মার্চের বিশেষ আয়োজন

একাত্তরের মার্চে মাঠে ও আর্মি মেসে বিভেদের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে

স্কট কার্নি ও জেসন মিকলিয়ানের ‘দ্য ভরটেক্স: দ্য ট্রু স্টোরি অব দ্য হিস্টোরিজ ডেডলিয়েস্ট স্টর্ম অ্যান্ড দ্য লিবারেশন ওয়ার অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলার সাইক্লোন যে পাকিস্তানের ইতিহাস বদলে ভূমিকা রেখেছিল, পূর্ব বাংলার মানুষকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল সে বিবরণই পাওয়া যায় এ গ্রন্থে। আর এ ইতিহাসের অন্যতম চরিত্র ভোলার সন্তান, জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তারকা ফুটবলার থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরের বীর যোদ্ধা। মাহমুদুর রহমান গ্রন্থটি অবলম্বনে সে যাত্রার গল্প রূপান্তর করেছেন। ২৩ ও ২৪ মার্চ বণিক বার্তার ই-পেপারে এর দুটি পর্ব প্রকাশ হয়েছে। এখানে পর্ব দুটি একত্রে পাঠকদের জন্য পুনঃপ্রকাশ করা হলো

তখন মানচিত্রে ছিল পূর্ব পাকিস্তান। সময়টা ১৯৬৮ সাল। ঢাকা শহরে ভেসে আসছে প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের চিৎকার। হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার হোম গ্রাউন্ডে খেলছেন। গায়ে পাকিস্তান ফুটবল দলের সবুজ-সাদা মেশানো নকশার জার্সি। তাতে বড় করে লেখা নম্বর ১০। পেলের অনুপ্রেরণায় এ নম্বর জার্সিতে নিয়ে খেলতে নামেন হাফিজ উদ্দিন। তবে ঢাকার দর্শকের কাছে তিনি পেলের চেয়েও বড়।

সেদিন পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ষাটের দশকে দেশটি তখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। পাকিস্তানের স্ট্রাইকার হাফিজ সেই দলের খেলোয়াড়দের ড্রিবল করে চলে যাচ্ছিলেন গোলপোস্টের কাছে। প্রথমার্ধেই হাফিজ ডান পায়ের এক শটে বল পাঠিয়ে দিলেন গোলপোস্টে। আর সেই সঙ্গেই স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক চিৎকার করে উঠলেন—জয় বাংলা।

ঢাকায় তখন পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধিতা তুঙ্গে। প্রতিবাদের আগুন ঝরছে চারপাশে। তা থেকে রেহাই পেল না ফুটবল ম্যাচটিও। হাফ টাইমে প্যাভিলিয়নে চলে এল প্রতিবাদী কয়েকজন ছাত্র। তাদের নেতার গায়ে সাদা কোর্তা। পাকিস্তান দলের কোচকে ডেকে সে বলল, ‘আজকে ঢাকার এ ম্যাচে শুধু বাঙালি খেলোয়াড়রাই খেলবে। যদি আপনি তা না করেন তাহলে আমরা এখানে হাঙ্গামা করব।’

পূর্ব বাংলার তখনকার অবস্থা জানা ছিল হাফিজের। ছাত্ররা যে ফাঁকা হুমকি দেয়নি সেটাও তিনি বুঝেছিলেন। কিন্তু হাফিজ এও জানতেন, পাঞ্জাবি খেলোয়াড়দের ছাড়া এ ম্যাচ জেতা অসম্ভব। এদিকে ঢাকায় তার তারকা ইমেজ আছে। সব মিলিয়ে হাফিজের মনে হলো এখানে তার কথা বলা প্রয়োজন। তিনি এগোলেন কয়েক কদম। কিন্তু মুখ খুলতে পারলেন না। হাফিজের মনে পড়ল তার বাবা ডা. আজহার উদ্দিন আহমদের কথা।

