আলোকপাত

শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আগামীর উচ্চশিক্ষা ভাবনা

মহান মুজিব বর্ষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষপূর্তির এই বছর, ২০২১ আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের ও আনন্দময়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ-পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে মনে করা হয়েছিল তত্কালীন পূর্ববঙ্গবাসীদের জন্য এক

মহান মুজিব বর্ষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষপূর্তির এই বছর, ২০২১ আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের আনন্দময়।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ-পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যে ১৯২১ সালের জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে মনে করা হয়েছিল তত্কালীন পূর্ববঙ্গবাসীদের জন্য এক চমত্কার রাজকীয় ক্ষতিপূরণ

প্রতিষ্ঠার পর প্রথম প্রায় তিন দশক ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঈর্ষণীয় সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল, পূর্ব বাংলার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যে অঞ্চলের শুধু উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তাই মেটাচ্ছিল তা নয়, সার্বিক অর্থে এখানকার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ভূমিকা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলা ভাষার মর্যাদা সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের তেজস্বী ভূমিকা ঐতিহাসিক তাত্পর্য লাভ করে। অতঃপর ক্রমে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধিকার আন্দোলনে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা গ্রহণে রীতিমতো বাধ্য করে। যেন অনেকটা প্রতীকী ঘটনা হিসেবেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই প্রথম উত্তোলন হয়।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলায় (পূর্ব পাকিস্তানে) আরো পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধান্য কিছুটা হলেও সংকুচিত হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম ১৯৫৮-৬২ সালে, আইয়ুব আমলের শুরু থেকে; শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলাম ১৯৬৩ সালে, দীর্ঘ ৪৪ বছর শিক্ষকতার পর ২০০৭ সালে অবসরে যাই। ২০০৭-১১ আমি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি। তখন দেশের অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল। খুব ক্ষীণভাবে হলেও এখনো কিছুটা সংযুক্ত আছি, পিএইচডি গবেষকের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে। অর্থাৎ গত ছয় দশকেরও বেশি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-মন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছি।

গত ১০০ বছরে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার অভাবনীয় সংখ্যাগত অগ্রগতি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও হয়েছে। ১৯২১ সালে শুরুতে ছিল তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন শিক্ষার্থী তিনটি হল। বর্তমানে অনুষদ ১০টি, বিভাগ ৮৩টি, শিক্ষক ১৯৮৬, শিক্ষার্থী প্রায় ৫০ হাজার, হল ২৩টি, বিভাগ ছাড়া ইনস্টিটিউট রয়েছে ১৩টি, গবেষণা ব্যুরো কেন্দ্র (কেন্দ্রীয় মর্যাদার বিভাগীয় পর্যায়ের) মোট প্রায় ৫৭টি (অধিভুক্ত কলেজের হিসাব এসবের বাইরে) পক্ষান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে জমির পরিমাণ শুরুর ৬০০ একর থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭৫ একরে।

জমি ছাড়া সব ক্ষেত্রেই সংখ্যা পরিমাণগত বৃদ্ধি সুস্পষ্ট। প্রশ্ন জাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিচালন গুণমান নিয়ে। সাম্প্রতিক কালে নানা ক্ষেত্রেই গুণমানের আন্তর্জাতিক তুলনা এবং তার ফলাফল প্রচারের প্রচলন হয়েছেজাতীয় উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন সূচক (বা ইন্ডিকেটর) নিয়ে। শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রকাশনা, শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার বিভিন্ন উপাদান পরিচালনের (বা গভর্ন্যান্স) নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে বৈশ্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং করার ব্যবস্থা রয়েছে। বস্তুত, বিশ্বে একাধিক র্যাংকিং অনুশীলন কার্যকর রয়েছে। পরিতাপের বিষয়, প্রায় সব র্যাংকিং অনুশীলনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান আদৌ সম্মানজনক নয়। সম্প্রতি ধরনের পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষকসমাজ তাদের নিজেদের অবস্থানের উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে আগ্রহী হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক . মো. আখতারুজ্জামানের সর্বশেষ সিনেট বক্তৃতায় (২৪ জুন ২০২১) এমন উদ্যোগের আশ্বাস পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন অবশ্যই বেশ কঠিন, তবে মোটেও অসম্ভব নয়।

ঐতিহাসিকভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা তথা রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক বিশেষ অবস্থান দখল করে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন তার দু-দুটো স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানে (২০০৬-২৬ ২০১৭-৩০) দেশে একটি স্নাতকোত্তর পর্যায়ের নতুন আলাদা রিসার্চ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার কথা সুপারিশ করেছে এজন্য যে বিদ্যমান কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণভাবে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় করা বাস্তব কারণেই সম্ভব নয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও নয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী স্নাতক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু রেখেই এখানকার গবেষণা প্রকাশনা কার্যক্রম অনেক বেশি শক্তিশালী করা যায়। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান গবেষণা ইনস্টিটিউটগুলোকে সত্যিকার পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করতে হবে, প্রয়োজনে নতুন কিছু গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে। বর্তমানের অসংখ্য গবেষণা কেন্দ্র নামের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নামসর্বস্ব না রেখে হয় সত্যিকার কার্যকর করতে হবে, না হয় বন্ধ করে দিতে হবে।

