জনবহুল বাংলাদেশে একটি সরকারি চাকরি পাওয়া যেমন দুঃসাধ্য, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রক্রিয়াটিও তেমন প্রতিযোগিতামূলক। ক্যাডার সার্ভিসের নিয়োগ পরীক্ষা সংগত কারণেই আরো অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী যাচাইয়ের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। পিএসসি কোনো সরাসরি নিয়োগকারী সংস্থা নয়, বরং এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান দায়িত্ব হলো মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীদের বাছাই করে রাষ্ট্রকে একটি দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গঠনে সহায়তা করা।
পিএসসি বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসের জন্য যোগ্যতর প্রার্থীকে বাছাই করে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাদ দিলে বিসিএসের সর্বশেষ ধাপটি হলো ভাইভা। প্রথম ধাপে ১০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেয়া হয়। এরপর ৯০০ নম্বরের লিখিত ও সর্বশেষ ২০০ নম্বরের ভাইভা নেয়া হয়। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য বিবেচনায় নেয়া হয় না। লিখিত ও ভাইভায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই পিএসসি মেধাতালিকা প্রণয়ন করে। কাজেই একজন প্রার্থীর জন্য বিসিএসের ভাইভা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পিএসসির জন্যও তা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। কাজেই ভাইভাটি হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানসম্মত।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে পিএসসির ভাইভা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, অভিযোগও আছে বিস্তর। বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় পিএসসির ভাইভা নেয়া হয় এবং যে পদ্ধতিতে চাকরিপ্রত্যাশীদের মূল্যায়ন করা হয় তাতে প্রকৃতপক্ষে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন হয় কিনা তা নিয়েও অনেকের মনে সংশয় আছে। সংগত কারণেই পিএসসির ভাইভার জন্য কিছু সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে বিসিএসের ক্ষেত্রে পিএসসি ২০০ নম্বরের ভাইভা নিয়ে থাকে। সাধারণত একটি ভাইভা বোর্ডে পাঁচজন করে সদস্য থাকেন, যাদের মধ্যে একজন পিএসসির সদস্য। পিএসসির সদস্য ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যরা বোর্ডের সদস্য হিসেবে বোর্ডে উপস্থিত থাকেন। একটি বোর্ডে দিনে গড়ে ২০ জন প্রার্থীর ভাইভা নেয়া হয়। ভাইভার জন্য একজন প্রার্থী সাধারণত ১০-২০ মিনিটের মতো সময় পেয়ে থাকেন। এ অল্প সময়ের মধ্যেই একজন চাকরিপ্রত্যাশীকে ২০০ নম্বরের মূল্যায়নের জন্য বিবেচনা করা হয়। কাজেই প্রশ্ন জাগে এ অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি নম্বরের মূল্যায়ন সম্ভব কিনা!
ভাইভার প্রশ্নের ধরন একেক বোর্ডে একেক রকম। কেউ খুব সহজ প্রশ্ন করেন, কেউ অতি জটিল। আবার কোনো ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্ন করা হয়, কখনো বা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নও করা হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশ্ন করা হয় জ্ঞানভিত্তিক, যা মূলত লিখিত পরীক্ষার বিষয়বস্তু হওয়ার কথা। পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটিই ব্যক্তিনির্ভর। মূল্যায়নরীতিও ব্যক্তিনির্ভর। নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে ইউনিফর্ম কোনো রীতি নেই। একজন প্রার্থী একটি বোর্ডে যে নম্বর পান, তিনিই যদি অন্য বোর্ডে পরীক্ষাটি দিতেন তাহলে তার নম্বর ভিন্নতর হতে পারে।
ভাইভার নম্বর বণ্টনরীতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভাইভায় নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে বোর্ডের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। চেয়ারম্যানদের কেউ উদার হলে নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে অন্যদের মতামত আমলে নেয়া হয় কখনো কখনো। কিন্তু এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিছু ক্ষেত্রে বোর্ডের সদস্যরা আলাদা করে মূল্যায়ন করে থাকেন, পরবর্তী সময়ে যার গড় নম্বর প্রার্থীর রেজাল্টের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও তা কেবল লোকদেখানো সংস্কৃতির মধ্যেই পড়ে। কেননা ভাইভার পুরো বিষয়টিই নির্ভর করে বোর্ডের চেয়ারম্যানের সদয় বিবেচনার ওপর। ভাইভার এ পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, অগ্রহণযোগ্যও বটে। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়াটি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রবণতাকেও উৎসাহিত করে। এমন প্রেক্ষাপটে বিসিএস পরীক্ষার পুরো ভাইভা প্রক্রিয়াটিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সংগত কারণেই এ ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির সংস্কার জরুরি।
