আলোকপাত

জনপ্রশাসনে অবহেলিত প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই—এটা সবাই বলেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ খাত বাস্তবে অবহেলিত, ভীষণভাবে অবহেলিত। এটা সবাই বলেন না, কেউ কেউ বলেন, উপলব্ধি করেন।

প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই—এটা সবাই বলেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ খাত বাস্তবে অবহেলিত, ভীষণভাবে অবহেলিত। এটা সবাই বলেন না, কেউ কেউ বলেন, উপলব্ধি করেন। প্রশিক্ষণ খাতের লোকজন সে প্রশিক্ষক হোন, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক হোন কিংবা প্রশিক্ষণ আয়োজক হোন, তারা যতই জ্ঞানী, দক্ষ আর ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন হোন না কেন এ সমাজে সম্মানিত, কাঙ্ক্ষিত বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী নন। তাহলে দেশ, সমাজ আর অর্থনীতির উন্নয়নের কাজ, মানুষকে সেবা দেয়ার কাজ, সভ্যতার পরিমার্জনের কাজ এগোবে কীভাবে? প্রশিক্ষণ খাত কেন অবহেলিত? বলে রাখা ভালো যে রাষ্ট্রের সংবিধান থেকে শুরু করে সরকারের কার্যবিধিমালা, চাকরি আইন, উন্নয়ন পরিকল্পনা, চাকরিনীতি ও চাকরি বিধিমালাসহ বিভিন্ন বিধিবিধানে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা সম্পূর্ণই ভিন্ন।

মেধা, দক্ষতা আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে কোনো কার্যক্রমে উৎকর্ষ অর্জনের, লক্ষ্য অর্জনের পন্থা বা মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়া, অনুধাবন না করা, জ্ঞানার্জন বিমুখীনতা, শর্টকাট পন্থাপ্রিয়তা তথা সঠিক পদ্ধতির পরিবর্তে বাঁকাপথে কাজ করা, গবেষণাকাজে অনাগ্রহ, সুশাসনের অভাব, কর্মক্ষম জনবলের চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীত, পক্ষপাতিত্ব বা গোপন আঁতাতের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন ইত্যাদি কারণে প্রশিক্ষিত কর্মী বা প্রশিক্ষণ খাতের গুরুত্ব সমাজে প্রতিভাত হয় না। অন্যদিকে প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানে নিয়োজিতদের প্রশাসনিক বা উন্নয়নমূলক দায়িত্বসম্পন্ন পদগুলোর সঙ্গে অসম্পৃক্ততা, সরাসরি সাধারণ জনগণের সঙ্গে দাপ্তরিক সম্পৃক্ততা বা সরাসরি সেবাদানের সুযোগহীনতা, উন্নয়ন ও সেবা প্রদানকারী অংশীজনের সঙ্গে অসম্পৃক্ততা এবং অন্যান্য অংশীজন পর্যায়ে মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টির সুযোগ না থাকা ইত্যাদি কারণে তাদের সামাজিক ও পেশাগত মানমর্যাদা নিচুমানের ধরা হয়।

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আন্তঃবিভাগীয় বা আন্তঃদাপ্তরিক সভায়, সম্মেলনে, অনুষ্ঠানে, নীতিনির্ধারণী সভায়, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে, উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে কিংবা আন্তর্জাতিক সভা-সিম্পোজিয়ামে, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দলে প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানকে প্রায়ই সম্পৃক্ত করা হয় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করার সুযোগও নেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের দেশী-বিদেশী পর্যায়ে যোগাযোগ/এক্সপোজার হ্রাস পায়, তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বহুমুখীকরণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠান অনেকটা ‘একঘরে’ হয়ে পড়ে।

