আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি কেমন? আমরা কি আসলে প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছি? আমাদের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়, যা তাদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আরো বেশি নমনীয় হওয়া উচিত। শিক্ষাদান পদ্ধতি, পাঠ্যক্রম, গবেষণা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক।
এর জন্য সর্বপ্রথম ইউজিসি ও অন্যান্য উচ্চতর কর্তৃপক্ষের বাধা থেকে মুক্ত হতে হবে। ইউজিসি কারিকুলাম পর্যবেক্ষণ করবে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু কারিকুলাম উন্নয়ন ও বাস্তবায়নে স্বাধীনতা দেয়া দরকার। আমাদের দেশে একটি কোর্স অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে এটি কার্যকর হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। তাহলে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে? বৈশ্বিক পর্যায়ে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব কারিকুলাম বাস্তবায়নের সুযোগ আছে, যখনই তারা চায়।
বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই আমরা এখনো এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি যা বৈশ্বিক মানের একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করে। তাছাড়া ক্যাম্পাসে যদি নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ না থাকে, তবে আমরা কীভাবে বলব যে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শীর্ষস্থানীয় র্যাংকিংয়ে পৌঁছবে? সাংস্কৃতিক দিক থেকেই এক্ষেত্রে আমাদের বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আবার বিদেশী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে অনেক সমস্যা বিদ্যমান।
আমরা বিদেশ থেকে শিক্ষক আনতে গেলে বিডার (বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) অনুমতি নিতে হয়। একজন ব্যক্তিকে শিক্ষাসংক্রান্ত কাজে আনতে গেলে বিডা থেকে কেন অনুমতি নিতে হবে? বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্যও কোনো পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। এমনকি আমাদের দেশে স্টুডেন্ট ভিসা নেই। বিদেশী শিক্ষার্থীদের এ দেশে ভ্রমণ ভিসা বা অন্যান্য ভিসায় আসতে হয়। এ ধরনের অনেক জটিলতা রয়েছে আমাদের দেশে। এগুলো আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা এবং উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। বাংলাদেশকে তাই আরো বেশি নমনীয় হতে হবে।
বিগত সরকারের আমলে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ব্যাহত হয়েছে। এ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি কোর্স বাধ্যতামূলক করেছে। এমনকি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রদেরও বাংলা কোর্স এবং বাংলাদেশের উদ্ভবসহ অন্য একটি কোর্স নিতে হয়। বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও একই বাংলা কোর্স রসায়ন বিভাগের ছাত্রদেরও পড়তে হয়। কেন এসব বাধ্যতামূলক করা হলো?
এটি শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম বাধা। অন্যদিকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মৌলিক কোর্সগুলোকে পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। আমরা একটি বৈশ্বিক মানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা বলছি, যেটি বৈশ্বিক মানের পাঠ্যক্রম প্রদান করবে। তাহলে কেন এমন বাধ্যতামূলক বিষয়গুলো আমাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে? এদিকে ব্র্যাক বলছে, স্নাতক কোর্সে ১৪০ ক্রেডিট ঘণ্টা থাকতে হবে। ইউজিসি বলছে ১২০ অথবা ১৩০ ক্রেডিট ঘণ্টা। দুটি প্রতিষ্ঠান দুটি ভিন্ন কথা বলছে। এগুলোর যথাযথ সমাধান প্রয়োজন যাতে এগুলোর সমন্বয় করা যায় এবং ভবিষ্যতে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য না থাকে।
কেন বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা করা হবে? যেমন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর বিভাজন নিয়ে আমার সহকর্মীরা কথা বলেন। আমাদের জানা উচিত, শিক্ষকরা পিএইচডি গবেষণা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সক্ষমতা রাখেন কিনা। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে শুধু তাদের ধরন অনুযায়ী বিভাজন করা উচিত নয়। পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর ক্ষেত্রে দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা বিভাগে পিএইচডি গবেষণা পরিচালনার মতো যথেষ্ট মানবসম্পদ রয়েছে কিনা।
ইউজিসিকেও গবেষণার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো বিভাজন না করে গবেষণার জন্য অনুদান দেয়া প্রয়োজন। কোনো সম্ভাবনাময় শিক্ষককে উন্নত মানের গবেষণা করতে দেখলে সরকারি-বেসরকারি বিবেচনা না করে ইউজিসিকে সেই প্রতিষ্ঠানে গবেষণার জন্য অনুদান দিতে হবে।
আমরা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নাল প্রকাশ করছি। আমাদের ৫০০ শিক্ষক বিশ্বমানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করেছেন। আমরা গবেষণার জন্য আরো সমর্থন চাই। ল্যাব স্থাপন করার জন্যও অনুদানের প্রয়োজন। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আলাদা করে দিয়ে বলা হচ্ছে, ‘আপনারা এ তহবিল পাবেন না, কারণ আপনারা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান’।
