ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে আইসিবি কাজ করছে

বিগত সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেগুলো থেকে তেমন কোনো রিটার্ন আসেনি। এমনকি আইসিবির মতো একটি ভালো প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করা হয়েছে।

আবু আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান। অধ্যাপক আবু আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন। তিনি সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের (বর্তমানে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি) পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ পরিবেশ, আইসিবি নিয়ে তার পরিকল্পনা ও সাম্প্রতিক অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

আপনি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। বিনিয়োগ সম্প্রসারণে এখন পর্যন্ত কী কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

বিগত সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেগুলো থেকে তেমন কোনো রিটার্ন আসেনি। এমনকি আইসিবির মতো একটি ভালো প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এ প্রতিষ্ঠানকে কেউ ঠিক করতে পারবে না। কারণ ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পোর্টফোলিওতে এসেছে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জাঙ্ক স্টক, যার ৭৭ শতাংশই নেই অর্থাৎ ক্ষয় হয়ে গেছে। আবার এগুলো উচ্চ সুদে ঋণ করা অর্থ। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকও রয়েছে। যখন আইসিবির প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার মতো উদ্বৃত্ত ছিল। এর কিছু অর্থ ব্যাংকে রাখা হয়েছিল। তবে এ অর্থ এখন আইসিবি পাচ্ছে না। নিজের অর্থই ব্যাংক থেকে পাচ্ছে না, আবার বাজারকে সহায়তার জন্য উচ্চ সুদে টাকা আনছে আইসিবি। এ টাকার বিষয়ে কর্মকর্তাদের যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম তখন তারা বলেছে, সেই সময় তারা এটি করতে বাধ্য হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ বাইরের প্রভাবশালীরা চেয়েছিল। তারাই এগুলো এনে বিক্রি করেছে এবং তারাই এক সময় অর্থায়নের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমাদের শুধু সেগুলো নিতে হয়েছে। কিন্তু আইসিবির কোনো লাভ হয়নি। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি বেঁচে থাকার কথা নয়।

সম্প্রতি আইসিবিকে ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। তাতে আইসিবি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

আইসিবিকে বাঁচানোর জন্যই এ অর্থ দেয়া হয়েছে। আইসিবির দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখলাম প্রতিষ্ঠানটি ডুবে যাচ্ছে। কে নেতৃত্বে আছে সেটা বিষয় নয়, এটিকে ওপরে ওঠানোর কোনো সুযোগ দেখছি না। প্রতিষ্ঠানের সূচকগুলো খুবই নাজুক, এটি দ্রুত ঠিক করা কঠিন। প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা অর্থ উপদেষ্টাকে অবহিত করেছি এবং বলেছি পুঁজিবাজারে আইসিবির সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হলে এটিকে বাঁচাতে হবে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠান ১৯৭৬ সালে বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য সাধনকল্পে স্থাপন করা হয়েছে। যখন এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তখন মূলধন বাজার খুব ছোট ছিল। তবে প্রতিষ্ঠাতাদের দূরদর্শিতা ছিল। এর অন্যতম কাজ ছিল ক্যাপিটাল মার্কেট ও ইকুইটি মার্কেটকে সহায়তা করা, আইপিও আনা এবং আন্ডার রাইটিং, ব্রিজ ফাইন্যান্সিং ও মিউচুয়াল ফান্ডিং করাসহ বিভিন্ন কাজ করা। এখনো প্রতিষ্ঠানটি এসব কাজই করে। যদিও তার কাজের পরিসর অনেক সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন জায়গায় আইসিবির যে বিনিয়োগ রয়েছে তা কি প্রত্যাহার করবেন?

এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রত্যাহার করতে গেলে যাদের টাকা দেয়া হয়েছে তারা টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এ বিষয়ে কাজ করছি। আরেকটি হলো জেড ক্যাটাগরি ইচ্ছা করলেও প্রত্যাহার করা যায় না। তবে এখন সবাই প্রত্যাশা করছে মার্কেটটি যেন ভালো হয়, সেজন্য অপেক্ষা করছে। আবার কমার্শিয়াল অডিট বাধা দেবে। তার পরও আমরা কিছু শেয়ার বোর্ডে নিয়ে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর কমার্শিয়াল অডিটের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হোক। কারণ এসব নিয়ে বসে থাকলে আরো ক্ষতি হবে। এর মূলধন ব্যয় তো আছে। ৯ শতাংশ সুদে আইসিবি বন্ড ইস্যু করেছে। কিন্তু ৭ শতাংশ সুদে অন্যান্য উৎস থেকে বন্ড ক্রয় করেছে। বেশি রেটে ইস্যু করছে এবং কম রেটে ক্রয় করছে—এ ধরনের ব্যবধান কি কোনো বিনিয়োগ বা অর্থনীতিতে সমর্থনযোগ্য? যা-ই হোক এসব অতীতে হয়েছে। দেশে ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক যেভাবে লুণ্ঠিত হয়েছে, ঠিক একইভাবে আইসিবিও লুণ্ঠিত হয়েছে। যদিও লুণ্ঠনের ধরন ভিন্ন। যদি এখন আইসিবিকে বাঁচিয়ে না রাখা যায় তাহলে সেটি পুঁজিবাজারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা আইসিবিকে ৪ শতাংশে রেটে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। অর্থ উপদেষ্টা এখানে দ্রুততার সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এজন্য তিনি সাধুবাদ প্রাপ্য।

সরকার থেকে পাওয়া এ অর্থ কীভাবে ব্যয় করবেন?

অর্থ ব্যয়ের জন্য দুটি কর্মপরিকল্পনা দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ঋণ পরিশোধ। প্রাপ্য অর্থের একটা বড় অংশ হয়তো ঋণ পরিশোধেই যাবে। বিষয়টি বোর্ড ও কমিটির যারা রয়েছেন তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা সভরিন গ্যারান্টি নামে আলাদা একটি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্ট খুলেছি, যাতে এ অর্থের আলাদা হিসাব রাখা যায়। যেসব ঋণ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে কোন ঋণটি আগে শোধ করতে হবে তার একটি কর্মপরিকল্পনা করতে বলেছি। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আইসিবির ঋণের সুদ মাফ করে দেয় তাহলে একসঙ্গে টাকা শোধ করা সম্ভব হবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান আইসিবির সুদ মওকুফ করবে বলে মনে হয় না। এছাড়া ছোট অংকের যেসব পাওনা রয়েছে সেগুলোও দিয়ে দেয়া হবে। অর্থনীতি যদি গতিশীল না হয় তাহলে আইসিবিকে লভ্যাংশ দিয়েই বাঁচতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের যেসব উচ্চ লভ্যাংশের স্টক আছে তা বাছাই করতে হবে এবং সেদিকে যেতে হবে। এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া আছে। এ নিয়ে একটি কমিটি কাজ করছে এবং তারা নিয়মিত প্রতিবেদন দেবে। তবে আমি নিজেই কঠোরভাবে এটি তদারকি করব।

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে আইসিবির ভূমিকা আছে। আপনি পুঁজিবাজারের পরিচিত মুখ। পুঁজিবাজারের জন্য আইসিবির পক্ষ থেকে কি পদক্ষেপ আশা করতে পারি?

পুঁজিবাজারে ব্রিজ ফাইন্যান্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু যারা ব্রিজ ফাইন্যান্সিং করেছে তারা এখনো টাকা পাচ্ছে না। সেসব প্রকল্প এখনো ভালো হয়নি।

আপনি সবসময় বলেন, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসে না। ভালো কোম্পানি আনতে কী পদক্ষেপ নেবেন?

