বিশ্লেষণ

বিশ্ব অর্থনীতির চলমান রূপান্তর ও ক্লিন এনার্জির গতিপথ

বিশ্ব অর্থনীতি ও বাজারসংক্রান্ত সাম্প্রতিক আলোচনা একগুচ্ছ প্রশ্ন ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। বৈশ্বিক দৃশ্যপটে অনেক কিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কাজেই সেগুলো সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট চিত্র হাজির করাটা কঠিন হলেও বড় কিছু বিষয় বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তুলে ধরার জন্যই এ নিবন্ধের অবতারণা।

বিশ্ব অর্থনীতি বাজারসংক্রান্ত সাম্প্রতিক আলোচনা একগুচ্ছ প্রশ্ন ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। বৈশ্বিক দৃশ্যপটে অনেক কিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কাজেই সেগুলো সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট চিত্র হাজির করাটা কঠিন হলেও বড় কিছু বিষয় বৃহত্তর প্রেক্ষাপট  তুলে ধরার জন্যই নিবন্ধের অবতারণা।

প্রথম প্রশ্নটি বেশ সোজাসাপটা। সেটি হলো, মন্দা কি বিস্তৃত গভীর হচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন তাত্পর্যজনকভাবে কমিয়েছে। আরো কমানোর আশঙ্কা আছে। বর্তমানে এটি উদ্বেগের একটা কারণ। একটি বিশ্বমন্দাপরপর দুই প্রান্তিকে ঋণাত্মক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়তো হবে না, কিন্তু সংঘাতের নাটকীয় বিস্তার কিংবা জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো বড় কোনো অভিঘাত চিত্র বদলে দিতে পারে।

অবশ্য কিছু অর্থনীতি নিশ্চিতভাবে সংকুচিত হবে। তেল গ্যাসের উচ্চমূল্য সত্ত্বেও ভয়াবহ প্রলম্বিত পশ্চিমা অবরোধের কারণে রাশিয়ার জিডিপি অবশ্যই কমবে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য, জীবাশা্ম জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা এবং রাশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার বাধ্যবাধকতায় ইউরোপও মন্দার মুখোমুখি হতে পারে। মহামারীর প্রভাবের সঙ্গে বেড়ে চলা খাদ্য জ্বালানি মূল্যের কারণে আবার অনেক নিম্ন আয়ের দেশও কঠিন সময় পার করছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে বড় কোনো অর্থনৈতিক অধোগতির মুখোমুখি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যদিও সেখানে মন্দা অবশ্য প্রত্যাশিত দৃশ্যপট নয়। একইভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম শক্তিশালী ইঞ্জিন চীন অন্তত এক বছর ধরে এক অংকের নিম্ন প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা মূলত কভিড লকডাউনের সম্মিলিত প্রভাব, বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে টিকা নেয়ার নিম্নহার, উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগজনিত আস্থাহীনতা এবং উচ্চঋণ পড়তি দামে জর্জরিত আবাসন খাতের কারণে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির নিকট কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা এবং জোগান চাহিদার ভারসাম্যহীনতা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য খাদ্যের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তীব্রতর করেছে। এর কিছুটা সাময়িক, যদিও তা প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকবে।

তবে মূল্যস্ফীতি ক্রমেই তেতে উঠছে। শিগগিরই প্রশমন হবে বলে মনে হচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ৭৫ শতাংশ জনসংখ্যা বয়োবৃদ্ধ হচ্ছে, শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমছে এবং উৎপাদনশীলতা প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হচ্ছে। আবার উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে অব্যবহূত সক্ষমতার (অতীতে যেটি মূল্য সংকোচনমূলক চাপের একটি বড় উৎস ছিল) ব্যবধান আগের চেয়ে কমে আসছে বটে, তবু তার মধ্যে একটা অংশ অব্যবহূত থাকছে। এছাড়া সরবরাহ চাহিদা সংযোগের সামনের নীতিচালিত বৈচিত্র্যের প্রভাব এবং মধ্যস্থিত মূল্যস্ফীতিমূলক চাপসহ সরবরাহ-প্রতিবন্ধক প্রবৃদ্ধির প্রলম্বিত সময় পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। 

তৃতীয় প্রশ্নটি হলো, প্রযুক্তি খাত ডিজিটাল রূপান্তরের পরবর্তী ধাপ কী হবে? লকডাউন এবং অন্য জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপগুলো মহামারীর সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার বেগবান করেছে। তবে বাজার প্রত্যাশার বিপরীতে প্রবণতা মনে হয় ধীর হচ্ছে, যেহেতু মহামারীর বিধিনিষেধ উঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

আশাবাদী প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের মধ্যেও শেয়ারবাজারে এমন ভ্যালুয়েশন হয়েছে, যা অনেকটা অবাস্তব। মূল্যস্ফীতির প্লাবন, আর্থিক কৃচ্ছ্রতা এবং নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের সময়ে বাজার সংশোধন হওয়া শুরু হয়েছে। বিস্ময়ের নয়, গ্রোথ স্টকপ্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ থেকে যার মূল্য আসে এবং যেটা প্রযুক্তি খাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছেলক্ষণীয়ভাবে কমেছে।