হাফিজ উদ্দিনের বাড়ি ভোলায়। পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় দ্বীপ এটি। রোড আইল্যান্ডের চেয়েও বড়। সেখানেই তার বাবা আজহার উদ্দিন থাকেন। ভোলার মানুষের সবচেয়ে শ্রদ্ধার ব্যক্তিদের একজন ছিলেন আজহার উদ্দিন। কেবল ডাক্তার হিসেবেই না, জনপ্রিয়তার কারণ রাজনীতিও। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতেছিলেন তিনি। পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের একচোখা মনোভাবের বিষয়ে বাবার সূত্রে হাফিজ উদ্দিন আরো ভালোভাবে জানতেন। যদিও হাফিজ তখন রাজনীতি নিয়ে ভাবতেন না কিন্তু সেদিন মাঠে কোনো কথা তিনি বলতে পারেননি।

দ্বিতীয়ার্ধে পাকিস্তানের ফুটবল দল আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরতে পারেনি। ৫-১ গোলে সেদিন জিতেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু হাফিজকে ঢাকার দর্শক বরণ করেছিল বীরের সম্মানে। ম্যাচ শেষে হাফিজ উদ্দিন যখন স্টেডিয়ামে চক্কর দিয়ে হাত নাড়ছিলেন, দর্শক হাততালির সঙ্গে চিৎকার করে তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তারা জানত না, তবে হাফিজ জানতেন এটা শুধু ফুটবলার হিসেবে তার শেষ আনুষ্ঠানিক পেশাদার ম্যাচ।

আজহার উদ্দিন চাইতেন তার ছেলে দেশের জন্য কিছু করুক। পরিবারের জন্যও তার করণীয় আছে। পূর্ব বাংলার শিক্ষিত পরিবারের একটি ছেলের করণীয় ছিল ভালো কোনো চাকরিতে যোগ দেয়া। হাফিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন, ফুটবল খেলছিলেন কিন্তু তার কাছে আরেকটি প্রস্তাবও ছিল। পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। হাফিজকে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন পাকিস্তান আর্মিতে যুক্ত হতে। সেদিন মধুর ক্যান্টিনে বসে হাফিজকে পুনরায় প্রস্তাবটি দিলেন সেই মেজর। বললেন, ‘আমি তো দেখছি তুমি কেমন অসাধারণ খেলো। আর্মিতে চলে এসো। আমাদের দলকে কেউ আটকাতে পারবে না।’

হাফিজ তখন মানা করে দিলেন। কিন্তু মেজর তার প্রস্তাবে যেকোনো সময় সাড়া দেয়ার সুযোগ দিয়ে রাখলেন হাফিজকে। এদিকে হাফিজ সেসব একপাশে রেখে ইকবাল হলে বসে তৈরি হচ্ছিলেন একটা পরীক্ষার জন্য। তার মনে তখন নানা রকম চিন্তার ঝড়। তিনি ফুটবল খেলবেন না সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর? তারপর যেমনটা হয় কৃতী পুরুষের ক্ষেত্রে। পরীক্ষার দিন হলে সবাই ছিল। কেবল হাফিজ ছিলেন না। তিনি জাতীয় দলে খেলার জন্য এয়ারপোর্টে রওনা দিয়েছিলেন। আর মেজর সাহেবকে কথা দিয়েছিলেন এক বছর পর আর্মিতেও যোগ দেবেন, তবে প্রয়োজনে ডাক পেলে তিনি খেলবেন জাতীয় দলেও। সেই খেলাই আসলে হাফিজের জীবন বদলে দিয়েছিল। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে তেহরানে খেলতে গিয়েছিলেন তিনি। ইরানের সঙ্গে এক ম্যাচে হারল পাকিস্তান দল। পরের ম্যাচ তুরস্কের সঙ্গে। কোচ তাকে বললেন, ‘এ ম্যাচে অধিনায়কের দায়িত্বটা তুমি নাও।’ ভাবনার বিষয় ছিল দুটো। প্রথমত, অধিনায়কের দায়িত্ব নিলে নিশ্চিত হারের গ্লানির পাশাপাশি দায়ও নিতে হবে হাফিজকে। দ্বিতীয়ত, পাঞ্জাবি খেলোয়াড়রা তার কথা আদৌ শুনবে কিনা।

