ড. এ কে এনামুল হক, ডেপুটি ভাইস চ্যান্সেলর, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ ক্যাম্পাস। এর আগে তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপকের ভূমিকা পালন করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের সম্মানিত নির্বাহী পরিচালক এবং ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের পরিচালক। সাম্প্রতিক অর্থনীতির নানা প্রশ্ন নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
সম্প্রতি সরকার কয়েকটি পণ্যের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়িয়েছে, যা বাজারে কিছুটা অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। সরকারের কাছে ভ্যাট বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না?
যতটুকু বোঝা যায়, সরকার এ পদক্ষেপ আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য গ্রহণ করেছে। তবে আমার মনে হয়েছে, এ মুহূর্তে এটি কার্যকর না করে সরকার বলতে পারত, ‘আমি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’ এবং এই আলোচনার পরিধি শুধু সরকারের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে, অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে হওয়া উচিত ছিল।
আমরা সাধারণত স্টেকহোল্ডার বলতে কেবল ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে বুঝি, কিন্তু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বাইরেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ রয়েছে। ভ্যাট বৃদ্ধির পর অর্থনৈতিক মহলের অনেকে বলছেন যে এ সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়নি। সরকারের উচিত ছিল বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে কর-জিডিপি বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণ করা।
এ বিষয়ে সবাই একমত যে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এটি কীভাবে করা হবে? যেহেতু বর্তমান সরকার নির্বাচিত নয়, তাই তাদের অংশগ্রহণমূলক নীতি গ্রহণ করা উচিত ছিল। এতে সরকারের সমালোচনা কম হতো এবং নীতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত।
সরকার যদি শুধু এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তাহলে এটি এনবিআরের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নেয়া হয়েছে বলেই মনে হবে। কারণ এনবিআর যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্তের চেয়ে সহজ পথ বেছে নেবে, যাতে তাদের পারফরম্যান্স ভালো দেখানো যায়। কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া মানে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন, যা প্রশাসনিকভাবে জটিল। তাই আমার মতে, এ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল।
তাহলে স্বল্পমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর কি কোনো বিকল্প পথ ছিল?
অবশ্যই ছিল। সবচেয়ে সহজ ও যৌক্তিক কৌশল হচ্ছে কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা। আমাদের কর ব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো আমরা যারা নিয়মিত কর দিচ্ছি, তাদের ওপরই করের হার বাড়াচ্ছি। এতে করদাতাদের মধ্যে কর প্রদানের উৎসাহ কমে যাচ্ছে এবং তারা বিরক্ত হচ্ছেন। অথচ কর নেটওয়ার্কের বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ রয়েছেন, যারা কর দেন না।
সরকার যদি সত্যিই ট্যাক্স-জিডিপি বাড়াতে চায় তাহলে তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় দেশে অন্তত ৮০-৯০ লাখ করদাতা থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে নিবন্ধিত করদাতা মাত্র ২৩ লাখ। অর্থাৎ আমাদের কর কাঠামোর বাইরে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ রয়েছেন।
সরকার যদি স্বল্পমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে চায় তাহলে এনবিআরকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে হবে, যার মধ্যে তারা নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করবে। কিন্তু নতুন করদাতা খুঁজে বের করা সহজ কাজ নয়। এক্ষেত্রে সরকারকে বড় পরিসরে পরিকল্পনা করতে হবে।
আমরা যখন কর-জিডিপি নিয়ে আলোচনা করি, তখন করদাতার সংখ্যা নিয়ে কথা বলি না। অথচ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমাদের দেশে ৮০ লাখ করদাতা থাকত, তাহলে প্রতি বছর বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু বর্তমানে ২৩ লাখ করদাতার ওপর বারবার করের চাপ বাড়ানো হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
এজন্য সরকারকে করনীতিকে জনমুখী করতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে কর আদায় করা হবে না। বরং কর আদায়ের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে, যাতে নতুন করদাতা সহজে কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন এবং বিদ্যমান করদাতারা অহেতুক চাপে না পড়েন।
সরকার যদি দেশের উন্নতি চায়, তাহলে ট্যাক্স-জিডিপির হার বৃদ্ধির প্রথম শর্ত হবে কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা। আমাদের কর কাঠামোয় অন্তত ৮০ লাখ থেকে এক কোটি করদাতা আনা সম্ভব। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব এনবিআর এবং সরকারকে যৌথভাবে নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। কেন এমনটা হচ্ছে?