আইসিবির ক্যাপিটাল আছে এবং এর একটি তালিকা তৈরি করেছে। তালিকাটি অর্থ উপদেষ্টার কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং তাকে দিয়ে বলেছি, আইসিবির মাধ্যমে সরকারের এ শেয়ারগুলো অফলোড করা উচিত। তাহলে সরকারও টাকা পাবে। আর শেয়ার অফলোড করলে বেসরকারি খাত থেকে যখন ব্যবস্থাপনায় কিছু মানুষ যাবে, তখন অ্যাসেটগুলো সক্রিয় হবে। এগুলো তখন দেশের জিডিপিতে অবদান রাখবে। অর্থাৎ পাবলিক কোম্পানিগুলোও ভালো হবে বা আয় উৎপাদনশীল কোম্পানি হবে। তাতে সরকার রাজস্ব পাবে। এসব শেয়ার বিক্রি করলে নগদ টাকাও পাওয়া যাবে। আর বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই বিষয়। তবে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন (আইবিবিএ) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জসহ (ডিএসই) অনেকেই বলছে বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে কিছু প্রণোদনা প্রয়োজন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অন্য দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। যেমন ইউনিলিভার, নেসলে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, মেটলাইফের মতো কোম্পানি। কিন্তু আমাদের দেশে তারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এজন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বসে প্রণোদনার বিষয়ে একটি সুরাহা করা দরকার।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে কোনো আস্থার সংকট আছে?

কোনো আস্থার সংকট নেই। তারা কেন অফলোড করবে? শতভাগ মালিকানা থাকলে সুবিধা হচ্ছে তারা আয় করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারছে। কথা হচ্ছে, এ দেশের জনগণের স্বার্থের কথা তো নীতিনির্ধারকরা চিন্তা করেন না।

এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর করণীয় কী ছিল?

নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব ছিল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করা। বিগত সময়ে সেটি করেনি। কিন্তু এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। তারা এরই মধ্যে একটি তালিকা তৈরি করছে। যদিও আমরা একটি তালিকা দিয়ে এসেছি। ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের পুঁজিবাজারে ওই কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত আছে কিন্তু আমাদের দেশে নেই। আগে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ কোনো সংস্থাই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এসব বিষয় দেখেনি। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। আর বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো ব্যাংকটির মুনাফা ১ হাজার কোটি টাকার নিচে। ৩ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা করা ব্যাংকটিকে পুঁজিবাজারে আনা যায়নি। কিন্তু দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ভালো কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেও (এনবিআর) রাখা যায়। একসময় অনেক প্রণোদনা দেয়ার সুযোগ ছিল। সেগুলো উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে অনেক সুযোগ দেয়া হয়েছিল এবং পুঁজিবাজারে অনেক তালিকাভুক্তিও এসেছিল। ২০০৯ সালে গ্রামীণফোন এবং ২০২০ সালে রবি আজিয়াটা লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এগুলো ছাড়া আর কোনো ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে আইসিবি কাজ করছে। পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে সরকারের দুটি সুবিধা হবে। এক. সরকার অর্থের ঘাটতি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে। দুই. এসব কোম্পানি অধিক দক্ষ এবং উৎপাদনশীল হবে। এটি করা গেলে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।

আপনি দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার পর্যবেক্ষণ করছেন। কবে নাগাদ পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন?

পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে একটু সময় দিতে হবে। পুঁজিবাজার বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তার চেয়ে ভালো অবস্থানে নিতে হলে দুটি কাজ করতে হবে। সুদের হার কমতে হবে। কিন্তু আমরা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে আছি। তারা সুদের হার বৃদ্ধির পক্ষে। বাংলাদেশ ব্যাংকও আইএমএফকে অনুরসণ করছে। আগে পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ। এখন ১০ শতাংশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর কত বাড়বে? কিন্তু সীমাহীন পলিসি রেট কখনই ভালো নয়। যদিও এ রেট ২০২৫ সালেও চালু রাখতে আইএমএফ টিম বলে গেছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। পলিসি রেট বেশি থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিনিয়োগ, ভোগ ও রাজস্ব আহরণ। একদিকে আইএমএফ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পলিসি রেট বেশি হওয়ায় বিনিয়োগ কম হচ্ছে। ফলে রাজস্ব আহরণও কম হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থ বিবেচনায় আইএমএফ ফ্রেমওয়ার্ককে পুরোপুরি অনুসরণ করা ঠিক হবে না। বরং ফ্রেমওয়ার্কের যেসব অংশ দেশের অর্থনীতির গতিশীলতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সেসব অংশ অনুসরণ না করাই উচিত।

সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক উন্নত হলে পুঁজিবাজারও ভালো হবে। অর্থাৎ জিডিপির প্রবৃদ্ধি, রফতানি, রিজার্ভ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লে এবং মূল্যস্ফীতি কমলে, সর্বোপরি সুদের হার কমলে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সময় লাগবে না। আর শেয়ারবাজারে ভালো শেয়ারও আসতে হবে। ভালো শেয়ার এলে অংশগ্রহণমূলক হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে শেয়ারবাজারে বাছাই করার অনেক সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ১০ বছর আগে অধিকাংশ ব্যাংকে মানুষ বিনিয়োগ করে মুনাফা পেয়েছে। কিন্তু এখন আর পাচ্ছে না। শুধু ব্যাংক খাতেই নয়, বীমা কোম্পানি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও একই অবস্থা। এ অবস্থা থেকে আমরা উত্তরণ ঘটাতে পারি যদি ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা যায়। এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া উচিত। তবে এক্ষেত্রে আইসিবি সহযোগিতা করবে।

দেশে ব্যক্তি খাত বা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

বেসরকারি বিনিয়োগ খুব কম। এ কারণে অর্থনীতি এখন মন্দার দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দুষ্টু, ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বাদ দিয়ে ভালো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের বসা উচিত। গত ১৫ বছরে ভালো ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারেননি। কারণ সরকারের সঙ্গে সংযোগ না রেখে এবং সরকারকে কোনো কিছু না দিয়ে কেউ ভালো ব্যবসা করতে পারেননি। তাই ভালো ভালো ব্যবসায়ীর সঙ্গে বসে কথাগুলো সরকারের শোনা উচিত।

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুজাতিক ঋণদাতার কাছ থেকে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এগুলো কী অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে মনে করেন?

এগুলো দেশের বাজেটে সহায়তা করবে। এগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই)। যেমন পোর্টপোলিও বা প্রকল্পে বিনিয়োগ। এগুলো সরকার টু সরকার বা প্রতিষ্ঠান থেকে আসবে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আর্থিক নীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আগে দেখবে আমাদের অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক আছে কিনা। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সে দেশের সুদের হার, বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। পৃথিবীর কোনো দেশের শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস দেয়া হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে প্রায় দুই বছর ধরে ফ্লোর প্রাইস দিয়ে রাখা হয়েছিল। এতে শেয়ারবাজারকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে যখন আইসিবির কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করি তখন তারা বলেন, এ দুই বছর তারা কোনো বেচাকেনা করতে পারেননি।

দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে বিনিয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

দেশের নির্বাচিত সরকার অবশ্যই দরকার। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হতে হবে। তবে অতি তাড়াহুড়ো করতে গেলে সমস্যাও আছে। কিছু সংস্কার না করে নির্বাচনের খাতিরে শুধু নির্বাচন দিয়ে একটি সরকার আনা হলে আগের মতোই অবস্থা হবে। এজন্য দেশের জনগণও ধৈর্য ধারণ করছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব না। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে সরবরাহ চেইনের উন্নতি করতে হবে। এত কঠোর মুদ্রানীতি অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। সরকারকে বিনিয়োগের দিকেও নজর দিতে হবে। সেজন্য সরকারসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা। আর সরকারের পরিচালন ব্যয়েও কৃচ্ছ্র সাধন করা উচিত। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের দরকার আছে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কিছু প্রকল্পের কাজ অর্ধেক হয়েছে, আবার কিছু প্রকল্পের কাজ বেশি হয়েছে। উন্নয়নমূলক প্রকল্প অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখে। তাই সেগুলো শেষ করতেই হবে। যেহেতু অর্থনীতিতে লুণ্ঠনের আপাতত বন্ধ হয়েছে, তাই দেশের রিজার্ভ বাড়তে থাকবে। এ মুহূর্তে আমাদের রফতানি বেড়েছে। যদি রফতানি ১০ শতাংশ হারেও বাড়ে তাহলে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি থাকবে না।

রফতানিমুখী খাতের আইসিবির বিনিয়োগের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?

এ রকম কোনো পরিকল্পনা নেই। আইসিবির উদ্বৃত্ত থাকলেই তো রফতানিমুখী খাতে বিনিয়োগ সুযোগ ছিল। কিন্তু রক্তক্ষরণ হয়ে আইসিবির এখন প্রায় মৃত অবস্থা।

আরও