হাফিজ দায়িত্বটা নিলেন। আর লক্ষ্য করলেন দলটা তার কথা শুনছে। তার নেতৃত্বে পাকিস্তান দল সেদিন অসাধারণ খেলেছিল। যদিও সেদিন কোনো রূপকথার গল্প লেখা হয়নি, কিন্তু পাকিস্তানের দলীয় নিষ্ঠা ও ঐক্য সবার নজর কেড়েছিল। একমাত্র গোলটি এসেছিল হাফিজের পা থেকে কিন্তু তারচেয়ে বড় বিষয়, নিজের মাঝে নেতৃত্বের গুণটি তিনি সেদিনই আবিষ্কার করেন। তবু বাবার চোখে নিজেকে বড় হতে দেখার ইচ্ছাও ছিল হাফিজের। সেই ইচ্ছা এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ভোলায় সত্তরের সাইক্লোন) পূরণ করে দিয়েছিল। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি রওনা দিয়েছিলেন বাড়িতে। হাতে ছিল মায়ের টেলিগ্রাম। তিনি লিখেছিলেন, ‘হাফিজ। বাড়ি ফিরে আয়। অনেকে মারা গেছে। পরিবারের মানুষও আছে।’

অল্প কয়েকটি কথা হাফিজকে বিচলিত করেছিল। তিনি আরো বিচলিত হয়েছিলেন যাওয়ার পথে নদীতে, রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ দেখে। হাফিজের পরিবারের ২০ জন সদস্য মারা গিয়েছিলেন সেই সাইক্লোনে। পুরো দ্বীপের সবই তছনছ হয়ে গিয়েছিল। হাফিজ অনুভব করেছিলেন কেবল মরদেহ দাফন করতেই প্রচুর পরিশ্রম ও দলগত চেষ্টার প্রয়োজন হবে। সেসব চিন্তার মধ্যেই হাফিজ খেয়াল করেন তার বাবা আজহার উদ্দিন হাত রেখেছেন হাফিজের কাঁধে। ব্যারাক থেকে সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম গায়েই চলে এসেছেন তিনি। তারপর তাকিয়ে দেখলেন তার বাবা তাকে দেখছেন। হাফিজ অনুভব করলেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন দায়িত্ববান পুরুষকে দেখছেন তার বাবা, ফুটবলারকে না।

মানুষের জীবন কখনো অভাবনীয়ভাবে বদলে যায়। তার ধ্যান-ধারণায় যা থাকে না, তার মধ্যেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হয়। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে হাফিজ উদ্দিন আহমদের দিন অনেকটা সে রকমই কাটছিল। ফুটবলপাগল তরুণ তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট। কাজ করছিলেন সাইক্লোনে ভেসে যাওয়া ভোলায়। মায়ের টেলিগ্রাম পেয়ে ছুটি নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু এর পর পরই কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জলিলের কাছ থেকে বার্তা পেলেন। ব্রাভো কোম্পানিকে দুর্গতদের সেবায় কাজ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পরদিনই হাফিজের সঙ্গে তার ইউনিট যুক্ত হলো ভোলায়।

হাফিজ ও তার ইউনিট গণকবর খুঁড়ছিলেন। ধীরগতিতে এগোচ্ছিল তাদের কাজ। কেননা এ কাজের জন্য গোরখোদক না, প্রয়োজন ছিল এক্সক্যাভেটর। তবু তারাই হাঁটু কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে কবর খুঁড়ে যাচ্ছিলেন। একটা কবর খোঁড়া শেষ করে সেখানে শোয়ানো হলো মৃতদেহ। তারপর আরেকটা কবর খোঁড়া। হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভাবছিলেন দুই তালগাছের মধ্যখানে তার বাছাই করা ভূমিতে বাকি মৃতদেহগুলোর জায়গা হবে কিনা। সেই সময় তার কাছে এল একটি টেলিফোন। কমান্ড সেন্টার থেকে ফোনটি এলে সেখানে এক পাঞ্জাবি নন-কমিশন্ড অফিসার কথা বললেন।

অফিসার বললেন, ‘হাফিজ, আশা করি সব ভালোই যাচ্ছে। একটা জরুরি প্রশ্ন করতে ফোন করেছি। দ্বীপে ব্ল্যাক ডগ আছে, কী মনে হয়?’

হাফিজ নানা রকম কুকুরই দেখেছেন। কিন্তু কালো কুকুরে বিশেষ কী আছে তিনি জানেন না। তবে বললেন, ‘হ্যাঁ, সারা দ্বীপেই আছে অনেক। কিন্তু কুকুর দিয়ে কী দরকার?’