একটা বিষয় ছিল যে এবার আমনের উৎপাদন ঘাটতি ছিল। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ সমস্যা ছিল। আমার আগের লেখাগুলোয় বলেছি, ভিয়েতনামের মতো দেশে ২ লাখ বাড়িঘর বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। বন্যা
আক্রান্ত এলাকার ফসলি জমিও নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ফসলের উৎপাদন কমেছে এবং উৎপাদন কম হলে সেটা দীর্ঘমেয়াদে বাজারে প্রভাব ফেলবে—মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে খাদ্য ঘাটতি প্রকট হতে পারে। বেশকিছু দেশ সেই সময় রফতানি বন্ধ করতে পারে এবং তারা তখন এ ঘোষণা দেবে।
তাহলে সরকার যদি আগে থেকেই খাদ্যশস্য আমদানির পরিকল্পনা করে, তখন ভালো হবে। এ সময়ে আমদানি ব্যবস্থা নিয়ে এরই মধ্যে একটি ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, খাদ্য আমদানির দায়িত্ব সরকারি হাতে নিতে হবে, না হলে প্রাইভেট সেক্টর দাম বাড়ানোর চেষ্টা করবে, যা বাজারে সংকট তৈরি করতে পারে।
খাদ্যের ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) ছিল, যেটা মাঝখানে বন্ধ ছিল। সরকারের এ পদ্ধতিগুলো স্পষ্ট হওয়া দরকার, কারণ স্পষ্ট না থাকলে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করবে। অর্থাৎ সরকারের সিদ্ধান্ত যতটা স্পষ্ট হবে, তত দ্রুত বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে।
আমি মনে করি, সরকারের এ পদ্ধতিগুলোকে যতটা স্পষ্টভাবে এবং দ্রুত সমাধান করা হবে, তত দ্রুত ব্যবসায়ীদের স্পেকুলেটিভ বা ফাটকা কারবারি আচরণ থেমে যাবে। সরকার যদি এটা আগে থেকেই ভাবত, তবে খাদ্যনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সাহায্য হতো।
এটা মোটামুটি পলিসি প্রণয়নে ব্যর্থতা, তবে সরাসরি দায়ী করার মতো কিছু নয়। সরকার হয়তো ভেবেছে যে ওএমএস নিয়ে অনেক নেতিবাচক আলোচনা বাজারে হয়েছে অথবা যারা এর দায়িত্বে আছেন তারা সঠিক লোক নন। তবে এক্ষেত্রে এটাকে হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়া বা রেশন কার্ডভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এজন্য পদ্ধতিগুলো চালু রেখে আস্তে আস্তে পরিবর্তন আনা উচিত।
সামাজিক সুরক্ষায় সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে এগুলো কি যথেষ্ট বলে মনে করেন বা কী কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
আমি মনে করি, এগুলো যথেষ্ট নয়। কিছুদিন আগে সরকার অনেক সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল, যেমন ৪৩ লাখ ভুয়া সুবিধাভোগী চিহ্নিত হয়েছিল। এ কারণে সরকার সম্ভবত কিছুটা আত্মবিশ্বাসের অভাবে এ পদক্ষেপগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং এটা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
যেহেতু সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমগুলো এখন স্থগিত বা সীমিত, ফলে বাজারে আর্থিক পরিস্থিতি আরো অস্থির হতে পারে। যদি আমি জানি যে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম কম বা স্থবির হয়ে যাবে, তখন বাজার আরো অস্থির হয়ে উঠবে এবং এখানে স্পেকুলেটিভ আচরণ বাড়তে পারে। আর যদি এ ধরনের কার্যক্রম চলে থাকে, তবে বাজারে চাহিদা কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে, যা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ীদের স্পেকুলেটিভ বিহেভিয়ার কমাতে সাহায্য করবে।
এছাড়া সরকারের সামাজিক সুরক্ষার কার্যক্রমে যেমন চাল, ডাল, তেল, চিনি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেগুলোর ওপর ভরসা করেই অনেক মানুষ বাজারে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে থাকে। এ পণ্যগুলোর বাড়তি সরবরাহ বা ঘাটতি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে যখন রোজার মতো বড় সময় আসছে। রোজার সময়ে মানুষ খাদ্যসামগ্রীর দাম নিয়ে আরো চিন্তিত থাকে এবং এই সময়ে কিছু স্পেকুলেটিভ আচরণ হয়ে থাকে। তাই সরকারকে চিন্তা করতে হবে, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কীভাবে সামাজিক সুরক্ষার কার্যক্রম আরো কার্যকর ও স্থিতিশীল রাখা যায়।
একটি স্পষ্ট ও সমন্বিত নীতি সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
রোজার সময় দেখা যায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এবার রোজাকে সামনে রেখে কোন কোন ঝুঁকি আছে বলে মনে করেন?
