সামাজিক পরিবর্তন ও রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী। নানা কারণে সমাজ পরিবর্তন হয়। এ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ গতিপথ দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। অর্থনীতি আর রাজনীতি নিয়ে পাড়াগাঁয়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নির্বাহী বিভাগের সচিবালয় পর্যন্ত সবাই আড্ডা, আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, বাদানুবাদে ব্যস্ত। কালের প্রবাহে আমাদের সামাজিক পরিবর্তন, সামাজিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা কম, লেখালেখিও কম আর গবেষণা তো নেই-ই বললে চলে। দুর্ভাগ্যজনক, সময়ের পরিসরে সমাজের যে পরিবর্তন হচ্ছে বা হবে তা ইতিবাচক না নেতিবাচক তা অনুসন্ধান করার আগ্রহ নেই কারো। সমাজবিজ্ঞানী, গবেষক, এমনকি সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত রাজনৈতিক নেতারাও এ নিয়ে ভাবছেন বলে মনে হয় না। এটাও একটা বিরাট অবক্ষয়ের লক্ষণ। প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আর্নল্ড জে টয়েনবি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন— Civilizations die from suicide, not by murder. আমরা যদি নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে আনতে না চাই তো আমাদের সমাজকে নিয়ে ভাবতে হবে, সমাজকে বাঁচাতে হবে, পরিচর্যা করতে হবে।
জ্ঞানার্জন: জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য মনুষত্ববোধকে জাগ্রত করার জন্য, মানবিক গুণাবলি অর্জনের জন্য, সুকুমারবৃত্তিকে পরিচর্চা করা আর নিজকে সমাজ বা বিশ্ব ব্যবস্থার উপযোগী করার জন্য। কিন্তু আজকাল বিদ্যার্জন শুধু কর্মসংস্থান বা রোজগারের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই করছে আবালবৃদ্ধবনিতা। মনের খোরাক, আত্মতৃপ্তি, সুকুমারবৃত্তি–এগুলোর গুরুত্ব হ্রাস পাচ্ছে। নৈতিকতা, আদর্শ সচ্চরিত্রবান প্রজন্ম গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ক্রমশ হ্রাসমান। এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রটুকু বাদ দিয়ে। তাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক বিষয়ে নয় বরং বিসিএস কিংবা অন্য লাইনে রোজগারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ভালো রোজগার করার জন্য, বিত্তবান হওয়ার জন্য, ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য কিংবা বিদেশে চাহিদা আছে এ ধরনের বিষয়ে/প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর বেশ বড় প্রতিযোগিতা। বিজ্ঞ, জ্ঞানী, অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এমনকি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয়তা, সামাজিক সম্মান, মানমর্যাদা কমে যাচ্ছে। চাকরিতে বদলি-পদায়নের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দক্ষ, জ্ঞানী, অভিজ্ঞ, প্রশিক্ষিতদের বিবেচনায় নেয়া হয় না।
আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে শিক্ষার্থী নিজেরা বা তাদের অভিভাবকরা ডিগ্রি শ্রেণী নিয়ে অর্থাৎ এ প্লাস, গোল্ডেন, ফার্স্ট ক্লাস ইত্যাদি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হলো কিনা তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। পক্ষান্তরে শিক্ষার্থীর চারিত্রিক কাঠামো, আদর্শিক উন্নয়ন, আদব-কায়দা, আচরণ কোন দিকে যাচ্ছে তার ভ্রুক্ষেপ নেই বাবা-মার। সুশীল সমাজ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র, এলাকার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, ইউটিলিটি সার্ভিস ইত্যাদি নিয়ে দাবি-দাওয়া, মিটিং-মিছিল, অবরোধ করে, যা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা এবং পরিবেশ, গণপাঠাগার উন্নয়ন—এসব বিষয়ে ততটা সিরিয়াস নন। অতিশয় প্রযুক্তিনির্ভরতা শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, মেধাশক্তি, ভাবনাশক্তি, গবেষণাশক্তি কখনো কখনো কমিয়ে দিচ্ছে। তারা সরাসরি প্রযুক্তির সহায়তা নেয়। এতে মেধা বা উদ্ভাবনী দক্ষতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
