প্রথমেই মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক একটি চমৎকার প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেছেন। বেশি সময় থাকলে সে অনুযায়ী আলোচনা করা যেত, তাহলে হয়তো বিষয়টি আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ হতো। যেহেতু আমি বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে কাজ করি, তাই আমার দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য দিকগুলো আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকের দু-তিনটি দিক নিয়ে আলোচনা করছি।
প্রথমত, ব্যবসায় আধিপত্য (ডমিন্যান্স) থাকা উচিত নাকি উচিত নয়—সে বিষয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ব্যবসায়ের একটি পর্যায়ে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বাজারে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। এতে সমস্যা নেই। তবে সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন এ অবস্থানের অপব্যবহার করা হয়। আধিপত্য বা প্রভাবের কোনো অপব্যবহার হচ্ছে কিনা বাজারে তা পর্যবেক্ষণ করাই প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজ এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
দ্বিতীয়ত, বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এটির দ্বিমতও পোষণ করা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে না পারার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আমরা শক্তিশালী মামলা তৈরি করতে পারি না। এ বিষয়টিও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় উঠে এসেছে। লাইসেন্সিং বা যথাযথ নথি সংরক্ষণ (রেকর্ড কিপিং) না থাকলে আমাদের পক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সঠিক তথ্য-উপাত্ত না থাকলে এসব মামলায় আদালতে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় এবং তা মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, ভ্যালু চেইন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। একটি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী ভ্যালু চেইনের কোন পর্যায় থেকে কোন পর্যায় পর্যন্ত থাকবে সেটিও একটি বড় আলোচনার বিষয়। আমি মনে করি, তারা ভ্যালু চেইনের বিভিন্ন স্তরেই থাকতে পারেন। তবে মূল বিষয় হচ্ছে, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছে কিনা সেটি দেখতে হবে।
এছাড়া গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আইনগত তথ্য পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এর বড় ভুক্তভোগী। কারণ আমাদের কাছে এখনো তেমন কোনো শক্তিশালী ডাটাবেজ নেই, যার ওপর ভিত্তি করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের একটি রিয়েল-টাইম সিস্টেম চালুর চেষ্টা করছি।
প্রতিযোগিতা কমিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে সেগুলো প্রতিরোধ ও নির্মূল করা। প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড বলতে কী বোঝায় সে বিষয়ে এখানে জিজ্ঞাসা করা হলে ৮০-৯০ শতাংশই বলবেন সিন্ডিকেশন।
সিন্ডিকেশন একটি প্রচলিত পরিভাষা। তবে আইনের ভাষায় বলা হয় কার্টেল, গোপন যোগসাজশ, একচেটিয়া বাজার (মনোপলি) বা স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ (অলিগোপলি)। আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কার্টেল থাকতে পারে, তবে তারা পণ্যের অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেন এবং বাজারকে প্রভাবিত করেন, তখনই ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। তখন আমাদের হস্তক্ষেপের জায়গাটি তৈরি হয়।
প্রতিযোগিতা কমিশনে এরই মধ্যে ১০২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জের বিষয় হলো প্রায় প্রতিটি মামলাই বর্তমানে উচ্চ আদালতে গিয়ে আটকে আছে। আপিল বা রিটের মাধ্যমে এসব মামলা আটকে থাকে। আমরা গত সপ্তাহে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করেছি। যাতে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতিযোগিতা কমিশনের আগের চেয়ারম্যান ও অন্য সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে আমি এবং আরো তিনজন সদস্য চার সপ্তাহ আগে প্রতিযোগিতা কমিশনে যোগদান করেছি। এখন পুরো বিষয়টি নতুন করে গুছিয়ে ও বুঝে নেয়ার চেষ্টা করছি।
দীর্ঘদিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রাজস্ব বিভাগে কাজ করেছি। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে আমার একটি সম্যক ধারণা রয়েছে। আপনাদের সহযোগিতা পেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ভোক্তাদের কাছে ন্যায্য দামে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করব এবং সেটি বাস্তবায়নে আমরা সচেষ্ট থাকব।
এএইচএম আহসান: চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম: বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]