দেশের জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এরই মধ্যে জনসংখ্যা ১৭ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এর চাপ পড়ছে ভূমির ওপর। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য আবাসন সংস্থান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ভূমির ব্যবহার বেড়ে চলেছে। বিপরীতে কমছে ফসলি জমির পরিমাণ। বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৪ শীর্ষক বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছরে দেশের ২ শতাংশ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। এতে প্রভাব পড়েছে কৃষি উৎপাদনে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যও জানাচ্ছে, সর্বশেষ পাঁচ বছরে আবাদকৃত জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। এর বিপরীতে পাঁচ বছরে হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে কেবল ৪ শতাংশ। আর চাল উৎপাদন মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে। এভাবে জনসংখ্যার হার বাড়তে থাকলে ও কৃষিজমির পরিমাণ কমতে থাকলে দেশ খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জনগণের খাদ্যের জোগানের বড় অংশই আসে কৃষি থেকে। আবাদি জমির পরিমাণ কমার অর্থ হলো কৃষি উৎপাদন কমে আসা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে সংকট তৈরি হওয়া। ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য কৃষিতে উদ্ভাবন ও জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ‘রাইস ভিশন ফর বাংলাদেশ: ২০৫০ অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে দেশের জনসংখ্যা হবে ২১ কোটি ৫৪ লাখ। তখন প্রতি বছর ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন চালের প্রয়োজন হবে। গবেষণায় বলা হয়, ধান চাষের জমির পরিমাণ না কমলেই কেবল এ চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এরই মধ্যে কৃষিজমি কমেছে এবং ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য হলেও অকৃষি খাতে ভূমির ব্যবহার আরো বাড়বে। বিপরীতে কৃষিজমির পরিমাণ কমে আসবে। সুতরাং কীভাবে স্বল্প জমিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায় সেদিকে মনোযোগী হতে হবে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন, পানি সংকট প্রভৃতি কারণে খাদ্যনিরাপত্তা এখন বিশ্বব্যাপীই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কৃষি জৈবপ্রযুক্তি বিষয়ক যুব ফোরামে দেশী-বিদেশী গবেষক ও নীতিনির্ধারকরাও তাই ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও অভিযোজ্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোয় জোর দিয়েছেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা হলেও এখনো বিভিন্ন নিত্যপণ্য আমদানি করতে হয়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জিনোম বিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে পুষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
দেশের কৃষি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এ দেশের বিজ্ঞানীরা সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছেন, কৃষকরা পরিশ্রম দিয়ে উৎপাদন বাড়িয়েছেন। বিশেষত ব্রি লবণাক্ততা সহনশীল, একটি উচ্চফলনশীল বোরো ও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী তিনটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। নতুন উদ্ভাবিত তিনটি জাতসহ এখন পর্যন্ত ব্রি ১২১টি জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে আটটি উচ্চফলনশীল বা হাইব্রিড। সুতরাং উদ্ভাবনের মাধ্যমে আরো নতুন ফসলের জাত ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তাই বর্তমানে প্রয়োজন কৃষিতে জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য টেকসই সমাধান তৈরি করতে হবে, যাতে উৎপাদনে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়। এজন্য গবেষণাকর্ম জোরদার করতে হবে। বিশ্বব্যাপী কৃষিতে বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশের কৃষি খাত কিছুটা পিছিয়ে আছে। এর অন্যতম কারণ দুর্বল গবেষণা অবকাঠামো ও গবেষণা ও উদ্ভাবনে পরিকল্পিত বিনিয়োগের অভাব। এছাড়া গবেষণায় বিনিয়োগের পরিমাণও যৎসামান্য, জিডিপির প্রায় দশমিক শূন্য ২৬ শতাংশের কাছাকাছি। কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়াতে হলে গবেষণাকর্ম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও টেকসই নীতি কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের অন্যতম ধাপ হলো পর্যাপ্ত উৎপাদন। এক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে কৃষিপ্রযুক্তির প্রয়োগ অপরিহার্য। এরই মধ্যে জিনোম এডিটিং, বায়োটেকনোলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং উচ্চফলনশীল, রোগ প্রতিরোধক এবং জলবায়ুর অভিঘাত সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে। ২০১২ সালে আবিষ্কৃত ক্রিসপার-কাস জিনোম এডিটিং প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা চলছে উদ্ভিদে। প্রযুক্তিটি ব্যবহারের মাধ্যমে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি উন্নত ফসলের জাত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারতসহ অনেক দেশের বাজারে চলে এসেছে। দেশকেও এ প্রযুক্তির ব্যবহারের দিকে আরো এগোতে হবে। বিশেষত বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারে এমন ফসলের উৎপাদনে প্রযুক্তি কাজে লাগানো দরকার। এটি সম্ভব হলে প্রতি বছর নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে পরিমাণ ফসল নষ্ট হয় তা বাঁচানো যাবে। এছাড়া পর্যাপ্ত উৎপাদনের সঙ্গে পর্যাপ্ত পুষ্টির দিকেও নজর দিতে হবে। উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন খাবার উৎপাদনেও মনোযোগ প্রয়োজন। তবে বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে যে জাতগুলো উদ্ভাবন করা হচ্ছে বা হবে, তার মধ্যে কোনো ক্ষতিকর উপাদানের সংযোজন বা প্রভাব রয়েছে কিনা, সেটিও অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্ট খাদ্যশস্য যেন স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি না করে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য জিএমও ও ক্রসিং দুটোর জন্যই তদারকি ব্যবস্থা রাখতে হবে। বায়োটেকনোলজি পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলে কিনা, সেটাও দেখতে হবে। এসব গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক গবেষণাগার নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি, আধুনিক যুগে কৃষি শুধু বীজ ও সারের ওপর নির্ভরশীল নয়। নির্ভুল বা যথার্থ কৃষি ব্যবস্থায় সেন্সর, ড্রোন এবং উপগ্রহ চিত্রের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে কৃষকরা তাদের ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ, সারের চাহিদা এবং রোগ-বালাইয়ের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারেন। এটি কৃষিপণ্যের উপকরণের অপচয় কমায় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিগ ডাটা ব্যবহার করে কৃষিসংক্রান্ত সব তথ্য (মাটি, জলবায়ু, বাজার) একটি কেন্দ্রীয় প্লাটফর্মে একত্র করা যেতে পারে। এ প্লাটফর্ম কৃষকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে, যেমন কোন ফসল কোথায় চাষ করলে লাভ বেশি হবে, কখন বীজ বপন করতে হবে এবং বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি। এগুলো বিবেচনায় রাখাও প্রয়োজন। কৃষিতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যা উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং পুষ্টির নিশ্চয়তা দেবে।