সহিংসতা: একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে সামান্য বা তুচ্ছ কারণে সমাজে খুন-খারাবি ঘটেই চলেছে। সমাজে ভীষণ অস্থিরতা বিরাজ করছে। শিক্ষিত লোকেরাও অন্যদের আঘাত করছে সামান্য কারণেই। সামান্য থুতু ফেলাকে কেন্দ্র করে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমুল সংঘর্ষ হয়ে যায়, শিক্ষার্থী মারা যায়, শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষিত হয়। শিক্ষিত ছাত্ররা দলবদ্ধভাবে মোবাইল চুরির সন্দেহে টোকাই বা অপ্রকৃতিস্থ লোককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলছে আর উৎসুক শিক্ষার্থী/জনতা দেখছে বা উপভোগ করছে। কেউবা ভিডিও করছে নিষিদ্ধ আনন্দে কিংবা আর্থিক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে। হিংস্রতা, সহিংসতা আর উগ্রতা বেড়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে পিটিয়ে, পাথরের আঘাতে, দা-চাপাতি দিয়ে নৃশংস হত্যা যেন সাধারণ ব্যাপার। আদিম যুগের বর্বরতার মতো পূর্ব ঘোষণা দিয়ে কয়েক দিনের প্রস্তুতি নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রে দুই গ্রামের/মহল্লার মধ্যে সম্মুখযুদ্ধ এখনো প্রচলিত আছে কোনো কোনো জেলায়। সামান্য স্বার্থের কারণে কথায় কথায় নিকটাত্মীয়কে, পরিবারের সদস্যকে মেরে ফেলছে।
প্রতারণা: ক্রমেই বেড়ে চলেছে প্রতারণা, যে যেখানে পারছে নব নব পন্থায় তাই করছে। এক ধরনের প্রতারণায় ভিকটিম হয়ে মানুষ সচেতন হচ্ছে তো নতুন ধরনের প্রতারণার জাল চলে আসছে। খাদ্যে ভেজাল, ভোগ্যপণ্যে ভেজাল, নকলের মহোৎসব চলছে যেন। কোনো প্রচেষ্টাই থামাতে পারছে না এ প্রবণতা। এটি একটি ইন্ডাস্ট্রিতে রূপ নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে, হাটবাজারে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, বড়-ছোট নির্বিশেষে সবাই সবার সঙ্গে প্রতারণার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তির উৎকর্ষ দেখলে রীতিমতো অবাক হতে হয়।
আতিথেয়তা: আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়া, মেহমান বাসায় আসা, মেহমানকে নিজ হাতে তৈরি করে বিশেষ ধরনের সুস্বাদু খাবার দিয়ে আপ্যায়নসহ আদর-যত্ন করার বাঙালি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। অতিথি আপ্যায়ন একসময় বাঙালির গর্বের ঐতিহ্য ছিল। গ্রামে কারো গৃহে মেহমান এলে পুরো পরিবার ব্যস্ত হয়ে পড়ত খাবার ও আদর-যত্নে। এখন শহুরে ব্যস্ত জীবনে সময়ের অভাব, কাজের চাপ, চাকরির ব্যস্ততা কিংবা পরিবারের সদস্য সংখ্যা হ্রাসের কারণে সেই আতিথেয়তার রীতি অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজন এলে বাহ্যিকভাবে আদর-সম্ভাষণ জানালেও প্রকৃতপক্ষে মনঃক্ষুণ্ণ হন অনেকে। আত্মীয়-স্বজনদের কিংবা মেহমানদের আজকাল হোটেল-রেস্তোরাঁয় আপ্যায়নের ব্যবস্থা করার রীতি চলে এসেছে। শহরে এমনকি গ্রামাঞ্চলেও আজকাল অতিথি এলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধুমধাম করে উন্নত মানের খাবারের আয়োজন করা হয় না। তবে উৎসবের সময়—ঈদ, পূজা, নববর্ষ বা বিয়ের অনুষ্ঠানে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে সেই ঐতিহ্য এখনো কিছুটা টিকে আছে।
