তরুণদের মনোসামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য

২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল একটি প্রজন্মের রক্ত, ত্যাগ আর অদম্য সাহসের মহাকাব্য। কিন্তু রাজপথের উত্তাপ হয়তো থিতিয়ে এসেছে, তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর শান্ত করিডোরগুলোয় বর্তমানে এক নীরব হাহাকার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যাকে আমরা বলছি এক গভীর ‘অদৃশ্য ক্ষত’। ইউনেস্কো ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পরিচালিত জুলাই ২০২৫-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক ‘র‍্যাপিড নিডস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনটি আমাদের এমন এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উঠে এসেছে।

ঢাকা ও রাজশাহী অঞ্চলের ২২টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এ জরিপে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার ফলে তাদের মনের ওপর এক ভয়াবহ ট্রমা বা মানসিক অভিঘাত জেঁকে বসেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার’ বা সংক্ষেপে পিটিএসডি। সাধারণ পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে বললে, এটি এমন এক অবস্থা যেখানে কোনো ভয়াবহ স্মৃতি মানুষের মস্তিষ্কে স্থায়ী হয়ে যায়। এর ফলে একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ করেই সেই আতঙ্কিত দিনগুলোর কথা মনে করে শিউরে ওঠেন, যাকে বলা হয় ‘ফ্ল্যাশব্যাক’। রাতের পর রাত তাদের কাটে নির্ঘুম ও দুঃস্বপ্নে, সারাক্ষণ তারা এক অজানা ভয়ে তটস্থ থাকেন এবং মেজাজ হয়ে যায় খিটখিটে। এ অদৃশ্য ক্ষত কেবল মনের ওপর নয়, শরীরের ওপরও বিষাক্ত প্রভাব ফেলে—দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা থেকে শুরু করে হজমের সমস্যা কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয় এটি। সামাজিকভাবে একজন শিক্ষার্থী নিজেকে গুটিয়ে নেন, যার ফলে তার ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবন স্থবির হয়ে পড়ে এবং পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ হারিয়ে ফেলে তারা ভবিষ্যতের প্রতি এক চরম অনীহায় নিমজ্জিত হয়।

গবেষণার পরিসংখ্যানগুলো যখন বিশ্লেষণ করা হয়, তখন তা কেবল সংখ্যা থাকে না, বরং এক আর্তনাদ হয়ে ধরা দেয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত এ সমীক্ষায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪২৫ জন শিক্ষার্থী মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার (যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্কেল ব্যবহার করে নির্ধারিত) ‘পিটিএসডি’তে ভুগছেন। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ৪২ শতাংশের মধ্যে পিটিএসডির লক্ষণ স্পষ্ট, ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতা এবং প্রায় ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী তীব্র উদ্বেগে ভুগছেন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ট্রমার মাত্রা অন্য সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি দেখা গেছে। যারা সরাসরি সহিংসতা, মৃত্যু বা প্রিয় বন্ধুকে জখম হতে দেখেছেন, তাদের মনের ভেতর সেই স্মৃতিগুলো আজও দগদগে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ মানসিক ট্রমা সবার ওপর সমানভাবে আঘাত করেনি। নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও ভয়ের হার পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি, আবার উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও ট্রমার প্রভাব প্রবলভাবে দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে যে পুরো সমাজ যখন অস্থির থাকে, তখন কেবল আর্থিক সচ্ছলতা মনের শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।

যেহেতু এ গবেষণাটি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও সুশৃঙ্খলভাবে করা হয়েছে, তাই এ নমুনা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল পুরো দেশের তরুণ প্রজন্মের এক ভয়াবহ ঝুঁকি নির্দেশ করে। যদি দ্রুত নিরাময়ের ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তবে আমাদের পুরো তরুণ প্রজন্ম এক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সংকটে পড়বে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থেকে তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা ও অকাল বার্ধক্যের মতো শারীরিক সমস্যা ছড়িয়ে পড়বে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে—মেধাসম্পদের চরম অপচয় ঘটবে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করতে বাধাগ্রস্ত হবে এবং কর্মক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং মাদকের প্রতি আসক্তি তৈরি হওয়ার মতো সামাজিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কাও এখানে প্রবল। অর্থাৎ একটি সুস্থ-সবল প্রজন্মের পরিবর্তে আমরা হয়তো এক মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজন্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

অথচ এ বিশাল সংকটের বিপরীতে আমাদের অবকাঠামো অত্যন্ত নড়বড়ে। জরিপকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্ধেকেরও কম প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। আর যেখানে সেবা রয়েছে, সেখানেও প্রশিক্ষিত জনবল, বাজেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের ঘাটতি রয়েছে। তার ওপর রয়েছে সামাজিক কুসংস্কার—মানসিক সমস্যা মানেই ‘পাগলামি’ বলে ধরে নেয়ার সেই পুরনো প্রবণতা। ফলে একজন শিক্ষার্থী নিভৃতে কাঁদলেও লোকলজ্জার ভয়ে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে পারছেন না। আমাদের এখন প্রথাগত বিচ্ছিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু আলাদাভাবে একজন বিশেষজ্ঞ দিয়ে এ বিপর্যয় সামাল দেয়া সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের একটি সমন্বিত ও বহুস্তরীয় অংশগ্রহণ। যেখানে ক্লিনিক্যাল চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক সমর্থন, আইনি সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ২০২৪-এর আন্দোলন ছিল ন্যায়বিচার ও সাম্যের; আর এ লড়াকু প্রজন্মের জন্য প্রকৃত ন্যায়বিচার তখনই নিশ্চিত হবে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজে তাদের ‘নিরাময়ের অধিকার’ (রাইট টু হিল) স্বীকৃত হবে। আমাদের ক্যাম্পাসগুলোকে ট্রমার উৎস থেকে নিরাময়ের একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানে রূপান্তর করার লক্ষ্যে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

সৈয়দ তানভীর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইমদাদুল হক তালুকদার: মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

রাজু দাশ: ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার (এডুকেশন- হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং), ইউনেস্কো, ঢাকা

আরও