সবার আগে ভাইভার পূর্ণ নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ নম্বরে আনতে হবে। ভাইভা অত্যন্ত সীমিত সময়ের মধ্যে পরিচালিত হয়। মাত্র ১৫-২০ মিনিটে ২০০ নম্বরের মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত নয়। এত অল্প সময়ে একজন প্রার্থীর প্রকৃত প্রতিভা মূল্যায়নও সম্ভব নয়। অন্যদিকে প্রার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় ভাইভার সময়কাল বৃদ্ধি করাও সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় ভাইভা ১০০ নম্বরে সীমিত করলে তা হবে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক।
ভাইভার মূল্যায়ন পদ্ধতিরও পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমানে ব্যক্তিনির্ভর ভাইভা পদ্ধতির পরিবর্তে একে কাঠামোগত পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য ১০০ নম্বরের ভাইভাকে পাঁচটি পৃথক ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে হবে। এ পাঁচটি ক্যাটাগরি হলো: যোগাযোগ ও আন্তর্ব্যক্তিক দক্ষতা; স্মার্টনেস ও উপস্থিত বুদ্ধি; নীতিবোধ ও মনস্তত্ত্ব; পলিসি সচেতনতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা; যুক্তি, নেতৃত্ব ও সমস্যা সমাধান দক্ষতা। প্রত্যেক ক্যাটাগরির নম্বর হবে ২০। পাঁচটি ক্যাটাগরিতে মোট নম্বর হবে ১০০। এবার বোর্ডের প্রত্যেক সদস্যকে পৃথক এক-একটি দিক মূল্যায়নের জন্য নির্ধারণ করতে হবে। এভাবে বোর্ডের প্রত্যেক সদস্যকে এক-একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির দায়িত্ব দিলে মূল্যায়ন হবে অধিকতর সুনির্দিষ্ট ও পক্ষপাতমুক্ত। প্রার্থীর জন্যও এ প্রক্রিয়া হবে বৈচিত্র্যময় এবং এর মাধ্যমে একজন প্রার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা বিচারও সম্ভব হবে। ফলে পুরো ভাইভাটিই হয়ে উঠবে অনেক বেশি স্বচ্ছ, যুগোপযোগী, বিজ্ঞানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য।
ভাইভা বোর্ডে কোনো সাইকোলজিস্ট বা মনোবিজ্ঞানী থাকে না। ফলে প্রার্থীর মানসিক সক্ষমতা মূল্যায়নের কোনো সুযোগ থাকে না। কাজেই ভাইভায় প্রার্থীর মনস্তত্ত্ব ও মানসিক দক্ষতা পরীক্ষা করার জন্য বোর্ডে একজন সাইকোলজিস্ট রাখতে হবে।
বর্তমানে পিএসসির ভাইভা একটি এককালীন ও একমুখী উপায় হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে ভাইভা পরীক্ষা রেকর্ড করা হয় না। ফলে ভাইভার ক্ষেত্রে নম্বর পুনর্মূল্যায়নের কোনো সুযোগ থাকে না। কোনো প্রার্থী যদি মূল্যায়ন চ্যালেঞ্জ করতে চান, তাহলে তার জন্য কোনো আইনি বা প্রশাসনিক সুযোগ থাকে না। কাজেই ভাইভার অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং করতে হবে এবং তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। এটি একদিকে যেমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে এটি ভবিষ্যতে যেকোনো অভিযোগ বা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক হবে।
মনে রাখতে হবে সরকারি চাকরি শুধু একটি পেশা নয়, এটি রাষ্ট্রের জনগণের সেবাদানের একটি গুরুদায়িত্ব। তাই এ দায়িত্ব পালনের জন্য যাদের নির্বাচন করা হবে, তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু বিদ্যমান ভাইভা পদ্ধতিতে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজেই বিদ্যমান ভাইভা পদ্ধতিতে এ সংস্কারগুলো করতেই হবে। ভাইভার নম্বর কমাতে হবে, ক্যাটাগরিভিত্তিক ভাইভা পদ্ধতি চালু করতে হবে এবং দক্ষতা কাঠামোর আলোকে সদস্যদের দায়িত্ব নির্ধারণ করে ভাইভা সম্পন্ন করতে হবে। ভাইভা পরীক্ষার এ ন্যূনতম সংস্কারটুকু করা হলে রাষ্ট্রের জন্য উপযুক্ত মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নির্বাচন করার সুযোগ ও সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
সফিক ইসলাম: শিক্ষক ও বিজ্ঞান আন্দোলন কর্মী