আমাদের প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের অপমান করে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটটা ডেকে এনেছেন। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে চলতি বছরের জুনে হাইকোর্ট থেকে যে রায় দেয়া হয় তাতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এ রায়ের প্রতিবাদস্বরূপ ও কোটা সংস্কার দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য আন্দোলনই বলা যায়।
কিন্তু এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ করে মন্তব্য করলেন যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য কোটা রাখবেন না তো কি রাজাকারের নাতি-পুতিদের জন্য কোটা রাখা হবে! এ মন্তব্য অত্যন্ত অবিমৃশ্যকারী ও বালখিল্যপনার মতো হয়েছে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা এতটাই অপমান বোধ করেছে যে তারা রাগ করে মন্তব্য শোনার পর থেকে স্লোগান দিতে শুরু করে, ‘আমি কে, তুমি কে, রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’; ‘দেশ বিকানো স্বৈরাচার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’
অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা এতই ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন যে নিজেদের ঘৃণিত রাজাকার বলতেও দ্বিধা করেননি। এর ফলে কোটা সংস্কার আন্দোলনটিতে প্রচণ্ড গতি সঞ্চার হয়। আর এই গতি থামানোর জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। এই লেলিয়ে দেয়ার জন্যই আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঢুকে পড়ে বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির ও জঙ্গিরা। এতে সারা দেশে ছাত্রলীগ প্রচণ্ড মার খেয়ে মাঠ থেকে ভেগে যায়।
সম্প্রতি ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট মেনে নিয়েছে যে চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হবে। এই রায় এটিই প্রমাণ করে যে কোটা সংস্কার আন্দোলনটি ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবি ও ন্যায্য আন্দোলন ছিল। কিন্তু সে আন্দোলন এখন হাইজ্যাক হয়ে বিএনপি, জামায়াত, শিবির, ছাত্রদল ও জঙ্গিদের এক দফা দাবি—সরকার উৎখাতের আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছে।
অনুপ্রবেশকারীরা এ আন্দোলনে প্রবেশের পর থেকে প্রচণ্ডভাবে জ্বালাওপোড়াও শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে তারা বিটিভি ভবনে অগ্নিসংযোগ, ছাত্রলীগের ওপর হামলা, উঁচু দালান থেকে ফেলে দেয়া, মেট্রোরেলের দুটি স্টেশন ধ্বংস, ইন্টারনেটের ডাটা সেন্টারে অগ্নিসংযোগ, সাবমেরিন কেবল কাটা, সেতু ভবন ভাংচুর, রেললাইন উপড়ানো, পুলিশের ওপর হামলা, সারা দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসসহ কোনো কিছুই আর ধ্বংসযজ্ঞের বাইরে রাখা হয়নি। সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হওয়ার সঙ্গে মানুষের প্রাণও গিয়েছে। এসব সংঘাত-সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার বাধ্য হয়েই কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েন করেছে। যদিও এখন কারফিউ সীমিত পরিসরে চলমান।
এই অবস্থায় কোটা সংস্কার করে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও এরই মধ্যে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মেনে নিলেও শুরু হওয়া আন্দোলনকে বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির ও জঙ্গিরা সহজে থামতে দেবে বলে মনে হয় না।
এখন ব্রডব্যান্ড সেবা পরীক্ষামূলক চালু করা হয়েছে। কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। সাধারণ ছুটি তিনদিনের পর আর বর্ধিত করা হয়নি। তবে মাঝে দেশের অর্থনীতির চাকা পুরো থমকে গিয়েছিল। সারা দেশ অচল হয়ে পড়েছিল। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ায় ডিজিটাল বাংলাদেশের সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ সরকার দেশের অর্থনীতিকে পুরোপুরি সচল করবে তা বর্তমানে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এটা বলা যায়, কোনো দেশপ্রেমী ব্যক্তি মেট্রোরেল কিংবা দেশের জাতীয় টেলিভিশন সেন্টার ভাংচুর বা পুড়িয়ে দিতে পারে না। এই কাজগুলো স্বাধীনতাবিরোধীরাই করতে পারে। তাদেরকে যত তাড়াতাড়ি শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে, তত দ্রুত প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞ ও মানুষ হত্যার যে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা বন্ধ করা যাবে।
ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়