প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী নিরাপত্তার জন্য গানম্যান বরাদ্দ, কাঙ্ক্ষিত প্রটোকল দেয়া, সার্কিট হাউজে কিংবা রেস্ট হাউজে কক্ষ বরাদ্দ, পুলিশি সালামি ও পুলিশ প্রটেকশন, গাড়ি, আবাসন ও লজিস্টিক সুবিধা ইত্যাদিতেও প্রশিক্ষকদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। ক্রমাগত বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য আর বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে একদিকে মানসিকভাবে হীনম্মন্যতায় নিমজ্জিত হয় আবার উপযুক্ত সহায়ক পরিবেশের অভাবে দক্ষতা, কর্মস্পৃহা লোপ পায়। স্বভাবতই প্রশিক্ষণের প্রতি সবার আগ্রহ হ্রাস পায়।

অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত বা দায়িত্ব সম্পৃক্ত কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণে পাঠায় না বিধায় প্রশিক্ষণের প্রতি অংশগ্রহণকারীর আগ্রহ থাকে না। একজন কর্মচারীর কী ধরনের, কোন মেয়াদের প্রশিক্ষণ দরকার তা নির্ধারণ করা অর্থাৎ প্রশিক্ষণ চাহিদা নির্ণয় করা হয় না, ফলে ওই কর্মচারী প্রায়োগিক দিক চিন্তা করে সেই প্রশিক্ষণকে প্রয়োজনীয় মনে করেন না এবং এবং প্রশিক্ষণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে যে উদ্দেশ্য নিয়ে একটি কোর্স ডিজাইন করা হয়, যে উদ্দেশ্যে একজন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণে মনোনিবেশ করেন, তাকে প্রশিক্ষণোত্তর লব্ধ জ্ঞান-দক্ষতা প্রয়োগের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় না, অর্থাৎ তাকে প্রশিক্ষণসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রাখার নিশ্চয়তা বা অঙ্গীকার দেয়া হয় না। ফলে সেই প্রশিক্ষণ গ্রহণে প্রশিক্ষণার্থীর আদৌ আগ্রহ সৃষ্টি হয় না।

প্রশিক্ষণ খাতের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার পেছনে প্রশিক্ষণ খাতে নিয়োজিত কর্মরতরাও অনেকাংশে দায়ী। প্রথমত, প্রশিক্ষণ খাতে নিয়োজিতরা নিজেদের অবহেলিত, অপাঙ্‌ক্তেয় মনে করেন, কখনো আবার হীনম্মন্যতায় ভোগেন আর তাই খাতের উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন না। কেউ কেউ লেজুড়বৃত্তি কিংবা স্বজনপ্রীতির অভিযোগে দুষ্ট। অনেকে প্রশিক্ষণার্থীদের সেবা প্রদানে বা নিজ কর্তব্য পালনে আন্তরিক নন। অনেকে প্রশিক্ষণ কোর্স ডিজাইনে, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা কিংবা সেশন পরিচালনায় আন্তরিক নন, মনোযোগী নন। ফলে এ খাতের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই নেতিবাচক পরিলক্ষিত হয়।

সরকার বহুল প্রতীক্ষিত ও প্রত্যাশিত সরকারি চাকরি আইন জারি করে ২০১৮ সালে। ওই আইনের ৮ ধারায় সরকারি কর্মচারীর পদোন্নতির মানদণ্ড নির্ধারণ করে বলা হয়েছে যে ‘কোনো স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক চাকরি বিবেচনাক্রমে পদোন্নতি প্রদান করিতে হইবে’। চাকরিতে যোগদানের পর আবশ্যকীয় বুনিয়াদি বা বিভাগীয় প্রশিক্ষণের ফলাফলকে কর্মকর্তাদের পারস্পরিক মেধাতালিকা প্রস্তুতকরণে গুরুত্ব দেয়ার বা পদোন্নতির মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় নেয়ার দীর্ঘদিনের দাবি এমনকি এ-সংক্রান্ত আইন জারি হওয়ার ছয় বছর পরও উপেক্ষিত হয়ে আসছে। ফলে প্রশিক্ষণার্থী কিংবা কর্তৃপক্ষ কারো কাছেই প্রশিক্ষণ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা এবং মাঠ প্রশাসনে কর্মরত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব কর্মকর্তা/কর্মচারীর জন্য জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা নীতিমালা ২০২৩ প্রণীত হয়েছে, যার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রশিক্ষণকে আকর্ষণীয় উপভোগ্য ও প্রণোদনামূলক করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ও অনুষদ সদস্যদের দক্ষতা ও মানসিকতার উন্নয়ন সাধন এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সাধন করা। এ মহৎ উদ্দেশ্যটিও জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের নিষ্ক্রিয়তায় সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হতে পারছে না। জানা যায়, জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের অষ্টম সভা ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তার আগে ২০ বছর কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির সভা হয়েছে গত ১১ বছরে মাত্র তিনটি। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আলাপ-আলোচনা এবং প্রতীক্ষার পরও এ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের প্রশিক্ষণকে এগিয়ে নেয়ার জন্য জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালা প্রণীত হয়নি।