বর্তমানের বিভাগগুলোর শিক্ষাদানের মান উন্নত করতে হবে, পাশাপাশি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রমও শক্তিশালী করতে হবে। বলা বাহুল্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতি থাকতেই পারে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে হতেই হবে সৃষ্টিশীল গবেষণামনস্ক, নিষ্ঠাবান, আন্তরিক, পরিশ্রমী উন্নত নৈতিকতাবোধসম্পন্ন। দেশপ্রেমিক তো বটেই। এমন শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগেও ছিলেন, এখনো অনেকেই আছেন, তবে মোট সংখ্যার তুলনায় হয়তো খুবই কম।

বিশ্বমঞ্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এগিয়ে নেয়ার জন্য এর শিক্ষক গবেষকদের মানসম্পন্ন প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সব রকমের প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিগত উত্কর্ষ অর্জনের পরিকল্পনা থাকা অতি আবশ্যক। হাজার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রকৃত বিশ্বমানের গবেষক-শিক্ষক আছেন, যাদের সংখ্যা অবশ্য খুবই সীমিত কিন্তু তারা তো দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। বিশ্ববিদ্যালয় তথা মঞ্জুরী কমিশন তাদের কথা তরুণ শিক্ষকদের সামনে তুলে ধরতে পারেন। তারা অনেকেই স্বভাবগতভাবে প্রচারবিমুখ।

আগামীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সর্বোচ্চ সুযোগ সৃষ্টি করতেই হবে। মঞ্জুরী কমিশন উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প বা হেকাপের মাধ্যমে (২০০৯ থেকে) দেশে প্রথম বড় রকমের গবেষণা প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও সে সুযোগ অনেকটা লাভ করেছে। ভবিষ্যতে গবেষণার সুযোগ আরো সমৃদ্ধ করতে হবে। লক্ষ্যে আর্থিক বরাদ্দ বহুগুণ বাড়াতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে স্থান সংকুলানের তীব্র সমস্যার মধ্যে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত হবে বর্তমানে উন্নয়নশীল পূর্বাচল নতুন শহরে সরকারের কাছ থেকে কমপক্ষে ১০০ একর জমি বরাদ্দ নিয়ে আধুনিক গবেষণা ক্যাম্পাস গড়ে তোলা। সেখানে প্রধানত চিকিৎসাবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান আইটি-বিষয়ক গবেষণার প্রাধান্য থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা অধ্যাপক বা রিসার্চ প্রফেসর নিযুক্ত থাকবেন, যাদের মূল দায়িত্বই হবে পূর্ণকালীন গবেষণা, অবশ্য মাঝেমধ্যে তারা তাদের কাজনির্ভর কিছু গণবক্তৃতাও দেবেন।

নতুন শহরে নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণ করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ক্যাম্পাসের পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, বস্তুত ক্যাম্পাসের এক ধরনের ভৌত নবায়ন বা রিনিউয়াল দরকার হবে, যা আগামী ২০ বছরে (অর্থাৎ ২০৪১ সালের মধ্যে) ১০০ বছরের জন্য পরিকল্পিত বাস্তবায়ন হবে (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমন বাংলাদেশের জন্য শতবর্ষী বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ অনুমোদন করেছেন) বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য এরই মধ্যে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান ক্যাম্পাসের কার্জন হল ক্যাম্পাস, এসএম হল, ফজলুল হক হল, শহীদুল্লাহ হল, উপাচার্য ভবন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, চারুকলা অনুষদ ভবন, টিএসসির সবুজ চত্বর, প্রাচীন বৃক্ষ শোভা ইত্যাদি সংরক্ষণ করে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সময়ানুগভাবে সুবিন্যস্ত করা প্রাসঙ্গিক হবে। ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক কারণে বাংলা বিভাগটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সমৃদ্ধ করা উচিত, যাতে এটি বিশ্বের সেরা বাংলা ভাষা সাহিত্যের শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে, হওয়া উচিত। এজন্য নান্দনিক স্থাপত্য নকশাবিশিষ্ট আলাদা ভবন থাকা উচিত।

ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন বাংলাদেশে পরিচালনগত দিক দিয়ে ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। ১৯৭৩ অধ্যাদেশ যার মূল চালিকাশক্তি। অধ্যাদেশের বেশকিছু সীমাবদ্ধতার কথা নানা সময়ে, নানা মহল থেকে আলোচিত হয়েছে। আমরাও মনে করি, অধ্যাদেশের পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন বা গভর্ন্যান্সের মৌলিকত্ব যে গণতান্ত্রিক চেতনা, তা বজায় রেখেই সময়োপযোগী করা সম্ভব হতে পারে।

স্বাধীন বাংলাদেশ যদি ৫০ বছরে অর্থনৈতিক সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের অতি চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরে থাকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন তাহলে তেমন সাফল্য দেখাতে পারল না, তা আমাদের ভাবতে হবে। আগামী ৫০ বছরে যেন দেশ কাঙ্ক্ষিত উন্নত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে পায়। গর্বের বিষয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সুযোগ্য কন্যা দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

 

নজরুল ইসলাম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল পরিবেশ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান

আরও