ব্যাংক খাত

খেলাপি বনাম লুণ্ঠন ও বেনামি ঋণ

দেশের ব্যাংকিং তথা অর্থনীতি খাতের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও অবিসংবাদিত বিষয় খেলাপি ঋণ। বিষয়টার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য অল্পবিস্তর সবারই জানা।

দেশের ব্যাংকিং তথা অর্থনীতি খাতের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও অবিসংবাদিত বিষয় খেলাপি ঋণ। বিষয়টার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য অল্পবিস্তর সবারই জানা। তবে এ সংজ্ঞার বাইরেও যে খেলাপি ঋণ থাকতে পারে, সেটা ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত নন—এমন অনেকেরই জানা নেই। দৃশ্যমানভাবে খেলাপি নয় কিন্তু খেলাপের লক্ষণযুক্ত এবং ঘোষিত খেলাপি মিলিয়ে যে অনাদায়ী ঋণ থাকে, ব্যাংকিং পরিভাষায় এ ধরনের ঋণকে বলা হয় ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ, ইংরেজি পরিভাষায় যার নাম ডিসট্রেসড লোন বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ। এ ঋণের মধ্যে থাকে দৃশ্যমান খেলাপি, আদালতের আদেশে খেলাপি তালিকা থেকে বাদ দেয়া এবং পুনঃতফসিল ও অবলোপন করা ঋণ। স্পষ্টতই দেখা যায়, প্রথমটি ছাড়া বাকি তিনটি খেলাপি হলেও সেগুলো দৃশ্যমান খেলাপি তালিকায় থাকে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্ট থেকে জানা যায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে খেলাপি ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি, পুনঃতফসিল করা ঋণ ৩ লাখ ৪৯ হাজার কোটি এবং অবলোপন করা ঋণ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে ২০২৪ সালের হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দাঁড়িয়েছে মোট বকেয়া ঋণের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৫ শতাংশে। অন্যদিকে কেবল দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের হার মোট বকেয়া ঋণের ২১ শতাংশ। যেকোনো বিচারে এবং এশিয়া ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় এ হার কেবল অগ্রহণযোগ্যই নয়, চরম ঝুঁকিপূর্ণও বটে, যা অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে সংকটে ফেলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে যে খেলাপি ঋণের এমন উল্লম্ফন ঘটার মূল কারণ হঠকারী ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা, খেলাপি ঋণ আদায়ে ধীরগতি ইত্যাদি। সেই সঙ্গে দায়ী করা হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা, স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধের ক্ষমতাকে খর্ব করে দিয়েছে। তবে যে বিষয়টি উহ্য রয়ে গেছে, সেটি হচ্ছে হঠকারী ঋণ অনুমোদনের পাশাপাশি কিছু ব্যাংকের ঋণ বিতরণের নামে লুটপাট এবং জ্ঞাতসারে বেনামি ঋণ বিলানোর মহোৎসব। ইসলামী ধারার কমপক্ষে পাঁচটি ব্যাংককে নজিরবিহীনভাবে একক মালিকের হাতে তুলে দিয়ে ঋণের নামে যা ঘটানো হয়েছে, সেগুলোকে অবাধে লুটপাট ছাড়া অন্য কোনো সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। প্রথম প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকও এ প্রবণতায় প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি গিয়ে পৌঁছেছে।

ঋণ পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর সুযোগ বারবার করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১৯৯৫ সালে পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়ার ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে। তারপর এ সুযোগ আরেকবার দেয়া হয় ২০০৩ সালে। সেই পরিমার্জিত নীতিমালায় পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়া হয় মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ১৫ শতাংশ কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি কম সেই পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে। তৃতীয়বার পুনঃতফসিল করার জন্য ডাউন পেমেন্টের হার রাখা হয়েছিল মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কিংবা মোট বকেয়ার ৩০ শতাংশ। ২০১২ সালে ডাউন পেমেন্টের হার, পুনঃতফসিলের সর্বোচ্চ মেয়াদ ইত্যাদি পরিবর্তন করে জারি করা হয় পরিবর্তিত আরেকটি নীতিমালা। তারপর ২০১৫ সালে ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্বমন্দার বিরূপ প্রতিক্রিয়া’ বিবেচনা করে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ ঋণগ্রহীতাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার ওপর খেলাপি ঋণের জন্য একটা বিশেষ সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এ সুযোগের মাধ্যমে ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার মধ্যকার ঋণের জন্য ২ শতাংশ এবং ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের জন্য ১ শতাংশ হারে ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ছয় থেকে ১২ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করার নীতিমালা করা হয়েছিল। এসব ঋণের জন্য সুদের হারেও দেয়া হয়েছিল বিশেষ ছাড়। এতবার প্রতিষেধক দিয়েও যে বিশেষ কাজ হয়নি তা বর্তমান খেলাপি ঋণের চিত্র থেকেই বোঝা যায়।

২০২২ সালে ঋণখেলাপিদের বড় ছাড় দিয়ে আবারো জারি করা হয়েছিল নতুন নীতিমালা। এ নির্দেশনায় ২ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে চারবার ঋণ পুনঃতফসিল করা এবং সর্বোচ্চ ২৯ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ করে দেয়া হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, দেশের ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে খেলাপি ঋণ কম রাখার জন্যই এমন অবাধ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কারণ দাতা সংস্থাগুলো ঋণ শ্রেণীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেয়। ডাউন পেমেন্ট কমানোর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল ঋণখেলাপিদের পক্ষে ১৫ শতাংশ জোগাড় করা কঠিন হয়ে যায়।

