জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ১৮ মাসের মাথায় এসে একটি সুষ্ঠু ও সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্য প্রথমেই অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। নির্বাচন হবে কি হবে না—এ প্রশ্নের যারা অবতারণা করেছিলেন তারা নিশ্চয়ই তাদের উত্তর পেয়ে গেছেন। তবে এ নির্বাচন আয়োজনের কৃতিত্ব এককভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের নয়, নির্বাচন কমিশনের নয় বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও নয়। বরং সরকার, সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর, ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ৩ হাজার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আট লাখের বেশি দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসামরিক কর্মকর্তা আর নির্বাচনে অংশ নেয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ সেসব ভোটার যারা তাদের মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে আমি সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে চাই সেসব সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীকে যারা হেরে গিয়েও ফলাফল মেনে নিয়ে, বিজয়ী প্রার্থীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশের জন্য এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। নাগরিকদের মনে সংশয় ছিল নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার। কিন্তু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠন পরবর্তী পরিবেশ এখন পর্যন্ত তুলনামূলক্ত শান্ত রয়েছে।
প্রায় ২০ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি। এ সুদীর্ঘ বছর পর এসে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহু চাপ সহ্য করে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে বিএনপিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ সরকারের সামনে রয়েছে বেশকিছু আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ। যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সমঝোতা ইত্যাদি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বেশকিছু ইস্যু রয়েছে যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠিত করা, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করা, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ব্যাপারে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে আসা। কারণ এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামী লীগ দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল এবং এর প্রচুর জনসমর্থন রয়েছে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ইস্যুগুলো অগ্রাধিকারের পর্যায়ে পড়ে। রফতানিমুখী বৃহৎ শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের জন্য সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জও সরকারকে নিতে হবে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সরে এসে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে মনোনিবেশ করতে হবে। শিল্পকে ছড়িয়ে দিতে হবে গ্রাম পর্যন্ত।
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের উঠে আসা অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনে এককভাবে ১৮টি আসন, ১৯৯৬-এর নির্বাচনে এককভাবে তিনটি, ২০০১-এর নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ১৭টি এবং ২০০৮-এ এককভাবে দুটি আসন প্রাপ্তির পর ২০২৬-এ এসে জোটবদ্ধ হয়ে ৭৭টি আসন নিঃসন্দেহে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তার বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া এবং ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। তবে যা-ই হোক, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দলের বিকল্প নেই। জনগণ আশা করে, ১৭ বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে যে ফ্যাসিবাদ ও স্বেচ্ছাচারী সরকারের জন্ম হয়েছিল এবার সেই সমস্যার সমাধান হবে। জনগণ চায়, শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সরকারের উদাসীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, দুঃশাসন, অব্যবস্থাপনা যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ক্ষমতাসীন দলের মতো বিরোধী দলেরও ভূমিকা থাকবে দেশের উন্নয়নমূলক উদ্যোগে নিজেরা শরিক হওয়া এবং নেতিবাচক দিকগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরে তার সংশোধন নিশ্চিত করা।
জামায়াতের উচিত হবে, বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করে জনগণের আস্থা অর্জন করা, যাতে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে এলেও জামায়াত নিজের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে বিএনপি জোট সরকারের কাজ হবে, দেশের উন্নয়নে কাজ করা, জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে শক্তিশালী অবস্থানে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা যে বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না সেটি মাথায় রেখেই দেশ পরিচালনা করতে হবে।
সাজ্জাদ হোসেন রিজু: ব্যাংক কর্মকর্তা