কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং (এমএল) এখন বিশ্ব অর্থনীতির রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি ও সেবাখাতে এ প্রযুক্তির বহুমাত্রিক প্রয়োগ করতে পারছে। এর মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হচ্ছে আবার জীবনমানেরও উন্নয়ন করছে। প্রযুক্তির এ উৎকর্ষের সময় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একটু আলাদা। বাংলাদেশের অর্থনীতি শ্রমনির্ভর। তৈরি পোশাক, কৃষি, নির্মাণ ও পরিবহন খাতের কোটি কোটি মানুষের জীবিকা কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এমন বাস্তবতায় এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের সুবিধা ভোগের ব্যাপক সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। একই সময়ে এ প্রযুক্তিকে ভালোভাবে আত্নস্থ করার ক্ষেত্রে কাঠামোগত কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছে।
প্রযুক্তি যখন মানুষের সহায়ক
এআই মূলত এমন এক প্রযুক্তি, যা বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ (ডেটা এনালিসিস), প্যাটার্ন শনাক্তকরণ এবং মানুষের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর অবিচ্ছেদ্য অংশ মেশিন লার্নিং, যেখানে সিস্টেম ডেটা থেকে শিখে সময়ের সঙ্গে উন্নত হয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এআই মানুষের বিচারবোধ বা সৃজনশীলতার বিকল্প নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সহায়ক হাতিয়ার। এর সাফল্য নির্ভর করে আমরা কোন প্রেক্ষাপটে এবং কতটা নিয়ন্ত্রিতভাবে এটি ব্যবহার করছি তার ওপর।
শ্রমবাজারের বাস্তবতা ও এআই
শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ এখনো অদক্ষ ও আধা-দক্ষ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ অদক্ষ এবং ৩৫ শতাংশ আধা-দক্ষ। ডিজিটাল দক্ষতার এই সীমাবদ্ধতার কারণে এআই-নির্ভর কর্মসংস্থানে তাদের সরাসরি যুক্ত হওয়া কঠিন। অথচ আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এআই ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এখন অনস্বীকার্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান বিদ্যমান।
বর্তমান চিত্র ও প্রসারের গতি
বাংলাদেশে সীমিত ও অসম আকারে হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং ও ফিনটেক খাতে জালিয়াতি শনাক্তকরণ, ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকসেবায় এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। কৃষিতে ফসলের রোগ নির্ণয় ও আবহাওয়া পূর্বাভাসেও এআই-এর প্রাথমিক ব্যবহার শুরু হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ নানা কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। কর্মক্ষেত্রেও এর প্রসার ঘটেছে। প্রায় ৪৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এখন বিশ্লেষণমূলক ও স্বয়ংক্রিয় কাজে এআই চালু হয়েছে। টেলেনর এশিয়ার এক গবেষণা অনুযায়ী, ৯৬ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দৈনন্দিন কাজে এআই-এর সাহায্য নিচ্ছেন। এসব তথ্য থেকে এটুকু স্পষ্ট যে, শিল্প খাতে কিছু বাধা থাকলেও সাধারণ মানুষের ডিজিটাল জীবন ও কর্মপরিবেশে এআই ইতিমধ্যে একটি অপরিহার্য ও শক্তিশালী উপাদান হয়ে উঠেছে।
বাজার সম্ভাবনা বনাম অতিরঞ্জিত আশাবাদ
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের এআই ও রোবোটিকস বাজার প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০২৫ সালে এই বাজারের আকার ছিল আনুমানিক ৭০-৮০ লাখ মার্কিন ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এর আকার ২৩ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে বাজারের এই বিশাল প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আগ্রহের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে এআই নিয়ে অতি-আশাবাদ বা অতিরঞ্জিত আলোচনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকাও জরুরি, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
কৌশলগত পথচলা: ভিন্নতাভিত্তিক পদ্ধতি
প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে অবকাঠামো, ডেটার মান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং নীতিগত প্রস্তুতি—এই চারটি উপাদান অপরিহার্য। এগুলোর ঘাটতি থাকলে এআই কেবল সীমিত প্রভাব ফেলবে, এমনকি বৈষম্যও বাড়াতে পারে। এ কারণেই ‘সবখানে একসঙ্গে প্রয়োগের বদলে বিভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। শ্রমনির্ভর খাতে হঠাৎ স্বয়ংক্রিয়তা বাড়ালে কর্মসংস্থান হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যখন পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত। এর বিপরীতে, পূর্বাভাস, মাননিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বা জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির মতো লক্ষ্যভিত্তিক প্রয়োগ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, আবার কর্মসংস্থানও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখতে পারে।
ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই ধীর ও ভিন্নতাভিত্তিক কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে ডিজিটাল অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য ডেটা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সীমাবদ্ধতা এই প্রযুক্তি গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। তাই যেসব খাতে প্রস্তুতি বেশি, সেখানে আগে প্রয়োগ শুরু করে অন্য খাতগুলোকে প্রস্তুত হওয়ার সময় দেওয়া একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে। খাতভেদে প্রয়োগের ধরনও আলাদা হওয়া প্রয়োজন। পোশাক বা উৎপাদন শিল্পে অটোমেশনের মাধ্যমে দক্ষতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব, তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কর্মসংস্থানে বড় ধস না নামে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সাশ্রয়ে এআই ব্যবহার করে ব্যয় কমানো যেতে পারে। কৃষিতে এআই শ্রমিকের বিকল্প নয়, বরং বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করবে। আর্থিক ও সরকারি সেবায় এআই স্বচ্ছতা আনবে, তবে তা অবশ্যই শক্তিশালী নীতিমালা ও নৈতিক কাঠামোর অধীনে হতে হবে।
তরুণ প্রজন্ম ও আগামীর প্রস্তুতি
বিশ্ব অর্থনীতিতে এআই যখন ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন করছে, তখন বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তবে এর সফলতা প্রযুক্তি গ্রহণের গতির ওপর নির্ভর করবে না। বরং এ প্রযুক্তি কতটা প্রাসঙ্গিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটিই হবে সফলতার মূল। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এমন নীতি, যা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সুরক্ষিত রাখে। আমাদের বিশাল তরুণ কর্মশক্তিই এই রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের প্রস্তুত করতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে একটি দ্বিমাত্রিক কৌশল প্রয়োজন। প্রথমত, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক ডিজিটাল ও এআই সচেতনতা নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, একটি উচ্চতর দক্ষ বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী গড়ে তোলা, যারা স্থানীয় প্রেক্ষাপটে এআই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রয়োগে নেতৃত্ব দেবে। এক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও বিশেষায়িত পাঠ্যক্রম প্রণয়নের মাধ্যমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এআই গ্রহণ কেবল গতির প্রশ্ন নয়, বরং এটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক সমন্বিত পথচলা, যেখানে প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, কিন্তু মানুষের ভূমিকাকে সংকুচিত করবে না। মানুষের মেধা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধনেই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব।
এম এম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও প্রাক্তন উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