বিশ্লেষণ

ব্যবসার পরিবেশ সূচকের অবনতির জন্যও কি বিশ্ব পরিস্থিতি দায়ী

দেশে বিরাজমান অসহনীয় মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের কথা উঠতেই রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এর জন্য তোতা পাখির মতো শেখানো উচ্চারণে করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করতে শুরু করেন, যদিও তথ্যগতভাবে এর কোনোটিই মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নয়। করোনার প্রভাব বিশ্ব ও বাংলাদেশ থেকে

দেশে বিরাজমান অসহনীয় মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের কথা উঠতেই রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এর জন্য তোতা পাখির মতো শেখানো উচ্চারণে করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করতে শুরু করেন, যদিও তথ্যগতভাবে এর কোনোটিই মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নয়। করোনার প্রভাব বিশ্ব ও বাংলাদেশ থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যেই বহুলাংশে মিটে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ২০২২ সালের পর আর নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ২০২১ সালের পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অধিকাংশ সময়েই আরো হ্রাস পেয়েছে। ফলে এটি খুবই স্পষ্ট যে, দায়িত্বশীলদের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্ম থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুরবস্থার দায় এড়ানোর জন্যই তারা এসব কথা আপ্তবাক্যের মতো উচ্চারণ করে থাকেন। আর তা করতে গিয়ে সেসব বক্তব্যকে কখনো কখনো তারা রীতিমতো হাস্যকর পর্যায়েও নিয়ে যাচ্ছেন।

গত ৩০ মে রাতের এক টেলিভিশন টকশোতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধাভোগী এক প্রাক্তন উপাচার্য সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির বিষয়ে বলছিলেন যে, এ ব্যাপারে সরকারের কোনো দায় নেই—এর জন্য দায়ী হচ্ছে বিশ্বব্যাপী প্রসারমাণ দুর্নীতি। আর ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি গণহত্যার প্রসঙ্গ টেনে  অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াজনিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বৈঠক থেকেও একই সঙ্গে সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, যা সারা পৃথিবীর মধ্যেই এক বিরল ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ ইসরায়েলকেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের কোনো বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে—এ রকম কোনো কথা বা ভবিষ্যদ্বাণী বাংলাদেশের বাইরে আর কোথাও কোনো রাজনীতিক বা অর্থনীতিবিদ উচ্চারণ করেছেন বলে এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি।

তো এই যখন রাষ্ট্র-সংস্কৃতি, তখন গত ৩০ মে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কর্তৃক প্রকাশিত ব্যবসা পরিবেশ সূচকের (বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স- বিসিআই) তথ্য নির্দেশ করছে যে, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে দেশে ব্যবসার পরিবেশ সূচক ৪.২ পয়েন্ট নিচে নেমে গেছে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত ১১টি সূচকের মধ্যে সাতটির ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবনমন ঘটেছে এবং তিনটির ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলেও পরিমাণে তা খুবই সামান্য। আর একটি সূচক (পরিবেশগত নিয়মনীতি ও মান) এবারই প্রথম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বিধায় এর অগ্রগতি-অনগ্রগতির বিষয়টি হয়তো আগামী বছর বোঝা যাবে। উল্লিখিত অবনমিত সূচকগুলোর মধ্যে পয়েন্টের হিসাবে সবচেয়ে বেশি পতন ঘটেছে যে দুটি ক্ষেত্রে তার একটি হচ্ছে ‘‌ব্যবসা শুরু করা’ এবং অন্যটি হচ্ছে ‘‌ঋণের প্রাপ্যতা’। এখন ব্যক্তি মাত্রই স্বীকার করবেন যে, বাংলাদেশের মতো শিল্পে অনগ্রসর একটি দেশে উদ্যোক্তার জন্য ঝক্কি-ঝামেলাবিহীন ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে ব্যবসা শুরু করতে পারাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সে রকম একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সংক্রান্ত সূচকের অবনমনই যদি সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ঘটে তাহলে বুঝতে হবে যে, এ দেশের ব্যবসা ও শিল্পের সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ও সম্ভাবনা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। তাহলে যে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে মাঝে মাঝেই দেশের শিক্ষিত তরুণদের  চাকরির খোঁজ না করে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, সেটি কি তাহলে কেবলই কথার কথা?

