কভিড-১৯

ভ্যাকসিন র‍্যাশনালিটি

চার্লস ডিকেন্সের গ্রেট এক্সপেক্টেশনস উপন্যাসে শিশু পিপ বলেছিল, “শিশুদের ছোট্ট দুনিয়াতে যেটা সবচেয়ে ভালোভাবে টের পাওয়া যায়, তা হল অন্যায়।” আমরা করোনা মহামারির এসময়ে কথাটিকে এভাবে বলতে পারি : মহামারির কবলে পড়া সমগ্র মানব জাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ফুটে উঠেছে স্বার্থপরতা, বৈষম্য ও বঞ্চনা। এসবকিছু মহামারি-পূর্ব সময়েও বিদ্যমান ছিল, মহামারি তাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

চার্লস ডিকেন্সের গ্রেট এক্সপেক্টেশনস উপন্যাসে শিশু পিপ বলেছিল, “শিশুদের ছোট্ট দুনিয়াতে যেটা সবচেয়ে ভালোভাবে টের পাওয়া যায়, তা হল অন্যায়।” আমরা করোনা মহামারির এসময়ে কথাটিকে এভাবে বলতে পারি : মহামারির কবলে পড়া সমগ্র মানব জাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ফুটে উঠেছে স্বার্থপরতা, বৈষম্য ও বঞ্চনা। এসবকিছু মহামারি-পূর্ব সময়েও বিদ্যমান ছিল, মহামারি তাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। শিশু পিপের অনুভূতির তীব্রতা বড়রাও যে অনুভব করে না তা নয়— তবে তাদের প্রকাশভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য আছে। আমাদের যাপিত জীবনে যেসব অন্যায়, অসাম্য, আধিপত্য প্রতিদিন আমাদের আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেধেঁ রেখেছে— যেগুলোতে কোনভাবেই আমাদের সম্মতি নেই— এহেন পরিস্থিতি থেকেই আমাদের মনে তীব্রভাবে এ বোধের জন্ম হয়। পৃথিবীর কোন একটি অংশে মানবতার এই বিপন্নতা আমাদের পীড়িত করলেও তার থেকে বেরিয়ে আসার সহসা কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যেমন, গাজায় ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের অসম যুদ্ধ এবং অন্যায়ভাবে একজন নারী সাংবাদিককে আটক ও হেনস্থা করা আমাদের পীড়িত করে।