এ থেকে আমাদের দেশের মানুষ কী ধারণা পায়? তারা মনে করে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধুই ব্যবসার জন্য। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি কোনো অনুদান পায় না এবং তাদের আয়ের জন্য কোনো অর্থনৈতিক মডেলও নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন একটি মডেলে বৃদ্ধি পেতে হবে, যা তাদের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। উন্নয়ন ও বৃদ্ধির জন্য একটি লাভজনক মডেল থাকলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা বাড়াবে। বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে এগুলো অত্যন্ত জরুরি।
এবার র্যাংকিংয়ের কথায় আসি। আমি প্রতি বছর র্যাংকিং সংস্থাগুলোর কাছে যাই। এ বছর আমি দুবার গিয়েছিলাম। তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা কী? তারা সবসময় বলেছে, এর দায় আমাদের নেতিবাচক ভাবমূর্তির। এটি আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর। কারণ আমরা বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য একটি নিরাপদ ক্যাম্পাসও দিতে পারছি না।
যদি একটি ক্যাম্পাস নিরাপদ না হয়, তাহলে তারা কীভাবে বলবে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি মহান প্রতিষ্ঠান? যখন আবরারের মতো শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মারা যাচ্ছে, তখন এটি বোঝা যায় যে গ্রামের বা অন্যান্য জায়গা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। ক্যাম্পাসে তারা সবসময় রাজনীতি বা অন্যান্য কাজকর্মে জড়িত থাকে। আমরা কীভাবে নিশ্চিত করতে পারি আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হবে, যদি আমরা নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি নিশ্চিত করতে না পারি? একাডেমিক পরিবেশ ও প্রক্রিয়ানির্ভর বিষয়গুলো তৈরি করার ক্ষেত্রে আমরা বৈশ্বিক মানের থেকে অনেক দূরে আছি। আমরা এখনো সেখানে পৌঁছতে পারিনি।
আমাদের শিক্ষার্থীদের আরো ভালোভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো তাদের জন্য উন্নত মানের পাঠ্যক্রম তৈরি ও সঠিক একাডেমিক পাঠ্যক্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করতে পারিনি। আমাদের শিক্ষক উন্নয়নের প্রয়োজনীয় সমর্থন নেই। প্রবাসী বাংলাদেশী (এনআরবি) শিক্ষকদের আমাদের দেশে আনার কোনো প্রক্রিয়া নেই। অনেক এনআরবি আমাদের দেশে আসতে চায়, কিন্তু তাদের ফিরে আসার তেমন সুযোগ নেই। ইউজিসিকে একটি ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে যেখানে বিদেশ থেকে দেশে আসতে ইচ্ছুক শিক্ষকদের তথ্য থাকবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক এনআরবি শিক্ষকদের আমাদের দেশে আনার জন্য একটি প্রক্রিয়া তৈরি করাও জরুরি।
মালয়েশিয়া, চীন ও তুরস্ক এ মডেল অনুসরণ করে তাদের নিজেদের প্রবাসী নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। আমাদের প্রবাসী শিক্ষকদের বাংলাদেশী একাডেমিতে অন্তর্ভুক্ত করলে এটি একটি বিপ্লব হবে।
আমি ইউজিসির সম্মানিত চেয়ারম্যান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানাব একটি চুক্তি তৈরির, যেন একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত কড়াকড়ির মধ্যে না থাকে। তাদের নতুন কোর্স ও একাডেমিক ক্ষেত্রে নতুন বিষয় গ্রহণে নমনীয় হতে হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। যারা মানহীন কাজ করবে, তারা আমাদের দেশে টিকে থাকতে পারবে না।
তাহলে পাঠ্যক্রমের বিষয়ে ৭০ শতাংশ ইউজিসির অনুমোদিত হওয়া উচিত। ৩০ শতাংশ একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা উচিত, যাতে তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উপকারী কোর্সগুলো তৈরি করতে পারে। অন্যথায় আমরা ভালো গ্র্যাজুয়েট পাব না। শিক্ষার্থীদের সঠিক দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করতে পারব না। সেই দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা দেয়া উচিত, যা তত্ত্ব ও ব্যবহারিক অনুশীলন এবং শিল্পের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
আমাদের দেশে অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না পাঠ্যক্রম ও নির্দেশিকার কঠোর বিধিনিষেধের কারণে। এ বিধিনিষেধগুলো আরো নমনীয় হতে হবে, যেমনটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসরণ করে। যখন এসব কার্যক্রম বাংলাদেশে আসবে, তখন একদিন আমাদের শিক্ষার্থীরা বেড়ে উঠবে এবং আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অর্জন করতে সক্ষম হবে। তারা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে পারবে।
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী রয়েছে। এ শিক্ষার্থীদের সত্যিই আমাদের দেশে একাডেমিক প্লাটফর্মের প্রয়োজন, যা পরিকাঠামো এবং অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে তাদের সহায়তা করবে। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। যদি আমরা এসব কাজ না করি, তবে বৈশ্বিক মান এবং গুণগত শিক্ষা কখনো আমাদের দেশে আসবে না।
আমি মনে করি, বর্তমান সরকারকে সব বাধা দূর করতে হবে, যাতে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরো নমনীয় হতে পারে এবং আমাদের দেশে জ্ঞান বিস্তার ও জ্ঞান সৃষ্টির স্বাধীন প্রবাহ ঘটতে পারে।
আবদুল হান্নান চৌধুরী: উপাচার্য, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
[‘উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]