স্রেফ ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, চাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তাদের অভিনন্দন। আশা করা যায়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন সরকার গঠিত হবে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ শুরু করবে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হওয়া জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এটিই শেষ কথা নয়, এটি কেবল সূচনা। নতুন সরকারকে দীর্ঘ পথ পারি দিতে হবে। এ পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, দুর্গম।

এ অবস্থায় সরকারের মূল চ্যালেঞ্জগুলো কি? সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ নির্ধারণ করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি আজ এমন স্তরে পৌঁছেছে যেন ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’। তবে এর মধ্যেই সরকারকে কাজ শুরু করতে হবে।

নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো একটি দক্ষ মন্ত্রিসভা গঠন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার মানসিকতা। এ দ্বৈত বাস্তবতা কখনো কখনো প্রতিহিংসা বা দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি করে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় একটি ছোট ও দক্ষ মন্ত্রিসভা কার্যকর উপায় হতে পারে। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে খুব সহজেই এ কাজটি করা যায়। যেমন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একীভূত করা যায়। এতে করে সরকারে কাজের গতি বৃদ্ধি পাবে এবং আর্থিক ব্যয় সংকোচন হবে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ—এটি আসলে সরকার গঠনের পর প্রথম চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। তা হলো আমলাতন্ত্রের জনমুখী রূপান্তর। বাস্তবে এই একটি ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া গেলে অন্যান্য বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সহজ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ঔপনিবেশিকতার সংস্কৃতিতে আবদ্ধ। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অংশ অতিরিক্ত দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করে। এর মাধ্যমে এরা নিজেরা ক্ষমতায়িত হয় এবং ক্রমে সরকারকে ভুল পথে নিয়ে।

নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে দলীয় আমলাতন্ত্র কোনো সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না, নিরাপত্তাও প্রদান করে না। কাজেই প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ পরিহার করতে হবে। এর পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন, পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার নজির রয়েছে। এবার এ চক্র ভাঙতে হবে। বিজয়ী দলকেই এর মূল দায়িত্ব নিতে হবে।

ধারণা করা হচ্ছে বিজয়ী জোটের প্রধান তারেক রহমান এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। কারণ ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের দিনেই তিনি বলেছিলেন, ‘বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়।’ এখন সময় এসেছে এ বক্তব্য যে কেবল কথার কথা না তা প্রমাণ করার। বিজয়ী দলের দায়িত্ব হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার, পরাজিতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। বিরোধী দলের দায়িত্ব হবে কার্যকর সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।

তবে নতুন সরকারের জন্য প্রথম সপ্তাহটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময়টিই হলো সরকারের ওপর মানুষের আস্থার বুনিয়াদ গড়ে তোলার উপযুক্ত সময়। এ সময়েই জনগণকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—তারা নির্বাচনী ইশতাহার বাস্তবায়নে আন্তরিক। প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই একটি সুস্পষ্ট ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে এবং সেই লক্ষ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যা জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।

মনে রাখতে হবে, সরকারের মেয়াদকাল মাত্র পাঁচ বছর। এর প্রতিটি দিন মূল্যবান। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যায়, কিন্তু রাজনৈতিক ভুলের দায় দীর্ঘস্থায়ী হয়।

শেষ কথা হলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলানো সহজ; কিন্তু রাজনৈতিক চরিত্র ও সংস্কৃতি বদলানো কঠিন। এ নির্বাচন ক্ষমতার পরিবর্তন এনেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর। নতুন সরকার সেই রূপান্তরে কতটা আগ্রহী তা দেখার অপেক্ষায় সমগ্র জাতি।

সফিক ইসলাম: লেখক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

আরও