ন্যায্যতার পরিসর সঙ্কুচিত হওয়ার কারণেই অন্যায় দূর করা যাচ্ছে না। অন্যায়ের মাত্রা কার্যকরভাবে কমানো গেলে ন্যায্যতার প্রসার করা যায়। যুক্তিনির্ভর আলোচনার মধ্যে দিয়ে আমরা বিভিন্নভাবে অন্যায্যতাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারি। ন্যায্যতার সন্ধানে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতাই দায়ী নয় বরং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণেও অন্যায়ের সৃষ্টি হয়। বন্ধু এস্টেলার অপমান কিংবা বড় বোনের জুলুমের বিষয়টি শিশু পিপের মনে দাগ কেটেছিল, কারণ, তার আশপাশের মানুষদের আচরণে অন্যায্যতা ছিল। কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতার পথ— অর্থাত্ প্রাতিষ্ঠানিক নীতিকাঠামো, আইনকানুন, বিধিবিধানের পথ-পদ্ধতি খুঁজতে গিয়ে আচরণের ন্যায্যতার কথা ভুললে চলবে না। অন্যদিকে, সমাজে ন্যায্যতা ও নৈতিকতা প্রসারের জন্য তথ্য ও জ্ঞানের গুরুত্ব অনেক বড় বিষয়, এটিকে হেলাফেলা করা চলে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি কথা ক্লাস রুমে খুব বলা হতো, “দেয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ”। অর্থাত্ পৃথিবীর যেসব দ্রব্য বা সেবা মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে দরকার হয়, সেগুলোর পেতে হলে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। কারণ, সেটিকে চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয় বস্তু হতে গেলে তাকে দস্তুরমতো বিরাট এক ভ্রমণের মধ্যে দিয়েই যেতে হয়েছে। এই যাত্রাপথে বস্তুটি সৃষ্টির জন্য উত্পাদনের উপকরণ, কাঁচামাল, মানব শ্রম, দক্ষতা, বুদ্ধিবৃত্তি ইত্যাদি লেগেছে। এগুলোর কোনটিই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। ফলে, যখন চূড়ান্ত ভোগ্যপণ্যটি তৈরি হল, তার মূল্য পরিশোধ করলেই কেবল তা পাওয়া যাবে। এই বিষয়টি কোভিড-১৯ বা করোনা প্রতিরোধের টিকার ক্ষেত্রেও একশ ভাগ সত্য। কিন্তু করোনার টিকা নিতে আমাদের পকেট থেকে টিকা-ক্রয়মূল্য ও তার সেবা গ্রহণের দাম দিতে হলো না কেন? দাম তো দিতেই হয়েছে, কারণ, অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মতো এটিরও ওপরে উল্লিখিত ভ্রমণ ব্যয় হয়েছে। আমরা জানি, আমাদের পক্ষ থেকে দাম দিয়েছে সরকার। আমরা সরাসরি দাম পরিশোধ করিনি। আর সরকার কেবল টিকা কেনার দামই দেয়নি বরং এর পরিবহন, সংরক্ষণ, বিভিন্ন টিকা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন-ভাতা, রেজিস্ট্রেশন সফ্টওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যয় ইত্যাদি বা সংক্ষেপে সংশ্লিষ্ট সেবার দামও দিয়েছে সরকারই। আমরা এও জানি সরকারের নিজস্ব কোন টাকা নেই। জনসাধারণের কাছ থেকে কর ও ভ্যাট বাবদ সরকার যতটুকু আদায় করে, তা দিয়েই সরকার চলে।

অর্থনীতিতে সকল পণ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় : একটি হল প্রাইভেট গুডস বা ব্যক্তিগত ভোগ্যপণ্য আর অন্যটি হল পাবলিক গুডস বা সর্বজনীন ভোগ্যপণ্য। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যেসব সাধারণ দ্রব্য (নরমাল গুডস) বাজার থেকে কিনি যেমন, চাল, ডাল, পোষাক, জুতা— এসবই হল ব্যক্তিগত ভোগ্যপণ্য। আর সর্বজনীন ভোগ্যপণ্য হল রাস্তা-ঘাট, সেতু, সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি। ব্যক্তিগত ভোগ্যপণ্য মানুষ বাজার থেকে কেনে। কিন্তু বাজারে গেলে প্রতিটি পণ্যের যে দাম আমরা পাই— সেটি কীভাবে নির্ধারিত হয়? নির্দিষ্ট পরিমাণে একটি পণ্য কিনতে ক্রেতা সর্বোচ্চ কতটুকু দাম দিতে প্রস্তুত এবং বিক্রেতা নূন্যতম কতটুকু না পেলে বিক্রিই করবেন না— এ দুইয়ের সামঞ্জস্যের ভেতর দিয়ে বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হয়। সাধারণত বিক্রেতা ব্যয়ের সঙ্গে মার্জিন (কম বা বেশি হতে পারে) যোগ করে তার পণ্য ক্রেতার হাতে তুলে দেন। কিন্তু কোভিড-১৯ বা করোনার টিকা এভাবে বিক্রি হতে পারবে না। কেন নয়? বিষয়টি একটু জটিল। বিষয়টি বুঝতে আরও কিছুটা ভ্রমণ আমাদের করতে হবে। তবে আপাতত এটুকু বলে রাখি— কোভিডের টিকা নরমাল গুড বা সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়।

অথচ টিকার চাহিদার দিকে তাকালে মনে হতে পারে যে, বাজারে এর এমন আকাশচুম্বি ডিমান্ড— সবাই তো এর দাম দিতে রাজি— দাম একটু বেশি হলেও তারা কিছু মনে করবে না— ফলে সরকার এমন লোভনীয় জিনিসকে কেন বাজারে ছাড়ছে না? আর যখন মানুষ নিজের পকেটের পয়সা খরচ করতে রাজি, তখন তাদের বিনামূল্যে টিকা দিয়ে সরকার কেন অর্থ অপচয় করছেন? আর তাছাড়া জনগণের টিকা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে সেবা সরকার দিচ্ছেন, সেটাও তো কম ব্যয় সাপেক্ষ নয়। পুরো ব্যপারটিই তো সরকার বেসরকারি ঔষধ কোম্পানি, বাণিজ্যিক সেবা প্রদানকারি সংস্থা কিংবা অন্ততপক্ষে বড় এনজিওগুলোর হাতে ছেড়ে দিলেই তো পারে!

