আলোকপাত

নিশুতি আলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিমাপের যথার্থ নির্ধারক কি

কয়েকজন গবেষণা সহকর্মীর সঙ্গে সম্প্রতি রাতের আলোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা নিয়ে আলোচনা করছিলাম।

কয়েকজন গবেষণা সহকর্মীর সঙ্গে সম্প্রতি রাতের আলোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদদের অনেকেই এ ধারণার প্রতি সন্দেহ পোষণ করেন—তা আলোচনা থেকে আরো একবার মনে পড়ে গেল। তাদের মতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের মতো বড় শহর ছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলে রাতে তেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তৎপরতা পরিলক্ষিত হয় না। রাতের বেলা কত বাতি জ্বলছে তা দিয়ে অর্থনীতির ধারণা পাওয়ার বিষয়টি ফলপ্রসূ যেসব দেশে তথ্য ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা উদাহরণ হিসেবে আফ্রিকার কথা বলতে পারি। কিন্তু বাংলাদেশের তথ্যভাণ্ডর তুলনামূলক সমৃদ্ধ। যে কারণে স্যাটেলাইটে নিশুতি আলোর ছবির ভিত্তিতে অর্থনীতির আকার পরিমাপ করার পদ্ধতি খুব বেশি কার্যকর হবে না। তাদের মূল বক্তব্য হলো যেহেতু বড় বড় শহরের বাইরে গ্রামে বা অন্যান্য অঞ্চলে রাতের বেলায় তেমন কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় না, তাই রাতের আলো অর্থনীতির নির্ভরযোগ্য পরিমাপক হিসেবে কতটা কার্যকর তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েই যায়।

অর্থনীতিবিদদের এ সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়। তবে রাতের আলো অর্থনীতির নির্ভরযোগ্য পরিমাপক কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছিল এবং এ অনুমানের নির্ভরতা যাচাইয়ে অর্থনৈতিক গবেষণাও হয়েছে। সমস্যা হলো অর্থনীতিবিদরা সেসব গবেষণার ভিত্তিতে পাওয়া প্রমাণগুলোকেও উপেক্ষা করছেন। রাতের আলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করার পেছনে মৌলিক ধারণা হলো আধুনিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাধারণত রাতের বেলায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের মাধ্যমে করা হয়, যা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায়। যখন মানুষ রাতে কাজ করে, কেনাকাটা করে বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তারা এমন সব আলো ব্যবহার করে যা স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে। অধিক কর্মকাণ্ড মানে আলোর আধিক্য এবং স্যাটেলাইট তা নিয়মিত রেকর্ড করে। যদিও খুব ছোট পরিসর বা ঘরের ভেতরের আলো সবসময় স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে না।

বাংলাদেশে রাতের আলোকে অর্থনৈতিক কাজের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহারের প্রতি আস্থাহীনতার মূল কারণ হলো, গ্রামীণ এলাকায় সাধারণত রাতে আলো জ্বলে ভোগের জন্য, উৎপাদন বা অন্য অর্থনৈতিক কাজের জন্য নয়। তাই সেটিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বড় শহরগুলোর বাইরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাতে বাতি জ্বালানো হয় পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে, যেমন রান্না, পড়াশোনা, সামাজিকীকরণ। যে কারণে গ্রামে রাতের আলো কেবল মানুষের ভোগপ্রবণতাকে তুলে ধরে, প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়। তাই নিশুতি আলো সবসময় সঠিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন দেখাতে পারে না।

তবে এ ভোগ বনাম উৎপাদন কার্যকলাপ আলাপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক বাদ পড়ে যায়। গ্রামীণ মানুষের ভোগপ্রবণতা তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উন্নয়নের হালচাল প্রতিফলিত করে। গ্রামের সেসব বাড়িতেই রাতে আলো জ্বলে যাদের আর্থিক সামর্থ্য থাকে। গৃহস্থালির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি গ্রামের মানুষের উচ্চ আয়, উন্নত জীবনমান এবং বিদ্যুতের পেছনে ব্যয় করার সামর্থ্য প্রকাশ করে গ্রামীণ রাতের আলো। এগুলো প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নির্দেশ করে। সেখানে উৎপাদনকাজ দিনে হয় নাকি রাতে হয় সেটি তখন গৌণ হয়ে ওঠে।

একই সঙ্গে গ্রামীণ ভোগপ্রবণতা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও নির্দেশ করে। যখন গৃহস্থালির আলো পড়ালেখার কাজে ব্যবহার করা হয় সেটি দক্ষতা বৃদ্ধিতে এক ধরনের বিনিয়োগ, যা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। যখন গ্রামীণ ব্যবসায়িক কাজে দীর্ঘ সময় বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার হয়, তারা অনেক অর্থনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে। আলোর ব্যবহার দেখায় চলমান সময়ে কত মানুষ সেটি ব্যবহারের সামর্থ্যসম্পন্ন এবং তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশাবাদী। তাই গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মাপার ক্ষেত্রে রাতের আলো একটা কার্যকর পরিমাপক হতে পারে।

