টেকসই শিল্পোন্নয়নে রফতানির মান ও সক্ষমতার উন্নয়ন জরুরি

বাংলাদেশের রফতানি খাতের সম্ভাবনা অনেক বড়। আমাদের তরুণ শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্য আছে। কিন্তু ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সফল হতে হলে পুরনো সাফল্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তৈরি পোশাক খাত আমাদের পথ দেখিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে অন্যান্য শিল্প খাত শক্তিশালী ক

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রফতানি খাত। স্বাধীনতার পর কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে শিল্প ও রফতানিমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, শুধু রফতানি আয় বাড়লেই কি টেকসই শিল্প উন্নয়ন নিশ্চিত হবে? নাকি প্রয়োজন শিল্প কাঠামোর বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তুলনামূলক আমদানি বেশি হলেও রফতানি আয় আগের তুলনায় বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি আয় ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার হয়েছিল। এর বড় অংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এদিকে সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রফতানি আয় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা গত বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।

বর্তমানে দেশের রফতানি কাঠামো সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক খাত একাই মোট পণ্য রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি অংশজুড়ে রয়েছে। এ নির্ভরতা একদিকে শক্তি, অন্যদিকে ঝুঁকি। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পরিবর্তন, ক্রেতাদের আচরণে বদল, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি বা প্রতিযোগী দেশের অগ্রগতি বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়েও তা দেখা যাচ্ছে।

রফতানি প্রবৃদ্ধির সামনে নতুন বাস্তবতা

বিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব তার একটি বাস্তব উদাহরণ। ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়, বরং মানসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রম অধিকার, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের রফতানি প্রতিযোগিতা শুধু শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবনের ওপর।

বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট খাত এবং অন্যান্য শিল্প খাতে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায়ও বলা হয়েছে, তৈরি পোশাকের বাইরে রফতানিবৈচিত্র্য বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাপূর্ণ শিল্প খাতকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।

শিল্প খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের শিল্প খাতের সামনে কয়েকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। অনেক শিল্প এখনো আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। শুধু কম শ্রম খরচের সুবিধা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন।

দ্বিতীয়ত, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। ভবিষ্যতের শিল্পে প্রয়োজন প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা, গবেষণা সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা। কিন্তু শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরির ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

তৃতীয়ত, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য সহজ অর্থায়ন, অবকাঠামো, দ্রুত সেবা, নীতি স্থিতিশীলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো জরুরি। বিশেষ করে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সহজ শর্তে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ অতি দ্রুত নেয়া প্রয়োজন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশের রফতানিবৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে পণ্যের মান, ব্যবসার খরচ, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বিকল্প শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

আয় বাড়াতে প্রয়োজন রফতানি সক্ষমতা

একটি দেশের প্রকৃত শিল্প উন্নয়ন তখনই হয়, যখন সে দেশ শুধু বেশি পণ্য বিক্রি করে না, বরং বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারে। বাংলাদেশকে এখন ‘কম খরচের উৎপাদক’ থেকে ‘উচ্চমানের উদ্ভাবনী উৎপাদক’ হওয়ার পথে এগোতে হবে। এমনটি চীন অনেক আগেই শুরু করেছে। ওখানে ঘরে ঘরে রফতানিমুখী ক্ষুদ্র শিল্প দেখা যায়।

এসব লক্ষ বাস্তবায়নের জন্য শিল্প গবেষণা ও উন্নয়নের বিনিয়োগ করা, উৎপাদনকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা, দক্ষ জনবল তৈরিতে মনোযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণে উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি রফতানি বহুমুখীকরণের জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও যাতে রফতানি সক্ষম হয় সেজন্যও উদ্যোগ জরুরি।

ভবিষ্যতের পথ

বাংলাদেশের রফতানি খাতের সম্ভাবনা অনেক বড়। আমাদের তরুণ শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্য আছে। কিন্তু ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সফল হতে হলে পুরনো সাফল্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তৈরি পোশাক খাত আমাদের পথ দেখিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে অন্যান্য শিল্প খাত শক্তিশালী করা। পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের ওপর ভিত্তি করেই রফতানি প্রবৃদ্ধির পরবর্তী অধ্যায়ের যাত্রা শুরু হবে।

বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন একটাই। আমরা কি শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়াব, নাকি এর মান ও সক্ষমতাও উন্নত করব? টেকসই শিল্প উন্নয়নের জন্য দ্বিতীয় পথই হতে পারে ভবিষ্যতের একমাত্র সঠিক দিকনির্দেশনা।

ড. মো. সালাহ উদ্দিন: গবেষক ও রফতানি বাণিজ্য প্রধান, প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি

আরও