অর্থনীতির নিরাময়

সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা না এলে বিনিয়োগ বাড়বে না

বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও অর্থনীতির নিরাময়—আমাদের আর্থিক খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে আজকের আলোচ্যসূচি নিয়ে বলার চেষ্টা করব। বৈষম্যের ব্যাপারে আমি বলব যে অবশ্যই আমাদের দিক থেকে বৈষম্য

বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও অর্থনীতির নিরাময়—আমাদের আর্থিক খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে আজকের আলোচ্যসূচি নিয়ে বলার চেষ্টা করব। বৈষম্যের ব্যাপারে আমি বলব যে অবশ্যই আমাদের দিক থেকে বৈষম্য দূর করাটা বিশাল একটা চ্যালেঞ্জ। এটা কোনো একটা একক মন্ত্রণালয় বা একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। এটা সামগ্রিকভাবে; সরকারি, বেসরকারিভাবে করতে হবে। যে নীতিগত, গুণগত পরিবর্তনের কথা আমাদের মুজেরী ভাই (মুস্তফা কে মুজেরী) ও বিদিশা (সায়মা হক) বলেছেন সেগুলোকে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা এ লক্ষ্যটাকে অর্জন করতে পারব। আমাদের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করতে হবে। দুঃখের বিষয় হলো আমাদের বৈষম্য বেড়েছে। আমাদের সম্পদবৈষম্য আরো বেশি বেড়েছে। এটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই এবং এটাকে অ্যাড্রেস করতে হবে।

আর্থিক খাতের জায়গা থেকে যদি বলি—সেখানে বৈষম্য কমানোর জন্য কীভাবে ইনক্লুশন (অন্তর্ভুক্তি) বাড়ানো যায় সে চেষ্টা করছি। আমরা জানি আমাদের ব্যাংক খাত দেশব্যাপী বিস্তৃত আছে। সত্যি কথা বলতে, প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাংলাদেশের চেয়ে পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত ব্যাংকিং শাখা নেই। সেদিক থেকে একটা ভালো বিষয় যে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে সহজেই হাঁটা দূরত্বে আমরা ব্যাংক সেবা পেতে পারি। এটা যেকোনো দেশের তুলনায়ই বলা যায়, সেটা ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় যেকোনো দেশের তুলনায়ই। এদের সবার চেয়ে আমাদের ব্যাংকিং ডেনসিটি (ঘনত্ব) বেশি। এটা ভালো, কারণ আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্বও বেশি। জনসংখ্যার ঘনত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবার পরিমাণ বৃদ্ধির জন্যই এ রকমটা হয়েছে। তো তার পরও আমাদের আর্থিক খাতের ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো কিন্তু কাজ করছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তীকরণের ব্যাপারে। আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করছে, এরই মধ্যে ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটা আরো দ্রুত বাড়ছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেই তারা কাজ করছে। সেই সঙ্গে আবার আমরা যেটা চেষ্টা করছি সেটা হলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমের (এমএফএস)। আমরা জানি যে এটা অন্যতম সফলতার গল্প এবং এটার ফলে আমাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রবণতা অনেকখানি বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আমরা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের কথাও চিন্তা করছি, যার মাধ্যমে ছোট ছোট লোন দিয়ে আমরা এ অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাকে আরো একটু বাড়ানোর চেষ্টা করব। এখন উন্নয়ন হয়েছে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু আমরা এখনো সন্তুষ্ট নই। এখনো বৈষম্য আছে। বিশেষ করে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতাটা কম, সেটা সব ক্ষেত্রেই। ব্যাংকিং অ্যাকসেসের ক্ষেত্রে সেটা খুবই কম, এটা ১০০ শতাংশের মধ্যে তুলনা করলে নারী ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৪-৬ শতাংশের বেশি হয়তো কোনো ব্যাংকেই নেই। সুতরাং এ বিষয়টা অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে আগামীতে, না হলে বৈষম্যের ব্যাপারগুলোকে আমরা দূর করতে পারব না। আমরা একটা উদ্যোগ হাতে নিয়েছি ‘ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টার’-এর মাধ্যমে। সেখানে আমরা সারা বাংলাদেশের সব উপজেলায় আমাদের গত ৫০ বছরের ব্যাংকিং কার্যক্রমের ঐতিহাসিক মূল্যায়নটাকে আমরা দেখছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাজধানী ঢাকায়ই আমাদের মোট ঋণের ৫৯ শতাংশ প্রদান করা হয়ে থাকে। মানে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদান কার্যক্রম অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক বা এর আশপাশের অঞ্চলে বিস্তৃত। ১৭ শতাংশ হলো চট্টগ্রামে, তাহলে আর থাকলটা কোথায় সারা দেশের জন্য? সেজন্য বলা যায়, আমাদের আর্থিক খাত আসলে খুবই কেন্দ্রীভূত অবস্থায় আছে। রাজনৈতিক কেন্দ্রিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক কেন্দ্রীয়করণও ঘটেছে। এটায় আমাদের হস্তক্ষেপ করতে হবে যদি আমরা প্রকৃত অর্থেই আমাদের দেশের সব প্রান্তের সব নাগরিকের জন্যই অর্থনীতিতে সমান প্রবেশাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তি চাই, অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটাকেই আরো ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ঋণ দিতে হবে এবং পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ যেমন আমাদের ব্যাংক খাতকে নিতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিতে হবে। সরকারকেও সেদিকে নজরদারি করতে হবে। তা না হলে কিন্তু এ অন্তর্ভুক্তিমূলক লক্ষ্যমাত্রাগুলো আমরা অর্জন করতে পারব না। আমরা এখনো কেন্দ্রীভূত এবং উচ্চ মাত্রার কেন্দ্রায়নের অবস্থানেই আছি।

