অভিমত

ডলফিনের মৃতদেহ ও বঙ্গোপসাগরের পরিবেশ দূষণ

বিশ্বময় কভিডের তাণ্ডবে মানুষ অসহায় হয়ে যখন ছিল ঘরবন্দি, প্রকৃতি তখন ফেলেছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস। অবিশ্বাস্যভাবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ফিরে আসে তিন দশক আগের মনোরম দৃশ্য। নীল জলে উচ্ছ্বসিত হয় প্রাণিকুল। আপন মনে মেতে ওঠে ডলফিন। সৈকতে নির্ভয়ে ছুটে চলে মায়াবী হরিণের দল। লালকাঁকড়ারা যেন খুঁজে পায় অবাধ বিচরণের আপন ভূমি। উড়ন্ত

বিশ্বময় কভিডের তাণ্ডবে মানুষ অসহায় হয়ে যখন ছিল ঘরবন্দি, প্রকৃতি তখন ফেলেছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস। অবিশ্বাস্যভাবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ফিরে আসে তিন দশক আগের মনোরম দৃশ্য। নীল জলে উচ্ছ্বসিত হয় প্রাণিকুল। আপন মনে মেতে ওঠে ডলফিন। সৈকতে নির্ভয়ে ছুটে চলে মায়াবী হরিণের দল। লালকাঁকড়ারা যেন খুঁজে পায় অবাধ বিচরণের আপন ভূমি। উড়ন্ত বালুকে আঁকড়ে ধরে সবুজে সবুজে জীবন সাজায় সাগরলতারা। বাতাসে কমে যায় দূষণ, পাহাড়ে ঢেউ খেলে নির্মল সমীরণ। কার্বনমুক্ত আকাশ নিজেকে রাঙায় কেবল নীলিমায়। ধীরে ধীরে পৃথিবী আবারো মানুষের দখলে চলে আসে। পরাস্ত হয় ভাইরাস। সাগর অবশ্য পরাজয়কে মেনে নিতে পারেনি, ভয়ংকর গর্জন তুলে সৈকতে ঠেলে ফেলছে যত আবর্জনা। কী নেই তাতেনানা রকমের প্লাস্টিক, ছেঁড়া জাল, ডাবের খোসা, কাঠের টুকরো, ছেঁড়া স্যান্ডেল, দেশী-বিদেশী মদ আর ফেনসিডিলের খালি বোতল, কোনো কোনোটায় আবার তেল অ্যালকোহলভর্তি। সঙ্গে ভেসে আসছে মৃত আহত কাছিম, জেলি ফিশ, ছোট-বড় অসংখ্য মাছ, ডলপিনের নিথর দেহ। অক্সিজেন টানলেই বাতাসে পচা গন্ধ। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টেই এমন দৃশ্য। পরিবেশপ্রেমীদের মাঝে চরম হাহাকার।

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কয়েক বছর ধরে তিমি ডলফিনের মৃতদেহ যে হারে ভেসে আসছে তাতে সমুদ্র যে মহাবিপদের বার্তা দিচ্ছে তা সহজেই বোঝা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্লাস্টিক দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে গিয়েছে। ফলে প্রাণ হারাচ্ছে নানা সামুদ্রিক প্রাণী। নিউইয়র্কভিত্তিক ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বলছে, দেশের বিভিন্ন সাগর উপকূল নদীপথে গত দুই বছরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে অর্ধশতাধিক ডলফিন ছয়টি তিমি। আগস্ট নভেম্বরের শুরুতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভেসে এসেছিল অসংখ্য বড় বড় জেলি ফিশ। সৈকতের বালিয়াড়িতে আটকে পড়া একেকটি জেল ফিশের ওজন ১০-১৫ কেজি। এবার সৈকতে ভেসে এল ছোট আকৃতির বিপুল পরিমাণ চামিলা, পোপা ছুরি মাছ।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থার (ইউএনইপি) দেয়া ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সাগরে ফেলা হয়। আর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার বলছে, বিশ্বে প্রতি মিনিটে ৩৩ হাজার ৮০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য নিক্ষেপ করা হয় সমুদ্রে। হিসাবে শুধু ভূ-মধ্যসাগরেই প্রতি বছর লাখ ৭০ হাজার টন প্লাস্টিকের প্রবাহ দেখা যায়। অথচ আমরা যে অক্সিজেন গ্রহণ করি তার অর্ধেকই উৎপাদন করে সমুদ্র, অর্থাৎ শৈবাল এবং ফিটোপ্লাঙ্কটন নামক এককোষী উদ্ভিদ। সাগর আমাদের আবহাওয়ামণ্ডল থেকে ৫০ গুণ বেশি হারে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন হ্রাস করে। 