এসব বাজার ওঠানামার মানে এই নয় যে চলমান ডিজিটাল, জ্বালানি বায়োমেডিকেল রূপান্তরের তেমন গুরুত্ব নেই কিংবা সেগুলোর দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক প্রভাব থাকবে না। অদূরভবিষ্যতে প্রতিবিম্বিত অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে স্বাভাবিকভাবে বাজার আরো বেশি উদ্বায়ী হবে।

উচ্চতর বাজার উদ্বায়িতার গুরুত্বপূর্ণ স্বল্পমেয়াদি প্রভাব থাকবে। কারণ উদ্ভাবনমূলক, সম্ভাবনাময় উচ্চ প্রবৃদ্ধির কোম্পানিকে সমর্থন প্রদানে ভূমিকা রাখা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রাইভেট ইকুইটি বাজারের উত্তাপ থেকে সুরক্ষিত নয়। ঊর্ধ্বমুখিতার সময় ভ্যালুয়েশন বাড়ে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি ডিনামিক্সের প্রবঞ্চনাপূর্ণ দাবি করা কিছু কোম্পানি অর্থায়িতও হয়। নিম্নমুখিতার সময়, আনুমানিক - মাস মার্কেট অ্যাডজাস্টমেন্ট থেকে প্রাইভেট ভ্যালুয়েশন পিছিয়ে থাকে। এর একটা কারণ বাড়তি মূলধন বাড়ানো প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগকারী কোম্পানি উভয়ই ভ্যালুয়েশনের সমন্বয় প্রতিহত করে। সময়ে প্রতিশ্রুত দাম দীর্ঘমেয়াদি বাস্তব মূল্যের বাইরে চলে যায়। এটা অর্থায়ন কঠিন করে তোলে এবং প্রবৃদ্ধি উদ্ভাবন ব্যাহত করে।                      

সাম্প্রতিক সময়ে যে চূড়ান্ত প্রশ্নটি মানুষের মনে আচ্ছন্ন হয়ে আছে তা হলো, রাশিয়ার তেল গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর ইউরোপীয় সমাধান এবং জীবাশ্ম জ্বালানির আকাশছোঁয়া দাম নিম্ন কার্বন ট্রানজিশন বিচ্যুত করবে কিনা। সৌভাগ্যজনকভাবে চিন্তা করার ভালো কারণ আছে সেটি হবে না, অন্তত দীর্ঘস্থায়ী উপায় হিসেবে।

প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্য বিভিন্ন দেশ ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং টেকসই জ্বালানি সলিউশনে বিনিয়োগ করতে জোরালো প্রণোদনা দেয়। এদিক থেকে তারা একটি কার্যকর বৈশ্বিক কার্বন প্রাইসিং স্কিম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা পরিবর্তনে কিছুটা এগিয়েছে।

নিবর্তনমূলক করের প্রভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্য দেশের ভেতরে আন্তঃদেশগুলোর মধ্যে বণ্টনমূলক প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। তবে আয় পুনর্বণ্টনের কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধরনের প্রভাব প্রশমন করা যেতে পারে। সরকারের যেটা করা উচিত নয় তা হলো, চূড়ান্ত দাম বাজারের নিচে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানি সাশ্রয়ী রাখা, যেহেতু এটি আরো টেকসই সুযোগ উন্মোচনের প্রেষণা দুর্বল করবে। বিকল্প উৎস বা উপায়ে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখার একটা ভালো যুক্তি আছে। কিন্তু তার মানে এটি নয় যে ত্রুটি রেখেই দাম কমাতে হবে। 

ভূরাজনীতিও ক্লিন এনার্জির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছে। জীবাশ্ম জ্বালানির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রধানত বহিস্থ নির্ভরতা তৈরি করে না। কাজেই সবুজ রূপান্তরের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং জ্বালানি সরবরাহকে হাতিয়ার বানানো সৃষ্ট অরক্ষণীয়তা হ্রাসের শক্তিশালী ম্যাকানিজম খুঁজতে হবে। 

গ্রিন ট্রানজিশন একটি বহু দশকের প্রক্রিয়া, যে সময়ে বিশ্ব জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির (ক্লিন এনার্জি) দিকে যাত্রা করবে। স্বল্পমেয়াদে বিশেষ করে ইউরোপের অর্থনীতিগুলো চাহিদা মেটাতে কয়লাসহ ডার্টি এনার্জির ব্যবহার বাড়াতে পারে। কিন্তু সেটি বৈশ্বিক স্থায়িত্বশীলতা এনার্জি ট্রানজিশনের জন্য বিপর্যয়কর হবে না বলে অনুমান।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

মাইকেল স্পেন্স: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ; যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক হুভার ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

আরও