পরিবার ও আত্মীয়: বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পারিবারিক কাঠামোয়। আগে যৌথ পরিবার ছিল সমাজের মূলভিত্তি—একই ছাদের নিচে দাদা-দাদি, বাবা-মা, চাচা-চাচি ও সন্তানরা একত্রে বাস করতেন। সিদ্ধান্ত নেয়া হতো সমষ্টিগতভাবে, দায়িত্ববোধ ছিল ভাগাভাগি করা। সুযোগ-সুবিধা ভাগাভাগি করা, আত্মত্যাগ করা, সহনশীলতা অর্জন, টিম স্পিরিট বা দলীয় চেতনা প্রভৃতি গড়ে ওঠার সুযোগ ছিল।
যৌথ পরিবার এখন ক্রমেই একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে। এখন পেশা, শিক্ষা, এককেন্দ্রিক মনোভাব ও স্থানান্তরের কারণে ছোট পরিবারই সাধারণ হয়ে উঠেছে। এখন সময়ের প্রয়োজনে যৌথ পরিবারের জায়গায় এসেছে একক পরিবার। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ শহরে চলে আসছে, আলাদা বাস করছে। ফলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেড়েছে, কিন্তু পারিবারিক মেলবন্ধন দুর্বল হয়েছে। উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক সমাবেশের সংখ্যা আগের তুলনায় কমলেও ডিজিটালমাধ্যম এখন সেই দূরত্ব কিছুটা ঘোচাচ্ছে—ভিডিও কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারিবারিক সংযোগ কিছুটা বজায় থাকছে।
যৌথ পরিবার যুগে সন্তানরা বাবার পক্ষীয় আত্মীয়দের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত ছিল। নানাবাড়ি, মামাবাড়ি মাঝে মাঝে বেড়াতে যেত ও আনন্দ করত। এখন সন্তানদের কাছে বাবার পক্ষের আত্মীয়-স্বজনদের চেয়ে মায়ের পক্ষের আত্মীয়-স্বজন বেশি প্রিয়, তাদের সঙ্গেই বেশি যোগাযোগ, ওঠাবসা। অর্থাৎ চাচা-চাচি, ফুফা-ফুফু সম্পর্কগুলোর চেয়ে নানা-নানি, মামা-মামি, খালা-খালু বেশি পরিচিত, বেশি প্রিয়। মামা সম্পর্কটার জনপ্রিয়তা তো আকাশচুম্বী। রাস্তাঘাটে অপরিচিত সবাই মামা, কেউ চাচা বা ফুফা নন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি প্রিয় তাদের ক্লাসমেট বা বন্ধু। এক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন এমনকি কাজিনরাও থাকে উপেক্ষিত অবহেলিত।
একক পরিবারে নারী-পুরুষ উভয়ই উপার্জনে অংশ নিচ্ছে। পরিবারের কর্তৃত্বে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। পুরুষের সঙ্গে নারীরাও অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে আংশগ্রহণ করছে। তবে এ পরিবর্তনের সঙ্গে এসেছে কিছু চ্যালেঞ্জও। নগরায়ণের ফলে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও পারিবারিক বন্ধন কিছুটা শিথিল হয়েছে, বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব বাড়ছে। তবু পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ এখনো টিকে আছে, যদিও আগের মতো নিয়মিত পারিবারিক সমাবেশ বা আত্মীয়তার গভীরতা কিছুটা কমেছে।
সন্তানের প্রতি মা-বাবার স্নেহ, ভালোবাসায় চির ধরেনি, অটুট রয়েছে এবং সামাজিক অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা আর নিরাপত্তাহীনতার কারণে সন্তানের জন্য মা-বাবার উদ্বিগ্নতা, সতর্কতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেড়েছে। মা-বাবারা এমনকি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীকে ও প্রটেকশন দেয়ার জন্য নিজেরা গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে মা-বাবার প্রতি বিশেষ করে বৃদ্ধাবস্থায় তাদের ভরণপোষণ, সেবা-শুশ্রূষা করার বিষয়ে অনেক সন্তানই উদাসীনতা প্রদর্শন করে। সন্তান ভোগবিলাসী, উন্নত আর নিরাপদ জীবনাকাঙ্ক্ষায় প্রবাসে স্থায়ী হচ্ছে। মা-বাবা বৃদ্ধ বয়সে একা সহায়-সম্বলহীন হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিচ্ছে। এসব কারণে সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে গাণিতিক হারে।
বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন: উপকারিতা অপকারিতা যা-ই হোক আগেকার অধিকাংশ বিয়ে হতো সেটেল্ড বা অভিভাবক কর্তৃক নির্ধারিত। ঘটকদের আধিক্য, প্রয়োজনীয়তা ও জনপ্রিয়তাও ছিল বেশ। গ্রামাঞ্চলে এমনকি শহুরে বসবাসকারীরাও তাদের সন্তানদের বিয়েশাদির বিষয়ে নিজ উপজেলা, জেলা বা পার্শ্ববর্তী জেলার পাত্র-পাত্রীকে প্রাধান্য দেয়া হতো। আর অবশ্যই সেক্ষেত্রে বংশমর্যাদাকে গুরুত্ব দেয়া হতো। সে সময় ‘নদীর জল ঘোলা ভালো, জাতের মেয়ে কালোও ভালো’ এ প্রবাদ বাক্য অনুসরণ করা হতো। এখন সেটেল্ড মেরেজের হার অনেক কম। পাত্র-পাত্রীরাই তাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করে।
আগেও যুবক-যুবতীদের মধ্যে প্রেম হতো। তবে তার হার ছিল অনেক কম। রক্ষণশীল পরিবারের মধ্যে আরো কম। যুবক-যুবতীরা আগে প্রেম করত লুকিয়ে, এখন প্রকাশ্যে। আগে প্রেম করতে লজ্জা পেত, এখন লজ্জা দূরীভূত। সে সময় মা-বাবা অভিভাবক যেন প্রেমের বিষয়ে টের না পায় সেজন্য প্রাণান্ত চেষ্টা থাকত যুবক-যুবতীদের। এখন অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবাই উল্টো জিজ্ঞাসা করেন সন্তানের পছন্দের কেউ আছে কিনা। এ প্রথার সপক্ষে এখন সবাই সোচ্চার।
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নর-নারীদের মধ্যে, স্বজাতি–ভিন্ন জাতি, পরধর্মে বিয়ে হচ্ছে যা এমনকি ৪০-৪৫ বছর আগেও কল্পনাতীত ছিল। আগে পরধর্মে বিয়েতে যেকোনো এক পক্ষকে স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করতে হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা করতে হচ্ছে না। পরধর্মে বিয়ে হলে আগে বিচারের নামে সালিশ হতো, এখন তা হচ্ছে না বলতে গেলে। এখন বিদেশী এবং অন্য ধর্মীয় নর-নারী দেশে এসে এ দেশের কাউকে বিয়ে করলে আত্মীয়-স্বজন এবং গ্রামবাসী/এলাকাবাসী মেনে নেয়। বিয়েতে বর-কনের আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে পড়াশোনা, চাকরি, স্বনির্ভর হওয়া এবং স্বাধীনতা ভোগ করার মানসে এখন বিশেষ করে শহরের মেয়েরা আগের তুলনায় অধিক বয়সে বিয়ে করে।
আগে ডিভোর্সের হার কম ছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্ত্রীরা বাধ্য হয়ে, নিরুপায় হয়ে এবং ধর্মীয় ভাবাবেগে সবকিছু সহ্য করে যেত। বর্তমানে নানা কারণে সমাজে ডিভোর্স বেড়ে গেছে নীরবে-সরবে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, বেকার-চাকরিজীবী সব ক্ষেত্রেই ডিভোর্স বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। তবে এ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ কারো কোনো মাথাব্যথা নেই, নেই প্রতিরোধ উদ্যোগ। গা সহনীয় হয়ে গেছে সবার। প্রেমের বিয়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে, তার পরও ডিভোর্স বাড়ছে। দাম্পত্য জীবনের আরো কিছু নবতর সংস্করণ সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে, যেমন ডিভোর্স ছাড়াই স্বামী-স্ত্রী আলাদা বসবাস করছে দীর্ঘদিন। ডিভোর্স বা সেপারেশন যা-ই হোক স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে দোষারূপ না করে এখন একে অন্যের প্রশংসা করা বা শুভকামনা জানানোর মতো চমৎকার রীতির/সংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটেছে। আবার সন্তান হলে উভয়ে আলাদা থেকেই সন্তানের ভরণপোষণ দিচ্ছে বা লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহ করছে। লিভ টুগেদার করছে কেউ কেউ, তবে মুষ্টিমেয় সাহসী দু-একজন ছাড়া বাকিরা গোপনে এ কাজ করছে। (বাকি অংশ আগামীকাল)
সিকদার আনোয়ার: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব