অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তার সান্নিধ্য পেয়েছি। তার সম্পাদিত সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছি। আমার বেশ কয়েকটি কবিতা তিনি প্রকাশ করেছিলেন। একজন শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্র হিসেবে যে সম্পর্কের শুরু, পরে সেটি পরবর্তী সময়ে সহকর্মীর রূপ নেয়। দীর্ঘদিন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে একসঙ্গে কাজ করেছি। তিনি এ বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপালনকালীন আমি এখানে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছি। অর্থাৎ শিক্ষক থেকে সহকর্মী—জীবনের এ দুই পর্বেই তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
শিক্ষক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি আমাদের শুধু পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন না। সমাজ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানুষের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শিখিয়েছেন। সামাজিক অবক্ষয়, সংস্কৃতির সংকট কিংবা রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন এবং অন্যদেরও ভাবতে উদ্বুদ্ধ করতেন। ছাত্রজীবনে তিনি প্রায় বলতেন, কোনো বিষয়কে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নয়, নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে, যাচাই করতে হবে, নিজের মতো করে চিন্তা করতে হবে। তার এ শিক্ষা আজও আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।
আমার সব সময় মনে হয়েছে, তার চিন্তার জগতে অধ্যাপক আহমদ শরীফের গভীর প্রভাব ছিল। আহমদ শরীফকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। পরবর্তী সময়ে আহমদ শরীফ চেয়ারের দায়িত্ব পালনও করেছেন। তবে তিনি কখনো কারো অনুকরণ করেননি; বরং নিজস্ব চিন্তার একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তুলেছিলেন। সমাজপ্রবাহের বাইরে দাঁড়িয়ে বিষয়গুলোকে দেখার এবং প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়ন করার এক ধরনের দার্শনিক প্রবণতা তার মধ্যে ছিল।
তিনি প্রচলিত অর্থে সাহিত্যসমালোচক ছিলেন না। তার প্রবন্ধ ছিল মননশীল, চিন্তাপ্রসূত এবং সমাজমুখী। সমাজের পরিবর্তন, মানুষের মুক্তচিন্তা এবং নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরির প্রশ্নই ছিল তার লেখার মূল অনুষঙ্গ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে মানুষকে আগে চিন্তা করতে শিখতে হবে। তার লেখালেখি ও বক্তৃতায় সেই আহ্বানই বারবার ফিরে এসেছে।
ব্যক্তি হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার ও মুক্তমনা। আমরা অনেক সময় তার কোনো মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছি, যুক্তি দিয়েছি। তিনি কখনো তা ব্যক্তিগতভাবে নেননি। বরং শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা স্বাধীনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করছে—এ বিষয়টিকে তিনি উৎসাহ দিতেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর তার গভীর আস্থা ছিল। যুক্তিনির্ভর বিতর্ককে তিনি সব সময় স্বাগত জানাতেন।
আজ (৫ জুলাই, ২০২৬) তার চলে যাওয়া শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য নয়, মুক্তবুদ্ধির চর্চার জন্যও একটি বড় ক্ষতি। ব্যক্তিগতভাবে আমি হারালাম এমন একজন শিক্ষককে, যিনি আমাকে শুধু সাহিত্য নয়, সমাজকে প্রশ্ন করতে, ভিন্নভাবে ভাবতে এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে শিখিয়েছেন। শিক্ষক হিসেবে তার শিক্ষা, সহকর্মী হিসেবে তার আন্তরিকতা এবং মননশীল মানুষ হিসেবে তার প্রভাব আমার স্মৃতিতে সব সময় অম্লান হয়ে থাকবে।
বায়তুল্লাহ্ কাদেরী: কবি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক