প্রতি বছরের মতো এবারো গত ১০ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হলো বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমর্থনে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা, সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এ দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মানসিক স্বাস্থ্য দিবস-২০২৫-এর এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে "জন্ম হোক সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ হোক আলোকিত। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে এ বছরও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দিবসটি পালিত হয়েছে। মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত এবং এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এ দিবসের ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালনের মধ্য দিয়ে শারীরিক অনেক অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্থতাও যে একটি ব্যাধি বা রোগ সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে মানসিক স্বাস্থ্য বলতে বুঝায় কোনো ব্যক্তির এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যেখানে সে তার ক্ষমতা উপলব্ধি করতে পারে, জীবনের স্বাভাবিক চাপ দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারে, উৎপাদনশীল ও ফলপ্রসূভাবে কাজ করতে পারে যার মাধ্যমে সে তার নিজ সমাজে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। এটি একজন ব্যক্তির চিন্তা, আবেগ, অনুভূতি ও আচরণকে প্রভাবিত করে। একজন ব্যক্তি কীভাবে তার মনস্তাত্ত্বিক চাপ মোকাবেলা করবে এবং অন্যদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে, জীবনের নানাবিধ উপযোগী সিদ্ধান্ত নেবে তাও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। একজন ব্যক্তির মানসিক সুস্বাস্থ্য তার বিশেষ মানবিক অধিকার। কারণ মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকলেই একজন ব্যক্তি তার নিজের জীবনের যথাযথ মূল্য খুঁজে পান, বিভিন্ন চাপ ও হতাশা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন, পারস্পরিক সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হন এবং কাজ ও দায়িত্ব পালনে যথাযথ মনোযোগী হয়ে থাকেন।
মূলত মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন বাংলাদেশে কেবলমাত্র চিকিৎসার বিষয় নয় বরং মানবাধিকার ও আইনি অধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সরকারের দায় যা নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচ্য। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণার্থে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এক্ষেত্রে তুলনামূলক সফলতা অর্জন করলেও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগেও বিশ্বের বহু দেশ বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো রয়েছে অবহেলা, কুসংস্কার ও আইনি দুর্বলতা। বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যেমন মানসিক রোগীর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ, মানসিক রোগের সময় উপযুক্ত চিকিৎসা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে রোগীর সম্মতি নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতা ও সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ প্রণয়ন করেছে।
২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনের মূল বিষয়বস্তু হলো এ আইন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে পরিচালিত হবে, তার নীতিমালা নির্ধারণ করে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো স্থাপন ও সেগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য এটি বিধান তৈরি করে, মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মূল্যায়ন, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসার পদ্ধতিগুলো আইনে বর্ণিত আছে। এ আইন একটি জাতীয় কমিটি গঠনের বিধান রাখে, যা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম তদারকি ও পর্যালোচনা করবে। এ আইনের পাশাপাশি, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের জন্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি, ২০২২ একটি গেজেট প্রকাশনার মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৬ নামে একটি খসড়াও ছিল, যা এই আইনের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে বলে ধারণা করা যায়।
উল্লেখ্য, যে উদ্দেশ্য নিয়ে অত্র আইনটি প্রণীত হয়েছে সেটা নানাবিধ কারণে ফলপ্রসূ হচ্ছে না। যেমন আইনটি সম্পর্কে সর্বসাধারণ যথেষ্ট জ্ঞান নেই, আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের মতো এমন জনবহুল দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং রেজিস্টার্ড মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতালের সংখ্যা খুবই সীমিত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ অপ্রতুল এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো পর্যন্ত নেই। উপরন্তু সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ বাস্তবায়নে বিশেষ অন্তরায় হিসেবে বিবেচ্য।
তথাপিও কিছু সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় আইনি সহায়তা পাওয়া সম্ভব যেমন—
প্রথমত, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা এর মাধ্যমে যেসব ব্যক্তি অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল তার সরকার থেকে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা পাবেন। লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস অ্যাক্ট, ২০০০ অনুযায়ী একজন মানসিক রোগী বা তার অভিভাবক ফৌজদারি, দেওয়ানি বা পারিবারিক মামলায় সরকারের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে পারবেন। এক্ষেত্রে জেলা জজকোর্টে অবস্থিত জেলা লিগাল এইড অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। আবার এ সংক্রান্ত বিষয়ে ১৬৪৩০ নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি হাসপাতালগুলোয় সামাজিক সেবা বিভাগ যেমন জাতীয় মানসিক শান্তি ইনস্টিটিউট বা অন্যান্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীরা আইনি সমস্যা থাকলে সামাজিক সেবা কর্মীদের মাধ্যমে সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রোগীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভর্তি পরিবারের অমানবিক আচরণ বা জবরদস্তি চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অভিযোগ থাকলে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, মানসিক রোগীর আইনগত অধিকার যদি লঙ্ঘিত হয় যেমন শারীরিক নির্যাতন, আটকে রাখা বা জোরপূর্বক ওষুধ খাওয়ানো ইত্যাদির ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা যায়।
চতুর্থত, বাংলাদেশে বিভিন্ন এনজিও মানবাধিকার সংস্থা রয়েছে যারা বিভিন্ন উপায়ে আইনগত সহায়তা প্রদান করে থাকে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেমন ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্র্যাক হিউম্যান রাইট অ্যান্ড লিগ্যাল এইড সার্ভিস।
এছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিকারের জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী:
প্রথমত, জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ফলে জনগণ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হবে এবং কুসংস্কার দূর করে মানসিক রোগকে একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা হিসেবে সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করতে অভ্যস্ত হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসক ও পরামর্শ নিয়োগ করা জরুরি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও এ-সংক্রান্ত ক্লিনিকের সংখ্যা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ মোবাইল বা অনলাইনভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সেবা টেলি কাউন্সিলিং বিষয়টিকে জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সমাজ ও পরিবারের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। যেমন মানসিক রোগীদের প্রতি অবশ্যই সহানুভূতিশীল হতে হবে, তাদেরকে ভালোবাসতে হবে। উল্লেখ্য, পারিবারিক সহায়তা, সহযোগিতা ও ভালোবাসা মানসিক রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চতুর্থত, প্রসঙ্গত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা উচিত। কর্মস্থলে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি চালু ও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও উদ্বেগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে।
পঞ্চমত, মেডিটেশন, প্রার্থনা ও ধ্যান, নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্য ও পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিকায়নের মাধ্যমেও মানসিক চাপ কমে এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত হয়।
ষষ্ঠত, সর্বোপরি সরকারকে ২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনের যথাযথ বাস্তবায়নসহ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
প্রত্যেক নাগরিকের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। মানসিক রোগীকে সম্মান প্রদর্শন এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা ও মর্যাদা প্রদান করতে হবে। কোন মানসিক রোগীকে সম্মতি ছাড়া ভর্তি করার ব্যাপারে কঠোরভাবে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। সরকারের অনুমতি ব্যতীত কেউ মানসিক রোগীকে আবাসিকভাবে রাখতে পারবে না। ক্ষেত্রবিশেষ আদালত মানসিক রোগীকে চিকিৎসার জন্য নির্দেশ দিতে পারে। উল্লেখ্য, মানসিকভাবে অযোগ্য কোনো ব্যক্তি যদি কোন প্রকার অপরাধ সংঘটন করে তাহলে তার বিচারের ক্ষেত্রে আদালত বিশেষ বিবেচনা করে থাকে। জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব পার্সনস উইদ ডিসঅ্যাবিলিটিজ (সিআরপিডি) অনুযায়ী মানসিক রোগীরা পূর্ণ নাগরিক অধিকার পায় এবং সম্মানের সঙ্গে সমাজে বসবাসের অধিকার রাখে। এ কনভেনশন অনুযায়ী মানসিক রোগীরা শিক্ষা, চাকরি, বাসস্থান ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা গ্রহণে কোনো প্রকার বৈষম্যের শিকার হবে না অর্থাৎ সমতা লাভ করবে এবং কর্মক্ষেত্রে তার প্রতি কোনো বৈষম্য আরোপ করা যাবে না।
মানসিক রোগীর উল্লেখিত অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে ২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইন ও ২০২২ সালের মানসিক স্বাস্থ্য নীতির যথার্থ প্রয়োগের দ্বারা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনসাধারণের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে প্রত্যেক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটগুলো মোকাবেলা করার লক্ষ্যে এবং ভবিষ্যতে আরো উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের একটি বিকল্প, কার্যকর ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ অবশ্যই গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
ড. মো. রাজিউর রহমান: সভাপতি আইন বিভাগ, সহযোগী অধ্যাপক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ড. মো: আবু সালেহ: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়