এবার আর্থিক অপরাধের কথায় আসি এবং তা নিয়ে কী করতে যাচ্ছি। আমরা প্রথমত যেটা করতে চাচ্ছি, ব্যাংকের টাকা যারা নিয়েছেন তারা যেন ব্যাংকের সঙ্গেই একজন ক্লায়েন্ট হিসেবে সেটাকে ফেরত দিয়ে বা নরমালাইজ করে একটা সিস্টেম্যাটিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন। যারা এখান থেকে টাকা নিয়ে বাইরে চলে গেছেন তাদের বিরুদ্ধেও আমরা কিছু পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা কীভাবে দেশের ভেতর এমনকি বিদেশ থেকে ওই টাকাগুলোকে ফেরত আনতে পারি তার চেষ্টা চলছে। সে ব্যাপারে কাজ এগিয়ে নিতে চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও তাদের অর্থ বিভাগের প্রতিনিধিরা আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের লোকজনরা আসছেন আলাদাভাবে; ব্রিটিশ সরকার থেকে আইএসসিসিও আসছে, বিশ্বব্যাংকের স্টার গ্রুপ যারা সম্পদ পুনরুদ্ধার (অ্যাসেট রিকভারি) নিয়ে কাজ করে তারা আসছে। এতে আমরা একটা রোডম্যাপ পাব কীভাবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে, দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে এবং আইনগতভাবে এটাকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি সেটা নিয়েই আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনারও আসছেন বাংলাদেশে, তার সঙ্গেও আমরা এ সপ্তাহে কথা বলব যে কীভাবে আমরা সিঙ্গাপুরকেও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পারি। দেশের বাইরেই যদি টাকা নিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে আমরা অন্তত আমাদের দাবিটা প্রতিষ্ঠিত করব। আমরা আইনগত পদ্ধতিতে যেভাবে এটাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব সেটার সর্বাত্মক চেষ্টা করব—দ্বিপক্ষীয়, আইনি অন্যান্য আন্তর্জাতিক পদ্ধতি মেনেই এসব করা হবে। এতে বেশ অগ্রগতি হয়েছে বলা যায়। যেটাকে আমি বলব জাল ছড়ানো হয়েছে কিন্তু এখনো গোটানো হয়নি, গোটানো হবে সামনে। আরেকটা জিনিস আমি বলব, আমরা কিন্তু খুবই সতর্ক। আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন, আমরা কিন্তু কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে সরকারিভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করিনি। কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যেটা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেটাকে কিন্তু আমরা ব্লক করিনি, সেটা পুরোপুরিভাবেই সচল আছে। বেক্সিমকোর কথা যদি বলি। তাদের রিসিভারশিপ দেয়া হয়েছে। রিসিভারশিপ দেয়া মানেই এই নয় যে বেক্সিমকো অচল করে দেয়া হলো। বরং বেক্সিমকোকে সচল রাখতেই দেয়া হয়েছে। কারণ কয়েক মাস ধরেই বেক্সিমকোর বেতন-ভাতা ইত্যাদি কিন্তু আমরা সরকার থেকেই দিচ্ছি অনেকাংশে। এভাবে তো চলতে পারবে না। ফ্যাক্টরি তো সরকার চালাতে পারবে না। তো এখন আমরা বেক্সিমকোয় রিসিভারশিপ দিয়ে যেটা দেখতে চাচ্ছি, সেটা হলো ফান্ড যাতে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা না হয়। যে পণ্য রফতানি হচ্ছে, সেই টাকাটা যেন বাংলাদেশে আসে এবং সেটা দিয়েই যেন আমরা লেবারের খরচটা মেটাতে পারি। সেটা দিয়েই আমরা যেন আমাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে রাখতে পারি। কোম্পানির ভ্যালু/মূল্যমানকে ধরে রাখাও কিন্তু আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। কোম্পানিকে মারতে এক সেকেন্ড লাগবে না, আজ বন্ধ করে দিলে কালকেই একটা কোম্পানি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু কোম্পানিকে বাঁচিয়ে রাখা অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। কাজেই আমরা চেষ্টা করছি কোম্পানিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

