চীনে যুব বেকারত্বের হার দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চীন সরকারের মে মাসের তথ্যানুযায়ী, ১৬-২৪ বছরের চীনা তরুণদের ২০ দশমিক ৮ শতাংশই এখন বেকার। দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের জন্য উচ্চবেতনের দক্ষতাভিত্তিক চাকরির বাজার দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। বিবেচ্য যে, ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশটির প্রযুক্তি খাতে হাজার হাজার পদ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। কভিড মহামারী, কঠোর প্রতিযোগিতা আইন, পুঁজিবাজারে বিধিনিষেধ আরোপ এবং প্রযুক্তি খাতে দমন নীতি চাকরির বাজার সংকোচনের মূল কারণ। সরকারের দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতিমালার কারণে উদ্ভূত অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেখে আর্থিক খাতেও ছাঁটাইয়ের প্রবণতা বাড়ছে।
জুনে চীনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সদ্য গ্র্যাজুয়েট বেকারদের দুর্দশা চিত্রায়িত ছবি ও বার্তায় ছয়লাব হয়ে গিয়েছিল। নিম্ন বেতনের চাকরির বাজারে কিছুটা প্রবৃদ্ধি বজায় থাকায় সেটাই এখন তরুণদের আশা-ভরসার জায়গা। উচ্চশিক্ষার জন্য বিপুল ত্যাগ স্বীকারের পর চীনা শিক্ষার্থীরা ও তাদের অভিভাবকরা নতুন এ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় খাবি খাচ্ছেন।
বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চীনের। দেশটির কলেজগুলোয় ভর্তি হতে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক গাওকাও ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের কারণে চাকরির বাজারে ঢোকার আগ পর্যন্ত চীনা শিক্ষার্থীদের সময় ব্যয় হয় মূলত নিবিড় পড়াশোনায়। গণিত, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মতো পাঠ্যক্রমের মুখ্য বিষয়গুলো আয়ত্ত করার চাপ এতটাই বেশি যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোও শারীরিক শিক্ষা ও সংগীতের মতো চাকরির বাজারে চাহিদাহীন বিষয়গুলোয় জোরারোপ কমিয়ে দিয়েছে।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের পেছনে তাদের পরিবারের ত্যাগ স্বীকারের পরিমাণ বিশ্বের অন্যান্য দেশে কল্পনাতীত। ১০ বছর বয়সী শিশুদেরও দিনে অন্তত ৪ ঘণ্টা বাসায় হোমওয়ার্ক করতে হয়। তাদের উৎসাহ দিতে অভিভাবকদেরও প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। অতীতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এত ত্যাগ স্বীকারের পর চীনের তরুণরা ও অভিভাবকরা আজকে আচমকা পড়ন্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
চাকরির বাজারে তরুণদের চেয়ে তরুণীদের দুর্দশা আরো বেশি। বিষয় ও বয়সভিত্তিক পরীক্ষায় ছেলেদের চেয়ে ভালো ফলাফল অর্জন করা সত্ত্বেও চীনা মেয়েদের বেসামরিক বিমান খাতের মতো পুরুষপ্রধান চাকরি ক্ষেত্রে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়, যদিও অতীতের নারীবিরোধী কোটা ব্যবস্থা এখন আর বহাল নেই। এসব কারণে চীনের সন্তান-কাঙ্ক্ষী দম্পতিদের মাঝে মেয়েসন্তানের চেয়ে ছেলেসন্তান জন্মদানের প্রবণতা বেশি। তাই দেশটিতে ১৫-১৯ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মাঝে প্রতি ১০০ মেয়ের বিপরীতে ছেলের সংখ্যা ১১৬। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০০ মেয়ের বিপরীতে ছেলের সংখ্যা ৯৮।
বিশেষত, গত দশকের মাঝামাঝি চীন সরকার জন্মহার বৃদ্ধিতে জোরারোপ করার পর নারীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা আরো হ্রাস পেয়েছে। দেশটির জন্মহার এরই মধ্যে সর্বকালের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। নিম্ন জন্মহার উদ্ভূত অর্থনৈতিক দুর্দশা প্রতিরোধে চীন সরকার তাই এক সন্তান নীতি পরিত্যাগ করেছে। এ অবস্থায় দেশটির অনেক প্রাদেশিক সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি জাতীয় ন্যূনতমের ওপরে বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এর ফলে নারীদের নিয়োগে নিয়োগকর্তাদের মাঝে আরো অনীহা তৈরি হয়েছে। কারণ নিয়োগকর্তাদের শঙ্কা হলো সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের জন্য ভবিষ্যতে নারীকর্মীদের ছুটির পরিমাণ বাড়বে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সন্তান থাকা অবস্থায় একজন পুরুষ অফিসে প্রয়োজনমতো সময় দিতে পারলেও মেয়েদের পক্ষে তা সম্ভব নয়।