প্রশিক্ষণ প্রদানের পর কর্মক্ষেত্রে তার প্রভাব বা কার্যকারিতা নিরূপণের বিধিবদ্ধ কোনো অনুশাসন নেই এবং নির্ধারিত কোনো পদ্ধতি চালু নেই। প্রশিক্ষণার্থী কিংবা তার কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণকে কেবল রুটিনমাফিক কাজ বলে মনে করেন বা কেবল পালনীয় দায়িত্ব বলে মনে করেন। প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সর্বদা জ্ঞানচর্চায় থাকতে হয় এবং জাতীয় বা বৈশ্বিক সব বিষয়ে নিজেকে হালনাগাদ রাখতে হয় কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য যে প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন শেষে চাকরি থেকে অবসরের পর তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদানের নজির নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, একটা দেশের শিক্ষিত, জ্ঞানী এবং প্রশিক্ষিত ব্যক্তি সমাজে বা রাষ্ট্রে কতটুকু সমাদৃত ও সম্মানিত। জ্ঞান ও দক্ষতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় একজন প্রশিক্ষক অবশ্যই সম্মানিত। অন্যদিকে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আইনের শাসন বা সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে কোনোমতেই সেখানে জ্ঞানী, শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত ব্যক্তি সম্মানিত হতে পারেন না।

প্রশিক্ষণ খাতকে কার্যকর, মর্যাদাশীল এবং আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। যেমন ১. প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানে আগ্রহী ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বা প্রশিক্ষকদের নিয়োগ বা পদায়ন করা এবং প্রশিক্ষকদের পূর্ণহারে বিশেষ ভাতা ও অন্যান্য যৌক্তিক সুবিধাদি প্রদান করা ২. চাকরিতে প্রবেশের পর অত্যাবশ্যকীয়/কোর প্রশিক্ষণগুলোর ফলাফলকে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে এবং পদোন্নতির মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনায় নেয়া ৩. প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা। প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গভর্নিং বডি গঠন করে তার মাধ্যমে পরিচালিত করা ৪. প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানে সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বাজেট নিশ্চিত করা ৫. প্রশিক্ষণ প্রদানের আগে প্রশিক্ষণের চাহিদা নিরূপণ ও কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের প্রভাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং প্রশিক্ষণোত্তর যথাযথ পদে পদায়িত করা ৬. প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অবসরোত্তর ব্যবহারের লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা ৭. জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালা অবিলম্বে প্রণয়ন করা এবং জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলসহ এ-সংশ্লিষ্ট সব কমিটি সচল করা ৯. প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিধিবিধান প্রণয়ন, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সমন্বয়সাধন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নকাজ যথাযথ সম্পাদনের লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে মানবসম্পদ বিভাগ নামে নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা ১০. সর্বোপরি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

মো. আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার এনডিসি: অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও সাবেক রেক্টর, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমি

আরও