তাছাড়া গ্রামীণ এলাকায় ভোগ এবং উৎপাদনকাজে ব্যবহৃত আলোর পার্থক্য নিরূপণ করাও কঠিন। গ্রামে প্রায়ই সন্ধ্যাবেলার বাজার, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, ঘরভিত্তিক ব্যবসা এবং রাতে চালু থাকা সেবা কেন্দ্রগুলোর জন্য আলোর প্রয়োজন হয়। যদিও ঠিক কতটা প্রয়োজন হয় তা এখনো সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি। এমনকি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত আলোর ব্যয় মেটানো হয় কৃষি আয়, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বা কৃষির বাইরে গ্রামীণ ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত আয়ের মাধ্যমে। আলো মানুষকে সন্ধ্যায় পড়াশোনার সুযোগ করে দেয় এবং ছোট ব্যবসার নানা কর্মকাণ্ড দীর্ঘ সময় পরিচালনা করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

এছাড়া বিদ্যুৎপ্রাপ্যতা এবং রাতের আলো নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিকও রয়েছে। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, রাতের আলোর উৎস বিদ্যুৎ, যার সংযোগ দেয়া হয়েছে জাতীয় গ্রিড থেকে। আবার সৌরশক্তি বা অন্যান্য উৎস থেকেও আলো আসতে পারে। বাংলাদেশের দুর্গম অঞ্চল, যেমন চরাঞ্চলগুলো জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার ছাড়া কেবল সৌরশক্তি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি গাইবান্ধার কাবিলপুর চর এলাকায় ফ্রেন্ডশিপের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে সৌরশক্তি সেখানের দোকানগুলোকে দীর্ঘ সময় খোলা রাখতে, ফার্মেসির ফ্রিজ চালু রাখতে এবং মহিলাদের রাতের বেলা সেলাই ও টেইলারিংয়ের মতো আয়মূলক কাজ করতে সহায়ক হয়ে উঠেছে।

তবে আলো কোন কাজে ব্যবহার করা হয় সেটি নীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো শুধু গ্রামে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে; সেটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা। রাতের আলো গ্রামীণ অর্থনীতির এ ধরনের গতিশীলতা ভালোভাবে তুলে ধরতে পারে ,যেটি প্রচলিত পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রাতের আলো কেবল কোথায় বিদ্যুৎ রয়েছে সেটি নয়, এর সঙ্গে কোথায় সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক কাজ হচ্ছে সেটিও তুলে ধরে।

বিদ্যুতের প্রাপ্তি এবং রাতের আলোর মধ্যে সম্পর্ক আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরে। রাতে বাতি জ্বলার অর্থ হতে পারে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকার মানে সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এমন নয়। এ যুক্তি এমন একটি মাপের প্রস্তাব দেয় যা বিদ্যুতের অব্যবহৃত পরিকাঠামোকে উপেক্ষা করে এবং দেখায়, কোথায় মানুষ এবং ব্যবসাগুলো প্রকৃত অর্থনৈতিক কাজের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। এটি আচরণকে প্রতিফলিত করে, অর্থনৈতিক প্রবণতা ও কর্মকাণ্ড প্রদর্শন করে—কেবল পরিকাঠামোর উপস্থিতি নয়।

বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন করা হচ্ছে এবং আঞ্চলিক পার্থক্যগুলোর দিকে নজর দেয়া হচ্ছে, রাতের বেলা আলো ব্যবহার শুধু স্মার্ট নয়, এটি প্রয়োজনীয়। তবে এ পরিমাপকগুলো নিখুঁত নয়। তারা একটি বিয়ের অনুষ্ঠান এবং রাতের বাজার আলাদা করতে পারে না, কোনো ভবনের ভেতরের কার্যকলাপ বা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সময় কিছু ধরা পড়ে না। তবে এ সীমাবদ্ধতা তাদের অকার্যকর করে তোলে না—এটি কেবল মানে যে এ উপাত্তগুলো অন্যান্য টুলসের সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। মূল প্রশ্ন হলো, নিশুতি আলো বা নাইটটাইম লাইটস পরিমাপে কি সবকিছু উঠে আসে? নাকি তারা এমন কিছু প্রকাশ করতে পারে, যা আমরা অন্যত্র দেখতে পারি না। একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল দেশে যেখানে সীমিত তথ্য রয়েছে, এমনকি অসম্পূর্ণ আলো আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দেখতে সাহায্য করতে পারে।

সৈয়দ আবুল বাশার: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

আরও