আমি এক্সিম ব্যাংকে গত মাসে ১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছি শুধু তাদের গ্রাহকদের দেয়ার জন্য, গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন দেয়ার জন্য। আমরা এগুলো করছি কী কারণে? যেন কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ না হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে যেন শ্রমিকরা আগুন লাগিয়ে না দেন বা ভাংচুর না করেন আমরা সে চেষ্টা করছি। কিন্তু একই সঙ্গে জবাবদিহি/দায়িত্ববোধও তো থাকতে হবে, প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংকের টাকা নিয়ে চলে গেলাম, অ্যাকাউন্টেবল হলাম না, সেটা তো হবে না। কাজেই আমরা সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আইনগতভাবে দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য যা করার দরকার সেটা করব।

আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা অর্থনীতির নিরাময় নিয়ে কথা বলতে পারি। আমি বা আমরা যখন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হলাম তখন বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ দেখলাম। তার মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, বিনিময় হারে অস্থিরতা, বাণিজ্য ঘাটতি, চলতি হিসাবের মারাত্মক ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর বড় আকারের বকেয়া। প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি বকেয়া পেয়েছি। অর্থাৎ এলসি খোলা হয়েছে কিন্তু এলসি পরিশোধ করা হয়নি। এগুলো সবই তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করার বিষয় হিসেবে আমরা হাতে নিয়েছি। এর সঙ্গে নিত্যনৈমিত্তিক অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোর ব্যবস্থাপনা তো আছেই।

