তিস্তা চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করছে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এ সময় তিস্তা নদীবেষ্টিত লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার ১১টি পয়েন্টে সমাবেশ, পদযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হবে। এ আন্দোলনের দাবির দুটি অংশ: এক. ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর; দুই. তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। তিস্তা নদীর সংকটের সমাধানের জন্য তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিকল্প নেই। প্রশ্ন হলো, ভারতের কাছ থেকে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না করে যদি শুধু মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে তিস্তা অববাহিকার সংকটের সমাধান হবে কিনা।
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে তিস্তা নদীর বিদ্যমান সংকটের কারণগুলো বোঝা দরকার। তিস্তা নদীর মূল সমস্যা হলো নদীর উজানে ভারত কর্তৃক ব্যারাজ নির্মাণ করে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ। তিস্তার উজানের পানির নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে থাকায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানি পায় না আর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে আসা পানির ঢলে ব্যাপক বন্যা হয়। এর ফলে তিস্তা নদী শুকিয়ে গেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা নদীর অববাহিকায় মরুকরণ ঘটেছে, সেচের পানির সংকট তৈরি হয়েছে এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।
ভারতের গজলডোবায় নির্মিত ব্যারাজের কারণে তিস্তার পানিপ্রবাহ কী মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে তার একটা ধারণা পাওয়া যায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের তথ্য থেকে। গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের আগে ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যায়ে মার্চের শেষ ১০ দিনে বাংলাদেশে তিস্তার গড় পানিপ্রবাহ ছিল ৬ হাজার ৭১০ কিউসেক (কিউবিক ফিট পার সেকেন্ড)। গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে বর্ষা মৌসুমে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে অক্টোবরে পানি কমতে শুরু করে ডিসেম্বর নাগাদ তিস্তা শুকিয়ে যায়। সেচের জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঁচ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ শুকনো মৌসুমে গড়ে ১২০০ থেকে ১৫০০ কিউসেক পানি পায় যা কোনো কোনো সময় ২০০-৩০০ কিউসেক পর্যন্ত নেমে যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, উজানে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহের সব বাধা অপসারণ না করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা নদী মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করে তিস্তার পানি সংকটের সমস্যার কোনো সমাধান আদৌ করা সম্ভব কিনা। চীনের তৈরি প্রকল্প পরিকল্পনা অনুসারে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে তিস্তা নদী খনন করে ও দুই পাশে বাঁধ দিয়ে নদীর প্রশস্ততা হ্রাস ও গভীরতা বৃদ্ধি, ড্রেজিংয়ের মাটি দিয়ে ভরাট করে নদীর দুই পাড়ে ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি উদ্ধার এবং সেই ভূমিতে আবাসন, শিল্প পার্কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে তিস্তা নদীর সর্বোচ্চ প্রস্থ ৫ দশমিক ১ কিমি এবং গড় প্রস্থ ৩ দশমিক ১ কিমি। দুই পাশে বাঁধ দিয়ে নদীর এ প্রস্থ কমিয়ে দশমিক ৭ কিমি থেকে ১ কিমির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হলে তা নদীর গতি ও পানি ধারণক্ষমতার ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। (Demonstration Project of Teesta River Comprehensive Management, South Asian Monitor, Sep 2, 2020)
নদী বিশেষজ্ঞ এবং কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার পরিবেশ, ভূগোল ও ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানের গবেষণা অনুসারে, এ প্রকল্পের আওতায় শুধু নদীর প্রশস্ততা কমিয়ে এবং গভীরতা বাড়িয়ে শুকনা মৌসুমে পানিপ্রবাহের পরিমাণ বাড়ানো যাবে না। নদীটি খনন করার ফলে তলদেশে যে পানি দেখা যাবে তা আসলে নদীর দুই পাড়ের অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া অন্য কিছু নয়। নদীতে দৃশ্যমান পানি সেচের জন্য ব্যবহার করলে অববাহিকা অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাবে, তাতে অগভীর নলকূপের মাধ্যমে আহরিত পানীয় জল এবং সেচের পানির প্রাপ্যতা কমে যাবে।
নদীটির দুই পাড়জুড়ে বাঁধ দেয়ার কারণে প্রস্থচ্ছেদ অনেক কমে যাবে, ফলে বর্ষাকালে যখন পানিপ্রবাহ অনেক বেড়ে যাবে তখন স্রোতের মাত্রাও অনেক বেড়ে যাবে এবং দুই পাড়ের ভাঙনপ্রবণতা অনেক বেড়ে যাবে। দুই পাড়ের বাঁধের কারণে উপনদী ও শাখা নদীগুলোর সঙ্গে তিস্তার মূলধারার সংযোগও বিঘ্নিত হবে এবং দুই পাড়ের প্লাবনভূমিতে বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়তে না পারার কারণে পাড়ের বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়বে। এমনকি পুনরুদ্ধার করা জমিগুলো নদীর সক্রিয় বন্যাপ্রবাহের এলাকায় থাকবে এবং তাতে সেগুলোর বন্যাজনিত ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। (তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মো. খালেকুজ্জামান, সর্বজনকথা, June 21, 2023)
কাজেই ভারতের কাছ থেকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না করে যত মেগা প্রকল্পই করা হোক না কেন তিস্তা নদীর সংকটের সমাধান হবে না। এমনকি ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি ভাগাভাগির চুক্তি যেনতেনভাবে করা হলেও সংকট রয়ে যাবে। এর কারণ হলো, গঙ্গা চুক্তিতে যেভাবে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ভাগাভাগির চুক্তি হয়েছে, ফারাক্কার উজানে পানি প্রত্যাহার বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি, খসরা তিস্তা চুক্তিতেও একইভাবে শুধু ভারতের গজলডোবা পয়েন্টে পানি ভাগাভাগির ফর্মুলা রাখা হয়েছে। কিন্তু গজলডোবার উজানে বিশেষত সিকিমে অনেকগুলো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হয়েছে বা হচ্ছে যেগুলো তিস্তার পানিপ্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলছে।
তিস্তা চুক্তিতে উজানে নদীর পানিপ্রবাহ ও গতিপথ পরিবর্তন বিষয়ে বিধিনিষেধ না থাকলে এবং উজানে যেকোনো প্রকল্পের ব্যাপারে নিয়মিত তথ্য-বিনিময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলে গঙ্গা চুক্তিতে যেভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিস্তা চুক্তির ফলেও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুধু তিস্তা নয়, ভারতের সঙ্গে সব আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে চুক্তি করতে হবে এবং চুক্তিতে উজানে পানি প্রত্যাহার ও নদীর গতিপথ বিষয়ে বিধিনিষেধের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের ওয়াটার কোর্স কনভেনশন ১৯৯৭-এর আলোকে পানির ন্যায্য ব্যবহার, নো হার্ম প্রিন্সিপাল, ন্যূনতম পরিবেশ প্রবাহ ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিটি ২০২৬ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবে, এ চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
কল্লোল মোস্তফা: লেখক ও গবেষক