জোগানের সঙ্গে দামের সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক নাকি সমানুপাতিক সে নিয়ে বিস্তর বাহাস থাকতেই পারে এবং বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা তাদের তত্ত্ব ও তথ্যের সম্মিলনে মতামত দিতে পারেন। সরবরাহ আইন (ল অব দ্য সাপ্লাই) বলছে, সবকিছু সমান থাকলে জোগানের পরিমাণ তার দামের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং এ পরিবর্তন সমানুপাতিক অথবা ইতিবাচক।
সে যা-ই হোক, দেশের তাবৎ বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন স্টিয়ারিং হাতে এবং সেখানে বাজারে প্রায়ই উধাও হয়ে যাওয়া পণ্য দাম বাড়ালেই ফিরে আসে যখন, তখন ধরেই নেয়া যায় দাম বাড়ালে জোগান বাড়ে। অর্থনীতির জোগান আইনও তাই বলে।
যদি তত্ত্বটি এমনই হয়ে থাকে তো কীইবা করা, বিধি বাম মেনে নেয়াই ভালো। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে সাধারণ্যে (দ্য কমন্স)। এই যেমন করিম সাহেব অর্থনীতির ছাত্র কিংবা অর্থনীতির গবেষক কোনোটাই নন। তবে তিনি অর্থনীতির লোকজনকে খুব পছন্দ করেন, সেটা তার কথাবার্তা, আলোচনা থেকে বোঝা যায়। তিনি স্বপ্ন দেখেন অর্থনীতিবোদ্ধারা একটি নতুন সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র উপহার দেবেন যেখানে থাকবে সবার জন্য সুখ আর সুখ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার মাঝে নানা সময়ে অসন্তোষ দেখা গেলেও মনে করেন পরের মাসেই দাম কমে যাবে। এজন্য তিনি প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে যে বেতন পান তাতে সংসারের ব্যয় অর্ধেক মাস মিটিয়ে বাকি অর্ধেক মাস ক্রেডিট কার্ডের ঘোরটোপে কাটলেও আশায় বুক বাঁধেন। এ মাসে যখন তিনি পত্রিকায় দেখলেন বাজার থেকে হঠাৎ করে বোতলজাত সয়াবিন তেল উধাও, তিনি ভেবেছিলেন শত্রুরা হয়তো এ দেশে সয়াবিন তেল রফতানিতে বাগড়া দিয়েছে, ফলে তেলের আকাল পড়েছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো পরের দিন তিনি যখন দোকানে গেলেন, দেখতে পেলেন দোকানির দোকান ভর্তি নানা নামে বোতলজাত সয়াবিন তেল। তিনি বিরক্ত হলেন সংবাদপত্রের ওপর, ডাহা মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের জন্য। তার পরও কৌতূহলবশত জানতে চাইলেন সত্যিই হঠাৎ করে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজার থেকে উধাও হয়েছিল কিনা। দোকানি সহাস্যে জানালেন বিষয়টি সত্য এবং বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে হঠাৎ উধাও হয়েছিল তার বিপরীতে হঠাৎ করেই তেলের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। বরং এখন দোকানে জায়গা দেয়া দায় হয়ে পড়েছে। এও জানালেন কিছু তেল গুদামজাত থাকার কারণে তারও স্বল্প সময়ে বেশ মুনাফা হয়েছে। করিম সাহেব শিখলেন দ্রব্যের দাম বাড়লে বাজারে তার জোগান বাড়ে।
আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হুটহাট বেড়ে যাওয়ার রীতি নতুন নয়। আবার পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে আমাদের মাঝে মজুদদারিও যে বেড়ে যায় সেটাও সঠিক। আবার মজুদদারির ফলে বাজারে সেই পণ্যের যে ঘাটতি দেখা দেয় তা অস্বীকার করার সুযোগও নেই। বাজারদর বেড়ে গেলে নিরুপায় সাধারণ জনতা স্বাভাবিকভাবেই উষ্মা প্রকাশ করে। তখন বাজারের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে জনতা কী কী সাশ্রয়ী ভূমিকা পালন করতে পারে সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকরা পরামর্শ দেন, যা নিয়ে সমাজে অনেক হাস্যরস ও ক্ষোভেরও নজির রয়েছে। যেমন বাজারে ডিমের দাম বেড়ে গেলে পরামর্শ দেয়া হলো, যখন ডিমের দাম কম থাকবে তখন তা কিনে সিদ্ধ করে রেফ্রিজারেটরে মজুদ রেখে দেবেন ও পরে খাবেন। কিংবা বাজারে চালের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ জনতাকে আশ্বস্ত করা হলো রোদ উঠলে চালের দাম কমে যাবে। নিরুপায় সাধারণ নাগরিক এসব কথা শুনে হাসে কিংবা কাঁদে অথবা ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়। যদিও এসবে রাষ্ট্র পরিচালনার স্টিয়ারিং হাতে যারা বসে থাকেন তাদের কখনো কিছু এসেছে-গেছে কিনা জানা নেই।
শুরুতেই বলেছিলাম অর্থনীতির তত্ত্ব নিয়ে জ্ঞান নেই বললেই চলে। তবে প্রতিদিন বাজারে চলমান ‘দাম বাড়ালেই পণ্যের জোগান বাড়ে’ এমন অবস্থায় সাধারণের আহাজারি শুনে এর পেছনে অর্থনীতির কী তত্ত্ব আছে তা জানার আগ্রহ জাগা স্বাভাবিক। জোগান ও মূল্য সম্পর্কিত তত্ত্ব ‘ল অব সাপ্লাই’ বলছে একটি পণ্য বা পরিষেবার দাম যেমন বৃদ্ধি পায়, সরবরাহের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। ব্যাখ্যাটা এমন দাঁড়াতে পারে যে জোগান হলো কোনো পণ্যের পরিমাণ, যা একটি খামার নির্দিষ্ট মূল্যে বাজারে বিক্রি করে কিংবা জোগানের প্রস্তাব দেয় এবং জোগানের তত্ত্বমতে, দাম বাড়ার সঙ্গে খামার থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। আরেকদিকে এটাও ঠিক যে আমরা সবসময় লাভের সীমাটা বাড়ানোর উপায় খুঁজি এবং যখনই কোনো কিছুর জন্য বেশি মূল্য পাই তখন আমরা সেই সুযোগ লুফে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জোগানদাতারা যখন তাদের পণ্যের জন্য চাওয়ার সঙ্গে আরো মূল্য পান, তারা ঠিক এ রকম আচরণ করেন। এটিই জোগানের আইন এবং স্বাভাবিকও বটে। তবে লাভের পরিমাণ ভয়াবহ আকারে বাড়ানোর প্রবণতা আমাদের সমাজে স্বাভাবিক বিষয়। আমরা দেখেছি, পচনশীল পেঁয়াজ মজুদ করে রেখে বাজারে কৃত্রিমভাবে দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে অধিক মুনাফা লাভের আশায়। একপর্যায়ে পচা পেঁয়াজ গোপনে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দিতেও দেখেছি। ডিমকাণ্ড, পেঁয়াজকাণ্ড, তরমুজকাণ্ড, আবার আসন্ন রোজায় দেখা যাবে বেগুন ও খেজুরকাণ্ড। তেলকাণ্ড নিয়ে তো আলোচনা চলছেই। এমন হঠাৎ করে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে গেলেই দোষ দেয়া হয় সিন্ডিকেটের। কিন্তু রাষ্ট্রের শাসক, নীতিনির্ধারকদের মুখে মুখে ঘুরে ফেরা এই সিন্ডিকেট জনতার চর্ম চোখে কখনো দৃশ্যমান হলো না। অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সেই ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতার কয়েক ছত্রের মতো—‘ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্ব্বোধ অতি ঘোর। যা কিছু হারায়, গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর!’ সিন্ডিকেটও যেন সেই কেষ্টা বেটা অতীত, বর্তমান সব সময়ই অদম্য দোষী হয়ে আছে। অতীতে সিন্ডিকেটের গল্প শুনেছি বাজারে পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ার জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে, এত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যে বর্তমান এল সেখানেও দেখি কেষ্টা বেটার মতো সিন্ডিকেটের গল্প শোনানো হচ্ছে। আজ এর দাম ঝড়ের গতিতে বাড়ে তো কাল আরেকটির দাম টর্নেডোর গতিতে বাড়ে। সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে মুনাফাখোরদের স্বার্থ দেখা হচ্ছে।
এই যে বাজার থেকে নিমিষে পণ্য উধাও করে জনতাকে জিম্মি করা হলো এবং রাষ্ট্রের চালক, নীতিনির্ধারকরা জিম্মিদশা থেকে রক্ষার নামে রাতারাতি দাম বাড়িয়ে জাদুর বলে হারিয়ে যাওয়া পণ্য বাজারে হাজির করলেন, এর জন্য পুরো জাতির উচিত মহান কর্মসম্পাদনকারীদের টুপি খোলা সন্মান জানানো। এ কাজটুকু না করলে তেলপ্রিয় জাতি তেলের অভাবে কারবালার কষ্ট পেত। আলোচনার শুরুতে উল্লেখ করা করিম সাহেব হয়তো এতক্ষণে জিজ্ঞেস করে বসতে পারেন এ বাড়তি দাম কে দেবে? তিনি হয়তো ভেবেছিলেন ড্রাইভিং সিটের লোক দেবেন। কিন্তু না, কে আর দেবে? দেবে সাধারণ জনগণ। কারণ যে সিন্ডিকেটের কথা বারবার বলা হচ্ছে সে তো অনেকটা অনেকের মগজে-মননে মিশে আছে। তাকে চোখেও দেখা যাবে না, শাস্তিও দেয়া যাবে না। বরং দৃশ্যমান ভোক্তাকে শাস্তি দেয়া উচিত, কারণ এরা জানে না ‘অনাহারে নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ’। সূত্র মেনে তেল খাওয়া কিংবা বাড়তি দামের সবকিছু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এ রকম সবক অতীতে দেয়া হয়েছে এবং বর্তমানেও চালু আছে, থাকবে। অতএব সিন্ডিকেট থাকবে, দাম বাড়বে এবং সিন্ডিকেটওয়ালাদের আবদার রক্ষার জন্য দাম বাড়িয়ে হলেও অর্থনীতির ল অব সাপ্লাইকে নিজেদের মতো করে স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ করতে হবে। করিম সাহেব হয়তো আবারো প্রশ্ন করতে পারেন, তত্ত্বে তো পরিষেবার মান বৃদ্ধির সঙ্গে দাম বৃদ্ধির সম্পর্কের কথাও বলা আছে, এখানে পরিষেবা বাড়ানোর কোনো আভাস নেই। হ্যাঁ, তবে আমরা না হয় গতানুগতিক তত্ত্বকে এড়িয়ে বরং মুনাফাখোরদের সুবিধার্থে তাদের আবদার রক্ষা করে পণ্য হাওয়া করার জাদু দেখিয়ে দাম বাড়ানো ব্যবস্থার তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে দিই। অর্থনীতির তত্ত্বের পাতায় আমরা, আমাদের ব্যবসায়ীরা হয়তো এর মাধ্যমে নতুন ধারা প্রবর্তনের জন্য সাধুবাদ কিংবা স্বীকৃতি পাবে। করিম সাহেব নিশ্চয়ই এত ঝামেলার বিষয় থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতির সূত্র মনে করেই মেনে নেবেন যে দাম বাড়লে জোগান বাড়ে এবং নিমগ্ন হবেন বাড়তি দামের তেল দিয়ে নিজস্ব উন্নয়নে কিছু করা যায় কিনা সে চেষ্টায়, আমজনতা গোল্লায় যাক।
ড. এএসএম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়