ব্যাংক খাত নিয়ে আলাদা করে বলার জায়গা আছে। দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে কয়েক লাখ কোটি টাকা ব্যাংক খাত থেকে চলে গেছে। সে কারণে ব্যাংক খাত মোটামুটিভাবে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশে ছিল ও আছে এবং এ জায়গাটাকে সংস্কার করাটা কিন্তু একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, ব্যাংক খাতে কোনো ধরনের মেল্টডাউন হবে না, আমরা এটাকে স্থিতিশীল করে এনেছি। হ্যাঁ, কয়েকটা ব্যাংক এখনো গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছে না। সেজন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি কিছু তারল্য সরবরাহ করে কীভাবে এটাকে চালানো যায়, সেই ব্যাপারে। কিন্তু একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে আমরা কিন্তু ব্যাংক খাতকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি। আমরা টাকা ছাপাচ্ছি না, গত তিন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো টাকা ছাপিয়ে দেয়া হয়নি এবং হবে না। গত সপ্তাহে সার কেনার জন্য একটা বন্ড ইস্যু করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার মতো। আমরা জানি যে ওই বন্ড তারা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই তারল্যকৃত করবে। সেজন্য ওই টাকার বিপরীতে ভারসাম্য তৈরির জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বন্ড ইস্যু করে আমরা ওই টাকাটার জোগান দিয়েছি এরই মধ্যে। কারণ আমাদের লক্ষ্য হলো সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা। এটা না হলে মূল্যস্ফীতি কমবে না, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সেজন্য আমাকে এ লড়াইটা করতে হবে। যে ব্যাপারটি আমি লক্ষ করেছি এবং অবশ্যই জানি যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। কিন্তু যে পদ্ধতি আমি গ্রহণ করেছি সেটা হলো বিশ্বব্যাপী অনুসৃত তত্ত্বীয় অর্থনীতির মৌলিক নীতি। আমরা সেটাকেই অনুসরণ করছি।

আমরা প্রত্যেকটা দেশকে পর্যবেক্ষণ করেছি। যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, থাইল্যান্ড কোনো দেশেই অন্তত ১২ মাসের আগে মূল্যস্ফীতি কমেনি। আমরা মূল্যস্ফীতি কমানোর কাজ শুরু করেছি খুব বেশি দিন হয়নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফের) চাপে বিগত সরকার চলতি বছরের জুনে সুদহার বাজারভিত্তিক করেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে সুদহার বাড়ানোর মাত্র তিন-চার মাস পেরিয়েছে। আরো আট মাস সময় অন্তত আমাকে দিতে হবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৫-৬ শতাংশে আনতে।

যদি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করি, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আগস্টে ও সেপ্টেম্বরে কমেছে। অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধির পেছনে বন্যার বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে। দেশে বন্যা হয়েছে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। এ বন্যার প্রভাব কি দামের ওপর পড়বে না? অবশ্যই পড়বে এবং পড়েছেও। আরেকটি বিষয় খেয়াল করতে হবে, আমাদের পরিসংখ্যানে এখন কোনো রাজনৈতিক প্রভাব নেই। আগে মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন সেটা করা হচ্ছে না। ফলে এখন মূল্যস্ফীতির হার গণনা করতে গেলে সেটার মাত্রা বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা আশা করি, এটা কমে আসবে।

তবে মূল্যস্ফীতি কমাতে কি আমরা শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করব? না। এর জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল নির্বিঘ্ন রাখাও জরুরি। এরই মধ্যে সরবরাহ ঠিক রাখতে অনেক নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে কিংবা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো স্বল্পমেয়াদে হলেও যেন আমরা দাম কমাতে পারি। তবে সবকিছুর দাম কমানো সম্ভব নয়। যেমন ভোজ্যতেল। কারণ বিশ্ববাজারে এর দাম ৮০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার হয়েছে। তাহলে বাংলাদেশে কি এটার দাম কমানো সম্ভব? সম্ভব নয়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা থাকলেও এটি সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম না কমলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়বেই।