বঙ্গোপসাগরের ওপর বছর দুয়েক আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একদল গবেষক নানা বিষয়ে অনুসন্ধান করে। সংস্থাটির জীববৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক জেনা জ্যামবেক হিথার কোল্ডওয়ে তাদের দল নিয়ে পদ্মা নদীতে দীর্ঘ দুই মাস একটি জরিপ চালায়। সময় তারা বঙ্গোপসাগর থেকে হিমালয় পর্যন্ত হাজার ৫৭৫ কিলোমিটার এলাকাতেও বিভিন্ন গবেষণা করে। তাদের অনুসন্ধানে সাগরের প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহ চিত্র ওঠে আসে। জরিপ শেষে গবেষক দলের উপনেতা হিথার কোল্ডেওয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে উল্লেখ করেন, বঙ্গোপসাগরের দূষণে প্রধান ভূমিকা রাখছে প্লাস্টিক বর্জ্য। প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ টন প্লাস্টিক পণ্য নদী দিয়ে ভেসে ভেসে সাগরে গিয়ে পড়ছে।

দুই বছর ধরে আশঙ্কাজনক হারে বিরল প্রজাতির মৃত তিমি ডলপিন ভেসে আসে সৈকতে। এর মধ্যে গেল বছরের ২২ জুন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার ঘোলার চরে ১২-১৫ ফুট লম্বা একটি মধ্যবয়সী ব্রাইডস প্রজাতির তিমি সাগরতীরে মৃত অবস্থায় ভেসে আসে। তারও আগে ২১ মে লাবণী পয়েন্টে পাওয়া যায় মৃত তিমির বাচ্চা। আর ওই বছরের শুরুতে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌ-রোডের মাঝামাঝি পাওয়া যায় ৪০ ফুট লম্বা বালেন প্রজাতির একটি মৃত তিমি। এছাড়া টেকনাফ, উখিয়া, মাতারবাড়ী, কুতুবদিয়া উপজেলা সেন্টমার্টিনের সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন অংশে ভেসে আসে ২০টিরও বেশি মৃত ডলফিন এবং শয়ে শয়ে কাছিম বা কচ্ছপ। আর বছরের সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে আসে বিশালাকৃতির একটি বেলিন প্রজাতির মৃত তিমি। জোয়ারের পানিতে সৈকতের ঝাউবাগান পয়েন্টে ভেসে আসা তিমিটির দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ ফুট প্রস্থে ফুট। ডলফিনের মৃত্যুর সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। বঙ্গোপসাগরে বিভিন্ন সময়ে আহত সামুদ্রিক প্রাণী কখনোসখনো বাঁচার জন্য উপকূলেও ছুটে আসে, কিন্তু তাদের রক্ষায় আমাদের নেই কোনো রেসকিউ টিম, নেই আধুনিক যন্ত্রসমৃদ্ধ চিকিৎসা ব্যবস্থাও।

বঙ্গোপসাগরের বড় অংশই বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। অথচ এর দূষণ যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে তাতে আর স্বচ্ছ পানি নজরে পড়ে না। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় জাহাজ ভাঙার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের দূষণ, কর্ণফুলীর মোহনা বহির্নোঙরজুড়ে তেল দূষণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এখন থেকে সচেতন না হলে সাগরের দূষণ এমন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছবে, যখন আর কোনো কিছুই করার থাকবে না। তখন ক্ষুব্ধ সাগর প্রতিশোধ নেবে একের পর এক।

 

ওবায়দুল্লাহ সনি: সাংবাদিক

আরও