ব্যবসা শুরু করার সূচকের অবনমনের সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ার বিষয়টিও বহুলাংশে জড়িত। অথচ দুষ্প্রাপ্য ও উচ্চ মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা নিরন্তর দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিদেশীদের  এ কথা বলার জন্য যে, বাংলাদেশ হচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য পৃথিবীর সেরা স্বর্গভূমি। কর্তাদের এমন বক্তব্যের মুখে লক্ষ্য বিদেশীর কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন যে, বাংলাদেশ যদি বিনিয়োগের এমন স্বর্গভূমিই হবে তাহলে অভ্যন্তরীণ জরিপেই (এমসিসিআইয়ের   জরিপ) মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যবসা শুরু করার পরিবেশ সূচক কেন ৮.০৪ পয়েন্ট নেমে গেল? আর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করে বেরোনো তরুণই-বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরামর্শে চাকরি না খুঁজে ব্যবসা বা শিল্প স্থাপনের আশায় প্রয়োজনীয় অলিগলি খুঁজে পাবে কেমন করে? আর সেসব না পেয়েই যে তারা বন্যার স্রোতের মতো বিদেশমুখী হচ্ছে—গন্তব্যস্থলের বর্তমান হালচাল কিংবা ভবিষ্যতের হালহকিকত কিছু না জেনেই—সে বিষয়ে সন্দেহ পোষণের এতটুকু কোনো অবকাশ আছে কি? আর একই কারণে দেশের বিদ্যমান উদ্যোক্তারাও যে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে বা নতুন ব্যবসায় হাত দেয়ার ব্যাপারে প্রায়ই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন, সেটাও তো বিদ্যমান বাস্তবতারই অংশ। তাহলে এ পরিবেশে নতুন ব্যবসা শুরুর কাজটিও কি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ পরিস্থিতির মতোই ক্রমান্বয়ে কেবলই পতনের দিকে ধাবিত হতে থাকবে?

এমসিসিআইয়ের উল্লিখিত জরিপ অনুযায়ী পয়েন্টের পতন ও মানগত শ্রেণী উভয় বিবেচনা থেকেই অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছে ‘‌ঋণ প্রাপ্যতা’র বিষয়টি, যা যেকোনো নতুন ব্যবসা শুরু করা বা বিদ্যমান ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলোর অন্যতম। তো সেই ঋণই যদি উদ্যোক্তারা অতিরিক্ত অর্থ ও শ্রম ব্যয় ব্যতীত হয়রানিমুক্ত পরিবেশে ও সময়মতো না পান, তাহলে দেশের সামগ্রিক শিল্প ও ব্যবসায় খাত এগোবে কেমন করে? এক্ষেত্রে আরো লক্ষণীয় যে, উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত মান ও প্রত্যাশা অনুযায়ী ঋণ না পেলেও দেশের ব্যাংক খাত কিন্তু ঠিকই ক্রমেই ফোকলা হয়ে যাচ্ছে। আর ব্যাংকের অর্থ এভাবে উদ্যোক্তা নামধারী লুটেরাদের হাতে চলে যাওয়ার কারণে ঋণবাজারে যে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, সেটি একদিকে যেমন ঋণের ব্যয়কে বাড়িয়ে তুলছে, অন্যদিকে তেমনি তা ব্যবসায়ের গতি ও উৎপাদনশীলতাকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আর দেশে বিরাজমান সামগ্রিক আর্থরাজনৈতিক পরিবেশ দেখে তো মনে হয় না যে, সহসা এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সূত্র থেকে ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নতুন ও পুরাতন উভয় শ্রেণীর উদ্যোক্তাদের জন্যই সামনে আরো অধিক খারাপ সময় অপেক্ষা করছে?

