অনেক স্থানে খোদ প্রশাসনই ফাঁকা জায়গা জব্দ করে রেখেছে। সিটি করপোরেশন বা সরকারি সংস্থা অনেক সময় নিজেরাই ইজারা দিয়ে কিংবা স্থাপনা বানাচ্ছে। এমনটি বিচ্ছিন্ন দখলদারি নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। বাসযোগ্য নগরী হিসেবেও ঢাকার অবস্থান তলানিতে। বিশ্বের বসবাস অযোগ্য নগরীর তালিকাতেও ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, এখন থেকেই বিষয়টিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাবা শুরু করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে এনভায়রনমেন্ট ফান্ড চালু করেছে। কিন্তু শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে কাজ হবে না। যেকোনো পরিকল্পনার সুষ্ঠ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য শহরের প্রাণ মাঠ, পার্ক ও জলাশয় দখলমুখ করার পাশাপাশি সবুজায়নকে সংরক্ষণে জোর দেয়ার বিকল্প নেই।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গাছপালার অভাব ও ঘনবসতির কারণে ঢাকা ক্রমেই তাপদ্বীপে পরিণত হচ্ছে। শহরের আশপাশ এলাকার চেয়ে কয়েক ডিগ্রি বেশি থাকছে। চলতি মৌসুমে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৬ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় শরীর ঠাণ্ডা হওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় অনুভূত তাপমাত্রা প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি মনে হচ্ছে। অথচ সবুজ ও জলাধারসমৃদ্ধ এলাকায় এ তাপের তীব্রতা তুলনামূলক কম থাকার প্রমাণ মিলেছে। পার্ক-মাঠ যতই দখল ও কংক্রিটে ঢেকে যাচ্ছে, ততই নগরীর প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে। এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সূচকেও। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সদ্য প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম—যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক ও ত্রিপোলি ছাড়া বিশ্বের আর কোনো শহর ঢাকার চেয়ে কম বাসযোগ্য নয়। সংস্কৃতি ও পরিবেশ বিভাগে ঢাকার স্কোর মাত্র ৪১, যেখানে খেলাধুলার সুযোগ ও তাপমাত্রার ধরন সরাসরি বিবেচনায় নেয়া হয়। প্রতিবেশী এশিয়া অঞ্চলের গড় স্কোর যেখানে ৭৪, ঢাকা সেখানে ৩২ পয়েন্ট পিছিয়ে। উন্মুক্ত পরিসরের এ সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো নগর সৌন্দর্যের প্রশ্ন নয়; এটি ঢাকার সামগ্রিক বাসযোগ্যতা সংকটের একটি কাঠামোগত উপাদান।
সরকার একদিকে খেলাধুলার বিস্তার ও নাগরিক মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যমান মাঠ-পার্ক পুনরুদ্ধারে কার্যত নীরব কেন। এখন পর্যন্ত পার্ক-মাঠ দখলমুক্ত করার বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অভিজাত এলাকায় কিছু মাঠ-পার্ক থাকলেও তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়।
সবুজায়নের নতুন প্রকল্প নির্ধারণে সরকারের তৎপরতা অনেক। তবুও বিদ্যমান স্থাপনা রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে একই আগ্রহ অনুপস্থিত। এর বড় কারণ সিটি করপোরেশন ও সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরাই ইজারা-বাণিজ্য থেকে সাময়িক রাজস্ব আয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইজারা দেয়া দোকান, ফুডকোর্ট কিংবা পার্কিং থেকে আসা স্বল্পমেয়াদি আয় দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির তুলনায় প্রশাসনের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। জবাবদিহির অভাবে কোনো সংস্থাকেই এজন্য দায় নিতে হচ্ছে না। অথচ সরকার ক্রীড়া অর্থনীতির বিকাশে মনোযোগ বাড়াচ্ছে। এর জন্য প্রত্যেক ওয়ার্ডে ৫০০ মিটার দূরত্বেই খোলা মাঠ ও পার্ক থাকা জরুরি। সেখানে পর্যাপ্ত জলাশয় ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হয়। এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও নিরাপদ আশ্রয় নেয়া যায়। আবার শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি নাগরিকরাও সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। এসবের অভাব থাকায় শিশু-কিশোর ও তরুণ সমাজের একাংশ মায়োপিয়া, ওজন বৃদ্ধির মতো শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। নির্মল বিনোদনের অভাবে অনেকে ভুগছেন মানসিক অবসন্নতায়। শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পার্ক-মাঠ দখল হয়ে যাওয়ায় হয়ে উঠছে মাদকের পরিচিত স্পট। এসব নিরাপত্তা ও সামাজিক নানা সমস্যা বাড়াচ্ছে।
শহরের সামগ্রিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে তাই বিদ্যমান পার্ক, মাঠ ও জলাশয় দখলমুক্ত করার বিষয়ে জোর দিতে হবে। এজন্য দুই সিটি করপোরেশনকে রাজধানীর সব পার্ক ও মাঠের প্রকৃত দখল পরিস্থিতির একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং প্রতিটির জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমাসহ দখলমুক্তির কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে। পার্ক-মাঠে বাণিজ্যিক ইজারা প্রথা বন্ধ করতে আইনি কাঠামো শক্ত করা প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদি রাজস্বের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক সম্পদ বিক্রি করে দেয়ার প্রবণতা বন্ধে সিটি করপোরেশনের আয়ের বিকল্প উৎস চিহ্নিত করতে হবে। বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, থানার জব্দকৃত গাড়ির গ্যারেজ কিংবা প্রশাসনিক কার্যালয়ের মতো সরকারি স্থাপনা যেসব মাঠ-পার্ক দখল করে আছে, সেগুলো অবিলম্বে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিতে হবে। নগর তাপ প্রশমনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেখে পার্ক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা করতে হবে। উদ্ধারকৃত প্রতিটি স্থানে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে যুক্ত করা প্রয়োজন। স্থানীয় ওয়ার্ড কমিটি বা এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে একটি পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে, যাতে দখল পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। সবুজায়নের ক্ষেত্রে বাস্তুতান্ত্রিক অবস্থাকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। শহরে গাছপালা ও প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণের ভাবনাটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকার যদি সত্যিই ক্রীড়ার বিস্তার ও নাগরিক জীবনমান উন্নয়নে আন্তরিক হয়, তবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ঘোষণার আগে বিদ্যমান মাঠ-পার্ক দখলমুক্ত করার কাজটিই হওয়া উচিত প্রথম ধাপ। কারণ বাসযোগ্যতা শুধু নান্দনিকতার প্রসঙ্গ নয়। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হলেও নগরের বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।