এসব প্রচলিত ধ্যান-ধারণার কারণে নারীদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক চাকরির বাজার দ্রুত সংকোচনশীল। চাকরিপ্রার্থীর চেয়ে পদের সংখ্যা বেশি হলে নিয়োগকর্তারা মেয়েদের নিয়োগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু একটি পদের বিপরীতে ১১-৪০ জন প্রার্থীর কারণে চীনের চাকরির বাজার ক্রেতাশাসিত বাজারে পরিণত হয়েছে। এর ফলে তরুণীরা সমান যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণদের তুলনায় কম বেতনের চাকরি নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে অনেক তরুণী চাকরি করতে নিরুৎসাহিত হবে।
চীনের অর্থনীতি যে ভুল পথে চলেছে তার একটা লক্ষণ হলো তরুণীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। ক্রমবর্ধমান মাথাপিছু আয়, উচ্চশিক্ষার উচ্চ হার, পরিবারের আকার সংকোচন ও শ্রমবাজারে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ইত্যাদি উন্নত অর্থনীতির লক্ষণ কয়েক দশক ধরে চীনের অর্থনীতিতেও বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এখন দেশটির মাথাপিছু আয় ও উচ্চশিক্ষার হার কমতির দিকে (যেহেতু জনগণ দেখতে পাচ্ছে উচ্চশিক্ষা সব সময় উচ্চ বেতনের চাকরি নিশ্চিত করে না)। তাছাড়া পরিবারের গড় আকার বড় হচ্ছে এবং নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণও কমছে।
চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের নিচে নামবে এটা অনিবার্য ছিল। কিন্তু দেশটির অর্থনীতির বর্তমান গতিবিধি উদ্বেগজনক, যেহেতু সরকারের নীতিমালা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের ওপর ও তাদের পিতা-মাতার ওপর চাপ কমাতে সরকার ২০২১ সালে অনলাইন টিউটরিং আচানক নিষিদ্ধ করে এ যুক্তিতে যে তা ছাত্রছাত্রীদের মাঝে প্রতিযোগিতায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে। কিন্তু সরকারের এমন সব হঠকারী নীতিমালা প্রযুক্তি কিংবা আর্থিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়তা করছে না।
বরং পাছে তাদের সন্তান পিছিয়ে পড়ে এ ভয়ে পরিবারগুলোকে এখন গৃহশিক্ষকদের জন্য আরো বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। আর উচ্চবেতনের চাকরির সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাসের ফলে চাকরির বাজার আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়বে। অভিভাবকদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি পিছিয়ে পড়বে। এক সন্তান নীতির কারণে এত দিন মা-বাবারা তাদের সব উপার্জন একমাত্র সন্তানের জন্য ব্যয় করতেন। কিন্তু এখন যেহেতু চীনা পিতা-মাতারা দুই বা ততোধিক সন্তান নিতে পারেন, অনেকে তাদের সীমিত সম্পদ কন্যাদের চেয়ে পুত্রদের জন্য বরাদ্দ করবেন।
এটা নিশ্চিত যে যুব বেকারত্ব মোকাবেলার একটি উপায় হলো, তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের গ্রামমুখী করা এবং কম মজুরিতে শারীরিক শ্রমে উৎসাহিত করা। কিন্তু একটি মধ্যম আয়ের দেশের জন্য যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নগরায়ণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, গ্রামমুখিতা কিংবা গ্রামীণকরণ অর্থনীতির পশ্চাদগামিতার লক্ষণাত্মক। এটি মজুরি বৃদ্ধি করবে না কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষার জন্য অনুপ্রাণিত করবে না এবং নারীদের জন্য সমাজ আরো বেশি বৈষম্যময় হয়ে উঠবে।
কাজেই অর্থনৈতিক ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে চীনকে দক্ষতাভিত্তিক উচ্চবেতনের চাকরির বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। আর তাই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সংকোচন এড়াতে এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য তথা উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক পরিবেশ চীন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ন্যান্সি কিয়ান: মার্কিন অর্থনীতিবিদ, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ম্যানেজারিয়েল ইকোনমিকস অ্যান্ড ডিসিশন সায়েন্সের অধ্যাপক
ভাষান্তর: জামান মঞ্জু