এখন যেটা আমি বুঝতে পারছি, রোজার সময় যেসব পণ্যের দাম সাধারণত বাড়ে, আমি সেগুলোর ইমপোর্ট ভ্যালু ও সঠিকভাবে ইমপোর্ট হচ্ছে কিনা তা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করিনি। গত বছর এবং এবারের পরিস্থিতির মধ্যে তুলনা করা জরুরি।
এখানে একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে, যেসব বড় ব্র্যান্ড পণ্য বাজারে সরবরাহ করে তাদের সহায়তা করা। অনেক সময় বড় ব্র্যান্ডগুলোয় সিন্ডিকেট তৈরি হয় না, কারণ তারা নিজেদের মার্কেট শেয়ার নিয়ে প্রতিযোগিতা করে। সরকার যদি ব্র্যান্ডগুলোকে বলে,”তুমি যদি মার্কেট শেয়ার বাড়াও, আমি তোমাকে সহায়তা করব, তাহলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম বৃদ্ধির প্রবণতা কমবে।
বিশেষভাবে ব্র্যান্ডগুলো যখন বাজারে চাহিদার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়, তখন দাম বৃদ্ধির প্রবণতা কমে যায়। সুতরাং সরকারের উচিত এ ব্র্যান্ডগুলোকে সহায়তা দেয়া, যাতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে এবং দাম কম থাকে।
বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে বসুন্ধরা, প্রাণ, আড়ং ইত্যাদি বড় কোম্পানিকে ইমপোর্ট করার জন্য বলা হচ্ছে এবং তারা কিছুটা সাড়া দিয়েছে। যদি এ ধরনের ব্র্যান্ডগুলোকে সহায়তা দেয়া হয় এবং তাদের আরো বেশি পণ্য সরবরাহ করতে উৎসাহিত করা হয়, তবে বাজারে দাম বাড়ানোর চাপ কমবে এবং তা বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি সমস্যা হলো ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা। এখনো অনেক দুর্বল ব্যাংক আছে, সরকার ৩ হাজার কোটি টাকার মতো নগদ অর্থ সহায়তা দিয়েছে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এ পদক্ষেপ কি সমাধান?
এটি একটি কঠিন প্রশ্ন। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সঠিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব কিনা, তা নিয়ে ভাবতে হবে। আমি বলব, যেহেতু অনেক কারণেই ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, আমাদের উচিত এ সমস্যাগুলো ভবিষ্যতে যেন না হয়, সেই দিকে মনোযোগ দেয়া। ব্যাংকগুলোর দুর্বলতার কারণ আমরা জানি এবং আমাদের শ্বেতপত্রেও সেগুলোর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভবিষ্যতে যেন এসব সমস্যা পুনরায় না ঘটে।
ব্যাংক পরিচালনায় সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। এখন আমরা শুধু পাহারাদার বসাচ্ছি, অর্থাৎ আগে যাদের হাতে ছিল ব্যাংক, তাদের ওপর আস্থা না রেখে শুধু নজরদারি করা হচ্ছে। কিন্তু এটা ভেবে নেয়া ঠিক হবে না যে আগের মালিকরা আবার ব্যাংক চুরি করবে। হয়তো তারা আর এমন কিছু করবে না। তবে যদি ব্যাংক পরিচালনায় সঠিক লোক না থাকে, তখন কেউ ঝুঁকি নিতে চাইবে না। আর যদি ব্যাংকগুলোয় নতুন কোনো সমস্যা হয়, তখন সবাই বলবে, যাদের আমরা দায়িত্ব দিয়েছি, তাদের সময়েও কিছু হয়নি,” আর তাতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকের স্বচ্ছতা। ব্যাংকগুলোর জন্য দুটি মূল আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিনিধিকে ব্যাংকে বসাতে পারে। তবে তার প্রতিনিধিত্বের মানে অবশ্যই কোনো স্টাফের প্রতিনিধি নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ বা ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ হতে হবে। এর মাধ্যমে তিনি ব্যাংকের ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারবেন, যাতে ডিফল্টের ঘটনা না ঘটে।
