দেশ ও জাতি গঠনে আমরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের কথা জোর গলায় বলি। প্রতি নির্বাচনের আগেই এ নিয়ে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুনি নেতানেত্রীদের মুখে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও আমরা শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ভিত মজবুত করতে পারিনি। এতে জনমিতিক লভ্যাংশের সম্ভাবনাময় জায়গায় থাকলেও তার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। শিক্ষার ভিত ধরা হয় প্রাথমিক শিক্ষাকে, অথচ ৫২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই। প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাবে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। মাধ্যমিক, কলেজ ও উচ্চ শিক্ষা নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ল্যাব, লাইব্রেরি সুবিধা নেই। শিক্ষায় ব্যয় বলতে অনেকটা অবকাঠামো ব্যয় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি দক্ষ শিক্ষক ও গুণগত শিক্ষা। আশা করা যায়, নতুন সরকার তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক শিক্ষায় প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আসবে এবং বিদ্যমান কাঠামোগত সংকট মোকাবেলায় যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
সর্বশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রধান শিক্ষক পদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ১২২। এত বড় শূন্যতার বিপরীতে এমন নিয়োগ উদ্যোগ যে যথেষ্ট নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিখনফলে। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তৃতীয় শ্রেণীর মাত্র ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় এবং ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণী অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণীতে এ হার ছিল যথাক্রমে ৫০ ও ৩০ শতাংশ।
শুধু অর্থের পরিমাণ দিয়ে শিক্ষার সাফল্য বিচার করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। অবকাঠামো নির্মাণ, বই বিতরণ কিংবা নতুন প্রকল্প গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসবের কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক নিয়োগ, নেতৃত্ব, তদারকি ও জবাবদিহির ওপর। প্রধান শিক্ষক নেই, মাঠপর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তা নেই, অথচ নতুন প্রকল্পের পর নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে—এভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়। মাধ্যমিক স্তরেও একই চিত্র। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৫৭২টি প্রধান শিক্ষক পদের মধ্যে ৩৭৯টি, অর্থাৎ ৬৬ শতাংশ শূন্য। সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭০৩টি পদের মধ্যে ৫২৮টি, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ শূন্য। শুধু শিক্ষক নেতৃত্ব নয়, প্রতিষ্ঠান মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ শূন্যতা রয়েছে। বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের সব পদই শূন্য। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার এক-তৃতীয়াংশের বেশি এবং উপজেলা ও সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পদও খালি। এমন কাঠামোয় নিয়মিত তদারকি, শিক্ষাদানের মান যাচাই কিংবা অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া কঠিন।
শিক্ষার ফলাফলও সেই দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্বব্যাংকের মানবসম্পদ সূচকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর দুই মাস শিক্ষাজীবন শেষে যে দক্ষতা অর্জন করছে, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রায় ছয় বছরের শিক্ষার সমতুল্য।
উচ্চ শিক্ষার সংকট আরো বহুমাত্রিক। দেশে ৫৬টি পাবলিক ও ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বিপুলসংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পদ শূন্য। ফলে একদিকে একাডেমিক নেতৃত্ব দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ স্তরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম। যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করেও শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার উদাহরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে শিক্ষক নিয়োগে আর্থিক অনিয়ম এবং গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির ঘটনা উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। গবেষণা যদি জ্ঞান সৃষ্টির পরিবর্তে কেবল পদোন্নতির প্রয়োজন মেটানোর উপায় হয়ে ওঠে, আর শিক্ষক নিয়োগ যদি যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য বা অন্য কোনো বিবেচনায় নির্ধারিত হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হবেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও উদ্বেগজনক। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবমান অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করছে না।
তবে সংকটের চিত্র তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়; এখন প্রয়োজন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথম কাজ হওয়া উচিত শিক্ষা খাতের সব স্তরে শূন্য পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেগুলো পূরণ করা। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও মাঠপর্যায়ের মনিটরিং কর্মকর্তাদের পদকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্থায়ী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্পষ্ট করে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগ ও পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনা, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ বন্ধ করে যোগ্যতাভিত্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। শুধু জনবল নিয়োগ করলেই হবে না, মনিটরিং ব্যবস্থার চরিত্রও বদলাতে হবে। শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখছে, পাঠদান কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেসবের নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। মূল্যায়ন হতে হবে তথ্যনির্ভর, স্বাধীন ও ফলাফলভিত্তিক।
উচ্চ শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা দূর করা, আর্থিক হিসাব আন্তর্জাতিক মানে আনা, গবেষণার মান যাচাই এবং শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ক্ষমতা ও সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষা সংস্কারকে কেবল নতুন প্রকল্পের সমার্থক করে দেখা যাবে না। নতুন অবকাঠামো, প্রযুক্তি, খাবার বা উপকরণ প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু সেগুলোর সুফল নিশ্চিত করার জন্য যে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রয়োজন, সেটিই যদি দুর্বল থাকে তাহলে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়বে না।
শিক্ষা কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বিনিয়োগ। ফলে এখানে ব্যর্থতার মূল্যও দীর্ঘমেয়াদি। একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষায় যে ঘাটতি তৈরি হয়, তা পরবর্তী স্তরে গিয়ে সহজে পূরণ করা যায় না। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্বল শিক্ষক নিয়োগ বা নিম্নমানের গবেষণার প্রভাব কেবল একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে না; এর প্রভাব পড়ে দেশের শ্রমবাজার, উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। সুতরাং শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থার সুশাসন। শূন্য পদ পূরণ, দক্ষ নেতৃত্ব, কার্যকর মনিটরিং, স্বচ্ছ নিয়োগ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, আর্থিক জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীর শিখনফল—এসবকে বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে না দেখে একই সংস্কার কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকট রাতারাতি দূর হবে না। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটানো গেলে পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।