অর্থনীতির আলোচনায় উপরের যুক্তিগুলো ধরেই যদি আমরা এগোই, তবে, প্রথমত: দেখব যে, যখনই পয়সা খরচ করে টিকা (কিংবা অন্য যেকোন বস্তু) কিনতে হবে— তখন কিছু লোক সেটি কিনবে না। কারণ সকলের আর্থিক সঙ্গতি সমান নয়। তাছাড়া পছন্দের তালিকায় গুরুত্বের দিক বিবেচনায় প্রত্যেকের চয়নক্রম ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। বাজারে অন্যান্য স্বাভাবিক পণ্য বা নরমাল গুডের ক্ষেত্রে— যেমন, চাল, আটা, চা, কফি ইত্যদির ক্ষেত্রে দাম বেড়ে গেলে ভোক্তা পরিমাণে কম ক্রয় করবে বা তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বিকল্প ভোগ্যপণ্যের দিকে চলে যাবে। কোভিড মহামারির সময়ের বিভিন্ন সমীক্ষায় আমরা দেখেছি— গরীবদের আয় কমে যাওয়ায় খাদ্য কেনার সামর্থ্য কমে গেছে, ফলে তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। অন্য একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, সারা দেশের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৪ শতাংশ এবং ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু দৃষ্টিত্রুটিতে ভুগছে। অবশ্য শেষোক্তটি করোনা মহামারি-পূর্ব তথ্যের ভিত্তিতে করা।

কিন্তু একজন খাদ্য গ্রহণের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগলে, তার প্রতিবেশি যিনি পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করতে পারছেন, তার পাশের জনের এমন অবস্থা দেখে তার মানবিক অনুভবের পীড়ন ছাড়া কোন শারীরিক ক্ষতিই হয় না। কিন্তু করোনা ভাইরাস এমন নয়। একজন টিকা গ্রহণ করলে প্রতিবেশি যদি টিকা না নিয়ে থাকেন তবে টিকা গ্রহণকারিরও সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে সরকার যদি বিনামূল্যে বিতরণ না করে, করোনার টিকার বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা বাজারের হাতে ছেড়ে দিত তবে ব্যপারটি কী ঘটতো? ধরা যাক, কোন একজনের সামর্থ্য রয়েছে বলে সে অক্সফোর্ড-এস্ট্রাজেনেকার টিকা কিনলো, দুই ডোজই নিলো, তাতেও কিন্তু সে ১০০ ভাগ সুরক্ষিত নয়। তার পাশের জন যদি টিকা কিনতে অসমর্থ্য হন কিংবা তার চয়নক্রমে টিকা যদি ওপরের দিকে না থেকে থাকে, অর্থাত্ যদি তিনি টিকা না নিয়ে থাকেন, তবে প্রথমজনের সংক্রমিত হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়ে গেল। এধরনের বিষয়কে অর্থনীতিতে বলে বহিস্থ বিষয় বা এক্সটার্নালিটিজ। যেসব পণ্যের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যই এমন যে, আমি কনজিউম করলে আমার তো প্রয়োজন পূরণ হলোই সঙ্গে অন্যেরও উপকার হচ্ছে— সেসব ভোগ্যপণ্য বাজারের মাধ্যমে বিতরণের চেয়ে ‘ফ্রি’তে বা বিনামূল্যে বিতরণ করলে বেশি সুফল পাওয়া যায়। কারণ, এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, সমাজে যেন এটি বৃহত্ পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অধিকাংশকে (ধরা যাক ৮০ ভাগ জনগোষ্ঠিকে) ভ্যাকসিনেটেড বা টিকাকরণ করতে পারলে সমাজ অধিকমাত্রায় সুরক্ষিত হবে। তবে এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন-সুরক্ষা কেবলমাত্র একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরেই সীমিত রাখতে হবে নাকি প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর প্রতিও— আমাদের পড়শি নাগরিকের মতো— একই যুক্তির কর্তব্যদায় রয়েছে— সে আলোচনাটায় একটু পরে আসছি। আবার কেউ বলতে পারেন যে, ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’— কিন্তু আমি আগেই বলেছি, কোভিডের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এই যুক্তি ভ্যাকসিন র্যাশনালিটি নয়।

ভ্যাকসিন-র‍্যাশনালিটি বা টিকাকরণের-যৌক্তিকতা এ বিষয়ের একটিমাত্র দিক। ভ্যাকসিন-জাস্টিস বা টিকাকরণের-ন্যায্যতার প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য এক্ষেত্রে পরিসরটি অনেক বড় হয়ে যায়— এমনকি তা টিকার পরিধি ছাড়িয়ে স্বাস্থ্য ও গুণগত শিক্ষা সংক্রান্ত সরকারি সেবার ব্যপক বৃদ্ধি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের দেশে যদি টিকা বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হতো, তবে যার টিকা কেনার সামর্থ্য নেই— তাকে মৃত্যুর ঝুঁকি (শ্বাসকষ্টজনিত) নিয়ে বাঁচতে হবে— এটি ন্যায্যতার পরিপন্থি কাজ হতো। বাংলাদেশ সরকার তার সীমিত সম্পদের মধ্যেই যে বিনামূল্যে জনসাধারণকে টিকাকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন— এটি কেবল ভ্যাকসিন-র্যাশনালিটি হিসেবেই সঠিক তা নয়, বরং ভ্যাকসিন-জাস্টিস বা টিকাকরণের-ন্যায্যতার প্রশ্নে একটি প্রগতিশীল ভাবনা ও অনেক দেশের তুলনায় অগ্রসর সিদ্ধান্ত। কোন একটিমাত্র উত্স নিয়ে নির্ভরতার কারণে যে সরবরাহগত সমস্যার সমালোচনা হচ্ছে, সেটি এদিকটিও বিবেচনায় রাখছেন না যে, সরকার টিকাকরণের-যুক্তি বা টিকা-ন্যায্যতায় শতভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং টিকা প্রদানের সেবা বিতরণেও অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সরবরাহজনিত এ ঘাটতি আশা করি শিঘ্রই কাটিয়ে উঠা যাবে। তাছাড়া তৃতীয় বিশ্বের দেশে মানুষের অতি প্রত্যাশার সঙ্গে যেকোন সরকারের পক্ষেই কুলিয়ে ওঠা বেশ কঠিন। কেউ ভালো কাজ করলে স্বীকার করা যাবে না, সমালোচনাই করতে হবে, এটিও ঠিক নয়। এখানে সরকারের সমগ্র কাজের মূল্যয়ণ নয়, কেবলমাত্র টিকাকরণের একটি দিক নিয়ে আলোচনা করছি।

ভ্যাকসিন-র‍্যাশনালিটি মূলত: সমাজকে ভ্যাকসিন-কেপাবিলিটির বা টিকাকরণের সক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নিয়ে যাবে। আর এই ভ্যাকসিন-কেপাবিলিটি আমাদের ভ্যাকসিন-ফ্রিডম বা টিকা সংক্রান্ত স্বক্ষমতার বৃদ্ধি করবে। কারণ, সমাজে টিকাকরণের-যুক্তি যত বেশি ন্যায়ানুগভাবে ব্যবহৃত হবে ততই সমাজের উন্নয়ন ঘটবে। সমাজে বিদ্যমান অসহনীয় রকমের বৈষম্য, অন্যায় ও বঞ্চনা কিছুমাত্র কমাতে সক্ষম হলে সমাজে মানুষে-মানুষে বন্ধন দৃঢ় হবে। এতে করে আমরা আগের তুলনায় একটি গ্রহণযোগ্য সংহতিপূর্ণ সমাজ পাবো। এই মহামারির চরম সঙ্কটে বিনামূল্যে বিপুল হারে সকলকে টিকাকরণের আওতায় আনা গেলে সমাজের ভ্যাকসিন-ফ্রিডম বা টিকা সংক্রান্ত স্বক্ষমতা বাড়বে। আর যদি তা করতে আমরা ব্যর্থ হই তবে সমাজে টিকা কেন্দ্রিক নতুন মেরুকরণ বা নতুন টিকা-শ্রেণি সৃষ্টি হতে পারে— যা কোনভাবেই কাম্য নয়। করোনা-পরবর্তী বিশ্বে ভ্যাকসিন-ভিসা কিংবা ভ্যাকসিন-পাসপোর্টের প্রচলন হলে টিকা-বঞ্চিত মানুষের স্বক্ষমতা বা ফ্রিডম আরও বেশি করে সংকুচিত হবে। সকলকে টিকাকরণ করতে না পারলে টিকা-সংক্রান্ত-অধীনতা বা ভ্যাকসিন-আনফ্রিডমের পরিণতি আমাদেরকেই বহন করতে হবে— যেটি মানুষের বিদ্যমান অধিকারের অবস্থাকে আরও খর্ব করবে। এতে সমাজে নয়েজও বেড়ে যাবে। সুতরাং বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভ্যাকসিন-আনফ্রিডম দূর করতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যেগ গ্রহণ হতে হবে।

ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট এ পর্যন্ত যা বিনিয়োগ করেছে তার ৪২ শতাংশ মুনাফা করেছে। বাংলাদেশেরও একটি কোম্পানি এপর্যন্ত টিকা আমদানি করে বেশ মোটা অঙ্কের মুনাফা করেছে। মানবতার এমন দূর্যোগে এধরনের মুনাফা বেশ দৃষ্টিকটু। সেরাম তার টিকার দাম একবার চার শ রুপি ঘোষণা করে একদিন পর আবার তা তিন শতে নামিয়ে আনে। এটি একচেটিয়াকরণের (মনোপলি বা অলিগোপলির) সমস্যা। উত্পাদক (বহুসংখ্যক) পর্যায়ে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করলে এধরনের স্বেচ্ছাচারিতা এড়ানো সম্ভব হতো।         

সবশেষে বলব এই মহামারি প্রতিরোধে তথ্য ও জ্ঞানের গুরুত্বকে স্বীকার করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। টিকা নিয়ে প্রথমদিকে যেসব গুজব ছড়ানো হয়েছিল, এখন এগুলো কিছুটা দূর্বল হলেও সমাজে রয়ে গেছে। সরকার ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখ থেকে বিনামূল্যে গণটিকাদান শুরুর কিছু আগে থেকেই টিকা-বিরুদ্ধ গুজব ছড়ানো হয়েছিল। যুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞান ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাজের মানুষকে যত বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে, ততই জনস্বাস্থ্যের এদিকটিকে মোকাবিলা করতে আমরা সক্ষম হবো। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে আমাদের দৃষ্টির বৈশ্বিক প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সমকালীন পৃথিবীতে অর্থনীতির কার্যকারণ সূত্র থেকে পরিবেশগত অবক্ষয় পর্যন্ত ন্যায্যতা সম্পর্কিত নানা বিষয়ে প্রাসঙ্গিক জ্ঞানের অনুসন্ধান কিছুটা বিপদের মুখে পড়েছে, এবং সেই কারণে এই দিকটিতে জোর দিতে হবে। দার্শনিক টমাস হবেসর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু যে যুক্তিতে আমি আমার প্রতিবেশি ভাই বা বোনের টিকাকরণ করতে আগ্রহী, ঠিক একই যুক্তিতে আমার আশপাশের দেশের নাগরিকদের জন্যও টিককাকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ আঞ্চলিক দিক দিয়ে সংযোগের যে কেন্দ্র বা হাবে পরিণত হয়েছে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রপ্রধানরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তি ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবাষিকীতে সশরীরে যোগদান করেছেন— এ সম্পর্ককে টিকা-সহযোগিতার মাধ্যমে আরও সংহত করা যায়। এক্ষেত্রে দার্শনিক ডেভিড হিউম খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়। হিউম ন্যায্যতার বিষয়ে তাঁর চিন্তাকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের সঙ্কীর্ণ ধারণার মধ্যে আটকে রাখেননি। রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরে বৈশ্বিক ন্যায্যতা বলে কিছু হতে পারে না— সেটি টিকার ক্ষেত্রে হলেও— এমন কোনও ধারণা তাঁর চিন্তায় স্থান পায়নি। ন্যায্যতার পরিধি প্রসারিত করা, নৈতিকতার চর্চায় জ্ঞানের গুরুত্ব, মানুষের যুক্তিপ্রয়োগের বিবিধ রূপ ইত্যাদি যেসব বিষয়ে হিউম জোর দিয়েছেন, দৃষ্টির বৈশ্বিক প্রসারণে সেগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।