আবার আমদানি বাড়িয়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু চাল কি আমদানি হচ্ছে? হচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশের চেয়ে অন্য দেশে চালের দাম বেশি। তাই আমদানি করলে চালের দাম এখন যা আছে তার চেয়ে বরং বেড়ে যাবে। এমনকি যদি ভারতে চালের দাম না কমে তাহলে ভারত থেকেও চাল আমদানি করা হবে না। এটা বস্তবতা। তবে সুখবর হলো ভারতে চালের দাম কমতে যাচ্ছে। সেখানে দাম কমলে আমদানি করা হবে; তার আগে নয়। কাজেই আমাদের চালের দাম এখন যত, মোটামুটি ততই থাকবে। কিন্তু এটার একটা ভালো দিকও আছে। এর ফলে কৃষকরা প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন। এমন তো নয় যে তারা দাম পাচ্ছেন না। তারা মোটামুটি প্রত্যাশিত দামে চাল বিক্রি করছেন। সুতরাং ভালো দিকটা ভুলে গেলে চলবে না।

এদিকে সার আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবন্ধকতা ছিল। ব্যাপক বকেয়া জমার কারণে সার আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই সার এখন অবারিত আমাদের। সার আমদানির জন্য প্রতিটি এলসি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সার সংকটের কোনো খবর কোনো পত্রিকায় এখন আর আপনারা পাবেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি সারের কোনো সংকট আছে কিনা জানতে। তারা জানিয়েছে যে কোনো সমস্যা নেই, যতটা প্রয়োজন তারা আমদানি করতে পারবে। আমি ব্যাংকারদের সঙ্গেও আলাপ করি বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি আছে কিনা তা জানতে। কিন্তু এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে পর্যাপ্ত পাওয়া যাবে, আপনাকে কেবল টাকা নিয়ে আসতে হবে।

তবে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) জমা বকেয়ার সমাধান আমি করতে পারব না। তারা টাকা নিয়ে এলে বকেয়া পরিশোধ করতে পারবে। এটি অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার সমস্যা, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিজনিত সমস্যা নয়। তাই বিষয় দুটি আলাদাভাবে দেখতে হবে।

সার কথা, মূল্যস্ফীতি কমাতে আমি মনে করি সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকারের দিক থেকে যেসব পদক্ষেপ নেয়ার ছিল, অনেকাংশই নেয়া হয়েছে। এখন কেবল সময় দিতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে আশা করি আমরা মূল্যস্ফীতি ৫-৬ কিংবা ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারব।