দ্বিতীয়ত, যেহেতু ব্যাংকগুলো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, তাদের সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করতে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের নিয়োজিত একজন স্বাধীন পরিচালক থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোয় শেয়ারহোল্ডারদের এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। আমি মনে করি, যদি ব্যাংকগুলোর মালিকানা কিছুটা সংহত থাকে, তবে মালিক পক্ষের দিক থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সহজ হবে। যদি পুরো ব্যাংক ব্যবস্থাপনা সরকারের হাতে চলে আসে, তখন কিছু ব্যাংক উদ্বিগ্ন হতে পারে যে ভবিষ্যতে তাদের ব্যাংকও সরকারের নজরে আসতে পারে এবং তাতে ব্যবসার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।
সবশেষে আমি মনে করি, ব্যাংকগুলোর যে সংকট, তা সমাধান করা দরকার, কিন্তু এটি সরকারের একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়, বরং সঠিক আইনি ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা আনতে একটি সুসংহত ও সুশাসিত ব্যাংকিং সিস্টেম তৈরি করতে হবে, যাতে পুঁজি, আমানত ও ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়।
আপনারা শ্বেতপত্র তৈরি করেছেন। কিন্তু এ অলিগার্কদের আইনের আওতায় আনতে কোন কোন পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে আপনাদের কোনো প্রস্তাব ছিল?
আসলে আমাদের শ্বেতপত্র কমিটির কাজ ছিল অর্থনৈতিক অবস্থার একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরা এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নে প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা। আমরা কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করিনি, বরং শ্বেতপত্র কমিটি হিসেবে আমাদের কাজ ছিল, অর্থনৈতিক খাতে যে সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করা এবং এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সুপারিশ করা।
আমরা পাবলিকলি পাওয়া তথ্য, যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান এবং অন্যান্য সংস্থার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ বিশ্লেষণ করেছি। এর পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন এক্সপার্ট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তবে আমাদের উদ্দেশ্য কখনই কাউকে অভিযুক্ত করা বা শাস্তি দেয়া ছিল না। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ করে সরকারকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন দিতে সহায়তা করা, যাতে পরবর্তী সময়ে কার্যকর নীতির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।
যে বিষয়টি এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন তা হলো তদন্ত কমিটি না হওয়ায় কাউকে অভিযুক্ত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমরা শুধু পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি, যেমন কীভাবে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে, কীভাবে ঋণ বিতরণ হয়েছে এবং এসব কীভাবে কার্যকর হয়নি এবং আমাদের কাজ ছিল এ বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছতা আনা।
এখন বিভিন্ন তদন্ত কমিটি যেমন অ্যান্টি করাপশন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে, তারা এসব বিষয়ে গভীরভাবে তদন্ত করছে। তাদের তদন্তের মাধ্যমে একদিন প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য ছিল শুধু অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতির বিষয়ে সুপারিশ করা, যেটি সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ রয়েছে যারা ঋণখেলাপি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো অপরাধে জড়িত। এ গ্রুপগুলোর পাচারকৃত অর্থের কতটা ফেরত আনা সম্ভব, এটা অবশ্যই একটি প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। তবে ভবিষ্যতের জন্য আমরা কীভাবে একটি কার্যকর, বুলেট প্রুফ সিস্টেম স্থাপন করতে পারি?
সম্পূর্ণ বুলেট প্রুফ সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, কারণ পৃথিবীর কোনো অর্থনীতি এমন সিস্টেমের আওতায় কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়নি। এমনকি একটি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করলে তা স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। এটি আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে চোরের দশদিন, সাধুর একদিন। অর্থাৎ যিনি অপরাধ করবেন তার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে যদি আমরা চুরি পুরোপুরি বন্ধ করতে চাই, তা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি করবে।
এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনৈতিক নীতি তৈরি করা যেখানে যদি অপরাধী ধরা পড়ে, তাকে কোনো অবস্থায়ই ছাড় দেয়া হবে না। যেমনটি পশ্চিমা অর্থনীতিতে দেখা যায়, আমেরিকায় অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়, কিন্তু তারা জানে যে একবার কেউ ধরা পড়লে, তাকে আর ছাড় দেয়া হবে না। এ পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি পাবে এবং তারা আইন-শৃঙ্খলা মানতে বাধ্য হবে।
তবে আমাদের দেশে আইনি কাঠামো এবং নীতিমালার যথেষ্ট সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। অনেক আইনের প্রয়োগে ন্যায্যতার অভাব রয়েছে, যেমন মজুদদারি আইন। বর্তমানে মজুদদারি আইন অনুযায়ী, যদি চাল বা তেল কেনা হয় তা ৩০ দিনের মধ্যে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু সংকটকালে যখন তেলের দাম বাড়বে, তখন এ আইন সংকট আরো বাড়াতে পারে।
এছাড়া আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেমের মধ্যে একটি নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে, যেখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানদের প্রাইভেসি আঘাত না করে তাদের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয় না। ব্যাংকে টাকা রাখলে সেই তথ্য সবার কাছে সহজে প্রবাহিত হয়, তাতে ব্যক্তির টাকার মালিকানা গোপন থাকে না। এটি সিস্টেমিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে, যা বাজারের স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা লোপ পায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং সিস্টেমে যদি জনগণ আস্থা না রাখে, তাহলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একমাত্র যখন মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ আস্থা রাখবে এবং বিনিয়োগ করবে, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব। তাই ব্যাংকিং সিস্টেমকে আরো সুরক্ষিত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত করতে হবে। এর মাধ্যমে অবৈধ অর্থ পাচারের পথ বন্ধ হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী হবে।
আমাদের অর্থনীতি অনেক বড় হচ্ছে, জিডিপি বাড়ছে, বৈচিত্র্য আসছে, তবে বৈষম্যও বাড়ছে। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে বৈষম্য কমানোর যে উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে বৈষম্য কমাতে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
বৈষম্যের নানা দিক রয়েছে। বর্তমানে বৈষম্য নিয়ে আলোচনা এত বেশি হচ্ছে যে আমি মনে করি, এখন অনেকেই ভুলভাবে এই শব্দটি ব্যবহার করছেন। বৈষম্য বলতে কি আমরা সবাইকে সমান করতে চাই? যদি তাই হয়, তবে সেটা কমিউনিজমে চলে যাওয়ার মতো। প্রথমেই বলতে চাই, সমাজে কিছুটা বৈষম্য থাকবে, তবে সেটা যেন চরম আকারে না যায়, সেজন্য আমাদের একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে।
যেমন যদি কেউ ব্যাংক লুট করে কোটিপতি হয়ে যায়, এটা বৈষম্য সৃষ্টি করবে। একজন ব্যক্তি যদি ঘুস খেয়ে কোটিপতি হয়, তবে এটা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি দেখুন, একদিকে আমাদের সাবেক আইজিপি অবৈধভাবে অগাধ সম্পত্তি অর্জন করেছেন অন্যদিকে স্বচ্ছতার জন্য পুরস্কৃত হচ্ছেন। আসলে বৈষম্য বলতে আমি বোঝাচ্ছি, এমন ধরনের সুযোগ, যা আমার পাওনা নয়, কিন্তু আমি তা পাচ্ছি।
যদি প্রশ্ন করা হয়, গাধা আর ঘোড়া কি একই বেতন পাবে? উত্তর হলো না, যদি গাধা নিয়ে বসবাস করি, তবে ঘোড়া দেশ ছেড়ে চলে যাবে। অর্থাৎ সমাজে কিছু বৈষম্য থাকবে, তবে সেটা যেন উৎপাদনশীলতার ক্ষতি না করে, এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমার আপত্তি এই যে সরকার যদি ব্যাংক লুট বা ঘুস-দুর্নীতির মাধ্যমে বৈষম্য তৈরি করে, তবে সেটা বন্ধ করা জরুরি। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। এর পরও সমাজে কিছু বৈষম্য থাকবে এবং সেটা কীভাবে কমানো যায়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। গরিব মানুষের জন্য সঠিক সহায়তা ব্যবস্থা রাখতে হবে, যা সরকারকে দায়িত্বশীলভাবে করতে হবে।
এখন এর জন্য ট্যাক্স বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে এবং এর মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বৈষম্য শব্দটি নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা করা হচ্ছে, যার ফলে এর সঠিক অর্থ একসময় হারিয়ে যাবে। আমার মতে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাতে সহায়তা, দেশের টাকা পাচার অথবা দুর্নীতির মাধ্যমে পাহাড় গড়ে তোলা—এসব বন্ধ করা উচিত। এটি বৈষম্য কমানোর প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।
সংক্ষেপে বৈষম্য কমাতে হলে সরকারকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে কেউ অবৈধভাবে অর্থ অর্জন করতে না পারে।