলেন?
যাহোক, প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ভারতবর্ষের রাজারা ২ হাজার ৪০০ বছর আগে কর নিয়ে কেন এত চিন্তা করতে গিয়েছিলেন? উত্তর পাবেন সেই সময়কার আমাদের অর্থনীতিতে। প্রায় ১৫০০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর ধনী দেশের নাম ছিল ভারত (বাংলাদেশ তার অন্তর্ভুক্ত)। পৃথিবীর মোট দেশজ উৎপাদনের অর্ধেকের চেয়ে বেশি উৎপাদন হতো যুগ্মভাবে ভারত ও চীনে। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ভারত ও চীন তখন কর ব্যবস্থায় নজর দিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন করে রাজার হাতকে শক্তিশালী করা। কারণ সেই সময়ে কর দিয়ে সেসব সেবার ব্যবস্থা করা হতো যাতে প্রজাদের সমৃদ্ধি হয়। তারা গড়ে তুলেছিলেন শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, বিচার ব্যবস্থা ও অপরাধ দমনমূলক ব্যবস্থা। ফলাফল ছিল একটি দক্ষ ও সমৃদ্ধ দেশ।
এবার আসুন কোম্পানি ও ব্রিটিশ শাসনকাল। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল কর ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজকে শক্তিশালী করা, আমাদের নয়। ফলে তাদের সময়কালে কর ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। উৎপাদনের অংশের বদলে তৈরি হলো নির্দিষ্ট হারে কর আহরণ। সৃষ্টি হলো নতুন কর রাজনীতির। তৈরি হলো জমিদার ব্যবস্থা। জমিদার হলো কর আদায়ের হাতিয়ার। ফি বছর নির্দিষ্ট অংকের কর আহরণ করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। জমিদাররা প্রজার অবস্থার কথা চিন্তা না করেই কর সংগ্রহ করতেন। সংগৃহীত করের ১/১১ অংশ ছিল জমিদারের অবশিষ্ট ১০/১১ অংশ ছিল কোম্পানির। ভালো কিংবা মন্দ আবহাওয়া ফসল ঘরে উঠুক বা না উঠুক তাতে কিছু যায় আসে না, কর তাদের চাই। ব্যবসা-বাণিজ্যেও এল নতুন নীতি। সব লাভজনক ব্যবসার একক অধিকার দেয়া হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। তৈরি হলো কোম্পানির একক বাজার। ফুলেফেঁপে স্ফীত হলো কোম্পানির আয়। সমৃদ্ধ হলো ব্রিটিশ রাজ। ক্রমে পশ্চিমাদের দেশজ উৎপাদন বাড়তে লাগল আর ভারত ও সেই সঙ্গে চীনের জাতীয় উৎপাদন কমে যেতে লাগল। আরো বৃদ্ধি পেল জমিদারদের আয়। তাদের আয়ের মন্দা নেই। দুর্ভিক্ষ নেই। ব্রিটিশ রাজের শাসনামলেও একই ব্যবস্থা চালু রইল। বাকি কথা সবারই জানা।
১৯৪৭-এর পর স্বাধীনতা এলেও ভারতবর্ষে রয়ে গেল রাজকীয় কর ব্যবস্থা। স্থাপিত হলো আমলাতান্ত্রিক কর প্রশাসন। যাদের লক্ষ্য হলো সরকারের আয় বৃদ্ধি। জনগণ কী পেল কী দিল তা ধর্তব্য নয়। কর আহরণই প্রধান। শুরু হলো কর/জিডিপির অংক। অর্থনীতির বারোটা বাজলেও কর চাই। কৌটিল্যর করনীতি যা একসময় অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল তা পরিণত হলো বিড়াল ইঁদুরের খেলায়। বিড়াল ইঁদুরকে যেমন ইচ্ছে তেমন খেলায় তেমনি কর প্রশাসন জনগণকে নিয়ে খেলতে শুরু করল। পরম্পরায় সব সরকারের একটিই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, কর চাই। সরকারের দুর্নীতি বাড়লে কী হবে? নতুন কর চাই। করের মুখ্য পদক্ষেপ হলো যখন যেখানে পার কর আহরণ করো। করের প্রকার বৃদ্ধি হলো। প্রত্যক্ষ কর থেকে পরোক্ষ কর, আমদানি কর, রফতানি কর ইত্যাদি।
কর সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। তাই কর ব্যবস্থাকে হেয় করার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজন উপলব্ধির। কীভাবে কর আহরণ করলে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের সক্ষমতা বাড়বে তার সঠিক ব্যবস্থাপনা যেকোনো সরকারের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকার যে দেউলিয়া হতে পারে তা মনে রাখা জরুরি। গত ২০ বছরের যেকোনো সরকারের কর ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে কখনই দেখবেন না যে সরকার কর ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন করা সম্ভব তা নিয়ে তেমন কোনো কথা বলেছে। তবে বাজেট বক্তৃতায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা রচিত হয়েছে নেতাদের বন্দনায়।
কেন এত সব কথা বললাম? কর দিয়ে অর্থনীতিকে উন্নত করতে হলে কর ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। প্রচলিত ঔপনিবেশিক শাসকদের পরিচালিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তা হবে না। এজন্য কর ব্যবস্থাপনায় কর আমলা ও করনীতি কর্তৃপক্ষের পৃথক্করণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। মনে রাখতে হবে জমিদার দিয়ে করনীতির পরিবর্তন দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে না। অবশ্য আরো মনে রাখতে হবে যে করনীতির পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অর্থনীতিবিদদের সংশ্লিষ্টতা যারা পরিণত জ্ঞান, যুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে আনবে সেই পরিবর্তন, যা ক্রমান্বয়ে কর বৃদ্ধি ও একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। আমলাতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তা হবে না। কৌটিল্য, অ্যাডাম স্মিথ কিংবা কনফুসিয়াস যারা করনীতি নিয়ে প্রমিত ধারণার সৃষ্টি করেছিলেন তাদের কেউই শুরুতে কর প্রশাসনের অংশ ছিলেন না। ছিলেন শিক্ষক। অর্থনীতিবিদ। তবে সবাই পরবর্তী সময়ে সরকারের করনীতি প্রণয়নের অংশ ছিলেন। আশা করি ভাববেন।
ড. এ কে এনামুল হক: অর্থনীতিবিদ ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)