আমাদের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা না এলে বিনিয়োগ বাড়বে না। এক্ষেত্রে অধৈর্য হয়ে লাভ নেই। এ মুহূর্তে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ এখন সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে হবে, মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ‍স্থিতিশীল রাখতে হবে আগামী দিনগুলোয়। রিজার্ভ সংরক্ষণ করে কাজ করতে হবে আমাদের। যে কারণে গত দু-তিন মাস আমরা একটা ডলার বিক্রি করিনি। এগুলো যদি পুনরুদ্ধার করতে পারি, ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারি, তাহলে এমনিতেই বিনিয়োগ বাড়বে। আমরা চাই প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসুক, দেশীয় বিনিয়োগ আসুক। সেই পরিবেশ যেন আমরা দিতে পারি তার জন্য সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা হবে না। কিন্তু দেশে প্রবৃদ্ধির গতি যে কমে গেছে, তা অনিবার্যই ছিল। আমরা কি শ্রীলংকা হয়ে গেছি, অবশ্যই না; আমাদের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়নি; অর্থনীতিও ধসে পড়েনি। হতে পারত, কিন্তু হয়নি। আমরা এটাকে স্থিতিশীল করেছি। এ বিষয়ে এক ধরনের উপলব্ধি থাকতে হবে যে বিশাল একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েও বাংলাদেশ মন্দা এড়াতে পেরেছে। সেজন্য সাধুবাদ জানানো দরকার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করছে। আমাদের অংশীজন কারা? ব্যাংক, বেসরকারি খাত, সর্বোপরি নাগরিক, যেহেতু তারাই এসব পদক্ষেপ থেকে পাওয়া সুফলের মূল উপকারভোগী হবেন। স্থিতিশীলতা অর্জনে ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দফায় দফায় আলোচনা করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বদলানো হয়েছে। নতুন পর্ষদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। প্রতিদিনই বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। একটি ব্যাংক থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা যদি এক পরিবার নিয়ে যায়, তাহলে সেই ব্যাংকের অবস্থা কীভাবে ঠিক করা যাবে সেই ম্যাজিক আমার জানা নেই। এখানে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নধর্মী কাজ করতে হবে। আমরা যেটা করতে যাচ্ছি সেটি হলো ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্ট করা হবে যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে সব ক্ষমতা চলে আসবে, আইনগতভাবেই তা হবে। ফলে ব্যাংক একীভূতকরণ, অধিগ্রহণসহ সবকিছুই করা সম্ভব হবে। কিছু ব্যাংকে পুঁজি সঞ্চার করা হবে, কিছু ব্যাংকে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ যেমন ইসলামী ব্যাংকের কথাই বলি। এর ৮০ শতাংশ শেয়ার একটি পরিবারের কাছে ছিল যারা এখন দেশে নেই। এখন সেই শেয়ার তো অন্য কারো হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে, কার হাতে তুলে দেয়া হবে—এসব সিদ্ধান্তের জন্য আইনি কাঠামো প্রয়োজন। আমরা শিগগিরই একটা আইনি কাঠামোর খসড়া সরকারের কাছে নিয়ে যাব এবং তারপর আমরা কাজ শুরু করব। এরই মধ্যে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রথমে ১০টি ব্যাংকের অডিট সম্পন্ন করা হবে। বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের আর্থিক বিভাগের নিরীক্ষকসহ আন্তর্জাতিক নিরীক্ষকদের নিয়ে ব্যাংকগুলো মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মূল্যায়ন প্রতিবেদন করা হবে যাতে ব্যাংক খাতের অপরাধীদের আমরা দেশ ও বিদেশের কোর্টে উপস্থাপন করতে পারি। এগুলো করা হচ্ছে যাতে দিনশেষে আমাদের একটা ভালো ব্যাংক খাত প্রতিষ্ঠা করতে পারি। কেননা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের এ খাত।

আমাদের আর্থিক খাত সবচেয়ে দুর্বল, এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও। আমি সাধারণত আর্থিক খাতের গভীরতা পরিমাপক হিসেবে জিডিপি-ব্রডমানির (এম২) অনুপাত ব্যবহার করি। আমাদের জিডিপি-ব্রডমানির অনুপাত হওয়ার কথা ছিল ৮০-৯০। কিন্তু বর্তমানে সেটা আছে ৫৪ শতাংশ। অথচ অনুপাতটি ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। এরপর তা ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে ব্যাংক খাতে কী পরিমাণ লুণ্ঠন হয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। এটা অস্বীকার করে লাভ নেই। ব্যাংক খাত লুটপাটের প্রভাব ঋণপ্রবাহসহ বিনিয়োগে পড়েছে। এসব ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা ছাড়া উপায় নেই।

এসব কারণে সত্যিকার অর্থে এখন পর্যন্ত ভবিষ্যৎমুখী কিছু করা সম্ভব হয়নি। বরং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অতীতের জের টানা ও সংশোধনমূলক কাজ করতে হচ্ছে আমাদের। আগামীতে ব্যাংক খাতকে কীভাবে সাবলম্বী করে নতুনভাবে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায় সেই চেষ্টা করব। আপনারা যারা ব্যবসায়ী আছেন আপনারাও অংশীজন। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। কাজেই আমি বলব ধৈর্য ধরুন, আমরা সফল হব।

আহসান এইচ মনসুর: গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

[১১ নভেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ সম্মানিত অতিথির বক্তব্য]

আরও