তথ্যসূত্র:

অচিন চক্রবর্তী (২০২১, মে ৫). যে কাজ বাজার পারে না: যখন কেন্দ্রের দায়িত্ব নেওয়ার কথা, প্রধানমন্ত্রী হাত গুটিয়ে নিলেন. Anandabazar.Com. https://www.anandabazar.com/editorial/essays/narendra-modi-cant-deny-central-governments-responsibility-of-mass-vaccination/cid/1279358

2.      Sen, A. (2011, December 29). The Boundaries of Justice: David Hume and our world. The New Republic, 242, number-20(4915), 23–26. https://newrepublic.com/article/98552/hume-rawls-boundaries-justice

3.      Sen, A. (2009). The Idea of Justice (1st ed.). Belknap Press of Harvard University Press.

4.      Sen, A. (2004, February 5). Amartya Sen · Why We Should Preserve the Spotted Owl: Sustainability · LRB 5 February 2004. London Review of Books, 26(Number 3). https://www.lrb.co.uk/the-paper/v26/n03/amartya-sen/why-we-should-preserve-the-spotted-owl

5.      Sen, A. (2004a). Rationality and Freedom (1st ed.). Belknap Press: An Imprint of Harvard University Press.

6.      নিজস্ব প্রতিবেদক. (২০২১, মে ১৭). টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে চিন্তিত সরকার.  The Daily Prothom Alo. https://www.prothomalo.com/bangladesh/coronavirus/wUKvi-wØZxq-ডোজ-নিয়ে-চিন্তিত-সরকার

7.      নাজনীন আখতার. (২০২১, মে ১৯). গবেষণার তথ্য: দৃষ্টিত্রুটিতে ঢাকার ৪০% শিক্ষার্থী.  The Daily Prothom Alo.  https://www.prothomalo.com/bangladesh//দৃষ্টিত্রুটিতে-ঢাকার-৪০-শিক্ষার্থী

8.      মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ. (২০২১, মে ১৭). বন্ধ হচ্ছে অক্সফোর্ডের টিকা প্রয়োগ.  The Daily Bonik Barta. https://bonikbarta.net/home/news_description/263544/eÜ-n‡”Q-A·‡dv‡W©i-wUKv-cÖ‡qvM

9.      Basu, K. (2021d, April 30). Morals and the Vaccine Market. Project Syndicate. https://www.project-syndicate.org/commentary/covid19-vaccine-market-morals-and-economic-self-interest-by-kaushik-basu-2021-04

10.  Rodrik, D. (2021b, May 13). Beware Economists Bearing Policy Paradigms. Project Syndicate. https://www.project-syndicate.org/commentary/economic-policy-must-abandon-universal-paradigms-by-dani-rodrik-2021-05?a_la=english&a_d=609a671553dac60d3cf340ff&a_m=&a_a=click&a_s=&a_p=%2Fcommentary%2Fcovid19-vaccine-market-morals-and-economic-self-interest-by-kaushik-basu-2021-04&a_li=economic-policy-must-abandon-universal-paradigms-by-dani-rodrik-2021-05&a_pa=article-body&a_ps=&a_ms=&a_r=

আহমেদ জাভেদ: দ্য পিপল্স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের

অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক; বাঙলার পাঠশালা

ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি

আরও