উল্লিখিত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট ‘‌আইনকানুনের তথ্যপ্রাপ্তি’র ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এ বছর (২০২৩) পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিসরের (৪.৪৫ পয়েন্ট) অবনতি ঘটেছে। তো সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলো থেকে বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার কাজটিই যদি দিনে দিনে আরো কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে কেমন করে? আর ব্যবসায়িক আইনকানুন সংক্রান্ত তথ্যাদি সময়মতো ও প্রত্যাশা অনুযায়ী না পেলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে কি এখানে বিনিয়োগে এগিয়ে আসা সম্ভব হবে? অথচ তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে অন্যান্য ক্ষেত্রে যত বিলম্বই ঘটুক না কেন, তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তো এতটা বিলম্ব হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রযুক্তিকে দোষারোপ করে তো কোনো লাভ নেই। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে যারা তথ্য সরবরাহের কাজটি করবেন তাদের দক্ষতা, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে প্রাযুক্তিক অগ্রগতির বিষয়টি চিরদিনই অনেকটা জাপানি বনসাইর মতো ছোট্ট ও সীমিত পরিসরে আড়ষ্ট হয়ে থাকবে—কোনোদিনই তা বটবৃক্ষ হয়ে উঠতে পারবে না।

আসলে হয়রানিমুক্ত ও ঝক্কি-ঝামেলাবিহীন পরিবেশে ব্যবসা শুরুর আবহ সৃষ্টি করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি বিষয়-বিশেষজ্ঞনির্ভর তথা পেশাজীবিতাভিত্তিক দক্ষ, বিকেন্দ্রায়িত ও দুর্নীতিমুক্ত শিল্প-সহায়তা কাঠামো, যে কাঠামোটি গত ৫৩ বছরেও এ রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারেনি। বরং এ সময়ের মধ্যে এটিকে আরো অধিক হারে বিষয়-বিশেষজ্ঞ নির্ভরতার পরিবর্তে আমলানির্ভর, পেশাজীবিতার পরিবর্তে করণিক সর্বস্বতাপূর্ণ এবং দক্ষতার পরিবর্তে দায়সারা মানের অদক্ষতার ওপর ভর করে সাজানো হয়েছে। এ অবস্থায় দেশে বর্তমানে যা ঘটছে তা হলো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবিশেষের অবৈধ সম্পদের স্ফীতি সৃষ্টিকে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতাদান। কিন্তু সে প্রক্রিয়ায় তো দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতের সামগ্রিক বিকাশ ও উন্নয়নের ধারাকে কোনো দিনই একটি যৌক্তিক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব নয়। আর যদি তা না হয় তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশ ও মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতি রেখে এ দেশের শিল্প ও ব্যবসায় খাত বিকশিত হবে কেমন করে? 

এ অবস্থায় দেশের শিল্প ও ব্যবসায় খাতকে যদি সত্যি সত্যি এগোতে হয় তাহলে সর্বাগ্রে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো উন্নত ও উদ্যোক্তাবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা সুবিধাদি একেবারে তার দোরগোড়ায় পৌঁছাতে না পারলেও সেসব যেন অন্তত তার চলাচলের চৌহদ্দির মধ্যে থাকে, সেটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু প্রায়ই তা না করে অর্থাৎ এক্ষেত্রে কার্যকর বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণের পরিবর্তে নিজেদের ব্যর্থতার দায় ঘোচানোর জন্য সারাক্ষণ যদি করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ইত্যাদিকে অছিলা হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশের ব্যবসায় ও শিল্প খাত বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে আরো বেশি করে আড়ষ্টতায় নিমগ্ন হয়ে পড়বে না কি?

আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), শিল্প মন্ত্রণালয়

আরও