পরিবেশদূষণ ও ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরানো বিএনপি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে পরিবেশের সুরক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে

প্রকৃতি-পরিবেশ যেকোনো প্রাণীর জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। প্রকৃতিকে আশ্রয় করেই সভ্যতার সূচনা হয়েছে এবং বিকাশ লাভ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সময়ের পরিক্রমায় সভ্যতার বিকাশের কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।

পরিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনেরও প্রভাব রয়েছে। তবে বিগত কয়েক দশকে মানবসৃষ্ট কারণে সবচেয়ে বেশি পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। বায়ু, পানি, মাটি, শব্দদূষণসহ আরো অন্য দূষণে দূষিত হয়ে গেছে পরিবেশ, যার প্রভাব পড়ছে প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর। পরিবেশদূষণের কারণে বিশ্বের বহু শহর এরই মধ্যে বাসযোগ্যতাও হারিয়েছে। দুঃখজনকভাবে বাসযোগ্যতা বিচারে ঢাকার নাম একদম নিচের সারিতে রয়েছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৫ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত, বায়ুদূষণের সূচকে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরগুলোর তালিকায় রয়েছে এ শহরের নাম। এ তালিকার শীর্ষ দেশের অন্য বড় শহরগুলোর নাম না থাকলেও তাদের পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবেই দেশের পরিবেশ এক ধরনের সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল ল অ্যান্ড পলিসি, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল আর্থ সায়েন্স ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (সিআইইএসআইএন) এবং ম্যাকল মেক বেইল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ২০২৪ সালের এক গবেষণা তথ্যে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের ১৮০টি দেশের পরিবেশের অবস্থা বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭২তম। এ গবেষণায় বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল বায়ুমান, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ স্যানিটেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণের মতো বিষয়।

দেশের প্রকৃতি-পরিবেশ দূষণের এ ধারা বজায় থাকলে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প কার্যকর ও টেকসই হবে না। কেননা এর সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত, যার মধ্যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা অন্যতম। নতুন সরকার যদি নিজেদের কাজকে দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ করতে চায়, তবে অবশ্যই পরিবেশ সুরক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে।

বর্তমানে দেশে পরিবেশদূষণের যে চিত্র দাঁড়িয়েছে তা মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়ন এবং পরিবেশ ধ্বংস করে অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রতিফলন। ঢাকার দিকে লক্ষ করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বায়ুদূষণ থেকে শুরু করে অদক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাধার ও সবুজ পরিসর কমে আসা, শব্দদূষণ সব মিলিয়ে শহরটি ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। বছরের অধিকাংশ সময়ই বায়ুমান ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে থাকে। নির্মাণকাজের ধুলা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারকারী যানবাহন এবং জলাশয় ধ্বংস—সব মিলিয়ে দূষিত পরিবেশ ঢাকার বড় বাস্তবতা। আর কমবেশি এসব কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। ২০২৪-এর এপ্রিলে দেশের ইতিহাসে ৭৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহে ধুঁকেছিল মানুষ। এক মাসের তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, এমনকি শতাধিক মানুষের মৃত্যুও ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, শ্রম ও শিল্প উৎপাদন। গরমে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য—এ দুইয়ের ক্ষতির ফলে গত বছর বাংলাদেশের মানুষের ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ২১ হাজার কোটি টাকার মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৪ ভাগ বলে উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তন আরো বড় ধরনের ঝুঁকি বয়ে আনবে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার জন্য বিশেষভাবে দায়ী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া বড় বড় অবকাঠামোনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প। প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এর বাইপ্রডাক্ট হিসেবে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেননা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ঝুঁকির মূল্যায়ন করা হয়নি, বিবেচনায়ও নেয়া হয়নি। নদী ভরাট, বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস এবং জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ রোধ করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বড় প্রত্যাশা ছিল তারা দায়িত্ব নেয়ার পর প্রকৃতি পরিবেশ উন্নয়নে দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন আসবে। যদিও তা আসেনি। তৎকালীন পরিবেশ উপদেষ্টা নদী দখল-দূষণে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা প্রশংসাযোগ্য। তবে সেসব উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বয়ে আনেনি।

এ বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো বেশ স্পষ্ট—ঢাকাসহ পুরো দেশের পরিবেশগত অবক্ষয় রোধ।

ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথম ধাপে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, পুরনো যানবাহন পর্যায়ক্রমে অপসারণ, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করা এবং শিল্পদূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত করা ও যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য পৃথক লেন নির্ধারণ নগর চলাচল ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনতে পারে। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহন ও গণপরিসরকেন্দ্রিক নগর নীতি গ্রহণ জরুরি। পার্ক, মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান পুনরুদ্ধার না করলে নগরবাসীর মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যও বিপর্যস্ত হবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে মাঠ পুনরুদ্ধার ও খাল খননের প্রতিশ্রুতি ছিল—এখন সেটি বাস্তবায়নের সময়। এর বাইরে জরুরি হলো বিকেন্দ্রীকরণ নীতি প্রণয়ন। সব সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলে জনসংখ্যার চাপ বাড়বে বৈ কমবে না, ফলে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সব উদ্যোগ বৃথা হয়ে যেতে পারে। তাই ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়া যথার্থ হতে পারে।

পরিবেশ সুরক্ষায় দেশের জলাধার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নদী ও জলাশয় দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ। সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে। ঢাকাসহ পুরো দেশের বেশির ভাগ নদী-নালা-খাল মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে বর্তমানে। অন্তত ৮১টি নদী পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে বা চরম সংকটাপন্ন হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে। মূলত দখল-দূষণের কবলে পড়ে এসব জলাধার জৌলুস হারিয়েছে, পরিণত হয়েছে বর্জ্যের ভাগাড়ে। এছাড়া নদীতে অতিরিক্ত সেডিমেন্ট (পলি, কাদা, নুড়িপাথর, বালু) জমে যাওয়া এবং অববাহিকার সঙ্গে সংযোগ হারানোর কারণেও প্রাকৃতিকভাবে নদীপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আর জলাভূমির পরিমাণ যত কমেছে, এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব জলাধার পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করতে হবে।

আরও