অফিসারটি হাসলেন। বললেন, ‘সারা দুনিয়া ঘুরেও তুমি ফুটবল ছাড়া কিছুই বুঝলে না। ব্ল্যাক ডগ হুইস্কির একটা ব্র্যান্ড। আমাদের প্রেসিডেন্টের প্রিয় পানীয়।’

তখনই হাফিজ জানলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ভোলা সফরে আসছেন। সেখানে তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং মধ্যাহ্নভোজ সারবেন। সেজন্য ব্ল্যাক ডগ থাকা জরুরি। হাফিজ সেই পানীয়র ব্যবস্থা করেননি। একটা গালি দিয়ে সেদিন ফোন ছেড়েছিলেন। দুদিন পর ইয়াহিয়া খানের হেলিকপ্টার ল্যান্ড করে। হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বলা হয়েছিল কিছু মরদেহ যেন প্রেসিডেন্টের ল্যান্ডিং গ্রাউন্ডের কাছাকাছি রাখা হয়। কেননা ১০ কদম হেঁটে যাওয়া প্রেসিডেন্টের জন্য কষ্টকর।

সাইক্লোনের পর প্রেসিডেন্টের কোনো হেলদোল দেখা যায়নি। তবে তার মনে হয়েছিল কিছু ছবি তোলা আর একটা রিপোর্ট হওয়া প্রয়োজন। ভোলায় তাই তিনি প্রথমেই ল্যান্ডিং গ্রাউন্ডের খুব কাছে রাখা মরদেহগুলোর কাছ দিয়ে হেঁটে গেলেন। এমনভাবে থামলেন যেন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ছবি তুলতে পারে। তারপর এক বস্তা চালের ভেতর হাত রেখে ফের পোজ দিলেন। হাফিজসহ সবাই ভেবেছিলেন এরপর প্রেসিডেন্ট চলে যাবেন। কিন্তু তা না করে তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা দেয়া শুরু করলেন। এমনকি হাফিজ উদ্দিন আহমদের কথাও উল্লেখ করে বললেন, ‘হাফিজ আমাদের নায়ক। সে পরিবারের ২৫ সদস্যকে হারিয়েছে কিন্তু সে কাজ করছে মাঠে।’

পূর্ব বাংলার উপকূলের মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে যেমন পরিচিত, তেমনি পরিচিত ত্রাণের সঙ্গেও। তাদের জন্য হেলিকপ্টার মানেই ত্রাণ। তাই এক বৃদ্ধ প্রেসিডেন্টের সামনে গিয়ে বললেন, ‘চাল কই? আমরা ভুখা মরতেছি বাবা। কাপড় দরকার।’

বিরক্ত ইয়াহিয়া তেতো মুখে জানতে চাইলেন, বুড়ো কী বলছে। হাফিজ তাকে জানালেন বৃদ্ধের আরজি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তখন হাফিজকে বললেন, তিনি যেন নিজ পরিবারের উদাহরণ দিয়ে বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দেন। ক্রোধে আর গরমে ঘামতে থাকা হাফিজ প্রটোকল ভাঙতে পারলেন না। তিনি সেই উত্তরই দিলেন। আর তার কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট ও তার সঙ্গীরা রিলিফ সাইট থেকে শত গজ দূরে বিরিয়ানি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করলেন। টেবিলের মাঝেই ছিল একটি ব্ল্যাক ডগ। পাঞ্জাবি অফিসারটি ত্রাণের পয়সায় একটি স্পিড বোট ঢাকায় পাঠিয়ে বোতলটি আনিয়েছিলেন প্রেসিডেন্টের জন্য।

ফিরে গিয়েও হাফিজের প্রশংসা করেছিলেন ইয়াহিয়া খান। আর হাফিজের সহকর্মীরা তাকে অভিনন্দনের পাশাপাশি জানিয়েছিলেন যে একটা মেডেল এবার সে পেয়েই যাবে। কিন্তু তখন মেডেলের চিন্তা ছিল না হাফিজ উদ্দিন আহমদের। ফুটবল থেকে চোখ সরিয়ে তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন দেশ ও রাজনীতির অবস্থা।