বিভিন্ন সময়ে এমন খেলাপিবান্ধব নীতিসহায়তা সত্ত্বেও দেশের খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো চিকিৎসাতীত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। কখনো ব্যবসায়ীদের আবদার কিংবা চাপে, কখনো-বা দাতা সংস্থা ও বিদেশীদের কাছ থেকে প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে রাখার জন্য বারবার পুনঃতফসিল করার মহৌষধেও যে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি, তার প্রমাণ স্পষ্ট।

অতিসম্প্রতি সর্বশেষ জারি করা নীতিমালায় ২০২৪ সালের আগস্টের আগে ‘নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শ্রেণীকৃত হওয়া ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা পুনর্গঠনের জন্য ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের বিনিময়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগসহ রাখা হয়েছে সুদের হারে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। এ সুবিধার আওতায় পড়বে সেইসব প্রতিষ্ঠান, যারা ‘অব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নতুন নীতিমালায় এ সুবিধা পাওয়া গ্রাহক সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কোনো কিস্তি পরিশোধ না করার অবকাশ পাবেন। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে ২০২২ সালেও ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত ডাউন পেমেন্ট নিয়ে সর্বোচ্চ আট বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে ৫০০ কোটি ও ১ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে যথাক্রমে ২ ও ১ শতাংশ হারে ডাউন পেমেন্টের সুযোগ দিয়েও খেলাপি সমস্যার সুরাহা করা যায়নি। এবারের সুযোগ কতখানি সফল হবে সেটা বোঝার জন্য আমাদের দুবছর অপেক্ষা করতে হবে। এ দুই বছরের মধ্যে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধক্ষমতা নিরূপণ করাও সম্ভব হবে না। এরই মধ্যে নতুন নীতিমালার অধীনে ঘোষিত সুবিধা পাওয়ার জন্য সুযোগসন্ধানীরা যেভাবে নেমে পড়েছেন সেটা সামাল দেয়া ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়া বাকি শর্তগুলো প্রমাণ করা অত্যন্ত দুরূহ হবে।

সাধারণ খেলাপি ঋণকে দুভাগে ভাগ করা হয়, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপি। উল্লেখ্য, প্রচুর গড়িমসির পর ২০২৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইনে যুক্ত করা হয়েছিল ইচ্ছাকৃত খেলাপিবিষয়ক ধারা। কিন্তু সেই সংযোজন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি আইনটির দুর্বলতা এবং তৎকালীন সরকারের অনীহার কারণে। বর্তমান পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণকে চার ভাগে ভাগ করতে হবে। খেলাপি ঋণের তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগটা হবে লুণ্ঠিত ও বেনামি ঋণ। শেষোক্ত এ দুই শ্রেণীকে খেলাপি বলার কোনো অবকাশ নেই, কারণ দুর্বৃত্তির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে ফেলাকে ঋণের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। আজকাল একটা কেতাবি সমাধানের কথা প্রায়ই বলা হয় যে খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে দেয়া হবে কিংবা দিতে হবে। তবে এ সমাধান কাজ করে কেবল প্রকৃত খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে। লুণ্ঠিত ও বেনামি ঋণের দায়িত্ব কোনো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি নেবে না। এ দুই শ্রেণীর ঋণকে আলাদা করা হলে প্রকৃত খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ কমে আসবে এবং আদায়ের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। তার জন্য দরকার সরকারের নীতিগত ও আইনগত সহায়তা। খেলাপিদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়াটাই হবে এ সহায়তা।

লুণ্ঠিত ও বেনামি ঋণ আদায় প্রায় অসম্ভব হলেও ঋণের নামে এ লুণ্ঠনে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, বাজেয়াপ্ত করতে হবে তাদের সম্পদ। ঋণ বেনামি হলেও তার পেছনের মূল হোতা কারা সেটা ব্যাংকের অজানা নয়। সুতরাং তাদের শনাক্ত করা কঠিন হবে না। সেই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন কায়েম করার জন্য বাধ্য করতে হবে ব্যাংকগুলোকে, যাতে ভবিষ্যতে খেলাপি গ্রহীতার সংখ্যা আর না বাড়ে। বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এ বিষয়ে কিছুই করা হয়নি, বরং লুণ্ঠনকারীদের দেয়া হয়েছে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ও আশ্রয়-প্রশ্রয়। সেসব কাহিনী রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। বর্তমান অবস্থায় যেহেতু কোনো রাজনৈতিক সরকার নেই, এ ব্যাপারে মানুষের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। যদিও সরকার পরিবর্তনের পর দৃশ্যমান কিছু কাজ হয়েছে একমাত্র ব্যাংক খাতে, কিন্তু আমাদের যেতে হবে আরো বহুদূর। ধীরগতি এ যাত্রাকে পিচ্ছিল ও বন্ধুর করে তুলতে পারে।

ফারুক মঈনউদ্দীন: ব্যাংকার ও লেখক

আরও