ফুটবলের হাত ধরেই সেই চিত্র আরো স্পষ্ট হয় হাফিজের কাছে। ’৭১ সালের মার্চে তিনি ন্যাশনাল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে গিয়েছিলেন মুলতানে। ‘নিরাপত্তার কারণে’ পূর্ব বাংলার কোনো ফুটবল ক্লাব বা দলকে রাখা হয়নি সে টুর্নামেন্টে। বিভেদ ও বৈষম্য তখন খালি চোখেই দেখা যেত। ’৬৮ সালে পাকিস্তানি এক মেজর তাকে বলেছিলেন সেনাবাহিনীতে বাঙালি-পাঞ্জাবি বা অন্য কোনো বিভেদ নেই। হাফিজও তা বিশ্বাস করতেন। কিন্তু লক্ষ্য করছিলেন যে একটু একটু করে সবই বদলে যাচ্ছে। তিনি চাইতেন সেনাবাহিনীতে যেন এ বিভেদের মধ্যে না পড়েন। ফুটবল মাঠে তো একেবারেই নয়। কিন্তু একাত্তরের মার্চে তিনি এ বিভেদ লক্ষ্য করলেন মাঠে এবং আর্মি মেসেও।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফুটবল টিমের অবস্থা তখন খুব একটা ভালো ছিল না। হাফিজ চেষ্টা করছিলেন কিন্তু তিনি দলের অধিনায়কও নন। এতসবের মধ্যে অফিসার্স মেসে তিনি শুনলেন দুই অফিসারের বাদানুবাদ। ততদিনে নির্বাচনের পর আট সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে চলছে টালবাহানা। সেই প্রসঙ্গেই বাদানুবাদ। বাঙালি অফিসার আঙুল তুলে বললেন, ‘তোমার ইয়াহিয়া কেন অ্যাসেম্বলি বন্ধ করল?’

পাঞ্জাবি অফিসারটি বললেন, ‘মুজিব তো পাকিস্তান ধ্বংস করে দেবে। আর কোনো বিকল্প আছে ইয়াহিয়ার কাছে?’

অন্য অফিসাররা তাদের সরিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু তাতে কী। মতানৈক্য ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছিল। হাফিজ লক্ষ করেছিলেন ম্যাচ শেষে গুটিকয়েক বাঙালি খেলোয়াড় তার পাশে থাকে, পাঞ্জাবিরা দূরত্ব রাখে তিন ফুটের মতো। সেই তিন ফুট দূরত্ব হাফিজের কাছে কয়েক মাইলের মনে হয়। খেলা শেষে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফিরে তিনি সেই দূরত্ব আরো অনুভব করলেন।

ফেরার সময় তিনি দেখেছিলেন বিমান ভর্তি পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা। যশোর পৌঁছে অটোরিকশাচালক যখন তিন গুণ ভাড়াতেও ক্যান্টনমেন্ট যেতে অস্বীকার করলেন, তখনো বিষয়টি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল হাফিজের। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের গেটে গিয়ে সিভিল পোশাকের হাফিজকে যখন গেটে আটকানো হলো, তখন তিনি বুঝলেন বাঙালি অফিসারদের সুনজরে দেখা হচ্ছে না।

জিপের চালকের কাছ থেকে তিনি জানলেন যশোর ক্যান্টনমেন্টের ৭০০ বাঙালি সেনা সদস্যের মধ্যে অর্ধেককে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে। আর তার পরদিনই (১৭ মার্চ) হাফিজ ও তার দলকে পাঠানো হলো যশোরের ভারত সীমান্তে—ট্রেনিং এক্সারসাইজের জন্য। ক্যান্টনমেন্টে রইলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জলিল ও সার্জেন্ট আবুল হাশেম। তারা দুজন লক্ষ করলেন ক্যান্টনমেন্ট থেকে রেডিও সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। তাদের হাতের কাছে থাকছে না অ্যামুনিশনও।

পাকিস্তান আর্মি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিনিয়র টাইগার্স ব্যাটালিয়নের লেফটেন্যান্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ এসবের কিছুই জানতে পারেননি। কারণ প্রায় দুই সপ্তাহ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তারা তখন যশোরের ভারত সীমান্তে। ফিরে এসে আবিষ্কার করলেন কোনো কিছুই আর আগের মতো নেই।

আরও